তপন তার বাবার ট্রাঙ্কের তালা ভেঙ্গে টাকা চুরি করে। এর আগেও সে কয়েকবার এ কাজ করেছে। এবার সে ভাবছে, দূরে কোথাও পালিয়ে যাবে। সুতরাং অনেক টাকার দরকার তার। স্কুলের মাস্টারের বেতের পিটুনি তার সহ্য হয় না। তাই ঘর ছেড়ে দূরে চলে যাবে সে। এ মুহূর্তে তার এটাই ভাবনা। ঘরে কেউ নেই। মা অদূরে পুকুর ঘাটে বাসি থালা-বাসন ধোঁয়ায় ব্যস্ত। তপনরা দু'ভাইবোন। বোনটি ওর চেয়ে ছোট। ডাকনাম রিমা। বয়স পাঁচ। সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতেও শিখেছে ইতোমধ্যে। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে বন্ধুদের সাথে খেলতে গেছে মাঠে। কচি সবুজ ঘাসে মাঠখানা যেন সবুজ গালিচার মতো। যে কারোরই হৃদয় কাড়ে। রিমার বন্ধুরাও রিমার বয়সী। হঠাৎ কী মনে করে যেন রিমা ঘরে আসে। 'মা, মা' বলে ডাকতে থাকে। ঘরে ঢুকেই চোখের সামনে আবিষ্কার করে তপনকে। হাতে মুঠোভর্তি টাকা। ট্রাঙ্ক খোলা। তপন রিমাকে দেখে দিশেহারা হয়ে ওঠে। টাকা লুকানোর কোন জায়গা খুঁজে পায় না। তার উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ধরা পড়ার ভয় কাজ করতে থাকে মনের মধ্যে। আর সেই সাথে মান-অপমানের প্রশ্ন!
বাবা যে ট্রাঙ্কে টাকা রাখে সে-কথা রিমা জানে। টাকা রাখার সময় অনেকদিন সে দেখেছে। বাবাও ওকে খুশি হয়ে বলেছে, "মা, তোর জন্য এখানে টাকা জমাই। তুই বড় হয়ে পড়াশুনা করবি না, তাই।" রিমাও হেসে জবাব দিত। হাসলে ওর ডান গালে ছোট্ট একটা টোল পড়তো। ভারী মিষ্টি সে হাসি।
তপনকে ট্রাঙ্ক খুলে টাকা নিতে দেখে রিমার সাদা মন কী ভেবেছিল, তা সে-ই জানে। হয়তো অতটুকু মনেই স্রষ্টা ওকে ভাল-মন্দের নূন্যতম বুঝটুকু দিয়েছিলেন। তপনের কা- দেখে রিমা চেঁচিয়ে ওঠে, "মা, মা, দেখে যাও, ভাইয়া বাবার ট্রাং... আর বলতে পারল না সে। অভিশপ্ত তপনের দু'হাতে যেন অপদেবতা ভর করল। অপরাধ ঢাকতে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই তার হাত চলে গেল তার-ই অত্যন্ত আদরের বোনটির কোমল গলায়। গোঙ্গানোর সুযোগটুকু পেল না যেন রিমা। নিস্তেজ হয়ে পড়ল নিথর কোমল তনুখানা তপনের হাতের উপর। তপনের এক হাতে তখন মুঠোভর্তি টাকা অপর হাতে বোনের লাশ। একদিকে স্বার্থপরতা অপরদিকে অপরাধ লুকানোর নিষ্ঠুরতম আয়োজন। মায়ের তখন থালা-বাসন ধোঁয়া সম্পন্ন হয়েছে। পাখিরা যার যার নীড়ে ফিরে যাচ্ছে। ওদিকে রিমার বন্ধুরাও রিমার জন্য অপেৰা করে যে যার ঘরে ফিরে গেছে।
তপন কাঁপছে থরথর করে। বুকের উপর কান পেতে বুঝল, তার আদরের বোন এ জগতের মায়া ত্যাগ করে গেছে ইতোমধ্যে। কী করতে গিয়ে কী করে ফেলল, কিছুই যেন বুঝতে পারল না সে। এখন সে পালাবে নাকি চিৎকার করবে_ এ দোলাচলে দুলতে দুলতে বসন্তের ধাক্কায় যেন সম্বিত ফিরে পেল মায়ের গলা শুনে। "তপন, রিমা কোথায়? ওকে একটু খুঁজে নিয়ে আয় তো, বাবা।" _ নিত্যদিনের এমন আকুতি আজও জানাল মা। তপনের কানে কথাগুলো উত্তপ্ত সূচের মতো বিঁধল। তখনো মা ঘরে ঢুকেন নি। বাইরে শুকাতে দেওয়া কাপড়-চোপড় উঠাতে ব্যস্ত। বিকেলের রোদ ম্লান হয়ে গেছে। সূর্যাস্তের আগমুহূর্তের পশ্চিমাকাশ রক্তবর্ণ হয়ে আছে। একটু পড়েই সন্ধ্যা নামবে। তাই মা আবারও ডাকলেন, "তপন, কোথায় তুই? শুনতে পাচ্ছিস না? দেখ তো বাবা, রি... কথাগুলো শেষ করতে পারলেন না। তপনের হাউমাউ কান্না শুনে তিনি দ্রুত ঘরে ঢুকলেন।
"মাগো, এ আমি কী করলাম... মা, আমার সব শেষ..." রিমাকে জড়িয়ে ধরে তপন পাগলপ্রায় হয়ে কাঁদছে। মা তো মা, তখন বোধ হয়, প্রকৃতি জগতও একবার কেঁপে উঠল। "কী হয়েছে আমার রিমার?..." বলে আত্মচিৎকারে ফেটে পড়লেন মা। রিমাকে কোলে তুলে নিলেন। রিমা, রিমা বলে ডাক দিলেন কয়েকবার। কিন্তু রিমা আর কথা বলবে না। সে যে এখন অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে গেছে।
"মা, তুমি আমাকে খুন করে ফেল। আমি বাঁচতে চাই না মা। আমাকে হত্যা করে ফেল মা... আমি আমার নিরপরাধ বোনকে মেরে ফেলেছি... বলতে বলতে মায়ের দু'পা জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল তপন।
তপনদের বাড়ির এ অনাকাঙ্ৰিত কোলাহল শুনে আশেপাশের লোকজন তাদের বাড়িতে ভিড় করল। ক্রমে এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ল সবখানে। ঘটনাটি পুলিশের কানও এড়াল না।
ঘরের চৌকিতে রিমার নিথর দেহখানা শোয়ান। মনে হয় যেন ঘুমিয়ে আছে। নির্মল মুখখানার দিকে তাকালে মনে হয় না, রিমা বেঁচে নেই। "না, আমার রিমা মরে নি, মিথ্যা কথা... আপনারা চলে যান।" পুলিশের উদ্দেশে কাতর অনুনয় করলে শেষে স্বাভাবিক দাফন সম্পন্ন হল রিমার। বিকেলবেলা কাউকে না পেলে বাড়ির যেখানটায় রিমা একা একা খেলত সেখানেই একটি জামরুল আর আমগাছের মাঝামাঝি জায়গায় চির নিদ্রায় শায়িত হল রিমা।

দেড় বছর পর...
তপন আজ বাড়িতে এসেছে 'কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে' দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার পর। মায়ের মুখখানা শুকনা। তপনের মনেও ভীষণ অপরাধ বোধ কাজ করছে। কেমন করে মায়ের সামনে দাঁড়াবে, কী বলবে মাকে_ কিছুই ভেবে পেল না সে। বারান্দায় বসে শুধু শব্দহীন অশ্রু ঝরছে তপনের দু'গাল বেয়ে। এভাবে কেটে গেল অনেকৰণ। শেষে মা-ই ডাকলেন, "তপন, কাছে আয় বাবা। তোকে একটু দেখি।" এমন অনুরোধে শুষ্ক ঘাসও বুঝি সজীব হয়ে উঠবে। তপন ঠিক থাকবে কীভাবে? ঘরে ঢুকেই মায়ের পায়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। "মা, আমাকে তুমি কোনদিন ৰমা করো না। আমি ৰমার যোগ্য নই। তুমি আমাকে যা ইচ্ছা শাস্তি দাও।"
কিন্তু মায়ের মন! পৃথিবীর সমস্ত রাগ, অভিমান, ৰোভ, দ্বন্দ্ব এখানে এসে যেন পরাস্ত হয়। এ এক আশ্চর্য সৃষ্টি! ধীরে ধীরে মা ছেলেকে দু'হাতে ধরে উঠালেন। তাকালেন ছেলের মুখের পানে। ঠিক থাকতে পারলেন না মা। আবেগে হু হু করে কেঁদে উঠলেন, "বাবা, এই দেড়টি বছর সন্তান আমার কীভাবে কেটেছে, তা আমি ছাড়া আর কেউ জানবে না। তুইও তো আমার কাছে রিমার মতোই একটা সন্তান। মা কি তার সন্তানকে ফেলে থাকতে পারে?"
তপন এবার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল, মাগো, তুমি এত মহৎ! তোমার তুলনা যে তুমি নিজেই মা।