ভাষাহীন মাতৃভাষা

মাতৃভাষা (ফেব্রুয়ারী ২০২৬)

Muhammad Rakib Islam
  • ২৬৭
“এই শিহাব, কই যাস? দাঁড়া দাঁড়া, না খাইয়া যাইস না। কই যাই এই ছেঁড়াডারে নিয়া! আমার একটা কথাও যদি শুনত!”
এই বলেই মরা কান্না শুরু করে দেয় শিহাবের মা জবা।
শিহাবের খোঁজ অনেকক্ষণ ধরেই করছে জবা। যদিও শিহাবকে খুঁজে বের করা তার সাধ্যের বাইরে—সেটা জবা জানে। হঠাৎ কোথা থেকে শিহাব এসে লম্বা লাঠি নিয়ে চলে গেল, জবার কথা না শুনেই।
“এই কে রে! এই ধর শালাকে, বেঁধে রাখ!”
হঠাৎ কে যেন শিহাবকে ধরে ফেলে। শিহাব বুঝতে পারে—ইনি হলেন সেই গাছের মালিক, যে গাছ থেকে সে ফুল নিচ্ছিল। আসলে আজ ২০শে ফেব্রুয়ারি। শিহাব শুনেছে, কালকের দিনে নাকি ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, যখন মানুষ নিজেদের মাতৃভাষা বাংলার জন্য প্রাণ দিয়েছিল। তাই সে ফুল পাড়ার জন্য বাড়ি থেকে লম্বা লাঠি নিয়ে এসেছিল, যেন আগামীকাল শহীদ মিনারে দিতে পারে।
কিন্তু বাগানের মালিক ভেবেছিল, শিহাব ফল চুরির জন্য এসেছে। তাই তাকে বেঁধে রেখে দুই গালে দশটি থাপ্পড় দেয় শাস্তি হিসেবে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো—শিহাব এর মাঝে একটুও শব্দ করেনি। এতে বাগানের মালিকও অবাক হয়ে যায় এবং শেষে তাকে ছেড়ে দেয়।
মুক্ত হতেই শিহাব দ্রুতগতিতে ছুটে যায় অন্য গাছের খোঁজে।
“কিরে, কই যাস?”
সাজুর কথায় থেমে যায় শিহাব। সাজু হলো শিহাবের সমবয়সী—বন্ধু বললেই চলে। সাজু ও শিহাব ছোট থেকেই একসঙ্গে একই বস্তিতে বড় হয়েছে। সেও ফুলের খোঁজ করছে।
“কি হইছে তোর গালটা এত লাল লাল ক্যান?”
শিহাব কিছু বলে না, শুধু নিচের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে দেয়। শিহাবের অবস্থা দেখে সাজু বুঝে যায়, তাই আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।
“আয়, আমার সাথে আয়।”
সাজু বলে হাঁটতে থাকে ফুলের সন্ধানে। শিহাবও সাজুর পাশে হাঁটে।
আসলে এসব মার খাওয়া শিহাবের জীবনে নতুন কিছু নয়। কারণ শিহাবের বাবা নেই—নেই বললে ভুল হবে, আছে, তবে শিহাবদের সাথে নেই। শিহাবের বাবা জনাব জয়নাব মির্জা বহু কাল আগেi শিহাবের মায়ের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, যখন জবা গর্ভবতী ছিল। শোনা যায়, শিহাবের বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিল জবা—এটা জবা নিজেও জানতেন না। শিহাব এখন বারো বছরের ছেলে। এই বারোটি বছর শিহাবের কেটেছে পিতৃহীনভাবে, সমাজের অবহেলায়।
শিহাব ও সাজু একটি জবা ফুলের গাছ খুঁজে পায়। তবে সেটি ছিল একটি বাগানের ভেতরে। শিহাব চট করে গাছে উঠে যায়, আর সাজু নিচে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। শিহাব কয়েকটি ফুল ছিঁড়ে ফেলে, আর সঙ্গে সঙ্গে শোনা যায় বাগানের মালিকের হুংকার। দ্রুত দৌড়ে পালায় শিহাব ও সাজু।
ফুলগুলো ভাগাভাগি করে শিহাব বাড়িতে ফিরে যায়।
