বাস থেকে নামতে রাত আটটা বেজে গেল । এখন আবার নদী পাড়ি দিতে হবে । আবহাওয়াটা কেমন যেন লাগছে । ঝড় উঠলে নদীর মধ্যে নৌকায় বসেই ভিজতে হবে । তাছাড়া ভ্যান রিকসা কিছুই পাওয়া যাবে না । ভোগান্তির শেষ থাকবে না । এলোমেলো ভাবতে ভাবতে হাঁটছি । সমস্যা হলো না । প্রকৃতি অনুকূলই থাকলো । নদীর ঘাটে পেঁৗছাতে বেশি সময় লাগলো না । দূর থেকেই টের পেলাম নদীর অস্তিত্ব । নদীর উপর থেকে বয়ে আসা হিমেল হিমেল প্রবাহ গাঁয়ের প্রশান্তির হাতছানি দিতে লাগলো । নিকষ কালো আঁধারের বুক চিরে নৌকা তীরের দিকে ছুটলো । বিশালবক্ষা নদীর যেদিকে তাকাই শুধু নৌকা আর নৌকা । নৌকার পেটে জ্বলে থাকা হারিকেনের আলোগুলোকে জোনাকি পোকার মতো মনে হতে লাগলো । নৌকা ছেড়ে ভ্যান । বাসায় পৌছাতে বেশ রাত হয়ে গেলো ।
পাক্কা আট ঘণ্টা বাস জার্নি করেছি । শুয়ে বসে শান্তি পাচ্ছি না । মনে হচ্ছে শুধু দুলছি । সারাদিন বাসে যেভাবে দুলেছি সেভাবেই দোলাচ্ছে যেন । বাধ্য হয়ে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমালাম । তারপরও ঘুম ভাঙলো দেরিতে । এখনও মাথাটা ঝিম ধরে আছে । সাড়ে তিনশো কি. মি. পথ পাড়ি দেয়া এখন আর সহ্য করতে পারিনা ।
একসময় খুব উচ্ছ্বাস হতো । জরিনতেও আনন্দ পেতাম । নিজেকে যেন নতুন কিছুর মাঝে আবিষ্কার করতাম । সকল কর্মব্যস্ততা পিছনে ফেলে নিজের শহরে যাওয়ার আনন্দটাই ছিল আলাদা । কয়েকদিন ধরে চলতো কেনাকাটা । গোছগাছ । তারপর একদিন খুব ভোরে উঠে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে চড়ে বসা । শহরের কোলাহল পিছনে ফেলে বাস যখন ছুটে চলতো । কি যে আনন্দ হতো ! এখন আর সেই আনন্দ উচ্ছ্বাস না থাকলেও যেতে মন চায় । মন যেন পড়ে থাকে সেখানে ।
অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়না । একটু হাওয়া বদল দরকার। অস্থির হয়ে উঠছিলাম । যে লুকানো কৈশোরে পায়ের ছাপ এখনও জ্বলজ্বল করছে সেখানে যাবার উদগ্র বাসনা চেপে বসলো । মনে মনে স্থির করলাম । এবার যে কয়দিন বেড়াবো । বড় বোনের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে থাকবো । সেখানে বসে একটা গল্প লিখবো । গ্রাম্য পরিবেশে খোলা আকাশের নীচে বসে লেখার অনুভূতিটা কেমন তা পরখ করবো । গল্পের প্লট হবে তাৎক্ষনিক ।
অথচ সকালে উঠে মাথা ভার । তাই মনটাও ভার হয়ে গেলো । প্রাণ চঞ্চলতা ফিরে পাচ্ছি না । যতোটা ভালো লাগার কথা ততোটা লাগছে না । নাস্তা সেরে বাইরে চেয়ার নিয়ে বসেছি । অনেক দিন পর বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি । গল্প করছি । ইতিমধ্যে প্রতিবেশী একজন ভদ্রমহিলা দৌড়ে এসে বলতে লাগলো রাহেলা আত্মহত্যা করেছে ।
তার কথা শেষ না হতেই আমি জিজ্ঞাসা করে উঠলাম, কোন রাহেলা ?
