সুতপার মা আসত ঘড়ির কাটায় যখন ঠিক সাতটা পয়তাল্লিশ। এক মিনিট নড়চড় নেই। যাকে বলে বায়োলজিকাল ঘড়ি। অপর্ণার মা বলত, সুতপার মা মানুষ নয়, ঘড়ি একটা- মানব ঘড়ি। তবে শুধু যে এই নিয়মানুবর্তিতার কারণে সুতপার মা আলোচিত ছিল তা নয় বরং নানান গুণে গুণান্বিত সুতপার মায়ের স্বরুপটি অনেকের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছিল। বলা যায় আসরটাকে মাতিয়ে রাখত সুতপার মা-ই। তার বাচন ভঙ্গি ছিল দেখার মত। আসরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকলকে সমানভাবে আকৃষ্ট করতে একমাত্র সুতপার মা-ই ছিল পারঙ্গম। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে দিয়ে স্কুলের পাশে বটগাছের ন্যায় বিশাল আমগাছটার নিচে বসত সব মায়েরা। যারা চাকুরিজীবি ছিল তাদের বসার সুযোগ হতো না। যারা গৃহিণী ছিল তাদের এটাই ছিল চাকুরি। স্কুল ছুটি পর্যন্ত এখানে আড্ডা জমাতো সবাই। সবাই গোল হয়ে বসতো। তারপর শুরু হতো গল্প। সংসারের গল্পই ছিল মূল উপজীব্য। দেশের, দশের কিংবা সমাজের গল্পের চেয়ে কার স্বামী কেমন, কার স্বামী মাসে কয়টা শাড়ি দেয়, কার স্বামী একটু কিপ্টুস ধরনের, কার স্বামী কথামতো কান ধরে উঠবস করে- সব মিলেয়ে সংসার নামক রাজ্যে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আখ্যানই এখানে প্রাধান্য পেত। সুতপার মা সাধারণত অন্য গল্প করতো। আসরের একঘেয়েমি দূর করতো। সংসারের গল্প উঠলে তার বাঙময় দীপ্তিতে উজ্জ্বল মুখটা পাণ্ডুর হয়ে যেত। কিন্তু কেউ তা বুঝত না। বুঝবেই বা কেন? সুতপার মায়ের বর্ণনায় তাদের যে রঙিন জীবন চিত্রটি সবার চোখের সামনে প্রতিভাত হয়েছিল তা কখনোই সন্দেহের উদ্রেক করে নি বরং যারা সর্বদা পতির গুণ-কীর্তনে নিমগ্ন থাকলেও আদতে সংসার জীবনে সুখের ছোঁয়া খুব কমই পেয়েছিল তারা ঈর্ষা করতো।

