লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৯ জুলাই ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১০টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

১০৭

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবন্ধু (জুলাই ২০১১)

সুরত
বন্ধু

সংখ্যা

মোট ভোট ১০৭

মনির মুকুল

comment ৯৮  favorite ২  import_contacts ১,৩০২
শাকের ডাটাগুলো সাইজ করা যথেষ্ট কষ্টের। ঘাম বেরিয়ে আসছে। রান্না-বান্নার কাজটা যে এত ঝামেলার তা এর আগে তেমন ধারণা ছিলো না। নানীর অসুখের খবর পেয়ে মা নানী বাড়ী যাওয়ার কারণে তিন দিন যাবৎ সীমাকে এই দায়িত্বটা নিতে হয়েছে। সকালের খাবার তৈরি করতে না করতেই দুপুরের সময় চলে আসে, শুরু হয় দুপুরের রান্না। সেসব কাজ-কাম সেরে খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিতে নিতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। শুরু হয় রাতের আয়োজন। এই তিন দিনে সীমা বুঝেছে সংসারে গৃহিণীদের রান্না-বান্না নামক এই চাকুরীতে সপ্তাহে তো দূরের কথা মাসে কিংবা বছরেও কোন ছুটি নেই। বরং অতিথি আসলে ওভার টাইম ডিউটি করা লাগে। অথচ এ কাজটা যে কষ্টের তা পুরুষ সমাজ কোন দিন হয়তো বুঝতেও চেষ্টা করে না। পুরুষদের দোষ দিয়ে কি হবে সীমা নিজেও কি কখনো নিজের ইচ্ছায় মায়ের রান্নার কাজে সাহায্য করতে এসেছে? মা নিজের কষ্ট হলেও মেয়ের পড়ার ব্যাঘাত ঘটতে না দেওয়ার জন্য একা একা কাজ করে। ওদিকে সীমা পাঠ্য বইয়ের ওছিলা করে হুমায়ুন আহমেদের হিমু সিরিজ গুলো মুখস্থ করে ফেলেছে। মাকে কতই না ফাঁকি দিয়েছে। এভাবে ফাঁকিবাজি করে মাকে কষ্ট দেওয়া যে ঠিক হয়নি তা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যাচ্ছে।

হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনের শব্দে মনোযোগ ফিরে আসে। কার কল হতে পারে? হয়তো নানা বাড়ী থেকে এসেছে। নানীর শারীরিক অবস্থা মনে হয় আরো খারাপের দিকে গেছে। সীমা ছুটে আসে বেডরুমে। কিন্তু সে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে যায়। শিহাবের কল। আজ পাঁচ মাস যাবৎ প্রতিটা মুহূর্তে যে কলের জন্য সে অপেৰা করে এসেছে সেই কল। সীমার আত্মবিশ্বাস ছিল শিহাব এক দিন না একদিন তাকে কল করবেই। অবশেষে আজ সেই আশা সত্যি হয়ে ধরা দিল। আনন্দে সীমার চোখে জল চলে আসছে। রিসিভ করে প্রথম কোন কথাটা বলবে ভেবে পাচ্ছে না। এতদিন পর শিহাবই বা কোন কথা সাজিয়ে নিয়ে এসেছে।