বোনের এই গাঁয়ে বিয়ে হয়েছে প্রায় বিশ বছর হলো । সে বললো, পাশের গাঁয়ের এক মেয়ে রাহেলা । অভাবী ঘরের সুন্দরী মেয়ে হওয়াতে দুচার গাঁয়ের মানুষ তাকে চিনে ।
আমি উৎসুক হয়ে উঠলাম । আবার জানতে চাইলাম, কেন আত্মহত্যা করলো ?
ভদ্রমহিলা বলে চললো, মাতবরের ছেলে উঠায় নিয়া গেছিলো । সেই অপমান সহ্য করতে পারলো না মেয়েটা । আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম । চল দেখতে যাব । বোন ইতস্তত করছে । তার আবার রান্না বান্নার সময় হাজির । আমাকে ভদ্রমহিলার সাথে যাবার বন্দোবস্ত করে দিলো । যথাসময়ে হাটা শুরু করলাম । গাঁয়ের মেঠো পথে হাটতে গিয়ে মন সবসময় অজানা এক আনন্দে ভরে উঠে । কিন্তু আজ আমি যাচ্ছি একটি মৃত্যু দেখতে । অস্বাভাবিক মৃত্যু । তাই উপলব্ধিটা অন্যরকম । হরিষে বিষাদ । মাথার ভারটা এবার বুকের মধ্যে চলে আসলো । একদিকে গাঁয়ের সি্নগ্ধ পরিবেশ । অন্যদিকে ইটের ভাঙা রাস্তা । হাটতে কষ্ট হচ্ছে । এমনভাবে হাটা হয়না বহু বছর । তবু কৌতুহল আমাকে তাড়া করে নিয়ে যাচ্ছে অজানা এক জায়গায় । যেসব জায়গার কথা শুধু পত্রিকায় দেখি, যে সব ঘটনা সবসময় পত্রিকায় পড়ি । তা নিজের চোখে দেখার অদম্য কৌতুহল। কিন্তু কি দেখবো সেখানে । কেমন হবে পরিবেশ । ভাবতেও মনটা অস্থির হয়ে উঠছে । হাঁটছি আর কথা বলছি । একসময় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছে গেলাম । দূর থেকেই দেখতে পেলাম লাশ ঝুলছে । মনের আজানতে নিজের লেখা দুলাইন কবিতা আওড়াতে লাগলাম ;
এভাবে তোমরা মরছো যুগে যুগে
তবুও থামেনি শকুনের খেলা
তবুও চলছে হায়েনার থাবা ।
গাছের সাথে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করা কোন মানুষ এই আমি প্রথম দেখছি । বুকের মধ্যে থেকে থেকে কেমন করে উঠছে । বিষণ্ণ মন নিয়ে এগিয়ে গেলাম । তারপর আরও যা দেখলাম, যা শুনলাম, তাতে কখন যেন আমার দু-চোখের কোন ভিজে উঠলো । আমার গল্প লেখার উপকরণ হলো সত্যি। কিন্তু ওদের বেঁচে থাকার উপকরণ কি ? সে প্রশ্ন আজও করি নিজেকে । বাড়ীর পথে পা বাড়ালাম ।
গল্পটা শুরু করি এভাবে-
রাহেলা স্কুল থেকে ফিরে বইখাতা রেখে ঝপ করে মায়ের পাশে বসে পড়লো । মা জমিলা ঘরের মেঝেয় খেজুর পাতার পাটিটা বিছিয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছিল । সকাল থেকে মানুষের বাসায় কাজ করে শরীরটা বেশ ক্লান্ত । একটু যেন ক্লান্তিটা তাড়িয়ে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা । আবার তাকে কাজে বেরুতে হবে । রাহেলার কথা শুনে শোয়া থেকে উঠে বসলো জমিলা।
