রোদ বৃষ্টির খেলা

মুক্তির চেতনা সংখ্যা

বশির আহমেদ
  • ৩৯
  • ১৪
জলপাই গাছের ছায়াটি বারান্দায় এসে পড়েছে। সূর্যটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। গাছের সবুজ কচি পাতা সূর্য়ের আলো পড়ে চিকচিক করছে। তবে এ বছর গাছে খুব একটা জলপাই ধরেনি। মাথার চুল ছড়িয়ে দিয়ে শারমীন গাছের তলায় এসে বসেছে। বড় ভাইয়ের ঘরের দিকে তাকাল শারমিন| দরজাটা ঘর থেকে ভেজানো। ভাইয়া ঘরেই আছে। এ সময়টায় ভাইয়া ঘরেই থাকে। নিজের কথা ভাবতে পারেনা শারমীন| বড় ভাই সংসারে থেকেও না থাকার মত। আর শারমীন সংসারের বোঝা। শহিদের কথা মনে হলেই বুকে আগুন জ্বলে উঠে।

সেত আর খুব বেশী দিন আগের কথা নয়। গাছ পানে তাকিয়ে তাকিয়ে পাতা গুনতে শুরু করে। আর গোনা সম্ভব নয়। কোত্থেকে একটা পাখী এসে গাছটায় বসল। চিকন ডালটা নড়ে উঠল। পাখীর ভারে ডালটা দুলতে লাগল। শহিদ এখন হয়ত কাজে গেছে। হয়ত কাজটাই ছেড়ে দিয়েছে। রুনা সারা মাঠ জুড়ে খেলে চলছে। শহিদ মেয়েটাকে খুব আদর করে। মেয়েটাও হয়েছে বাপের নেওটা। বাবা বাসায় থাকলে সাড়া বাড়ী মাতিযে রাখে। শারমীন আবার ভাবতে চেষ্টা করে শহিদ এখন কোথায আছে? কিছুই জানেনা শারমীন| মেয়েটা একদিন হঠাৎ গেট পেরিয়ে বাইরে চলে গিয়েছিল। শারমীন তখন রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল। কিছুক্ষন পর মহল্লার এক লোক পাজাকোলা করে রুনার থেতলানো দেহটা বয়ে নিয়ে এসেছিল।

পাখীটা অচিন সুরে ডেকে উঠল। জলপাই ডালটা দুলে উঠল। ডালের সাথেসাথে দু একটা জলপাই দোল খাচ্ছে। পাখীটা উড়ে গেল। ছোট ভাইতো এখনও এলনা। কোথায় কোথায় যে ঘুরে বেড়ায়। ছোট ভাইটাও শেষ পর্যন্ত উচ্ছন্নে গেল। মাঝে মাঝে বড় ভাইকে বলতে ইচ্ছে করে ভাইয়া তুই আর মদ খাইস না। তুই জীবনটাকে আবার নতুন করে গড়ে তোল। এসব কথা বলতে গেলেই রাজিব ক্ষেপে যায়। ছোট হয়ে তুই আমাকে উপদেশ দিতে আসিস।
ভেবে পাযনা শারমীন| ছোট হয়ে বড় ভাইকে ভাল কথা বলায দোষ কোথায়? ছোট বড় যেই হউক উপদেশ দিলে দোষ কি? নিজের কোন দোষ খুজে পাযনা শারমীন| বড় ভাই বাড়ী ছেড়ে চলে গিয়েছিল। দুই বছর বাড়ী আসেনি। বাবার সামান্য কেরানীর চাকরীতে সংসার চলতে চায়না। বড় ভাইয়ের না আসাই উচিত ছিল।
এসে ইতো ভুল করল। বাবা মায়ের চোখের বিষ হলো। বাবা গ্রামের বাড়ীর শেষ জমি টুকু বিক্রি করে এই জমিটুকু কিনে টিনসিটের এই ছোট্র বাড়ী বানিয়েছে। ঘরটিতে চারটি কামরা । একটিতে বাবা মা অপর তিনটিতে তিন ভাইবোন থাকে। ছোট ভাই রাকীব নিজের রোজগারে নিজে চলে। কোথায় খায় কি করে শারমীন কিছুই জানেনা। অনেক কিছুই ভাবছিল শারমীন নিজের কথা শহিদেi কথা, রাজিবেi কথা, রাকীবের কথা আরো কত কি।

