ঢাকার মিরপুরের কালসীতে পুরোনো এই পাড়াটা ভোরে এক অদ্ভুত মায়ায় জেগে ওঠে। ফজরের আজান শেষ হতে না হতেই সরু গলির ভেজা বাতাসে রাতভর জমে থাকা ধুলো আর স্যাঁতসেঁতে সিমেন্টের গন্ধ মিশে যায়। পাঁচতলা বাড়িটার দেয়ালে বহু বছরের বৃষ্টির দাগ, কোথাও কোথাও চুন খসে ইট বেরিয়ে এসেছে, যেন সময় নিজের আঙুলের ছাপ রেখে গেছে। নিচে গেটের পাশে দারোয়ানের বসার টুল। তার পাশেই ছোট্ট টিনের টং দোকানে অ্যালুমিনিয়ামের কেটলিতে চায়ের ধোঁয়া উঠছে। রাস্তার কোণার হোটেলে পরোটা ভাজার তেলে কড়কড় শব্দ, পেঁয়াজ কুচির গন্ধ বাতাসে ভেসে এসে তৃতীয় তলার বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দূরে বড় সড়কে বাসের ব্রেক কষার কর্কশ শব্দ, সিএনজির টুংটাং, রিকশার বেলের মৃদু টিংটিং, সব মিলিয়ে শহরটা যেন চোখ মেলে ওঠার আগেই সন্মিলিত শব্দে নিজের উপস্থিতি জানিয়ে দেয়।
শায়লার ফ্ল্যাটে তখন রান্নাঘরের জানালা দিয়ে হালকা নীল ভোরের আলো ঢুকছে। রান্নাঘরটা বড় নয়, কিন্তু খুব গোছানো। দেয়ালে ঝোলানো স্টিলের খুন্তি, কড়াই, চাল ডালের কৌটা, সবকিছু নির্দিষ্ট জায়গায় সাজানো। গ্যাসের চুলায় পাতিল বসানো, তার ভেতরে ভাতের পানিতে ছোট ছোট বুদবুদ উঠছে। পাশে ডিমের ঝোলের পাতিলে হলুদের রঙ ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যের ভেতরেও এখন একটা অদৃশ্য চাপা টান আছে। তেলের বোতলটা আগের মতো ভরতি নয়, কৌটায় চাল মেপে রাখা, ডালের পরিমাণও যেন একটু হিসেবি। শায়লা যখন হাতা দিয়ে ডাল নেড়ে দেয়, তখন তার চোখে শুধু রান্না নয়, পুরো মাসের হিসাবটাও ভেসে ওঠে।
বারান্দা থেকে তাকালে নিচের গলিটা স্পষ্ট দেখা যায়। একপাশে পুরোনো ড্রেনের ওপর সিমেন্টের স্ল্যাব, তার ফাঁক দিয়ে কখনো ময়লার গন্ধ উঠে আসে। পাশের বাড়ির বারান্দায় শুকাতে দেওয়া কাপড় ভোরের বাতাসে দুলছে। একজন স্কুলছাত্র নীল সাদা ইউনিফর্ম পরে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার মা তাড়াহুড়ো করে হাতে টিফিন ধরিয়ে দিচ্ছেন। আরেক কোণে সবজি বিক্রেতা মাথায় বাঁশের ডালা নিয়ে হাঁক দিচ্ছে, “টাটকা লাউ, বেগুন, টমেটো।” এই হাঁকগুলো আগে ছিল সাধারণ সকালের শব্দ, এখন এগুলো শুনলেই শায়লার মনে পড়ে যায় দাম কতটা বেড়েছে।
আজও সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। নিচে গলির মুখে ভ্যানওয়ালা ডিম বিক্রি করছে। তার গলায় টানা সুর, “ডিম লাগবে, ডিম।” সেই সুরে কেমন যেন ক্লান্তি মেশানো। আগে এই হাঁক শুনলে শায়লা ভাবতো, কাল সকালে বাচ্চাদের জন্য অমলেট করা যাবে। এখন হাঁক শুনলেই প্রথমে মাথায় আসে দাম কত। যুদ্ধটা কোথায় হচ্ছে, কোন দেশের ওপর কোন দেশ রাগ করেছে, কোন সমুদ্রপথে জাহাজ আটকে আছে, এইসব বড় বড় খবর সে ঠিক বোঝে না। কিন্তু একটা জিনিস খুব ভালো বোঝে, ডিমের হাঁক আগের চেয়ে অনেক বেশি বিষণ্ন শোনায়।
পেছন থেকে মাহবুব বলল, “চা দেবে?”
