গেল বছর শেষের দিকে হবিগঞ্জ শহরের একটি ¯^নামধন্য কলেজ থেকে অনার্স শেষ করেছে মেয়েটি। আমিও। সেখানে পড়াকালীন সময়ে সারা কলেজে একটি মাত্র মেয়ে আমার চোখে পড়েছে। মেয়েটির নাম ছিল হ্যাপী। উচ্চতায় আমার সাইজ,ফর্সা ও মাজারি মোটা। ক্লাসের সব ছেলেরা এই মেয়েকে নিয়ে হাসাহাসিসহ কানাঘুষা করতো। কেন করত, কি কারণে করত প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। হ্যাপি প্রায় দিনই ক্লাসের সামনের বেঞ্চে বসত। আমি খুব লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। কি রকম লাজুক প্রকৃতির?
ঠিক যেন বোরকা পরিহিত মেয়েদের মত। শুনেছি যে সব মেয়েদের লজ্জা বেশি, তারাই নাকি বোরকা পড়ে।
আমি মেয়ে নই। মেয়ে হওয়া জন্মানো আমার সখ ছিল। অথচ কোন পছন্দের কোন মেয়ে ছিল না। যাকে আমি পছন্দ করতাম। অবশ্য কম বয়সি কিংবা, আমার বয়সী কোন মেয়েই আমাকে পছন্দ করত না। তাদের বক্তব্য পুরুষ মানুষের লজ্জা থাকবে কেন?
ইংরেজিতে হ্যাপীর স্পোকেন করা ছিল। সে স্যারদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলতো দেখে ছেলেরা হাসাহাসি করতো। ক্লাসের অন্য মেয়েরা হ্যাপির মতো ইংরেজি জানতো না। আমিও না। ইংরেজি জানতো বলে, হ্যাপীর সাথে কোন ছেলে কথা বলতে যেতোনা। ছেলেরা কথা বলতে গেলেই ইংরেজিতে হ্যাপি কি সব বলত তাদের। ছেলেরা আমাকে বলতো, ওইসব নাকি গালি! এরকম গালিতো আগে কোনওদিন শুনিনি আমি। আমি অবাক হয়ে ওসব শুনতাম ওই সব গালি।
আজকালকার দুএকজন শহুরে তরুণী যারা প্রবাসি (ইংল্যান্ড) এর পাত্র পছন্দ করে রাখে তারা নাকি ওইসব প্রয়োগ করে।
হ্যাপীর সর্ম্পকে বেশ কৌতুহুল হতে লাগলো। একবার কথা বলতে ইচ্ছা হলো। ৪ বর্ষের ১ম বর্ষের কথা বলছি। কথা বলতে গিয়ে দেখি, কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। আমি লাজুক মানুষ, ইংরেজিও জানি না! লজ্জায় একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে যাই।
মনে পড়ল রবি ঠাকুরের কথা। ইংরেজি জানিনাতো কি হয়েছে? বাংলাতো জানি। তাছাড়া বাংলা আমার মাতৃভাষা। রবি ঠাকুর নাকি একবার একটা চিঠির উত্তর ছোট করে দিয়েছিলেন! ঠাকুরের কথা মনে পড়তেই মনে বল এসেছিল। অনেকবার চেষ্টা করে বললাম,‘কেমন আছ ?
হ্যাপি কি বলেছিল জানেন? শুনলে হাসি পাবে।
সেই কথার উত্তরে হ্যাপী খুব রাগত ¯^রে বলেছিল,-তুমি যে একটা পাগল, এ কথা বাড়ির লোকে জানে!
সেদিনের পর থেকে কেটে যায় একটি বছর। হ্যাপীর সামনে যাইনি। পরবর্তী বছরগুলোতে কিভাবে যে হ্যাপীর সাথে আমার একটা সুসর্ম্পক হয়ে গেলো এই মুর্হুতে মনে পড়ছে না।
তুমি থেকে ‘তুই’ শব্দে এসে ঠেকল আমাদের সর্ম্পকটা। দেখতে দেখতে এক সাথে কাটিয়ে দিয়েছি ৬টি বছর। একে অপরের কাছে দুজনে শেয়ার করেছি অনেক কথা। কিন্তু আজ আমি যে সমস্যায় পড়েছি, সে কথাটা-হ্যাপিকে কি করে বলি?


সম্মান পরীক্ষার পর-হ্যাপি হঠাৎ বাড়ি চলে গেল। হ্যাপি তো আর গেল না, তাকে এক প্রকার বাধ্য হয়েই যেতে হল। কিন্তু তার চলে যাওয়াতে আমার কেন দুঃখ হয়? আমার দুঃখ কেন শেষ হয় না? কেন হ্যাপির এই চলে যাওয়াকে আমার যাওয়া বলে মনে হয় না! কেন মনে হয় ফিরে আসার জন্যই গেছে সে?
এ যাওয়াই সারা জীবনের জন্য চলে যাওয়া নয়। আমাদের দুজনের আবার দেখা হবে। আমরা আবার দুলব সিলেটের সেই আনন্দ নৌকায়। আবার সেই নৌকোর গলুইয়ে হ্যাপীর পাশে বসে আমি আকাশের রং দেখব, আর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে হ্যাপি বৈঠা বাইবে। আমরা হারিয়ে যাব বহু দূরে, দিগন্ত পেরিয়ে তেপান্তরে।
এমন এক দিগন্তে যাব, যেখানে কোনও পাপ, পঙ্কিলতা, হিংসা, ঘণৃা, নিষ্ঠুরতা নির্মমতা থাকবেনা, যেখানে থাকবেনা কোন অন্যায়, বৈষম্য, যেখানে কোনও রোগ-শোক কিছুই থাকবে না। এটি এমন এক দিগন্ত হবে, যে দিগন্তে কোন অপমৃত্যু থাকবে না। ভালবাসার সুভাস নিতে নিতে সেখানে বাস করব আমরা দুজন। ভালবাসা আমাদের মন দিগন্ত ছেড়ে পালাবেনা কোথাও?
গত নভেম্বরে বাড়ি চলে যাবার মাসখানেক পর আমি যখন ঢাকায়, হ্যাপী ফোন করেছিল। বলেছিল, চলে আসা ছাড়া আমার কিছুই করার ছিল না! কিছুই কি করার ছিল না তার? বলেছিলাম, কেন ভুলে যাস হ্যাপী তুই একজনের খুব কাছের মানুষ?
কিন্তু সেদিনও আমি হ্যাপীকে খুলে বলতে পারিনি আমার সমস্যার কথা। আমি যে সারাদিন তার ¯^প্ন পূরণের তালে থাকি। সাধনা করি। ¯^প্ন দেখি।
কিন্তু মাত্র কটা দিন কাছে না থাকায়, মনে হচ্ছে, আমার ¯^প্ন দেখার পথটি হয়ে গেছে কন্টকপূর্ণ। গন্তব্যহীন। মনে হচ্ছে এই ¯^প্ন পূরণ হবে না কোনদিন। গত ১০ মাসে অনেক কিছুই বদলে গেছে। আলাদা হয়ে গেছে দুজনের পৃথিবী।
ভালবাসা কি আমি জানতাম না! ভালবাসা কি বুঝতাম না! জানিনা কিভাবে ভালবাসলে ভালবাসা হয়!
তবে ১০ মাস পর আজ বুঝতে পারছি, ভালবাসা কি?
এতটা দিন ¯^প্ন দেখতে দেখতে কেটেছিল আমার। সেদিন বুঝতে পারিনি জীবনটা কোনও ¯^প্ন নয়, বাস্তব। জীবনে চলার পথে আমি সব সময় হ্যাপী হতে চেয়েছিলাম! জীবনের মানে কি? খোজঁতে যাইনি কোনদিন! অথচ আমি আজ ভালবাসা খুজিঁ। কিন্তু সময় থাকতে ‘আমার ভালবাসাকে চিনিনি’। প্রকাশ করিনি।
জীবন নামক আমার ছোট দিগন্ত ছেড়ে সে চলে গেল! যতক্ষনে গেল, ততক্ষনে আমার মনে হল-সে-ই বুঝি ছিল আমার ভালবাসা, সে-ই ছিল বুঝি আমার বেচেঁ থাকার পৃথিবী। অথচ সব কিছুর জন্য আজ আমি আমার নিয়তিকেই দোষারোপ করছি সর্বক্ষণ।
এ দোষারোপ করা আমার কি সাজে?
প্রেমেই যখন পড়েছিলাম, ভালই যখন বেসেছিলাম, তবে কেন, কিসের অপরাধে প্রেম আমার দুরে।
আজ মনে হচ্ছে, সত্যিই আমি ভালবাসা কি জানি না! কিভাবে ভালবাসতে হয় সেটাও জানি না! মাঝে মাঝে মনে হয় আমাকে কেউ তার মত ভালবাসার জন্য এগিয়ে আসবে না।
আমাকে ভালবাসা যাবে না। আমাকে ভালবাসা আর পাপ করা একই কথা!


গত বছর সেই হ্যাপি কে নিয়ে সিলেটের লালাখাল বেড়াতে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সৌভাগ্য বলছি এ কারণে, হ্যাপী যেতে চায়নি। তাকে রাজি করিয়েছিলাম আমি। সেখানে যেতে যেতে বিকাল হয়েছিল আমাদের।
হ্যাপী জলে নামার বায়না ধরেছিল। মানা করেছিলাম আমি। কারণ সে সাতার জানতো না। আমিও না। যদি দুর্ঘটনা ঘটে। আমার কথা শুনেছিল সেদিন হ্যাপী। প্রচন্ড গরমে আমি হাপিয়ে উঠেছিলাম। লালাখালের নীলাভ জলে অর্ধ ¯œান করে, বালুর ওপর সূর্যাস্তের আলোর নিচে বসে ছবি তুলার অফার করেছিলাম হ্যাপীকে আমি।
আমি গোলাপি আর আর জিনস, হ্যাপি কালো সেলোয়ার আর লেহেঙ্গা পরেছিল। কী চমৎকার সময় কেটেছিল আমাদের! মনে হয়েছিল ডানা মেলে দুর দিগন্তে হারিয়ে যাব আমরা। কিছুক্ষনের জন্য মনে হয়েছিল বন্ধুত্বের খোলস ছেড়ে দুজন বেরোতে পারব ভালবাসার নীল দিগন্তে।
কিন্তু গত ১০ মাসে উলট পালট হয়ে গেছে সব কিছু। বদলে গেছে দুজনের পৃথিবী। আমরা আর বন্ধু-বান্ধবী কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকা নই। আজ মনে হয়, এই পৃথিবীতে হ্যাপি ছাড়া কাছের মানুষ আর কেউ ছিলনা আমার। সেই অনার্স ১ম বর্ষ থেকে শেষ অবধি দীর্ঘ ৭টি বছর ধরে এই এক হ্যাপিকেই মনের মধ্যে আমি আপন করে তুলেছি। তাকেই আমি আমার জগত বানিয়েছি।
হ্যাপি আমাকে কিছুটা হলেও দুঃখ দিয়েছে জানি, কিন্তু তাই বলে আমি তাকে ভালবাসি এ কথা তো অ¯^ীকার করতে পারি না। এখনো সেই হ্যাপীকে কাছে পাবার ইচ্ছে হয়। মনে হয় সে ছাড়া বাচঁবো না। বাচঁতে পারবোনা।
পরক্ষনে আবার মনে মনে হয়, আমিতো বেচেঁ আছি! এত দিনতো বেচেঁছিলাম। তবে আর কেউ না জানুক আমিতো জানি,এই বেঁচে থাকাটা কেমন ছিল। প্রতিটা মুর্হুতে মৃত্যুর ¯^াদ ছিল। আমি জানি, এতদিন পরে হয়তো, হ্যাপি আমার এই সব কথা বিশ্বাস করবেনা। তবুও তাকেই ভালবাসব আমি।
কারণ, আমাকে তো আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো হলে চলবে না। অসাধারণ হয়ে তার ¯^প্ন যে আমাকেই পুরণ করতে হবে।
হ্যাপি যদি আমার মনের কথা বুঝতে পেরেও সুখে থাকতে চায়, থাকুক। আমার কোন আপত্তি থাকবে না। সে সুখী! এমন কথা শুনলে, আমি অবাক হব না। তার সুখের পথে কোনওদিন বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না আমি। আমার এই অসহ্য জীবন থেকে সে যদি মুক্তি চায়, নিয়ে যাক। আমার বলার কিছু নেই। আমি তাকে কোনওদিন দোষ দেব না। আমার অ¶মতাটুকু আমার থাকবে। আমার একাকীত্ব আমারই থাকবে।
এতদিনে আমি বুঝে গেছি, আমার দ্বারা কোন মেয়ের সুখ হবে না। কোন মেয়েকে সুখী করার ¶মতা আমার সত্যিই নেই। আমি একটা ফালতু মানুষ। যেখানেই থাকিস, আমাকে ¶মা করে দিস হ্যাপি! কোনওদিন ভাবিনি এভাবে বলব।
কিন্তু গন্ড মুর্খের মত জীবনে তকে নিয়ে আমি সুখের প্রত্যাশা করেছিলাম। আজগুবি ¯^প্ন দেখেছিলাম। বাস্তবতা আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল, জীবন দিগন্ত এত বিশাল নয়। এতে বেচেঁ থাকতে শ্বাস বন্ধ করে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে আমার। এতদিন বুঝিনি কিছু একটা পেতে হলে হারাতে হয় তার চেয়েও বেশি। অথচ নিবোর্ধের মত আমি হারাতে না চেয়েই পেতে চেয়েছিলাম। তাইতো হেরে গেলাম নিজেই.......


কতটা অদ্ভুত পৃথিবীতে এই বেঁচে থাকার অভিনয়! আমি ভেবে পাই না, একজন মানুষ কেন সুখে থাকতে চায়। কেন সুখের প্রত্যাশা করে সব সময়। সুখের চেয়ে দুঃখটা কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেনা তাদের কাছে। হ্যাপী আর আমার মাঝে আইফেল টাওয়ারের মত দুরত্ব। অথচ এত কাছে গেছিলাম, এত কাছে দুজন ছিলাম, সেই দুরত্ব টের পাইনি। আজ তাকে অন্য দিগন্তের মানুষ মনে হয়, হাত বাড়ালে যাঁর নাগাল পাওয়া যায় না। শুনেছি, আগের চেয়ে হ্যাপির জৌলুস বেড়েছে অনেকখানি।
এই লেখার মাধ্যমে একটা চরম সত্য কথা বলি। এই হ্যাপীর সাথে দেখা হওয়ার আগে,-আমি কখনো প্রেমে পড়িনি। পা-ও বাড়াইনি। হ্যাপীকে দেখে এত, এতই অবাক হয়েছিলাম যে, প্রায় ৭ বছর তাকে ছাড়া আর কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাইওনি।
সেদিন আমার লজ্জা ভাঙ্গিয়েছিল হ্যাপী। জানি, সে আসবে আর কোনদিনও ফিরে আসবে না। শুধু শুধু অকারণে বেদনার ছায়া আমার মন দিগন্তে। কেন জানি মনে হয়, দিগন্তে চলতে গিয়ে পথ পরিক্রমায় থমকে দাড়িয়েছি আমি তার প্রতিক্ষায়। কেন জানি মনে হয়, শুধু কাছে পাওয়ার জন্যই ভালবাসা নয়, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে ভালবাসার মানুষকে সুখে রাখা, সুখী দেখার নামটাই হল ভালবাসা...