আমাকে চিনতে পারলে না

বাবা (জুন ২০২৬)

Afsary Hossain
  • 0
  • 0
যাবার প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল সকালে হন্তদন্ত হয়ে রেডি হওয়া আর আমাকে আরও প্রেশার নেওয়া যে 'লেট হচ্ছে, লেট হচ্ছে!' আর আমার অভ্যাস ছিল বাবার ওই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কিছু না কিছু ভুলে যাওয়া, এবং ঠিক মাঝরাভার গিয়ে সেটা মনে পড়া। বাসা তো সেই মিরপুর-১ আর স্কুল মতিঝিল। বুঝতেই পারছেন, ওই মাঝরাস্তায় আমার মনে হতো যেন ভরে মরেই যাই। না পারতাম বলতে, না পারতাম সইতে। এভাবে একদিন ভুলে গেলাম আমার অ্যাডমিট কার্ড। এত শক্ত স্কুল, কোনোদিন হল-এ ঢুকতে দেবে না। তারপর বলতেই হলো। আর শুরু হলো এই দিয়ে যে পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্যতাটাই আমার নেই! এভাবে চলতে থাকলো বাসায় ফিরে আসা থেকে শুরু করে আবার স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত। না, সুধু স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত না। ধরেন স্কুলে যাওয়ার এক মাস আগে পর্যন্ত। বাবা রাকায় বাইক নিয়ে এক্সিডেন্ট করেন। এখন প্যারালাইজড। বকতে বকতে মাঝপথে একটু পিছন ফিরে তাকিয়েছিলেন, আর তখনই একটা ট্রাকের সাথে লেগে বাইকটা পড়ে যায়। আসলে পরীক্ষার সময় ছিল, তাই বাইকটা উল্টো পথে চলছিল। আমি কিছুটা লম্বা হওয়ায় পুরো পড়ার আগেই নেমে পড়ি, আর বাবার পা-টা... থাক ওসব কথা। আজ অবধি এই কথাই সুনছি যে সব আমারই দোষ ছিল। ধীরে ধীরে হাসিখুশি আমি পুরো মনলরা আর বদমেজাজী হয়ে যাই। পড়াশোনা চুলে যেতে থাকে, আর নেশা নামের যে বদভ্যাস-তাতে জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু আমি বাসা ছাড়তে পারলাম না। মা তাঁর কসম দিয়ে আজ অব্দি আমাকে আটকে রেখেছেন।