শায়লা ফিরে তাকিয়ে হালকা হাসে। “তা দেব, তবে চিনি কিন্তু অর্ধেক।”
“অর্ধেক চিনি খেলে নাকি মানুষ বেশি দিন বাঁচে।”
“সংসারের খরচ বাড়লে সব মানুষই বেশি দিন বাঁচার কৌশল শিখে যায়।” ম্লান হেসে শায়লা উত্তর দেয়।
এই ধরনের কথাগুলো ইদানীং সংসারে খুব বেশী করে উচ্চারিত হয়। কথাগুলো খুব বড় কিছু নয়, তবু ভেতরে ভেতরে একটা মায়া আছে। ছোট্ট ড্রইংরুমে পুরোনো সোফা, যার এক কোণ একটু বসে গেছে। সিলিং ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু গরম কমছে না। ফ্যানের শব্দে এক ধরনের ঘুমঘুম ক্লান্তি। রিদম পড়ার টেবিলে বই খুলে বসেছে, কিন্তু মাঝে মাঝে মোবাইলে নিউজের শিরোনাম দেখে। মুনা মেঝেতে বসে রং পেন্সিল দিয়ে একটা বাড়ি আঁকছে। বাড়িটার ওপরে বড় করে সূর্য এঁকেছে। শায়লা দেখে মনে মনে হাসল। বাচ্চারা সবসময় বাড়ির ওপর সূর্য আঁকে। তারা জানে না, বড়দের বাড়ির ওপর মাঝে মাঝে সূর্যের বদলে বাজারের হিসাব ঝুলে থাকে।
রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ আসছে। গন্ধটা আগের মতো তীব্র নয়। পেঁয়াজ এখন হিসেব করে দিতে হয়। শায়লা কড়াই নেড়ে দেখলো। আলুর সঙ্গে সামান্য ডিম কুচি মিশিয়ে সামান্য ঝুল দিয়ে একটা তরকারি করেছে। আগে এটাকে সে “ডিম ভাজি” বলত। এখন মনে মনে নাম দিয়েছে “ডিমের ঝোল।” মাহবুব টেবিলে বসে খবরের কাগজ খুলল। প্রথম পাতায় বড় বড় ছবি, দূরের শহরে ধোঁয়া উঠছে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কাগজ ভাঁজ করে রাখলো। যুদ্ধের ছবি দেখতে দেখতে তার এখন রান্নাঘরের তেলের বোতল মনে পড়ে যায়। মানুষের মনও অদ্ভুত, দূরের আগুনকে নিজের চুলার আগুন দিয়ে মাপে।
সন্ধ্যেয় অফিস থেকে বাসায় ফিরে মাহবুব ড্রয়ীংরুমের সোফায় বসে জুতোর ফিতে খুলছে। এমন সময় ছোট্ট মুনা হঠাৎ বলল, “আব্বু, যুদ্ধ কি আমাদের বাসায়ও আসবে?”
মাহবুব একটু থেমে বললেন, “না মা, যুদ্ধ বাসায় আসে না।”
রিদম বই থেকে মুখ তুলে শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু বাজারে তো আসছে।”
ঘরটা এক মুহূর্ত চুপ হয়ে গেল। তারপর মাহবুব হেসে ফেলল। “তুই খুব দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছিস। ব্যাটা”
রিদমও হাসল। “বড় না হয়ে উপায় আছে?”
এই কথার পর কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। বাইরে মাগরিবের আজান শুরু হয়েছে। আজানের সুর ঢাকার গলিগুলোকে এক ধরনের নরম অন্ধকারে ঢেকে দেয়। পাশের ফ্ল্যাট থেকে প্রেসার কুকারের সিটি, কোথাও টিভিতে খবর, কোথাও বাচ্চার কান্না। এইসব মিলিয়ে শহরটা এমন এক পরিচিত সুর তোলে, যেন সব ঘরের কষ্ট আলাদা হলেও তাদের শব্দ এক।
খাওয়ার টেবিলে আজ ডাল, আলু ডিম, আর কাঁচামরিচ। মাহবুব প্রথম লোকমা মুখে দিয়ে বললেন, “মন্দ না।”
শায়লা তাকিয়ে বললেন, “মন্দ না মানে?”