শহিদকে কোন দিন ভুলবেনা শারমীন| এ যে ভোলার নয়। জীবনের প্রথম পুরুষ। স্বামীর সংসার নিয়ে সুখেই ছিল। রুনার দর্ঘটনায় মারা যাওয়ার জন্য সকল দায় শারমিনেরi উপর চাপিয়ে লোকটি কোথায যে হারিয়ে গেল। আর ফিরে এলনা। দেখতে দেথতে পাঁচ পাঁচটি বছর কেটে গেল। বাধ্য হয়ে শারমীন কে বাবার সংসারে গলগ্রহ হতে হলো। kহিদ তার কাছে কি ছিল? লোকটা বুঝতে পারলো না। তাই তার জীবনের এই সর্বনাশ। ছায়া দ্রুত সরে যাচ্ছে। সূর্য অস্তাচলে প্রায়। চুল গুলো বাতাসে উড়ছে| শারমিনেরi বুক থেকে দীর্ঘ শ্বাস বেড়িয়ে এল। রাঁধতে হবে। মোড়াটা হাতে নিয়ে জলপাই গাছটার দিকে তাকাল। পাখীরা বাসায় আশ্রয় নিচ্ছে। কিচির মিচির শব্দ


কানে আসছে। জলপাই গাছটা বাতাসে দুলছে।
কিরে শারমিন কি করছিস?
কে? পেছন ফিরে তাকিয়ে থ হয়ে গেল শারমিন| নাজু আপা যে । কখন এলে?
তোরা কেমন আছিস? বাড়ীতে কি কেউ নেই?
ভাল ই। না সবাই তো আছে। বড় ভাই ওর ঘরে। শারমিন জানে নাজু আপা বড় ভাইয়ার খোঁজ নিতে এসেছে। বড় ভাইয়াকে নাজু আপা শৈশব থেকে ভাল বাসে। কিন্তু বড় ভাইয়া কোন দিন নাজু আপাকে ভাল বাসে নাই। কিন্তু নাজু আপা একথা মানতে রাজি নয়। নাজু আপা নিজকে বলে চলে রাজিব এখনও তাকে ভালবাসে। আর তাই রাজিব এখনও বিয়ে করেনি। নাজু আপার বিয়ে হয়েছে অনেক দিন। সে মনে করে ভাইয়া তাকে পায়নি বলেই সে মদ ধরেছে। নাজু আপা বলল দেখ আকাশের রংটা কেমন নীল। আমার জীবনের মত ই নীল। বলেই নাজু আপা হাসে। মনটা বিমুঢ় হয়ে উঠে।
শারমিন হাসতে পারেনা। শিলার কথা মনে পড়ে। কিন্তু শিলার কথা মনে এলেই একটা প্রচন্ড ঘৃনা মনকে বিষিযে তোলে। শিলা শিলার মতই শক্ত। বড় ভাইয়ের জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে। বড় ভাই কবিতা প্রেমিক ছিল। বাবা মা উভয়েই বড় ভাইকে খুব আদর করতেন। আর আজ কোথায় কি?
সূর্যটা ডুবে গেছে। ভাত চরাতে হবে। রাতের খবারের আয়োজন এখনও হয়নি। তুমি বস নাজু আপা আমি রান্না ঘরে ভাতটা চরিয়ে আসি। বলেই নাজু আপাকে এরিয়ে গেল শারমিন| নাজু কিছুক্ষন রাজিবেi ঘরের দিকে তাকিয়ে থেকে বাড়ীর দিকে পা বাড়ায়।