বাবার ব্যবসা এরপর আরও বড় হয়েছে। টেক্সটাইল কোম্পানি, আপের থেকেই ভালোই ছিল, এখন বড় হয়েছে আর তাই প্রফিটও বেশি। ট্রিটমেন্ট ভালোই হচ্ছে। ইন্ডিয়া গিয়ে নকল পা পর্যন্ত লাগিয়েছে। যদিও ওইটা শুধু শো (দেখানো)। এখনো যুইলচেয়ারে। পিএ (PA) আছে একজন, সব খেয়াল রাখে। এর চেয়ে অল্প করে নিজের এমন সামাজিক নিকৃষ্ট জীব হওয়ার সাফাই দেওয়া আর পেল না। এইবার আসি ওইদিনের পর করা সব চেয়ে বড় স্কুলের কথা নিয়ে। ওইদিন তাঁর পা গিয়েছিল, আজ জীবন চলে গেছে তাঁর। সবাই হাসপাতালে, আমি যাইনি। কেউ ভাবছেন তাঁর সাথে সম্পর্ক নেই তাই যাইনি, কেউ ভাবছেন তাঁকে খুন করেছি। হিসাব করলে দুইটাই, আবার কোনোটাই না। আমি আজ এক মেয়ের সাথে খুব অপমানজনক ব্যবহার করেছি আর তাই জেনে বাবা আমার সাথে সব সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছেন এবং তার ৩০ মিনিটের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। আর মৃত্যুর আগে পুলিশের হাতে দিয়ে গেছেন। মেয়েটি তাঁর পিএ-র একমাত্র মেয়ে। তাঁর পিএ বিগত ১২ বছর তাঁর সাথেই আছেন। আমাদের চেয়েও আঙ্কেলের প্রতি তাঁর টান এখন বেশি। আঙ্কেলের ওয়াইফ মারা যান ওই ১২ বছরের প্রথম ৫ বছরের পর পরই। আর মেয়ে তাঁর একটাই, যার মধ্যে তাঁর জাস। বাবার একমাত্র ছেলে আনি, ভাই আঙ্কেল আলাকেও মনিব মানেন, আর তাঁর মেয়েকেও জোর করে সানান। মেয়েটা কলেজে পড়ে। আলাকে আজ বাবা প্রথমবার বলেছেন বাসা থেকেই চলে যেতে। আমি বলেছি যাচ্ছি, তবে আমার সব মালামাল নিয়ে নিই। প্রচুর মাতাল আমি তখন। হয়তো এই হালে বাসায় দেখেই বলেছেন। রুমে গিয়ে দেখি ওই মেয়ে আমার ডায়েরি পড়ছে, যার মধ্যে এই ১২ বছরের সব লেখা। মেয়েটার থেকে নিতে নিই আর দুজনই পড়ে যাই। দেখি মেয়েটার হাতে অনেকগুলো টাকা, আর আলমিরাহটা খোলা। দেখেই যেই বললাম, 'তুমি টাকা চুরি করো?' আর সেই ওর চিৎকার-আমি নাকি ওকে... বাবার সামনে আমার এমন সব অভ্যাস যে এখন তাঁর বিশ্বাস করতে বাধল না যে আমি এইটা করতে পারি। ওর চিৎকারে মা, বুয়া, দারোয়ান সবাই এসে পড়ল। আর মেয়ের চিৎকার শুনেই যাবার ফুইলচেয়ারসহ আসছেন পিএ আঙ্কেল। তারা এসে বাস্তবের বাইরেই কিছু দেখল আর আমি শুধু বললাম, 'আমার এতটুকু হুশ যায়নি যে বাসার এইসব করব।' সাথে সাথে বাবা বললেন, 'এর মানে ঘরের বাইরে করে করে অভ্যাস। তাহলে ঘরে তোর মনের অজান্তে হওয়াও সম্ভব' বলে দারোয়ানকে অর্ডার দেন আমাকে বেঁধে রাখতে। মা কেঁদে কেঁদে সারা, কিচ্ছু শুনলেন না, বাবা পুলিশের হাতে দিয়ে দিলেন। আমি থানার এখন। এসে জেনেছিলাম বাবা হাসপাতালে, এখন শুনলাম আর নেই। এরপর আর ৩ বছর শেষ। নেশানির্মূল, তারপর সাজা-সব মিলিয়ে মাত্র বের হলাম। শুনলাম যে তেমন কিছুই নেই আর আমাদের পরিবারের। যা ছিল তার সঞ্চয় সামলিয়ে ওই পিএ আঙ্কেল মাকে ভালোই দেখাশোনা করছেন। মা মানসিকভাবে আর ঠিক নেই। ওই মেয়ের সাফি বিয়ে হয়েছে। সোজা ওর বাড়ি গেলাম। ঠিকানা আগেই জোগাড় করা ছিল, হাজতে সব হয়। টাকাও আসত হাজতে আমার নামে কালো রাস্তায়-এও পিএ আঙ্কেলের কাজ। মেয়েটার বাড়ি যেয়ে বেল দিতেই ও খুলল। দেখে থপ করে পেটটা লাগাতে নিল, বললাম, 'কিচ্ছু করব না, মায়ের কসম।' ও থেমে গেল। আমি ওকে বললাম, 'কী খেলে?' ওর উত্তর ছিল, 'তোমার বাবা তোমাকে সব কিছুতে দোষী ভাবতেন আর আমার বাবা সব কিছুতে আমাকে সাধু। তোমায় যাবা তোমাকে আরেকটু খারাপ ভাবলেও কিছু হতো না, আর আমার বাবা মারা যেতেন। কারণ বাবা এতগুলো বছর তোমাদের লয়‍্যালটি (আনুগত্য) নিয়ে যাচ্ছেন। কিছু আমি বুঝিনি তোমার বাবা তার লজ্জালটির জন্য তাকে নিজ ছেলেরও ওপরে ভাবতেন। 'ওর উত্তর ছোট, কিন্তু আমার বুঝতে যাফি সেই যে দোষী কে। আপনি দোষীকে ঠিক করে চিনে নিয়েল, না হলে নিজের জীবন শেষ হওয়াও ক্ষণিকের ব্যাপার।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

যাবার প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল সকালে হন্তদন্ত হয়ে রেডি হওয়া আর আমাকে আরও প্রেশার নেওয়া যে 'লেট হচ্ছে, লেট হচ্ছে!'

২৫ মে - ২০২৬ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