“মানে খুব ভালো।”
“তাহলে খুব ভালো বলো।”
“মানুষ যখন মন্দ সময় পার করে, তখন ভালো শব্দটাও হিসেব করে বলে।”
শায়লা হেসে ফেলে। এই মানুষটার ভেতরে এমন কিছু কথা আছে, যা সে আগে টের পায়নি। কষ্ট মানুষের ভেতরের ভাষা বদলে দেয়। আগে মাহবুব অফিস থেকে ফিরেও চনমনে থাকতো। এখন একটা নরম চুপচাপ ভাব এসেছে। যেন সে সবসময় কিছু ভাবছে, কিংবা হিসেব করছেন। কতদিনের মধ্যে চাল শেষ হবে, স্কুল ফি কবে, বিদ্যুতের বিল কত বাড়ল, অফিসে ছাঁটাই হবে কি না। তবে বাচ্চাদের সাথে আগের মতই সপ্রতিভ।
রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকার। বাইরে দূরের কিছু জেনারেটরের গম্ভীর শব্দ। মুনা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ইয়া, আজ মোমবাতি জ্বলবে।” তার কাছে লোডশেডিং এখনও খেলা। শায়লা ড্রয়ার থেকে মোম বের করে জ্বালালো। মোমের আলোয় ঘরটা বদলে গেল। দেয়ালে মানুষের ছায়া লম্বা হয়ে উঠল। রিদমের মুখে অদ্ভুত গম্ভীরতা। মাহবুব বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
ঢাকার রাতের অন্ধকার কখনো পুরো অন্ধকার না। দূরের বড় রাস্তায় গাড়ির আলো, উঁচু বিল্ডিংয়ের জানালায় আলো, আকাশে আধখানা চাঁদ। কিন্তু লোডশেডিংয়ের সময় শহরের শব্দ বদলে যায়। ফ্যান বন্ধ হলে মানুষ নিজের নিঃশ্বাসও শুনতে পায়। পাশের ফ্ল্যাটে কেউ হাতপাখা নেড়ে দিচ্ছে, সেই মৃদু ফসফস শব্দ তাদের ফ্লাট পর্যন্ত আসে।
শায়লা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। “কী ভাবছ?”
মাহবুব বললেন, “ভাবছি, মানুষ কেমন সহজে বদলে যায়।”
“কে বদলেছে?”
“আমরা। আগে লোডশেডিং হলে বিরক্ত হতাম। এখন মনে হয়, এতে বিদ্যুতের বিল একটু কমবে।”
শায়লা চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “আমি আজ বাজারে গিয়ে মাছের দাম শুনে রেখে চলে এসেছি।”
“খারাপ লাগছে?”
“না। শুধু মনে হলো, ইলিশ মাছ এখন গল্প করার জিনিস।”
দুজনেই হেসে ফেলল। হাসির মধ্যে বিষণ্নতা থাকলেও সেটা আরও সুন্দর শোনায়।
পরদিন শুক্রবার। সকালটা একটু অলস। বাসার পাশের টংয়ের চায়ের দোকানে রেডিওতে পুরোনো গান বাজছে। মাহবুব বাজারে গেল। কাঁচাবাজারে ঢুকতেই ভ্যাপসা গন্ধ। মাছ, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা, কাদা, গলে যাওয়া বরফ, মানুষের ঘাম, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আঁশটে গন্ধ।
সে সবজির দাম জিজ্ঞেস করে দাম শুনেই মাথা নাড়ল।
বিক্রেতা বলল, “ভাই, আমাদেরও কিছু করার নাই। ট্রাকভাড়া বাড়ছে। মাল আনতে খরচ বেড়ে যায়।”
মাহবুব বলল, “হুম জানি। সবাই একই কথা বলছে।”
লোকটা হেসে বলল, “কারণ সবার কষ্ট একই।”
এই সাধারণ বাক্যটা তার মনে দাগ কাটে। সত্যিই তো, শহরের সব মানুষ যেন একই অদৃশ্য সুতায় বাঁধা। কারো কষ্ট বেশি, কারো কম, কিন্তু সুতাটা এক।
বিকেলে রিদম বলল, “আব্বু, কোচিংটা বাদ দিই?”