দুই

দিনটা আজ ভাল না। সেই সকালে এক টুকরো রোদের মুখ দেখা গিয়ে ছিল। মেঘের আড়ালে সূর্য মুখ লুকিয়ে আছে। বৃষ্টি পড়ে পড়ে মনে হলেও বৃষ্টি হচ্ছেনা। বড় ভাই দুদিন যাবৎ ঘরে নেই। প্রায়ই এমন হয়। এটা একটা সাধারন ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। শারমিন প্রথম প্রথম নিজের কথা বড় ভাই ও শিলার কথা ভাবত এখন আর ভাবে না্‌। শিলার কথা মনে হলেই ভয়ানক পিড়া দেয়। শিলাকে শারমিন কোন দিন দেখেনি। ভাইয়া জ্বরের ঘোরে এক দিন সারারাত প্রলাপে শিলার ঘটনাটি খুলে বলেছে। এই শিলার কারনেই ভাইয়া আজ মদ ধরেছে। সারা দিন বিছানায় পড়ে থাকে। কারো সাথে দুটো কথা বলে না। ভাইয়াকে নিয়ে বাবা মায়ের কতই না স্বপ্ন ছিল। ছাত্র হিসাবে ভাইয়া খুব ভাল ছিল। বাবা ভাবতেন রাজিব বড় হয়ে বাবার কেরানী গিরির বদনাম ঘোচাবে। কি থেকে কি হয়ে গেল।

বিশেষ করে এক দিনের কথা বেশী মনে পড়ে। অনেক রাত করে ভাইয়া বাড়ী ফিরে এল। জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলছিল। দরজার কাছে এসে পড়ে গিয়েছিল। শারমিন দৌড়ে গিয়ে ধরে ছিল। মুথে বিশী্র গন্ধ। শারমিনের বমি এসে গেল। ছোট ভাই এসে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গেল। বাবা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। কিছুই বলল না। সারা রাত বারান্দায় বসে ছিল। মা দরজা লাগিয়ে ঘরে শুয়ে ছিল। ছোট ভাইও তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ে ছিল। শারমিন সারা রাত ভাইয়ার পাশে বিছানায় বসে ছিল। ভাইয়া সে দিন ও বার বার শিলার কথা বলে ছিল। শিলা ছিল ভাইয়ার কাছে অনন্যা। ভাইয়ার বেঘোর বর্ননায় মনে হয় সে খুব সুন্দরী ছিল। শিল বড় লোকের এক মাত্র মেয়ে। কলেজ জীবনে এদের পরিচয়। শিলা রাজিবেi সত্যিকার পরিচয় জানত না। রাজিব বহু বার তাকে তার পরিচয় দিতে চাইলেও শিলা শুনতে চাইতো না। দীর্ঘ সাত বছর পর যখন রাজিবেi পরিচয় জানতে পারল


শিলা রাজিব কে তার জীবনে অবাঞ্চিত হিসাবে গন্য করল। সেই থেকে রাজিব উচ্ছন্নে যেতে লাগল। এক সময় রাজিব বিভিন্ন বিপদে আপদে বাবার সাথে মিলে বিপদ ঠেকাত। সেই রাজিব আজ পালক ভাঙ্গা পাখীর মত ছটফট করে মরে একা একাকি। এর পর থেকেই বাবা অন্য মানুষ। বাসায় কে এল কে গেল, কি হলো, কি হবে, কি হতো, কি হতে পারত এসব আর ভাবেনা। শুধু মাস শেষে বেতনের টাকাটা শারমিনের হাতে গুজে দিয়ে খালাস।
মা এসবে নেই। দু,মঠো ভাত গিলে রাজ্য শাসন করে ঘরে খিল আটে। রাজ্যের কোথায় কি হচ্ছে, কি হয়েছে তাতে তার কিছু আসে যায় না। শারমিন কেই সব সামলাতে হয়।


এক বছরেই বদলে গেছে সংসারের সমস্ত ইতিহাস। কি কারনে, কে নায়ক, কে খল নায়ক, কি ঘটেছে কেউ কিছু জানে না। সব কিছু দেখেছে শারমিন| শহিদ আর রাজিবেi ঘটনার নিরব স্বাক্ষী সে। শারমিন শহিদেi সংসারে গিয়ে এ বাড়ীর সব কিছু ভুলে গিয়েছিল। অতীতের সকল দুঃখ কষ্ট ভুলে নিজকে নতুন ভাবে সাজিয়ে তুলে ছিল। বিধি বাম। শারমিন আর মনে করতে পারছেনা সে সব কথা।


( তিন)

