শেকড়ের টানে

মাতৃভাষা (ফেব্রুয়ারী ২০২৬)

Prince howlader
  • 0
  • ১৯
বিদেশের মাটিতে তেরোটা বছর কাটিয়ে আজ যখন আবীর ঢাকা বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখল, প্রথম যে জিনিসটা তাকে ধাক্কা দিল তা হলো শব্দ। চারপাশের মানুষের কোলাহল, ট্যাক্সি চালকদের হাঁকডাক, আর ফেরিওয়ালাদের চিৎকার—সবই তার অতি পরিচিত বাংলা ভাষায়। লন্ডনের হিথ্রো বা কেনসিংটনের রাস্তায় এই ভাষার সুরটা সে বড্ড মিস করত। সেখানে ইংরেজি ছিল প্রয়োজনের ভাষা, কিন্তু এই বাংলা হলো তার প্রাণের ভাষা।

আবীর পেশায় স্থপতি। লন্ডনে থিতু হয়েছে অনেকদিন। কিন্তু তার মনের এক কোণে সবসময় একটা অপরাধবোধ কাজ করত। তার সাত বছরের মেয়ে সারা বাংলা বলতে পারে না। ভাঙা ভাঙা কয়েকটা শব্দ ছাড়া তার আর কোনো দৌড় নেই। এবারের সফরের মূল উদ্দেশ্যই হলো সারাকে তার শিকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। ফেব্রুয়ারি মাস চলছে, একুশে ফেব্রুয়ারি আসতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি।



গাড়ি যখন গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটছে, সারা জানালার বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখছিল সবুজের সমারোহ। আবীর তাকে বোঝাচ্ছিল, "সারা, দেখ এই দেশটা আমাদের। এখানে সবাই তোমার মতো কথা বলে না, তারা তোমার বাবার ভাষায় কথা বলে।"

সারা বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল, "But Dad, why is everyone so loud?"

আবীর হাসল। "এটা চিৎকার নয় মা, এটা আবেগ। এই ভাষায় আমরা হাসি, এই ভাষায় আমরা কাঁদি।"

বাড়িতে পৌঁছানোর পর আবীরের বৃদ্ধ বাবা, অর্থাৎ সারার দাদু, নাতনিকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। তার সারা জীবনের সাধনা ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। নাতনিকে কাছে পেয়ে তিনি বাংলায় অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

আবীর দেখল তার বাবার চোখে জল। বাবা বিড়বিড় করে বললেন, "নিজের রক্ত অথচ নিজের ভাষা জানে না! এ তো বড় কষ্টের রে আবীর।"



ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ রাতে সারা তার দাদুর পাশে বসে ছিল। দাদু একটি পুরনো ডায়েরি বের করলেন। তাতে অনেক সাদাকালো ছবি। সারা একটা ছবি দেখিয়ে বলল, "Who are they, Grandpa?"

দাদু চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বললেন, "এরা হলো ভাষার বীর। শহিদ।"

সারা বুঝল না। দাদু তখন তাকে গল্প বলতে শুরু করলেন। ১৯৫২ সালের গল্প। যখন এই ভূখণ্ডের মানুষের ওপর ভিনদেশি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

দাদু বললেন, "মা, শোনো। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভাষা। পাখি তার নিজের সুরে ডাকে, মেঘের এক ভাষা আছে, বাতাসের এক ভাষা আছে। তেমনি আমাদেরও একটা ভাষা আছে—বাংলা। কিন্তু কিছু মানুষ চেয়েছিল আমাদের মুখ থেকে এই ভাষা কেড়ে নিতে। তারা বলেছিল, তোমাদের এই ভাষায় কথা বলা চলবে না।"

সারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "Why? Words are just words."

দাদু মাথা নাড়লেন। "না মা। কথা শুধু কথা নয়। তোমার মা যখন তোমাকে 'ভালোবাসি' বলে ডাকেন, তখন সেই শব্দটার মধ্যে যে মায়া থাকে, তা অন্য কোনো ভাষার শব্দে পাওয়া যায় না। সেদিন আমাদের ছাত্ররা, সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছিল। তারা বলেছিল—রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালিয়েছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার—নামগুলো মনে রেখো মা। তারা প্রাণ দিয়েছিল শুধু এই জন্য যে, আমরা যেন আজ বাংলায় কথা বলতে পারি।"

সারা চুপ করে শুনছিল। সে হয়তো সবটা বুঝছিল না, কিন্তু দাদুর গলার স্বর আর চোখের জল তাকে স্পর্শ করল। সে দাদুর হাত ধরে বলল, "I want to learn, Grandpa. শেখাও আমাকে।"