ক্যান, কি হইছে রে মা ? এই একটি মাত্র মেয়ে নিয়েই জমিলার জীবন । স্বামীকে হারিয়েছে প্রায় দশ বছর হলো । তারা চরের মানুষ । চরের মানুষের মাছ ধরা পেশা । মাছ ধরলে লাভ বেশি । জমিলার স্বামীও মাছ ধরতে যায় নদীতে । নদী থেকে গভীর সমুদ্রে । মাঝে মাঝে সমুদ্র আগ্রাসী রূপ ধারণ করে । আসে রাক্ষসী ঝড় জলোস্বাস । গ্রাস করে নিয়ে যায় জমিলাদের মতো নিরীহ মানুষদের । সর্বস্বান্ত করে দিয়ে যায় । তেমনই এক রাক্ষসী ঝড়ে ছোবল দিয়ে নিয়ে গেছে জমিলার স্বামী শাহজাহানকে ।
সেদিন জমিলা বার বার নিষেধ করছিল । নদীতে যাইতে হবে না । আকাশ জানি আইজ কেমন কেমন । জমিলার মনটাও তাই কেমন কেমন করছিল । বাধা মানেনি শাহজাহান । তখন তাদের নতুন জীবন । মাছ না ধরলে খাওয়াবে কি ?
শাহজাহান অকপটে বলে বসলো, আমারে বাধা দিসনা, জমিলা । নদী আমারে ডাকে । আমি বইসা থাকতে পারি না । এবার দেখিস মাছ বেশি ধরা পড়বো । তরে আর মাইয়ারে পোশাক কিইন্যা দিমু ।
জমিলা স্বামীর পাশে নির্বাক বসে থাকে । তার কথার উত্তরে কথা থেমে যায় । রাহেলার বয়স তিন বছর । গুটি গুটি পায়ে সারা উঠোন ঘুরে বেড়ায় আর জমিলা শাহজাহান চোখ ভরে দেখে । কি নাদুস নুদুসই না হয়েছে মাইয়াডা । আর কি সুন্দর গায়ের রং । গরীবের ঘরে এমুন মাইয়াও হয় । শাহজাহানের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয় ।
বেলা পড়ে যেতে লাগলে গামছাটা কাঁধে নিয়ে শাহজাহান নদীর উদ্দেশ্যে বের হয় । জমিলা ভাবে যাবার সময় মাইয়াডারে কোলে লইয়া কতো আদর করলো আর বললো, কবে যে তগোরে দেখতে পামু । তার মাথায় মমতার হাত বুলাইয়া কইলো, ভালা থাইকো ।
রাইত নামলে আইলো সেই সর্বনাশা তুফান । রক্ষুসী নদী গিল্লা খাইলো শাহজাহান মিয়ারে । শুধু কি তাই । গ্রামটার উপরেও কেমনে হামলাইয়া পড়লো । গ্রাম ভাসাইয়া নিতে লাগলো রক্ষুসী বানে । গাছগুলো ঝপ ঝপ কইরা উপড়াইয়া পড়তে লাগলো ঘর বাড়ী মানুষ জনের উপরে। জমিলা নিজে কোনরকম রাহেলারে বুকের মধ্যে জড়াইয়া ঘর থেইকা ছুটতে ছুটতে গিয়া উঠলো আশ্রয় কেন্দ্রে ।
সেই রাইত তো পোহাইলো । কিন্তু জমিলার জীবনে শুরু হইলো এক নতুন রাইতের ইতিহাস । ভাবলে শিরদাঁড়া সোজা হইয়া যায় । চোখ চক চক করে উঠে । জমিলা সোজা হয়ে বসে । মেয়ের গায়ে হাত রাখে ।
ক্যান যাবিনা মা ? ক, ক্যান যাবিনা ।
না যামুনা ।
কবি তো, ক্যান যাবিনা । আমি জানি তোরে জ্বালায় । মাতবরের পোলা তোরে জ্বালায় । ওই মাতবররে আমি খুন করমু । খুন কইরা জেলে যামু । এমুন করে বাঁচার চাইতে জেলখানাই ভালা । নিশ্চিন্তেৱ খাওন যায় । পরণ যায় । থাকনের জইন্যে চিন্তা করন লাগে না । চিল শকুনে খাবলাইয়া খাইবার পারে না । নিশ্চিন্ত ! কতো নিশ্চিন্ত !
চলো মা আমরা গাও ছাইড়া শহরে যাই ।
জমিলার সম্বিৎ ফিরে আসে । যামু । তয় তোর স্কুলে যাইতে হবে । তোরে নিয়া আমি বুকের মইধ্যে কত স্বপ্ন বুইনা রাখছি । তোরে আমি মাইনসের বাসায় কাজ করতে দিমু না । বেইজ্জতি হতে দিমূনা । মরছি আমি মরছি । তোরে মরতে দিমু না ।
মা জান, মাতবরের পোলা আমারে কইছে তুইলা লইয়া গিয়া বিয়া করবো । এতো শরমের কথা আমি কেমনে সমু মা । রাহেলা মায়ের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে । জমিলা দুইহাতে মেয়েকে সজোরে আঁকড়ে ধরে, তোর ভয় নাই । উদাস দৃষ্টিতে জমিলা বাইরে তাকায় । দৃষ্টির সীমানা গ্রাম ছাড়িয়ে বহুদূর চলে গেছে । যেখানে আর কিছু নেই । শুধু ধু ধু করা বালু আর বালু । যেখানে তার দৃষ্টি এখনো আটকে আছে শাহজাহান মিয়ার ফিরে আসার অপেক্ষায় ।
তারপর একদিন এই পথ চাওয়া বন্ধ করে কাজে নামলো জমিলা । মেয়েটারে বাঁচাতে হবে । এমন অন্ধ গাঁয়ে কাজ পাওয়া দুষ্কর । মাতবরের বাসায় ধান ভানার কাজ নিলো । রাইত বে রাইত ধান সেদ্ধ করতে হয় । শুকাইতে হয় । কামলা খাটন লাগে । তখন ভরা শরীর জমিলার । একপেচে শাড়ী পরে । ঘুমটা টেনে আঁচল দাতে চেপে কামড়ে রাখে । তবু মাতবরের দৃষ্টি পড়লো । ফাঁক ফোকরে ফুসলাইতে চেষ্টা করলো । কু প্রস্তাব দিতে লাগলো । সেখানে জমিলা বেশিদিন টিকতে পারলো না । আবার খাইয়া না খাইয়া দিন যাইতে লাগলো ।
এমনকি মা বাপ মইরা গেলে খালি ঘরে শুধু মাইয়াডা নিয়া থাকতে পারতো না । অন্যের বাড়ি মুরগির খোঁয়াড়ের পাশে পাশে রাত কাটাইতো । এরপর বুকে সাহস নিয়া ঘরে থাকতে লাগলো । নইলে তার ১০-১২ হাতের ছোট্ট ঘরটি ও বেদখল হইয়া যায় । দুয়ারের কাছে রাখতো বটিডা । উপরে ছনের ছাউনি করা ঘরটা দিয়া মাঝ রাইতে ঝরঝরাইয়া বৃষ্টি আইসা ভিজাইয়া দেয় দুই মা-ঝিয়েরে । কি প্রশান্তির সে বৃষ্টি । ওরা ভিজে । মন ভরে ভিজে । তবু ঘুম থেকে উঠে নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করে না । আবার কখনও চান্দের আলো ঝলমলাইয়া ঢুইকা পড়ে । তখন জমিলার মনটাও ঝলমল করে উঠে । তার রাহেলা ঐ চাঁদের আলোর লাহান তার আসমানে ঝলমল করে ঝুলবে ।
জমিলা বিছানা ছেড়ে উঠে । মেয়ের হাত ধরে টেনে উঠায় । মন শক্ত কর মা । আমাগো রুখে দাঁড়াইতে শিখতে হবে । ঘুরে দাঁড়াইলে শত্রু কিছুই করতে পারবে না ।
ক্যামনে মা । ওগো মুখের দিকে তাকানের সাহস ও তো আমার নাই । কেমুন ডর লাগে ।
কথা কয় যখন গাও দিয়া ঘাম ঝরে । কোমরে হাত বাইন্দা বেড়ি দিয়া দাড়ায় ।
আইচ্ছা । প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় লমু । দেশে এহন আইন হইছে । কড়া আইন । তুই খাইয়া ল । আমার লগে যাবি। আমরা দশ ঘর মানুষরে কথাডা কমু । দুই মায় ঝি একটা প্রতিরোধ গড়মু । এসপার ওসপার কইরাই ছাড়মু ।
কি খামু মা ?
বাসনে কয়ডা ভাত পানি দিয়া রাখছি । গুড় দিয়া খা ।
রাহেলা উঠে স্কুলের পোশাক পাল্টে নেয় । ভাতের থালা নিয়ে খেতে বসে । গলা দিয়ে খাবার নামতে চায় না । চোখে মুখে ধরা পড়া শাবক ছানার মতো ভয় ঠিকরে পড়ছে ।
এরপরের কয়দিন রাহেলার স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকে । মেয়ের জন্য জমিলা বোরখা জোগাড় করে । এমুন সুন্দর মাইয়াডা তার । কচুর লতির লাহান শরীলডা । মাইনষের নজরে তো পড়বোই । বোরখা পইরা গেলে আর সমস্যা হইবো না । তবু স্কুল বন্ধ দেওন যাবে না । রাহেলাকে বোরখা পরিয়ে জমিলা বিকল্প পথে স্বুলে দিয়ে আসে । যে পথে মাতবরের ছেলে রতনরা সাধারণত যায় না ।
রতন কয়েকদিন রাস্তার পাশে আড্ডা জমিয়ে রাহেলাকে না পেয়ে ক্ষেপা কুত্তার মতো হয়ে উঠে । এবার স্কুলের কাছাকাছি এসে দাড়ায় । দুর থেকে নজর দিতে থাকে । একসময় রাহেলার সে বিকল্প পথের সন্ধান পেয়ে যায় । হাজির হয় সেখানে । পথ আঁকড়ে ধরে বলে, পলায়া কয়দিন থাকবি ? শুনতাছি তোরা জনে জনে খবর করতাছিস । এইডা কি ভালা হইলো । আমার বাপের সম্মান আছে না ? গাঁয়ের মানুষ আমাগো কথায় উঠে বসে । তারা কি তগো কথা শুনবো রে রাহেলা । মর্জি করিস না । আমার সাথে চল । তোর আর তোর মায়ের কুন সমস্যা হবে না ।
তুমি আমার পথ ছাড়ো ভাই । রাহেলার কথা জড়িয়ে যেতে থাকে ।
ক্যান ? পথ কি ছাড়বার আইছি সুন্দরী ?
চল, বলেই হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মারে । রাহেলা কাটা কবুতরের মতো ছটফট করতে থাকে । চিৎকার করতে চাইলে মুখ চেপে ধরে । আসন্ন দুপুরে গাঁয়ের পথে জন মানবের সংখ্যা একেবারেই কম । তাছাড়া একপাশে বিশাল পুরানো জঙ্গল । আর এক পাশে ধু ধু মাঠ । সেই মাঠ পেরিয়ে ওপারে বয়ে গেছে ওদের গাঁয়ের নদী । তারই পাশে চরের মধ্যে রাহেলাদের বসত । এই জংলা এলাকাটা তাই প্রায় বিরান থাকে । সেই বিরান পথ ধরে রাহেলাকে ওরা কজন টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকলো কোন গন্তব্যে ?