ঘর গুছিয়ে রাখছিল শারমিন| মা শুয়ে আছে প্রতি দিনের মত। ঘরে টাঙ্গানো উত্তর দিকের ছবিটা দেখলে হাসি পায় শারমিনের| ইচ্ছে হয় ছবিটা ছিড়ে ফেলতে। ছবিটার এক দিকে রাজিব ,বাবা-মা আর এক দিকে রকীব ও শারমিন| বাবর মুখে পরম তৃপ্তির হাসি। চোখে মুখে উজ্জল জ্যোতি। ছবির দৃশ্য থেকে বেড়িয়ে এল শারমিন| জলপাই গাছে রোদ পড়েছে। সবুজ পাতা গুলো চিকচিক করছে। আকাশটা বেশ নীল। মা বললেন জলপাই গাছটার সাথে শারমিনেরi নিবিড় সম্পর্ক আছে। যেদিন শারমিন জন্মেছে সে দিন গাছটা তার বাবা রোপন করে ছিল। গাছটার প্রতি তাই শারমিনের বেশ হৃদ্যতা। রাজিব শারমিনের বিয়ের সময় গাছটা কেটে ফেলতে চেয়েছিল। সে দেয়নি। গাছটা আজ ফলে ফুলে পরিপুর্ন। শারমিনের জীবনে হাহা কার।
একটা কাক উড়ে এসে গাছটায় বসল। মোড়া হাতে শারমিন গাছের নিচে বসল। এখন বিকেল। কয়েকটা কুকুর বাইরে জটলা করছে। বড় ভাইয়ের দরজায় তালা। রাকীব এখনো আসেনি।
কোথায় যায় কে জানে। আগে বড় ভাই যেত এখন সে যায়। কোথায যায় কি করে কেউ কারো খবর রাখেনা। শারমিন শুধু জানে মাস গেলে বাবা সংসার খরচের টাকা দেবে। বাজার থেকে শুরু করে, রান্না বাড়া, সংসারের সকলের চাহিদা, সময়মত খাবার দেওয়া সহ সব কাজ করে যেতে হবে।

ছোট বেলা থেকে শুনে এসেছে জলপাই গাছের সবুজ রং চোখের জ্যোতি বাড়ায়। কৈ শারমিন । জ্যেতিতো দিন দিন ক্ষয়ে আসছে। স্কুলে পড়ার সময় প্রায়ই শারমিন গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতো। গাছথেকে চোখ সরিয়ে পেছনে তাকাল শারমিন| চোখটা জ্বলে উঠল। ইদানিং চোখটা তাকে বেশ জ্বালায়। নাজু আপা এল। জানে নাজু আপা তাকে ধরে এখন আদর করবে। এ কয় দিন নাজু আপা ছিল না। নাজু আপা এসেই বড় ভাইযার কথা জিঙ্গেস করবে। খুটিনাটি জানতে চাইবে। এসব বলতে আর ভাল লাগেনা। শারমিন উঠে গিয়ে আর একটা মোড়া এনে নাজু আপাকে বসতে দিল। ভিজা চুল ছড়িয়ে দিয়ে নাজু আপার মখোমুখি বসল। কাকটা ডেকে উঠল।


জটলা ভেঙ্গে কুকুর গুলো দৌড়ে পালাল। নাজু আপা জানতে চাইল শহিদেi কোন খোঁজ পেলে? শারমিন কোন উত্তর দিলনা। উত্তর দেবার কিছু নেই। তোর বাবা তার খোঁজ করেনি? রাজিব গেলেও তো পারত। খোঁজ করে কি লাভ শারমিন মনে মনে বলে। যে নিজ থেকে নিখোজ তার সন্ধান কে পাবে? মুখফুটে কিছুই বলল না শারমিন|
রাজিবেi ঘরে তালা দেখছি। রাজিব----------------|
কাল রাত থেকে নেই।
যায় কোথায় কোন খোঁজ খবর নাও না ?
কি লাভ। বাবা মা যে খানে নিস্তব্ধ সে খানে আমি কি করতে পারি? আমি মেয়ে মানুষ কোখায় খুঁজবো।
তবু ও তো।
রাজিব আর রাকীব থাকলেও যা না থাকলেও তা।
নাজু আপা হাসল।
শারমিন গাছটার পানে তাকাল। পাতাগুলো বাতাসে নড়ছে।
নাজু আপা উঠে পড়ল।
যাচ্ছেন?
হ্যা।
আবার আসবেন।
নাজু হাসল।