“কিরে বাপ, দুপুরে না খাইয়া টইটই কইরা কই ঘুরতাছিলি?”
শিহাব ফুলগুলো এগিয়ে দেয় তার মায়ের দিকে। ফুল দেখে শিহাবের মা জবার চোখ জলে উঠে এবং শিহাবের কপালে চুমু খায়।
“খিদা লাগছে?”
শিহাব মাথা নাড়ায়। জবা দ্রুত উঠে মরিচ আর পেঁয়াজ মাখানো পান্তা ভাত দেয়। শিহাব তৃপ্তির সাথে পান্তা ভাত খায়, আর জবা তৃপ্তির সাথে তার ছেলের খাওয়া দেখে।
পরদিন সকালে শিহাব ঘুম থেকে উঠেই সাজুকে নিয়ে দৌড় দেয় শহরের শহীদ মিনারের দিকে। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ শিহাবের ধাক্কা লাগে সাদা পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তির সাথে। তখনই একটি যুবক ছেলে এসে শিহাবকে কষে থাপ্পড় মারে।
“কিরে! তুই ধাক্কা মেরে আব্বুর পাঞ্জাবিটা নষ্ট করলি কেন?”
“আরে কী করছিস, জিহাদ? বাচ্চা মানুষ—এভাবে মারে নাকি?”
লোকটি তার ছেলে জিহাদকে ধমক দেয়।
থাপ্পড় খেয়ে শিহাবের চোখে পানি চলে আসে। জয়নাব শিহাবের চোখে পানি দেখে মায়া অনুভব করে। সে শিহাবকে দাঁড় করায় এবং একটি দোকানে নিয়ে যায়। শিহাব আর সাজুকে কিছু খাবার কিনে দেয়।
জয়নাব জিজ্ঞেস করে, “বাড়ি কোথায় তোমাদের?”
সাজু উত্তর দেয়, “ওই দূরে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের কাছের বস্তি।”
“তোমাদের বাবারা কী করেন?”
“আমার আব্বা রিকশা চালায়, আর ওর আব্বা—”
“থামো,” জয়নাব বলে ওঠে, “তোমার বন্ধু কিছু বলছে না কেন?”
এরপর শিহাব আর সাজু দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকে। জয়নাব এবার শিহাবকে জিজ্ঞেস করে, “তোমার নাম কী?”
শিহাব চুপ করে থাকে। হঠাৎ সাজু বলে ওঠে, “আঙ্কেল, ও কথা কইতে পারে না!”
সাজুর কথা শেষ হতেই শিহাব দোকান থেকে একটি খাতা আর কলম নেয় এবং কিছু লিখতে শুরু করে। লেখা শেষ করে জয়নাবের দিকে খাতাটি এগিয়ে দেয়, সঙ্গে দেয় একটি জবা ফুল।
জয়নাব খাতায় লেখা নামটি পড়ে এবং জবা ফুলটি দেখে ভীষণভাবে অবাক হয়ে যায়। তার মুখ দিয়ে আর কথা বের হয় না। একবার সে খাতার দিকে তাকায়, আবার তাকায় শিহাবের দেওয়া জবা ফুলের দিকে।
শিহাবের দিকে তাকাতেই শিহাব মুচকি হাসে, তারপর সাজুকে নিয়ে ছুটে যায়—হারিয়ে যায় বহু মানুষের ভিড়ে।
খাতায় লেখা ছিল —
‘সিহাব মিরযা’। ( থিম: মাতৃভাষা )
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী অসাধারণ শ্রুতিমধুর লেখনি পাঠে মুগ্ধ হলাম শুভকামনা রইল।
অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে
Mahbub Islam সুন্দর হয়েছে
Maruf Hossein খুবই ভালো হয়েছে

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

এই শিহাব, কই যাস? দাঁড়া দাঁড়া, না খাইয়া যাইস না। কই যাই এই ছেঁড়াডারে নিয়া! আমার একটা কথাও যদি শুনত!

২৪ জানুয়ারী - ২০২৬ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "স্বাধীনতা”
কবিতার বিষয় "স্বাধীনতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী,২০২৬