একুশে ফেব্রুয়ারির ভোর। কুয়াশাভেজা সকালে চারদিকে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' গানটি বাজছে। আবীর, সারা আর দাদু সবাই মিলে বেরিয়েছে শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে। সবার পায়ে জুতো নেই। সারা প্রথমে আপত্তি করেছিল খালি পায়ে হাঁটতে, কিন্তু আবীর যখন বলল এটা সম্মানের প্রতীক, তখন সে রাজি হলো।

সারা হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ আর গাঁদা ফুল। মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায়। হাজার হাজার মানুষ ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছে। প্রত্যেকের চোখে মুখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর শ্রদ্ধা।

শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে সারা দেখল ফুলে ফুলে ঢাকা পড়ে গেছে বেদিটা। সে নিজেও নিচু হয়ে ফুলগুলো রাখল। তারপর দাদুর দিকে তাকিয়ে বলল, "অ... আ... ই... উ..."

দাদু অবাক হয়ে বললেন, "কী বলছ মা?"

সারা পকেট থেকে একটা ছোট কাগজ বের করল। তাতে গত রাতে দাদু তাকে কয়েকটা বর্ণ লিখে দিয়েছিলেন। সারা অনেক কষ্টে উচ্চারণ করল, "মা।"

দাদুর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি সারাকে কোলে তুলে নিলেন। আবীর পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল দৃশ্যটা। তার মনে হলো, তেরো বছর পর আজ সে সত্যিই দেশে ফিরেছে।



ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর সারার মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। সে এখন আর শুধু ইংরেজিতে কথা বলতে চায় না। সে ভাঙা ভাঙা গলায় বাংলার বর্ণমালা চেনার চেষ্টা করে। লন্ডনে ফেরার সময় বিমানে বসে সারা আবীরকে বলল, "Dad, will you buy me Bengali books?"

আবীর সারার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "অবশ্যই মা। আমরা বাসায় এখন থেকে নিয়ম করে বাংলায় কথা বলব।"

সারা জানালা দিয়ে নিচের মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই বর্ণমালাগুলো শুধু অক্ষর নয়, এগুলো এক একটা নক্ষত্র। যারা অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখায়।



মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মা। বিদেশের চাকচিক্য বা আধুনিকতার ভিড়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই আমাদের শেকড়কে। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, এই ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীতে আর কোনো জাতি নেই যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে।

সারা আজ বুঝতে পেরেছে কেন তার দাদু ওই সাদাকালো ছবিগুলো দেখে কাঁদতেন। সে বুঝতে পেরেছে কেন একুশের ভোরে মানুষ খালি পায়ে হাঁটে। মাতৃভাষা হলো সেই মায়ের মতো, যাকে ছেড়ে দূরে থাকা যায় কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না।

লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নামার পর যখন চারপাশ আবার ইংরেজিতে ভরে উঠল, সারা তার বাবার হাত ধরে স্পষ্ট স্বরে বলল, "বাবা, আমি বাংলা ভালোবাসি।"

আবীর হাসল। তার মনে হলো, একুশের চেতনা শুধু বাংলাদেশের সীমানায় আটকে নেই, তা এখন সারার মতো হাজারো প্রবাসীর হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। রক্তে রাঙানো সেই বর্ণমালাগুলো আজ অবিনাশী, তারা বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মাহাবুব হাসান ঝরঝরে ভাষায় লেখা গল্পটা পড়তে আরাম লাগল। শেকড়ের কাছে ফেরার বর্ণনাটাও সুন্দর।
ফয়জুল মহী অসাধারণ শ্রুতিমধুর লেখনি পাঠে মুগ্ধ হলাম শুভকামনা রইল।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

গল্পটি মাতৃভাষার গুরুত্ব ও শিকড়ের টানের এক অনন্য প্রতিফলন। আবীরের পেশাগত ব্যস্ততা ও সারার বিদেশি বেড়ে ওঠার মাঝে বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বেঁধেছে 'বাংলা ভাষা'। ১৯৫২ সালের ত্যাগের ইতিহাস সারার হৃদয়ে দেশপ্রেম ও আপন ভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলে। এটি প্রমাণ করে যে, মাতৃভাষা কেবল শব্দ নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় ও আবেগের ধারক, যা সীমানা পেরিয়েও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়।

১৭ নভেম্বর - ২০২৫ গল্প/কবিতা: ৬ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "স্বাধীনতা”
কবিতার বিষয় "স্বাধীনতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী,২০২৬