রাকীব যে কোথায গেল । আজ চার দিন বাসায় আসেনি। এই প্রথম রাকীব বাইরে কাটাল।
রান্না ঘরের আঙ্গিনায় বসে বাসন মাজছিল শারমিন| আকাশ টা হঠাৎ মেঘে ছেয়ে গেল। ঘরে রাজিব ঘুমাচ্ছে মনে হয়।দেথতে দেখতে মাস পেরিয়ে গেল রাকীবের খবর নেই। শারমিন কযেক বার বড় ভাইয়াকে রাকীবেi খোঁজ করতে বলেছে। পাড়ার অনেক কেও বলেছে। কিন্তু কোন লাভ হয় নি। রাজিব ডাকল। বাসন রেখে আচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে এল । বৃষ্টি নেমেছে। ক্রাচে ভর দিয়ে একটা লোক বাসায় ডুকছে। শারমিন চিনতে পারছেনা। সে সরে গেল। শারমিন শহিদেi কথা ভাবছিল। কোথায় শহিদ কে জানে। এমনতো কথা ছিল না। দুজন দুজনার হয়ে আজীবন থাকার শপথ নিয়ে ছিল। কার ভুলে এমন হলো। কান্না শুনে চেতনা ফিরে পেল।
কে কাঁদছে? মা ডাকল। কে কাঁদে রে?
রাকীবেi গলার স্বর ঠিক এমনই। তবে কি রাকীব ফিরে এল। মা তো বিগত দুই বছরে এমন করে একদিন ও ডাকে নি। মার কি ভুল ভাঙ্গলো। রাকীবেi ঘর থেকেই যেন শব্দটা ভেসে আসছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। বন্ধ জানালার কপাট খুলে কে যেন দাড়িয়ে আছে আকাশ পানে তাকিয়ে। মুখ ভর্তি দাড়ি গোফ । পা নেই ক্রাচে ভর করে দাড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে ফুফিয়ে উঠছে। এক হাতে চোখ মুছছে।
কে হতে পারে? রাকীব| কিন্তু একটা পা। পেছন থেকে তো মনে হচ্ছে রাকীব| কিন্তু--------। আবার ফুফিয়ে উঠল।
রাজিব এসে দাড়াল। কে কে কাঁদছে শারমিন তাকাল। হয়ত কান্না শুনে ভাইয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। তাই উঠে এসেছে। কে রাকীব ?
ঘুরে দাড়িয়েছে ক্রাচে ভর দেওয়া লোকটা। শারমিন দেখল রাকীব| রাজিব এগিয়ে গেল । রাকীব ভাইয়া -------বলে ঝাপিয়ে পড়ল। দুভাই জড়াজড়ি করে ঝাপটে ধরল একে অপরকে।



রাকীব তোর একি অবস্থা। বলেই রাজিব কেঁদে উঠল্‌ । রাকীব বলতে লাগল বেচে থেকে কি লাভ ভাইয়া বেচে থেকে কি লাভ?
এত দিন কোথায় ছিলি? কেমন করে এমন হলো? প্রশ্ন গুলো একসাথে করে গেল রাজিব|
শারমিন দু,ভায়ের দুঃখটা অনুভব করল। দু চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
বাড়ী ফিরছিলাম রাত করে। হঠাৎ একটা ট্রাক----------------। আর কিছু মনে নেই। হাস পাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে এলাম। মা এসে দাড়িয়ে ছিল। রাকীব ক্রাচে ভড় করে এগিয়ে এসে মায়ের বুঁকে ঝাপিয়ে পড়ল।


(চার)

রাকীব আমি জানি তুই কবিতাকে ভাল বাসিস। সে তোকে প্রত্যাখ্যান করেছে তা ও আমি শুনেছি। জানিস না আমরা সামান্য একজন কেরানীর ছেলে। আমাদের ভাল বাসার কোন মূল্য নেই। উচ্চবিত্তের মানুষরা আমাদের তৃতীয শ্রেনীর লোক বলে গন্য করে। তাদের ধারনা আমাদের প্রেম প্রীতি ভালবাসা তাদের বিত্ত্যবৈববের প্রতি।

