বাবার ছায়া

বাবা (জুন ২০২৬)

Prince howlader
  • 0
  • 0
বিকেলের ম্লান আলোটা যখন বারান্দার এক কোণে এসে জড়ো হয়েছে, তখন তনয় চুপচাপ বসে ছিল। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ওষুধের চেনা, ঝাঁঝালো গন্ধটা। গত কয়েক মাস ধরে এই গন্ধটাই তনয়দের সংসারের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে।

কয়েক বছর আগেও তনয় ভাবত, বাবা মানুষটা একটু বেশিই কঠিন। নিখুঁত ইস্ত্রি করা শার্ট, কপালে সবসময় একটা চিন্তার ভাঁজ, আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর—সব মিলিয়ে একটা দূরত্ব যেন সবসময় বজায় থাকত। তনয় যখন ছোট ছিল, পরীক্ষার খাতায় একটু নম্বর কম পেলেই বাবার সেই গম্ভীর চোখের দিকে তাকাতে ভয় পেত। তখন মনে হতো, বাবা বুঝি বড্ড কঠোর, বড্ড হিসেবী। বন্ধুদের বাবারা যখন তাদের কাঁধে হাত দিয়ে গল্প করত, তনয় তখন দূর থেকে দেখত। তার মনে হতো, তার বাবা কেবলই কর্তব্যের এক জীবন্ত মূর্তি।

কিন্তু জীবনের আসল হিসেবটা তনয় বুঝতে পারল তখনই, যখন সে নিজে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠল।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর একবার তনয় খুব বড় এক বিপদে পড়েছিল। একটা ভুল বোঝাবুঝির জেরে কলেজের কিছু ছেলের সাথে ঝামেলা হয়, জল এতদূর গড়ায় যে পুলিশ পর্যন্ত ডাকতে হয়েছিল। সেদিন ভয়ে, লজ্জায় তনয় যখন থানার এক কোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল, তখন ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন তার বাবা।

বাবার চুলগুলো তখন সবেমাত্র পাকতে শুরু করেছে। তনয় ভেবেছিল, বাবা হয়তো আজ সবার সামনে তাকে প্রচণ্ড বকাঝকা করবেন, কিংবা রাগে মুখ ফিরিয়ে চলে যাবেন। কিন্তু বাবা তেমন কিছুই করলেন না। তিনি কোনো কথা না বলে সোজা গিয়ে অফিসারের সামনে দাঁড়ালেন। খুব শান্ত গলায়, নিজের সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে তনয়ের হয়ে ক্ষমা চাইলেন।

থানা থেকে বের হয়ে আসার পর তনয় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। বাবা তখন তনয়ের কাঁধে একটা হাত রেখেছিলেন। সেই প্রথম তনয় অনুভব করেছিল, ওই শক্ত হাতটার নিচে কতটা ওম লুকিয়ে থাকে। বাবা শুধু বলেছিলেন, "ভুল মানুষই করে রে খোকা। কিন্তু সেই ভুলের মাশুল যেন নিজের ভবিষ্যৎ দিয়ে দিতে না হয়, সেটা খেয়াল রাখিস।"

তারপর থেকে তনয় বাবাকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে, যে বাবা মুখে কখনো 'ভালোবাসি' শব্দটা উচ্চারণ করেননি, তিনি আসলে প্রতিটা মুহূর্তে নিজের শরীরের রক্ত জল করে ছেলের জন্য এক অদৃশ্য বটবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মাসের শুরুতে তনয়ের মেসের খরচের টাকাটা ঠিক সময়ে পৌঁছানোর জন্য বাবাকে যে নিজের কত শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিতে হয়েছে, তা তনয় বড় হয়ে টের পেয়েছে।

আজ সেই বাবা বিছানায় শায়িত। স্ট্রোক করার পর থেকে ডান পাশটা আর আগের মতো কাজ করে না। চশমাটা টেবিলের ওপর ধুলো মাখছে, আর বাবার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা এখন এক অদ্ভুত শান্ত ফিসফিসানিতে পরিণত হয়েছে।

তনয় বারান্দা থেকে উঠে বাবার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, বাবা একদৃষ্টিতে জানলার বাইরের আকাশটার দিকে তাকিয়ে আছেন। তনয় আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে বাবার বিছানার পাশে বসল। তারপর বাবার সেই শীর্ণ, কাঁপা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল।

বাবা চোখ ফিরিয়ে তনয়ের দিকে তাকালেন। ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল, যে হাসিতে কোনো শাসন নেই, আছে কেবল পরম তৃপ্তি।

তনয় বাবার বুকে মাথাটা রেখে মনে মনে বলল, 'বাবা, তুমি হয়তো কখনো মুখে বলোনি। কিন্তু আজ আমি জানি, এই পৃথিবীতে তোমার চেয়ে বড় আশ্রয় আমার আর কেউ নেই।' জানলা দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলোয় তখন এক ছেলের চোখে বাবার প্রতি চিরন্তন কৃতজ্ঞতার জল চিকমিক করছিল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

গল্পটি "বাবা" বিষয়ের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে বাবার চিরন্তন রূপ—বাইরে কঠোর কিন্তু ভেতরে বটবৃক্ষের মতো সুরক্ষাকারী—তা বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মুখে 'ভালোবাসি' না বলেও সন্তানের বিপদে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া এবং নীরব ত্যাগের মাধ্যমে তনয়ের জীবনে শেষ পর্যন্ত পরম আশ্রয় হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েই গল্পের মূল ভাবার্থ সার্থক হয়েছে।

১৭ নভেম্বর - ২০২৫ গল্প/কবিতা: ১৩ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