আজ বাড়ীতে তেমন কেউ নেই, ওর সাথে অনেকৰণ কথা বলা যাবে। এই পাঁচ মাসে না বলা কত কথা জমা আছে তা কি আর অল্প সময়ে বলা শেষ হবে। ৫০ টাকার ২টা রিচার্জ কার্ড সব সময় তার বইয়ের ভাজে জমা থাকে। কোন সময় দরকার হয়ে পড়ে। আজ সময় এসেছে কার্ড দুটি কাজে লাগানোর। অবশ্য শিহাবের সাথে কথা বলার জন্য ব্যালেন্স নিয়ে ভাবতে হয় না। কারণ সে-ই সব সময় কল ব্যাক করে। পাঁচ মাস শিহাবের সাথে যোগাযোগ না থাকার কারণে তাদের সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব মনে হলেও আজকের এই কল যেন তাতে পূর্ণতা দিল। মনে হচ্ছে তাদের মধ্যে কোন সময় কোন দূরত্বই তৈরি হয়নি। সময় নিয়ে ফোনে গল্প করা, কলেজ মাঠের পাশে দেখা করা, এগুলোও যেন নিয়মিতই হয়। শিহাবকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা বিষয়টাও এখন যেন আর স্মৃতি নয়। অথচ কয়েক মিনিট আগেও এসব ছিল ভাবনাতীত। বিগত পাঁচটা মাস যেন মনে হয়েছে ৫টা বছর। দুঃখের সময়টা সম্ভাবত দীর্ঘ মনে হয়। আর সুখের সময়টা ঠিক তার উল্টো। শিহাবের সাথে সম্পর্ক চলমান সময়টাই সুখময় সময় মনে হয়। পরিচয় হওয়ার পর থেকে সাত মাস স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে কেটে গেছে। প্রথম দিনটার কথা মোটেও ভোলার নয়। যেন এখনও চোখের সামনে ভাসছে।

সেদিনও এমন করে এক হতাশার মাঝে আশা জাগিয়েছিল তার কল। জনতা ব্যাংকের সামনে এসে রিক্সা থেকে নামতেই খেয়াল হলো হাতে বেতন বইসহ ট্রান্সপারেন্ট ব্যাগটা নেই। বেতন বইয়ের ভিতরেই কলেজের বেতন বাবদ ৩২০০ টাকা ছিল। ঐ টাকাটা জমা দেওয়ার জন্যই ব্যাংকে আসা। পথে কোথাও পড়ে গেছে। এখন কী করা যায়! বাবা শুনলেই বিপদ। বকাবকি শুরু করতে পারে। আবার মনে মনে এটাও ধরে নিতে পারেন টাকা গুলো হয়তো গায়েব করার জন্যই মেয়ে এমন মিথ্যা বলছে। যদিও তার বাবা এর আগে সীমার কোন কাজে এধরণের প্রমাণ পাননি। তারপরও যুগ হিসেবে এমনটা মনে করাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এখন প্রায় সব ছেলে মেয়েরাই এমন করে। কয়েকদিন পরেই অনার্স প্রথম বর্ষের পরীৰা। কলেজের বেতন পরিশোধ করাই লাগবে। কলেজ থেকে নতুন বেতন বই উঠাতেও জরিমানা গুনতে হবে। বাবা যাই বলুক, যা-ই ভাবুক তাকে জানাতে হবে। নইলে তো পড়াশুনার ৰতি হবে। বাবাকে কল করার জন্য ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে সীমা। মোবাইলটা হাতে নিতেই হঠাৎ রিংটোন বেজে উঠে। অপরিচিত একটা নম্বর। সীমা রিসিভ করে বলে- "হ্যালো...."
- "আপনি কি শরীফা পারভীন সীমা বলছেন?"
- "জি, আপনি কে বলছেন?"
- "আমার নাম বললে চিনবেন না, আপনার কি কোন ব্যাগ হারিয়ে গেছে?"
সীমা আশার আলো দেখার মতই উৎফুল্ল হয়ে বলে- "হ্যাঁ.. হ্যাঁ আপনি পেয়েছেন!"
- "জি, বেতন বইয়ের কভার পেজে আপনার নাম, রোল আর মোবাইল নম্বর লেখা দেখলাম। সাথে বেশ কিছু টাকাও আছে।"
- "জি, কলেজের বেতনের টাকা। আমি ওটা ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্যই আসছিলাম।"
- "আপনি এখন কোথায় আছেন?"
- "জনতা ব্যাংকের সামনে।"
- "ভালোই হলো আমি ওদিকেই যাচ্ছিলাম। আপনি গেটের কাছে পাঁচ মিনিট অপেৰা করেন আমি আসছি।"