সুতপার মা বলতো তাদের বিয়েটা ছিল লাভ ম্যারেজ। দু’জনেই সংরক্ষণশীল পরিবারের সন্তান ছিল বিধায় একান্নবর্তী পরিবারে তাদের আর ঠাঁই হয় নি। তাদের নীড় পাততে হয়েছিল এই যান্ত্রিক নগরীর ছোট্ট এক ফ্লাটে। সেখানেই চলতো তাদের সুখের ঘরকন্না। সুতপার মা বলতো সুতপার বাবা থাকে অ্যামেরিকায়। এই গাণিতিক ব্যবধান তাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে নি। তিনি আসেন প্রতি বছরে মাত্র পনের দিনের জন্য। এই সময়টা তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। অপর্ণার মা, সুনিধির মা মাঝে মাঝে সুতপাদের বাসা যেত। বাসায় ঢুকলেই সহজেই তাদের আভিজাত্য চোখে পড়ে। দামী সোফা সেট, আলমিরা, দেয়ালে পেইন্টিং, বিরাট বড় একটা একুরিয়ামে টাইগার বার্ব, সিলভার শার্ক, গোল্ড ফিশ, ব্লাক ঘোস্ট নাইফ সহ আরো অনেক দামী মাছের সমাহার। সুতপার মা বেশ সৌখিন তা বাড়িটা একনজর দেখলে সহজেই অনুমেয়। অনেক নামী শিল্পীর আঁকা ছবি, পোড়া মাটির পাত্র তার সংগ্রহে। হয়তো এমন আভিজাত্যের কারণেই অনেকে তার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করতো। এই ছিল সুতপাদের জীবনের রঙিন চালচিত্র।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় তাদের রিকশার সামনে দাঁড়ায় টেরা মজিদ। এই এলাকার সবাই যাকে একনামে চেনে। চোখ তার টেরা নয়, সে সবসময় বাঁকা চোখে তাকায়- তাই এ নাম। সুতপার মা তখন ভয়ে কাঁপছে। টেরা মজিদ সম্বন্ধে তার ভালোই জানা আছে।
কিছু বলবেন? মাথা নিচের দিকে নামিয়ে জিজ্ঞাসা করে সুতপার মা। টেরা মজিদের সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলা মহা অপরাধ।
ভালোবাসা চাই। মুচকি অথচ কটু টাইপের একটা হাসি দেয় টেরা মজিদ।
আপনার সাথে আমি পরে কথা বলবো। সুতপার মায়ের ভয়ার্ত কণ্ঠ।
আপনারটা না মিসেস।
কি বলেন! মাত্র ক্লাস এইটে উঠলো এবার। মাফ চাই। হাতদুটো মিনতির মতো করে তুলে ধরে সুতপার মা।
ঝামেলা করতে চাইলে ঝামেলা হবে। গোমর ফাঁস করে দেবো।

সুতপার মায়ের মুখটা সাথে সাথে রক্তবর্ণ ধারণ করে। রিকশা থেকে নেমে আবারো অনুনয়ের সুরে ক্ষমা প্রার্থনা করে । তাতে কোনো ফায়দা পাওয়া যায় না। টেরা মজিদ জানায়, সে বাসায় আসবে। ওরা বাড়িতে চলে আসে। সুতপা মেয়েটার বাইরের জগৎ সম্বন্ধে জ্ঞান খুবই কম। এতকিছু হয়ে গেল সে তার মাকে কেবল জিজ্ঞাসা করলো, লোকটা কে? তার মা বললো, তুই চিনবি না। আর কিছু জিজ্ঞাসা করে নি সুতপা। স্কুলে লেখাপড়ায় ভালো হলেও বস্তুজীবন সম্বন্ধে তার জ্ঞান ও আগ্রহ দুটোই কম।

সুতপার মায়ের আর রাতে ঘুম আসে না। কখন যে টেরা মজিদ এসে ভালোবাসার নামে তার কচি আদরের ধনটাকে নিয়ে যায় তার বুকের নিচে। সারাক্ষণ তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে হয়। কত নতুন নতুন বুকেই তো ওম খুঁজে টেরা মজিদ। তাদের ছেড়ে সুতপার জন্য কেন উঠেপড়ে লেগেছে সে? সে প্রায়শই রিকশার সামনে দাঁড়াচ্ছে। এরই মাঝে হয়তো কোনো একদিন বাড়িতে এসে পড়বে। এই মূহুর্তে বাসা চেঞ্জ করাও সম্ভব না। টেরা মজিদের কাছ জিম্মি হয়ে আছে সুতপার মা। সুতপাকে কি বলে বোঝানো যায়? আর বলা মানেই সমস্যার সমাধান নয় বরং শুরু। সুতপা এসবের কিছুই বুঝছে না। যত ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার উপর দিয়ে।

কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজাটা খুলতে যায় সুতপা। তার মা বাঁধা দেয়। তুই তোর রুমে যা। আমি দেখছি। তার বুকটা ধুকধুক করে কেঁপে ওঠে। টেরা মজিদ নয় তো আবার? এমন সময় আর কে আসবে? বাড়িওয়ালার ছেলে ভাড়া নিতে আসার কথা। সুতপার মা প্রার্থনা করতে থাকে – দরজার ওপাশের ব্যক্তিটি যেন বাড়িওয়ালার বদমাশ ছেলেটাই হয়। কিন্তু না। টেরা মজিদই এসেছে। চোখে সানগ্লাস। মুখে হাসি। আর যাই হোক এই হাসিটা দেখলে তাকে এরকম লোক মনে হয় না। কিন্তু এটা তার মুখোশ । সে দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে হাতদুটো বুকে পাঞ্জা করে নেয়। তারপর বলে, কি যেন নাম ওর? টেরা মজিদের সম্বোধন সুতপার মায়ের কাছে বেশ ভদ্র ঠেকে। তার বলার কথা- কী যেন নাম মাগীটার? টেরা মজিদ জানায়, সে সুতপাকে নিয়ে পার্কে বেড়াতে যাবে। ভয়ের কিছু নেই। মেয়েটা সারাটাদিন ঘরে পড়ে থাকে। তার মা তো তাকে কোথাও নিয়ে যায় না। যাবে কী করে? স্কুল থেকে ফিরে তার মা তো টিউশনির কথা বলে বেড়িয়ে পড়ে। মেয়েটা একলা পড়ে থাকে। এই কষ্টটা টেরা মজিদের সহ্য হচ্ছে না। তার বুকের মায়া উথলে পড়ছে। তাই এখন সে সুতপাকে নিয়ে পার্কে বেড়াতে যাবে। যেতে না দিলে গোমর না কি সব যেন ফাঁস করে দেবে। তাই সুতপার মাকে রাজি হতে হয় বাধ্য হয়ে। সুতপাকে জানানো হয় মজিদ তার দূর সম্পর্কের ভাই। টেরা মজিদ সুতপাকে নিয়ে যায়। সুতপা না ফেরা পর্যন্ত তার মা অস্থির হয়ে থাকে। এতো অস্থিরতা! এতো দুশ্চিন্তা! এতো ভয়! মাথার মধ্যে যেন একটা পোকা ঢুকে আছে। ঝিম ধরে দরজার পাশে বসে থাকে। চোখ বেয়ে জল নামে। কতদিন কাঁদে না সুতপার মা! তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে সদ্য বয়:সন্ধিতে পড়া একটি অসম্বৃত দেহ। তাজা লাল রক্ত। অসহায় আর্তনাদ। আর টেরা মজিদের ঘন ঘন তপ্ত নিশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ। এই দৃশ্যটাকে কিছুতেই মন থেকে সরানো যাচ্ছে না।

কলিং বেল বাজতেই দরজা খুলে দেয় সুতপার মা। সুতপা ম্লান মুখে হাসি ফোটায়। তার মা তাকে নিরীক্ষণ করে। সুতপার চুলগুলি আঁচড়ানোই আছে। কাপড়েও তো কোনো ভাঁজ পড়ে নি। সুতপাকে একটু একটু করে নিখুঁত রুপে আবিষ্কারের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে তার মা। একটু আগে চোখের সামনে ভাসা সব দৃশ্যকে অলীক মনে হতে থাকে।
মজিদ কি তোর হাত ধরেছিল?
না।
বুকে জড়িয়ে ধরেছিল?
না।
চুমু খেয়েছে?
না।
প্রতিটি প্রশ্ন করার সময় সুতপার মায়ের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে থাকে। আর প্রতিটি প্রশ্নের না-বোধক উত্তর পেয়ে পেয়ে তার মুখটা আনন্দ দীপ্ত হয়ে উঠতে থাকে। কিন্তু সুতপার মা বুঝতে পারে না তার মেয়ে অকপটে একটি সত্যকে আড়াল করলো!এই প্রথম তার সামনে মিথ্যা বললো!
প্রতিদিনকার মতো রাতে ফিরে কলিং বেল চাপে সুতপার মা। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। দরজাটা ঠেলতেই খুলে যায়। কী ব্যাপার সুতপা দরজা লাগায় নি কেন? বুকটা ছাত করে ওঠে। সুতপার রুমে হন্তদন্ত হয়ে ঢোকে। দেখতে পায় সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না দিয়ে ঝোলানো সুতপার নিথর দেহটা। সুতপার মা শুধু একবার চিৎকার করে উঠেছিল। কেন এমন করলো সুতপা? বাইরের জগত্ সম্পর্কে আনাড়ী এই বালিকাটি তখন বস্তুজীবনের স্বাদ ভোগকারী, জীবনের তিক্ততায় তিক্তময়ী, জীবনের গুঢ় তত্ত্বকে উদঘাটনকারী, জীবনের কঠিন বাস্তবতা মোকাবেলাকারী অভিজ্ঞ এক পৌঢ়া!