রাকীব আকাশে তারার দিকে তাকিয়ে রইল। তারা গুলো জ্বলছে আর নিভছে।
কবিতার সাথে তোর দেখা হয়েছে? জানতে চাইল রাজিব|
হাসল রাকীব|
না দেখা হয়নি।
কাল যাবি?
শারমিন ঘর থেকে চলে গেল।
রাকীব কিছুই বলল না।
বড় ভাই ঘর থেকে বেড়িয়ে বাইরে চলে গেল।
রাকীব ভাবনায় পড়ে গেল। বড় ভাইতো কোন দিন কবিতার কথা বলেনি। আজ হঠাৎ কবিতার কথা জানতে চাইল। রাকীব কবিতার মুখটা ভাবতে চেষ্টা করল। ধুসর হয়ে আসল সব।

আজ নাজু আপা চলে গেছে। শারমিন ভাবে তার কোথাও যাবার জায়গা নেই। এই অভিসপ্ত সংসারে আর মন টেকে না। কোথায যাবে সে। নিজেকে বড় বেমানান মনে হয়।
ঘুম ভেঙ্গে গেল। হাত মুখ ধুয়ে রাজিব ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়ল। শারমিন রাকীবেi ঘরে গেল। জানালার গ্রিল ধরে রাকীব দাড়িয়ে ছিল। শারমিন আসতেই সে সরে এল।
এত কি ভাবছিস ছোট ভাইয়া?
না তেমন কিছু না।
নাস্তা রেখে গেলাম খেযে নিস।
রাকীব আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।





ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল রাকীব তার অভিসপ্ত জীবনের কথা ভেবে। আজ কবিতাও তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। একে একে সবাই পর হয়ে যাচ্ছে। রাকীবের পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। দেখা যাবে এক দিন হযতো ছোট বোন টাও চলে গেছে তাকে ছেড়ে।
একদিন সকালে দেথা গেল শারমিন ঘরে নেই। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না।

বড় ভাই ভাল বাসত এক বড় লোকের মেয়েকে। সেও প্রত্যাখ্যাত হয়ে আজ মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঘরে ফেরে। কেরানীর ছেলে বলে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে বড় লোক বাবার মেয়ে। শিলা নামীয় মেয়েটি সবাইকে বলে বেরায় বামন হয়ে চাঁদ ধরতে চায়। কেরাণীর ছেলে হয়ে আমাকে বিয়ে করতে চায়।
সবার মনতো তার মত পাথরের তৈরী নয়্‌। রাজিব ভেঙ্গে পড়েছে। তার জীবন আজ ধংসের মুখে।


(পাচ)

রাজিব ভাই আপনি?
চমকে উঠল কবিতা।
হঠাৎ--------------।
হ্যাঁ হঠাৎ ই আসতে হল।
তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। নেশার তোরে কথা কিছুটা লেগে যাচ্ছে। স্বরটা যেন একটু কাঁপা কাঁপা লাগছে।
তুমি রাকীব কে ভাল বাসতে?
কবিতা কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে জবাব দিল্‌ । সেটা আমার ব্যক্তি গত ব্যাপার। আপনি কেন নাক গলাতে আসছেন?
আমি জানি এখানে আসা আমার উচিত নয়। তবু আসতে বাধ্য হলাম। তোমার সাথে আমার ভাই জড়িত। তুমি তার জীবনটা কেন এভাবে নষ্ট করছ?
আপনি কি চান একজন কেরাণীর ছেলেকে ভালবেসে বিয়ে করে আমি আমার জীবন টা ধংস করে ফেলি?
একথা তোমার প্রেম করার সময় ভাবা উচিত ছিল।
কি উচিত কি অনুচিত তা আমি আমারটা ভেবে দেখব।
সে আজ অসহায পঙ্গু বলেই কি তাকে তুমি ফিরিয়ে দিয়েছ? তাহলে কি তুমি তাকে ভাল বাসনি? ভাল বেসেছ তার দেহ? যে দেহ অনেক টাকা পয়সা রোজগার করবে। তোমাকে আয়েশি জীবন দেবে। সেই রাকীব কে?
বলতে বলতে রাজিবেi বাম চোখটা লাফাতে লাগল। রাগে দুঃখে শরীরটা দুলতে লাগল। পলকের মধ্যে পকেট থেকে ছুরিটা বেড়িয়ে এল। মনে হলো শীলা হাসছে। হাসতে হাসতে শিলা কবিতা একাকার হয়ে গেল। বাচাও বাচাও বলে শিলা চিৎকার করছে। ছুরিটা নড়ে উঠল। রক্ত আর রক্ত হাতটা ভিজে গেছে। শিলার দেহটা নড়েচড়ে নিথর হয়ে গেল। রাজিব দেখল শিলা কবিতা হয়ে গেছে। টলছে রাজিব| সাড়া শরীর ভিজে গেছে। ঘাম ঝরছে বেড়িয়ে এল রাজিব রাস্তায।





ঘুম যখন ভাঙ্গল। চারি দিকে বাড়ী ভর্তি পুলিশ। রাকীব ক্রেচে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।
আপনারা--------------।
রাকীব যেন কবিতার রক্তের গন্ধ পাচ্ছে। রাজিবেi মনে হলো রাকীব হাসছে। প্রতিশোধের নেশায় সে যেন টকবগিয়ে ফুটছে। বিছানা থেকে উঠে বসল রাজিব| রাকীব নয় আমি হত্যা করেছি কবিতা কে। রাকীব তুই আমকে ক্ষমা করে দিস ভাই।
ওরা মানুষ কে ভাল বাসতে পারে না । ভালবাসে চির দিন অর্থকে।অর্থ ই তাদের ভাল বাসা। শুধু অর্থ আর অর্থ।
চলুন বলে পুলিশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল রাজিব|
পুলিশ হাত কড়া পরিয়ে দিল হাতে।
ঘর ছেড়ে নেমে এল রাস্তায়।
গাড়ীতে উঠে বসল। বাবা মা কেউ এগিয়ে এল না।
রাস্তায় এসে দেথল বাবা মা সামনে দাড়িয়ে। রাজিব আজ তৃপ্ত । ভেতর ভেতর এতদিনের দহন থেকে আজ সে মুক্ত| দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যেদিন দেশ স্বাধীন হয়ে ছিল সেদিনের অনুভূতি রাজিবের মাঝে ফিরে এল ।

সবার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। রৌদ্রের আলো পড়ে তা যেন রূপার মালা হযে দুলছে। রাজিব জলপাই গাছ টার দিকে তাকাল। সমস্ত বাড়ীটা যেন তাকে দেখছে। আকাশ পানে তাকাল। কালো মেঘ কেটে গিয়ে নীল আকাশ হাসছে।


আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
বশির আহমেদ ভাই মনির মুকুল আপনার চমৎকার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ।
মনির মুকুল দীনতার আবহে জীবন প্রবাহের সুন্দর রূপ ফুটে উঠেছে। বর্ণনা বেশ সুন্দর। অনেক অনেক শুভকামনা।
হোসেন মোশাররফ কাল মেঘ কেটে...চমত্কার শেষ করেছেন ....
বশির আহমেদ ভাই শাহ আকরাম রিয়াদ গল্পটি ভাল লাগার জন্য আপনাকে শুভেচ্ছা ।
শাহ আকরাম রিয়াদ ভাল লাগল... সুন্দর একটি গল্পের জন্য ধন্যবাদ।
বশির আহমেদ ছোট গল্পের ক্ষুদ্র পরিসরে সব চরিত্রের সমাপ্তি টানা বেশ কঠিন । শারমীন স্বামী সন্তান হারিযে বাবা মায়ের সংসারেও কাজের বুয়ার মত মর্যাদাটুকুও না পেয়ে সংসার থেকে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে । ধন্যবাদ বোন রওশন জাহান আপনার মুল্যবান মন্তব্যের জন্য ।
রওশন জাহান অপূর্ব বর্ণনা শৈলীর একটি গল্প। তবে শেষ দিকে ঘটনা অত্যধিক নাটকীয় ভাবে মোড় নিয়েছে। যেহেতু শারমিনকে দিয়েই গল্প শুরু হয়েছিল তাই শেষ পর্যন্ত তার গন্তব্য পাঠক হিসেবে জানতে চাওয়া স্বাভাবিক। শুভ কামনা থাকল।
বশির আহমেদ ভাই মামুন ম, আজিজ গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ ।
মামুন ম. আজিজ গভীরতা ব্যাপক। তবে স্বল্প পরিসরে চরিত্র ব্যাপকতা একটু মাথাকে খাটাতে বাধ্য করে তোলে। শুভ কামনা রইল

০৭ এপ্রিল - ২০১১ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

বিজ্ঞপ্তি

“অক্টোবর ২০২১” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ অক্টোবর, ২০২১ থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।

প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী