নিঃশব্দ বটবৃক্ষ

বাবা (জুন ২০২৬)

Sushmita Pal
  • 0
  • 0
  • 0
বিকেলের ম্লান আলোটা যখন জানলার গ্রিল গলে পড়ার টেবিলের ওপর এসে পড়ে, ঠিক তখনই নীলিমার বুকের ভেতরটা কেমন জানি ফাঁকা লাগে। সামনে পড়ে থাকা ডায়েরির পাতাটা ধবধবে সাদা। অথচ সেখানে হাজারো কথা ভিড় করে আছে। আজ কয়েক দিন ধরে সে চেষ্টা করছে বাবার কথা লিখতে, কিন্তু কলম বারবার আটকে যাচ্ছে। মনের ভেতরের স্মৃতির জানলা গুলো একে একে খুলে যাচ্ছে, যেখান থেকে ভেসে আসছে এক পুরোনো সময়ের ঘ্রাণ।
বাবা মানে কী? নীলিমার কাছে বাবা মানে একটা পুরোনো সাইকেলের পরিচিত বেল বাজার শব্দ। সেই বেলের ‘কিরিং কিরিং’ শব্দটা শোনা মাত্রই সব খেলা ফেলে রেখে সে সদর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াত। বাবা মানে বাজারের চটের থলে থেকে উঁকি দেওয়া কাঁচামিঠে আম, বর্ষার ইলিশ কিংবা সস্তার কোনো গল্পের বই। নীলিমা কোনোদিন খুব দামি খেলনা পায়নি, কিন্তু বাবার ওই সাধারণ উপহারগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকত এক পৃথিবী আনন্দ।
মা বলতেন, "তোর বাবা মানুষটা বড় জেদি। কারও কাছে মাথা নোয়াতেন না।" নীলিমা তখন ছোট ছিল, মায়ের কথার মানে বুঝত না। সে শুধু দেখত, বাবা খুব কম কথা বলেন। স্কুল থেকে ফিরে চুপচাপ হাত-মুখ ধুয়ে চশমাটা নাকে বসিয়ে খবরের কাগজে ডুবে যেতেন। সেই গম্ভীর মুখের আড়ালে যে কতটা ভালোবাসা জমা ছিল, তা নীলিমা টের পায় আজ, যখন বাবা আর পাশে নেই।
নীলিমার মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন তার স্কুলের মাইনে জোগাড় করতে বাবাকে হিমশিম খেতে হতো। এক সামান্য স্কুল শিক্ষকের চাকরি করে একটা মেয়েকে বড় শহরে পড়ানো কতটা কষ্টের, তা নীলিমা এখন নিজের উপার্জনের দিনে এসে হাড়ে হাড়ে টের পায়। তখন সে বুঝত না কেন বাবা প্রতি বছর পুজোয় নিজের জন্য নতুন জামা কিনতেন না। মা জোরাজুরি করলে বাবা শুধু হাসতেন। সেই হাসির আড়ালে লুকানো থাকত এক চরম আত্মত্যাগ। নীলিমার মনে পড়ে, একবার সে এক জোড়া লাল জুতোর জন্য জেদ ধরেছিল। বাবা তখন বেতন পাননি। কিন্তু কী আশ্চর্য, ঠিক তিন দিন পর বাবা স্কুল থেকে ফেরার সময় সেই লাল জুতোর প্যাকেটটা হাতে করে নিয়ে এসেছিলেন। নীলিমা তখন খুশিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল, কিন্তু খেয়াল করেনি বাবার পায়ের সেই পুরোনো চটিটা তালি দেওয়া ছিল।
একদিন নীলিমা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "বাবা, তোমার নিজের জন্য কিছু কিনতে ইচ্ছে করে না? সবসময় আমার আর মায়ের জন্যই সব আনো।"
বাবা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে স্থির দৃষ্টিতে নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "তোর হাসিমুখটা যখন দেখি মা, তখন মনে হয় দুনিয়ার সব দামী জিনিস আমার কেনা হয়ে গেছে। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী আছে?"
বাবার সেই জেদটা ছিল আসলে এক অদৃশ্য বর্ম। অভাবকে তিনি কোনোদিন নীলিমার পড়ার ঘরের দরজায় পৌঁছাতে দেননি। নিজের ঘাম আর পরিশ্রম দিয়ে তিনি নীলিমার জন্য এক নিরাপদ আকাশ তৈরি করেছিলেন। আজ নীলিমা প্রতিষ্ঠিত, তার নিজের নাম-ডাক আছে। কিন্তু যে মানুষটার আঙুল ধরে সে হাঁটতে শিখেছিল, সেই মানুষটাই আজ নেই। তিন বছর আগে এক বর্ষণমুক্ত রাতে কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছেন তিনি। রেখে গেছেন শুধু এক জোড়া পুরোনো গোল ফ্রেমের চশমা, ধুলো পড়া একটা জং ধরা সাইকেল আর নীলিমার হৃদয়ে একরাশ হাহাকার।
নীলিমা ডায়েরির পাতায় কলম ছোঁয়াল। সে লিখল— "বাবা মানে শুধু শাসন নয়, বাবা মানে এক বিশাল আকাশ। যে আকাশ নিজে প্রখর রোদে পুড়ে আমাদের শীতল ছায়া দেয়। বাবারা হয়তো 'ভালোবাসি' শব্দটা মুখে বলতে পারেন না, কিন্তু তাদের ভালোবাসার ভাষা লেখা থাকে ছেঁড়া মানিব্যাগের ভাঁজে কিংবা ক্লান্ত দুপুরের দীর্ঘশ্বাসে।"
আসলে বাবারা এমনই হয়। মায়েরা যেমন চট করে কেঁদে ফেলেন বা আবেগ প্রকাশ করেন, বাবারা তেমনটা পারেন না। তারা তাদের ভালোবাসা জমা রাখেন ঘামে ভেজা শার্টের পকেটে। একজন বাবা তার সন্তানদের জন্য তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দেন, ঠিক যেমন একটা মোমবাতি নিজে পুড়ে ঘরকে আলো দেয়।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে নীলিমা একটা দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিল। একটা ছোট বাচ্চা তার বাবার কাঁধে চড়ে মেলায় যাচ্ছে। বাচ্চাটার চোখে রাজ্যের বিস্ময় আর আনন্দছটা। আর তার বাবার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। দৃশ্যটা দেখে নীলিমার দুচোখ ভিজে এল। সে যেন কুড়ি বছর আগের সেই ছোট্ট নীলিমা আর তার বাবাকে দেখতে পাচ্ছিল। সময় বদলে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু বাবার কাঁধের সেই আশ্রয়ের ভরসাটা কোনোদিন বদলায় না।
ঘরে ফিরে নীলিমা তার অসমাপ্ত লেখাটা শেষ করার সিদ্ধান্ত নিল। সে তার মনের সবটুকু দিয়ে লিখল—
"বাবা, তুমি বলেছিলে আমি যেন বড় মানুষ হই। আমি আজ তোমার ইচ্ছে পূরণ করেছি। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি, লোকে আমাকে চেনে। কিন্তু জানো তো বাবা, তোমার সেই সাইকেলের পেছনে বসে থাকা ছোট্ট নীলিমাটা আজও প্রতিটা বিকেলে দরজার দিকে চেয়ে থাকে। আজও মনে হয়, কলিং বেলটা বাজলেই তুমি ভেতর থেকে বলবে— 'মা, দেখ তোর জন্য আজ কী এনেছি!' ওপার থেকে তুমি কি শুনতে পাও বাবা? তোমার সেই নীলিমা আজও তোমাকেই খুঁজে বেড়ায় স্মৃতির প্রতিটা অলিতে-গলিতে।"
লেখা শেষ করে নীলিমা জানলার বাইরে তাকাল। শহরের আকাশে এখন অন্ধকারের ঘনঘটা, কিন্তু মেঘের আড়ালে একটা উজ্জ্বল তারা যেন মিটমিট করে হাসছে। নীলিমার মনে হলো, ওই তারাটা আসলে তার বাবা। তিনি হয়তো ওপার থেকেই দেখছেন তার মেয়েকে। যেন মনে মনে বলছেন, "ভালো লিখেছিস মা, একজন ভালো মানুষ হয়েছিস। এই তো চাইছিলাম।"
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

চলতি মাসের প্রতিযোগিতার নির্ধারিত বিষয় হলো ‘বাবা’। আমার রচিত "নিঃশব্দ বটবৃক্ষ" গল্পটি সম্পূর্ণভাবে এই মূল ভাবনাকেন্দ্রিক। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তব প্রেক্ষাপটে একজন স্কুল শিক্ষক বাবার নীরব আত্মত্যাগ, স্নেহ এবং সন্তানদের আগলে রাখার চিরন্তন লড়াইকে এই গল্পে ফুটিয়ে তুলেছি। সাধারণত মায়েদের প্রকাশ্য আবেগের আড়ালে বাবাদের গভীর অনুভূতিগুলো অনেক সময়ই আমাদের অলক্ষ্যে থেকে যায়। বাবারা মুখে কখনো 'ভালোবাসি' শব্দটি উচ্চারণ করেন না ; বরং তাদের সেই ভালোবাসা মিশে থাকে ছেঁড়া চটি জুতোয়, ক্ষয়ে যাওয়া সাইকেলের বেল-এ কিংবা সন্তানের আবদার মেটাতে গিয়ে লুকিয়ে রাখা ঘামের ফোঁটায়। গল্পের মূল চরিত্র 'নীলিমা' তার প্রয়াত বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জীবনের এই পরম সত্যটি উপলব্ধি করেছে। একজন বাবা কীভাবে নিজের সবটুকু সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় বা নিঃশব্দ বটবৃক্ষ হয়ে ওঠেন, তা-ই এই গল্পের মূল উপজীব্য। গল্পের প্রতিটি লাইনে বাবার আদর্শ, শাসন এবং নিঃশব্দ ভালোবাসার গভীরতাকে অত্যন্ত সহজ ও মার্জিত ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাই আমার বিশ্বাস, গল্পটি এই সংখ্যার জন্য ঘোষিত 'বাবা' বিষয়ের সাথে শতভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পাঠকদের হৃদয়ে গভীর আবেগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।

১৬ মে - ২০২৬ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