এতক্ষণে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সীমা। টাকা পয়সা হারিয়ে গেলে ফেরত পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। বইয়ের উপর মোবাইল নম্বর লিখে রেখে লাভ হয়েছে। পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেছে। সীমা এদিক ওদিক চাইতে থাকে। পিছন থেকে একটা ছেলে বলে- "ব্যাগটা মনে হয় আপনারই।" সীমা পিছন ফিরে দেখে বলে- "জি"। সে সীমার দিকে ব্যাগটা বাড়িয়ে দেয়। সীমা হাতে নিয়েই বলে- "অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।"
- "না দেখেই ধন্যবাদ দেওয়া ঠিক হবে না। আগে দেখুন সব কিছু ঠিকঠাক মত আছে কি না।"
- "দেখতে হবে না। এর থেকে কিছু বের হলে তো ব্যাগটা আমার হাত পর্যন্ত আসতো না। আপনি আমার অনেক বড় উপকার করলেন। আমার ভাগ্যটা ভালো যে আপনার মতো মানুষের সামনেই ব্যাগটা পড়েছে।"
- "সাবধানে চলাচল করবেন।" বলে ছেলেটা সামনের দিকে হাটা শুরু করে। সীমা কৃতজ্ঞ ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার চলে যাওয়া পথের দিকে। তারপর দৃষ্টি নামিয়ে ব্যাংকের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

বাসায় এসে কাউকে বলা হয়নি ঘটনাটা। রাতে পড়তে বসে বার বার তার কথাটা মনের মাঝে ভেসে উঠছে। রিসিভ কলে তার নম্বর আছে। একটা কল করা দরকার নইলে অকৃতজ্ঞ ভাববে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে রিসিভ কল বের করে কল দেয়। ওপাশ থেকে রিসিভ করে সে সালাম দেয়। সীমা সালামের জবাব দিয়ে বলে- "চিনতে পেরেছেন?"
- "আমি চিনতে পেরেছি বরং আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি।"
সীমা অবাক হয়, বলে- "আমি চিনতে পারেনি মানে?"
- "মানে সহজ, এই যেমন আমি বলতে পারছি আমি সীমার সাথে কথা বলছি, আপনি বলুন তো আপনি কার সাথে কথা বলছেন?"
সীমা এবার ঘাবড়ে যায়। ছেলেটার নাম তো তখন জেনে নেয়া হয়নি, এখন কি বলবে? সীমা এবার কিছুটা লাজুক ভাবেই বলে- "আমি তো আপনার নাম জানি না।" সে ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে বলে- "শিহাব, এবার প্রশ্ন আসতে পারে আমি কি করি? উত্তরটা তাই প্রশ্ন করার আগেই বলে দিচ্ছি, আমার অবস্থাও কিছুটা আপনার মত। মানে আপনি অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত আর আমি ওটা পার হয়ে বেকার প্রথম বর্ষে অবস্থানরত। অর্থাৎ এক বছর বেকার অবস্থায় আছি।"
কথাটা শুনে হাসি পায় সীমার। বেশ অনেকৰণ ধরে কথা হয় দুজনার মধ্যে।

তারপর মাঝে মধ্যেই দুজনার মধ্যে কথা হতে থাকে। একে অপরের সম্পর্কে অনেক কিছু জানাজানি হয়। ধীরে ধীরে দুজনার মধ্যে বন্ধুত্বের ভীত তৈরি হতে থাকে। দুজনের সম্মতিক্রমে সম্বোধন তুমিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুজনের কয়েকবার দেখাও হয়েছে। তবে শিহাব এখনও সীমার চেহারা দেখেনি। সীমা বাড়ীর বাইরে গেলেই নেকাব পরে বের হয়। তাই নিয়মিত কথা বা দেখা হলেও মুখখোলা অবস্থায় কোনদিন দেখা হয়নি। শিহাব নিজেও কোনদিন বলেনি নেকাব খোলার জন্য বা নেকাব ছাড়া বাইরে আসার জন্য। হয়তো প্রয়োজনও মনে করেনি। তবে সীমা একদিন দেখা করার জন্য নেকাব না পরেই এসেছিল। কিন্তু ঠিক সেই দিনেই শিহাব বিশেষ কাজে আটকা পড়ে আসতে পারেনি। তাই সীমার উদ্দেশ্যটাও সফল হয়নি। পরে নিয়মিত কথা হলেও সীমা এ ব্যাপারে কোন কথা তোলেনি। এরপর আরো চার মাসে পার হয়ে যায়। একে অপরের প্রতি অনেকটাই নির্ভর হতে থাকে।