বিয়ের দু’বছরের মধ্যে সুতপার জন্ম। মানুষটা কেন যেন দ্রুত বদলাতে থাকে। ভালোবাসা একটু একটু করে জানালা দিয়ে পালাতে থাকে। সুতপার মাকে মারধর করে, নেশা করে। একদিন শোনা যায় আরেকটা বিয়ে করেছে। আর ফিরে না। সুতপার তখন তিন বছর বয়স। এই ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে গলা জলে হাবুডুবু খায় তার মা। নিজেদের বাড়িতেও আর ফেরা সম্ভব নয়। একবার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসে ফেরার পথটি বন্ধ হয়ে গেছে । কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতে জমানো টাকাটুকু শেষ হয়ে যায় । বাড়ি ভাড়া বাকি পড়ে। একদিন তার মনে হয় আর যাই হোক তার জন্ম হয়েছে নারী হয়ে । লোলুপ দৃষ্টি পড়ার মতো দেহ-বল্লরীও তার আছে। বক্ষে হাত দিতে দিলেই মানিব্যাগে রক্ষিত সেকেন্ড গডকে পাওয়া সহজতর। তাই একদিন অত্যন্ত সচেতন ভাবেই সুতপার মা তার বুকের ওম পর-পুরুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। প্রথমে শুরু করেছিল বাড়িওয়ালার বড় ছেলেটাকে দিয়ে, যে ভাড়া নেয়ার ছলে প্রায়ই আসতো আর মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকতো তার বুকের দিকে। প্রতীক্ষায় থাকতো কখন শাড়ি সরে গিয়ে নাভিটা দেখা যাবে। সুতপার মাকে সেই ছেলেটাই এই পথে পাকাপোক্ত করে তুললো। তারপর থেকেই ভালোভাবেই চলতে লাগলো সুতপার মায়ের কল্পিত কাঙ্ক্ষিত জীবন সংসার। টেরা মজিদের বুকের নিচে তাকে অনেকবার যেতে হয়েছে। তাই সেদিন গোমর ফাঁসের ভয়ে সুতপাকে মজিদের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু পার্কে নয়, সুতপাকে টেরা মজিদ নিয়ে গিয়েছিল পুরান গন্তব্যে। হয়তো এজন্যই সুতপার এমন সিদ্ধান্ত। কিন্তু কেউ কেউ বলে, সুতপা আসলে সবকিছু জানতো। সে বুঝেও না বুঝার ভান করতো। তার মা যে টিউশনির নামে রাতের আঁধারে কোন অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে ফেরে তার সবই জানতো সুতপা। তার মা যাতে তার সামনে কখনো বিব্রত না হয়, অপদস্ত না হয় বা কোনো কষ্ট না পায় তাই সে সবকিছু নিরবে সহ্য করতো। কিন্তু সেদিন টেরা মজিদের সাথে তার মা-ই যখন তাকে যেতে বললো, তখন সে ভেবেছিল মায়ের পেশাটিকেই হয়তো তাকে বেছে নিতে হবে। এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি। একজন রুপোপজীবিনী হয়ে তাকে বাঁচতে হবে তা সে সহ্য করতে পারবে না। তাই এতটু্কুন বালিকা এতো বেশি অভিমানী হয়ে উঠলো যে শেষপর্যন্ত অগ্রিম পরাজয় বরণ করে নিলো।

তারপর থেকে সুতপার মাকে আর দেখা যায় না। কোথায় গেল সুতপার মা? কেউ বলে একমাত্র বাঁচার অবলম্বনকে হারিয়ে উন্মাদিনী হয়েছে। কেউ কেউ নাকি তাকে ট্রাফিক মোড়ে ভিক্ষা করতে দেখেছে। আবার কেউ বলে সুতপার দেখানো পথটিই বেছে নিয়েছে তার মা।