মাহবুব তাকালেন। “কেন?”
“অনলাইনে নোট আপলোড দেয়। ওগুলো ডাউনলোড করে নেব। তুমি একটু বঝিয়ে দিলেই হবে। এতে কোচিংয়ের টাকাটা বাঁচবে।”
শায়লা রান্নাঘর থেকে সবই শুনছিল। তার বুকটা কেমন নরম হয়ে গেল। সন্তানরা কখন বড় হয়ে যায়, মা-বাবা টেরও পায় না।
মাহবুব শুধু বলল, “দেখি।” এই “দেখি” শব্দটার মধ্যে রাজি হওয়া, না হওয়া, ভালোবাসা, কষ্ট সব মিশে আছে।
ঈদের আগে একদিন মুনা এসে খুব আস্তে বলল, “আম্মু, একটা জামা নিলেই হবে।”
শায়লা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “দুইটা না?”
মুনা মাথা নাড়ল। “একটা হলেই সুন্দর লাগবে। দুইটা হলে তো একটা বেশী সুন্দর, আরেকটা কম সুন্দর লাগবে।”
শায়লা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। শিশুদের ছোট ছোট বোঝাপড়া কখনো কখনো বড়দের সমস্ত চিন্তাকেও হার মানায়।
রাতে লোডশেডিং হলে মাহবুব শায়রাকে নিয়ে ছাদে উঠে। ঢাকা শহর যেন আলোয় রাঙ্গানো একটা বাগান। প্রতিটি জানালা এক একটি ফুল। কোথাও হাসি, কোথাও হিসাব, কোথাও ঝগড়া, কোথাও প্রার্থনা। দূরের যুদ্ধের ধোঁয়া এখানে দেখা যায় না, কিন্তু তার ছোঁওয়া আছে প্রতিটি ঘরের আলোয়।
সে ধীরে বলে, “শায়লা, মানুষ আসলে খুব শক্ত।”
শায়লা জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“কারণ সে কম নিয়েও বেঁচে থাকার নতুন নিয়ম বানিয়ে ফেলে।”
শায়লা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “আসলে ভালোবাসা থাকলে নিয়ম বানানো সহজ হয়।”
নিচে কোথাও একটা বাচ্চা হাসছে। দূরে কুকুর ডাকছে। ফ্লাইওভারের গাড়ির আলো সাপের মতো এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা শহর তার সমস্ত ক্লান্তি, কোলাহল, অনিশ্চয়তা নিয়েও বেঁচে আছে। তাদের পরিবারও বেঁচে আছে। ডাইনিং টেবিলে হয়তো আগের চেয়ে কম পদ, তবু সুখ বেশি। বারান্দায় হয়তো আগের চেয়ে কম সময়, তবু পাশাপাশি দাঁড়ানো বেশি। কষ্টেরও এক ধরনের সৌন্দর্য আছে, যদি তা মানুষকে কাছাকাছি আনে।
সেই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে শায়লা তেলের বোতলটা হাতে নিয়ে দেখল, খুব বেশি নেই। আশ্চর্যের বিষয়, আজ আর সেটা দেখে তার ভয় লাগলো না। বরং মনে হলো, কাল আবার নতুন দিন হবে। গলির চায়ের দোকানে কেটলি চাপবে, রিকশার ঘণ্টি বাজবে, বাচ্চারা স্কুলে যাবে, মাহবুব অফিসে বেরোবে, আর সে ভাত বসাবে।
জীবন আসলে এতটুকুই। দূরের যুদ্ধ পৃথিবীর মানচিত্র বদলায়, আর সংসারে বদলে যায় ভাতের পরিমাণ। তবু মানুষ বেঁচে থাকে, কারণ প্রতিটি রাতের শেষে ঢাকার আকাশে ভোর ঠিকই আসে। সেই ভোরের আলোয় বারান্দার গ্রিল, রান্নাঘরের পাতিল, স্কুলব্যাগ, খবরের কাগজ, সবকিছু আবার নতুন করে প্রাণ পায়। শায়লার ছোট্ট ফ্ল্যাটে সেই প্রাণটার নামই হয়তো আশা।