শিহাবের সাথে সম্পর্কের কথা পরিবারের কাউকে জানানো হয়নি। এমনকি বান্ধবীদেরও না। মোবাইলে নিয়মিত কথা হয়। সীমা তাকে কল করলেও শিহাব কেটে দিয়ে ব্যাক করে। একদিন কথা বলার সময় এক পর্যায়ে শিহাব বলে- "আচ্ছা সীমা তোমার আমার মধ্যে তো বন্ধুত্বের সম্পর্ক। আমরা কি পারিনা এটাকে বন্ধুত্বের সীমানা পার হয়ে আরো সামনে নিয়ে যেতে?"
সীমা চুপ থাকে কিছুৰণ। তারপর বলে- "এটা আসলে অনেক বড় সিদ্ধান্তদের ব্যাপার। এর জন্য আরো কিছু জানা-বোঝার দরকার আছে। আর সেগুলো ঠিক মত মিল মিশ না হলে তখন বন্ধুত্বটাও থাকবে না। তার চেয়ে বন্ধু আছি বন্ধুতেই থাকি।"
- "আর কি জানার বাকী আছে? তোমার ভালোলাগা-মন্দলাগা, সবই তো আমার জানা তেমনি আমারটাও জানা আছে তোমার। তাছাড়া আমি অনেক চিন্তা ভাবনা করেই তোমাকে বলেছি। এতে কি তোমার কোন আপত্তি আছে?"
সীমা কোন কথা বলে না। তবে সে শিহাবের কথা শুনে তৃপ্ত হয়। মনে মনে এমনটাই আশা করছিল সে। তারপর এ বিষয়টি নিয়ে আরো কথা হয়। সীমাও যে শিহাবের প্রতি কিছুটা দুর্বল তা শিহাবের বুঝতে অসুবিধা হয়নি।

সীমা বুঝতে পেরেছে ইদানীং তার পড়ার টেবিলে বইয়ের প্রতি মনোযোগ একটু কম হয়ে গেছে। সারাৰণ যেন ওর কথা মনে হয়। মনে চায় এখনি মোবাইলটা বেজে উঠুক। এখনও দুজন দুজনকে সেই আবেগ জড়ানো কথাটা বলা না হলেও সেরকমভাবেই ভাবতে শুরু করেছে। পরিচিত কাউকেও সম্পর্কের জানানো হয়নি। এমনকি সবচেয়ে কাছের বান্ধবী যূথীকেও না। ওকে আর না বলে থাকা ঠিক হবে না, নইলে পরে অভিমান করে বসবে। এটা ভেবেই আজ বিকালে যূথীকে আসতে বলা হয়েছে। আজ কলেজ থেকে ফেরার পথে শিহাব দেখা করতে বলেছে। তার কথার ধরণ শুনে মনে হয়েছে কোন গিফট টিফ্ট দিতে পারে। দিলে তো আরো মজা হবে, বিকালে যূথীকে দেখানো যাবে।