দুপুর গড়িয়ে গিয়ে রাহেলার স্কুল থেকে ফেরার সময় চলে যায় । জমিলা কাজ ফেলে ছুটে স্কুলের পানে । কাক পক্ষী ছাড়া আর কিছু নেই । স্কুল ঘরগুলো খাঁখাঁ করছে । আবার ছুটে আসে ছোট্ট কুড়েতে । পাতার তৈরি দরজাটা সজোরে টান দিলে খুঁটি থেকে ছুটে বাইরে পড়ে যায় । জমিলা দ্রুত ঘরে ঢুকে । এদিক ওদিক তাকায় । নাহ নেই । আবার বের হয় । মাতবরের বাড়ী যায় । পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে থাকে পাগলের মতো ।

এদিকে রতনের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে রাহেলা ছুটতে ছুটতে ঘরে আসে । বই আর বোরখা ঘরের মেঝেতে ছুড়ে ফেলে । ছোট্ট একটা কাগজে মাকে উদ্দেশ্য করে লিখে । "মা । আমাগোর আর শহরে যাওয়া হইলো না । তোমার বুকের ভিতর যে স্বপন তুমি বুনছিলা তা উপড়াইয়া ফেলো । গোঁড়া থেইকা উপড়াইয়া ফেলো। আমাগোর স্বপন দেখতে নাই । বাপ গেছে । আমি গেলাম । ঐ জঙ্গলে । তুমিও আইসো । তোমার রাহেলা " এরপর সে ঘরের মধ্যে কাপড় মেলে দেয়া রশিটার দিকে তাকায় । ঘরের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত বাধা । হ্যাঁচকা টানে রশিটা ছিঁড়ে নিয়ে ছুটতে থাকে জঙ্গলের দিকে ।
জমিলা সারা পাড়া ঘুরে যখন কোন হদিস করতে পারলো না তখন বুঝে গেলো যা হবার তা হয়ে গেছে। ফিরে এলো ঘরে । যেন সারা জীবনের সব ক্লান্তি এই মুহূর্তে তাকে গ্রাস করে নিয়েছে । ঘরের মধ্যে বোরখা, বই আর কাগজের টুকরাটা পড়ে থাকতে দেখে । কাগজটা হাতে নিয়ে হাঁটু ভাজ করে দাওয়ায় বসে । জমিলা একেবারে অক্ষরজ্ঞানহীন ছিল না । মেয়ের লেখা সে পড়তে পারে । বাক শক্তি হারিয়ে ফেলে । জঙ্গলে যাবে । সে শক্তিও যেন নেই আর । মুহূর্তে পৃথিবীটা চোখের সামনে দুলে উঠে । জমিলা ভূপতিত হয় ।
হুস ফিরলে উঠে বসতে চেষ্টা করে । পারে না । ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখে তার রাহেলা একটু একটু করে চলে যাচ্ছে । চোখের আড়াল হয়ে যাচ্ছে । জমিলা প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলো, 'রাহেলা তুই যাইস না মা । আমারে একা ফালায়া যাইস না । যে নাড়ি তেরো বছর আগে আমি কাইটা ফেলছি তা তুই আজ এক্কেবারে ছিনায়া লইলি । তোর গলার দড়িডা দিয়া আমার পেটের নাড়িতে আবার একটা পেঁচ দিয়া যা মা । শক্ত কইরা একটা বাঁধন দিয়া যা '। জমিলার আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে । এবার সে সর্বশক্তি দিয়ে উঠে বসে । ঘরের কোন থেকে তরকারি কাটা বটিটা নিয়ে ছুটতে থাকে মাতবরের বাড়ির দিকে । প্রকম্পিত বাতাস আর প্রলম্বিত সময়ের পিছে পিছে জমিলা ছুটছে আর ছুটছে । কেউ এগিয়ে আসছে না তাকে ধরার জন্য ।
এ পর্যন্ত লিখে খাতা বন্ধ করলাম । এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । ফিরে গিয়েই শেষ করবো । পুকুরের পাড়ে বসে লিখছিলাম । পানির দিকে তাকাতে ঝাপসা মনে হলো । এক ঝলক বাতাসে পুকুরের পানিতে ছোট ছোট ঢেউ তুললো । পরদিন ভোরে আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসে চড়ে বসতে হবে ।