সীমা কলেজের গেট থেকে বের হয়ে ডান দিকে নজর করতেই দেখা গেল শিহাব দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে তার পাশে যায়। শিহাব বলে- "চলো একটু সামনের দিকে যাই"। দুজন হাটা শুরু করে। বেশ কিছুদূর এসে একটা রেস্টুরেন্ট দেখিয়ে বলে- "চল একটু বসি"। এর আগে অনেকবার দেখা হলেও এদিকে আসা হয়নি। বেশির ভাগ সময় মাঠের পশ্চিম দিকে বসা হয়েছে। সীমা বলে- "বসবা তাহলে এদিকে কেন চলো ওখানেই যাই"। শিহাব বলে- "আজ আর ওদিকে যেতে ভাললাগছে না এখানেই বসি" বলেই শিহাব রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে পড়ে। পিছে পিছে সীমাও যায়। একেবারে কর্নারে নিরিবিলি চেয়ারেই বসে দুজন। একটু পরে মাচিয়ার আসলে ৪টা মিষ্টি দিতে বলে শিহাব। সীমা বলে- "এখন কিছু খাব না"। শিহাব বলে- "এখানে বসলে কিছু না কিছু খেতে হয়। সামান্যই অর্ডার দিয়েছি"। মাচিয়ার পিরিচে করে মিষ্টি দিয়ে গেল। সীমা চুপচাপ বসা। শিহাব বলে- "খেয়ে নাও"। সীমা মুখ থেকে নেকাব খুলে চামচটা হাতে নিয়ে দেখলো শিহাব তার নেকাব বিহীন খোলা মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই শিহাব মিষ্টির দিকে নজর করলো। ওর চাহনির মধ্যে হঠাৎ করে কেমন যেন একটা বিষণ্ণতা দেখা গেল। কিছু একটা বলতে গিয়েও খেই হারিয়ে ফেলছে। আগের মত প্রাণবন্তর ভাবটাও যেন ম্লান হয়ে গেছে। একটু পর পর বিষণ্ণ মনে সীমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। সীমা শিহাবের দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারছে শিহাবের চাহনি। মিষ্টি শেষ করে বলে- "চল উঠি"। আর কোন কথা হলনা। নেকাব ঠিক করে শিহাবের পিছু পিছু বের হয়ে আসে সীমা। তারপর রিক্সা ঠিক করে বাসায় আসার জন্য।

বাসায় এসে শিহাবকে কল দেয় সীমা। কিন্তু নম্বর বন্ধ। এর আগে কোন দিন এক মুহূর্তের জন্যও শিহাবের নম্বর বন্ধ দেখা যায়নি। কিছুৰণ পর পর ট্রাই করতে থাকে সীমা। দিনের পর দিন পার হয়ে যায় কিন্তু তার নম্বর আর খোলা পাওয়া যায় না। শিহাবও কোন কল করে না। সীমা মানসিক ভাবে প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে। তার আর বুঝতে বাকী রইল না যে শিহাব ঐদিন তার চেহারা দেখার জন্যই বুদ্ধি করে রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়েছিল। আর দেখার পর ওর পছন্দ হয়নি বলেই এভাবে গা ঢাকা দিয়েছে। ঐ দিনের পর থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই। ঐদিন বিকালে যূথী ঠিকই এসেছিল কিন্তু ওকে এ ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। তবে ওকে না বললেও মন খারাপের ভাবটা ওর কাছ থেকে আড়াল করা সম্ভব হয়নি। বার বার ও জিজ্ঞেস করেছিল মন খারাপ কেন? কোন ভাবেই ওকে বলতে পারেনি সীমা। শরীর খারাপের কথা বলে কাটিয়ে দিয়েছে। যেদিনই ওকে জানাবে বলে ভেবেছে ঠিক সেদিনই ঘটে গেল দুর্ঘটনা। সীমার মনে প্রশ্ন জাগে মানুষের বাহ্যিক চেহারা-সুরতই কি সব কিছু? এত দিন ধরে তিলে তিলে যে ভালোবাসা তৈরি হলো তা মাত্র দুই/এক মিনিটের চাহনীতেই সব বিলীন হয়ে গেল। একবারের জন্যও শিহাব যোগাযোগ করার প্রয়োজন মনে করেনি। দিন যায় মাস যায় এভাবে এই পাঁচ মাস যাবৎ একবারের জন্যই সীমা শিহাবের নম্বরটা খোলা পায়নি। একবারের জন্য শিহাবের কাছ থেকে কোন কলও আসেনি। তবু মনে মনে আশা ছিল একদিন না একদিন শিহাব কল করবেই। দুজনের যে মনের টান তা শুধু বাহ্যিক চেহারা-সুরতের কাছে পরাজিত হতে পারে না এমন আস্থা সব সময়ই সীমার মনের মধ্যে ছিল।

আজ অনাকাঙ্ৰিতভাবেই সেই অপেৰার দিন শেষ হলো। বহুদিন পর এলো সেই প্রতিৰিত কল। এই পাঁচ মাসে না বলা অনেক কথা জমা আছে মনের গভীরে। তারও নিশ্চয় আছে। তার এই ফিরে আসাটা সীমার জন্য যে কতটা আনন্দের তা হয়তো শিহাব নিজেও জানেনা। নিজেকে পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষ বলেই মনে হচ্ছে সীমার কাছে। আবার নতুন করে শুরু হবে তাদের পথ চলা। ভাবতেই খুব ভালো লাগছে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে সীমা যেন রিভিস করতেই ভুলে যায়। রিংটোন বাজতে বাজতে শেষ হয়ে যায়। আবারও কল দেয় শিহাব। আরো বেশি ভালো লাগলো সীমার কাছে। এবার সে আর দেরি করে না। রিসিভ করে নরম সুরে সালাম দেয়। অপর প্রাণ থেকে সে বলে- "মামী কেমন আছেন? আমি শিহাব বলছি"।
সীমা অবাক হয় কথাটা শুনে। বলে- "মামী!"
- "আপনি রনির আম্মু না?
- "না শিহাব, আমি তো তোমার সেই সীমা।"
সীমার কথাটা শোনার সাথে সাথেই সে কেমন যেন হয়ে যায়। তৎৰণাৎ বলে- "স্যরি রং নম্বর।"বলেই লাইনটা কেটে দেয়। সীমা খুবই অবাক হয়। সঙ্গে সঙ্গে কল ব্যাক করে, কিন্তু ততৰণে নম্বরটা বন্ধ করা হয়েছে। সম্ভাবত তার মামীর নম্বরের কাছাকাছি সীমার নম্বরটা সেভ করা ছিল তাই অসাবধানতায় এই নম্বরে কল চলে এসেছে। সীমার সামনে সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। এত দিন সে কার কলের জন্য অপেৰায় ছিল? কোন আশায় সে আজও বুক বেধে ছিল? সব কিছু যে বৃথা। চোখ দুটি ছল ছল করছে। কান্নার ঢল বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে ঢল বাঁধা দেয়ার সাধ্য সীমার নেই। কেঁদে ফেলে সে। শিহাব তাকে ছেড়ে যাওয়ার পরও এত দিন যে আশাটুকু পুষে রেখেছিল সেটা যে অমূলক তা বোঝা গেল এই কলে। সীমা মনে মনে ভাবে সৃষ্টিকর্তা কি তাকে এতই অসুন্দর বানিয়েছে যার কারণে তার স্বপ্ন দেখাও নিষেধ আছে?

মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠে। সীমা স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে তার আম্মা কল করেছে। কিন্তু সে এখন কিভাবে কথা বলবে, তার তো কথা আটকে আসছে। এমন কান্নাজড়িত কথা শুনলেও তো আম্মা জানতে চাইবেন কি হয়েছে? এ প্রশ্নের তো কোন জবাব দিতে পারবে না। কি করা যায়? রিং বাজতে বাজতে একসময় কেটে যায়। তিনি আবারও কল দিলেন। সীমা এবার রিসিভ করে ভারাক্রান্ত মনে কোন রকমে বলে- "হ্যালো...."। অপর প্রান্ত থেকে তার আম্মা বলেন- "তোর নানী মারা গেছে।" সীমা কাঁদতে কাঁদতেই বলে- "কখন?" সীমার কথা বলার ভাবে আম্মা বুঝে ফেলেছেন সীমা কাঁদছে। তিনি বলেন- "কিছুক্ষণ আগে। কাঁদিস না, কেউ তো আর চিরদিন বেঁচে থাকে না।" মায়ের এ কথাটা শুনে সীমার চাপা কষ্টটা প্রকাশ করার আরো সুযোগ হয়। সে ডুকরে কেঁদে উঠে। তার মা সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। তিনি হয়তো একবারও ভেবে দেখবেন না সীমার এই কান্নার পিছনে আর কোন কারণ আছে কিনা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement