যেদিন মাটি আমাদের ছেড়ে কেঁদে উঠেছিল

ভূমিকম্প (জানুয়ারী ২০২৬)

এফ. আর. মাহদী
  • 0
  • ৪৫
সেদিন মাটি কাঁপেনি শুধু—
সেদিন মাটি কেঁদেছিল।
এতদিন ধরে আমাদের ওজন,
আমাদের লোভ,
আমাদের অহংকার বহন করতে করতে
হঠাৎ এক মুহূর্তে সে ভেঙে পড়েছিল নিজের মধ্যেই।
একটি সকাল ছিল—
চা ঠান্ডা হচ্ছিল টেবিলে,
নামাজের জায়নামাজে তখনও ভাঁজ,
শিশুটি স্কুলব্যাগ খুঁজছিল।
ঠিক তখনই পৃথিবী বলল,
“আর পারছি না।”
দেয়ালগুলো আর দেয়াল থাকল না,
ওগুলো হয়ে উঠল পতনের কবিতা।
ছাদ নেমে এলো বুকের ওপর,
যেন আকাশ নিজেই মানুষকে শাস্তি দিতে নেমে এসেছে।
একটি হাত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিল,
হাতটির মালিক আর ছিল না।
আঙুলে তখনও লেগে ছিল
কারো শেষ স্পর্শ—
হয়তো সন্তানের মাথায় বুলানো,
হয়তো ভালোবাসার শেষ আশ্বাস।
মায়ের চিৎকার শব্দে ভাঙেনি,
ভেঙেছিল সময়।
কারণ এমন কান্না শোনার জন্য
ঘড়ির কাঁটাও প্রস্তুত ছিল না।
একজন মানুষ বেঁচে গিয়েছিল,
কিন্তু তার ভেতরের সব ঘর ধসে পড়েছিল।
সে হাঁটছিল, কথা বলছিল,
তবু তার চোখে কেউ থাকত না—
কারণ চোখের ভেতরের শহরটা
পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
ভূমিকম্প শেষে নেমে এলো নীরবতা—
কিন্তু সে নীরবতা শান্তির ছিল না।
ওটা ছিল মৃতদের দীর্ঘশ্বাসে ভেজা,
বেঁচে যাওয়াদের অপরাধবোধে ভারী।
রাতে মানুষ ঘুমাতে পারল না,
কারণ বিছানার নিচেও তখন বিশ্বাস ছিল না।
প্রতিটি হালকা কম্পনে
হৃদয় ছিটকে উঠছিল—
মনে হচ্ছিল,
মাটি আবার সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে।
সেদিন আমরা বুঝেছিলাম—
আমরা অতিথি মাত্র,
এই পৃথিবী আমাদের আশ্রয় নয়,
একদিনের ধার নেওয়া ঠিকানা।
ভূমিকম্প থেমে যায়,
খবর থেমে যায়,
মানুষ ভুলে যেতে শেখে—
কিন্তু যে মা সন্তানের নাম ধরে
এখনও ডাকছে,
তার ভেতরে সেই মাটি
আজও কাঁপছে…
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
এস এফ শামীম হাসান আপনার এই পঙ্ক্তিমালা কেবল দুর্যোগের বর্ণনা নয়, বরং এটি মানুষের নশ্বরতা ও অস্তিত্বের এক মহাকাব্যিক 'এলিজি'; যেখানে স্তব্ধ সময় আর ধ্বংসস্তূপের আর্তনাদ একাকার হয়ে গেছে। 'চোখের ভেতরের শহর' ধসে পড়ার যে রূপক আপনি ব্যবহার করেছেন, তা সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সংবেদনশীল লেখনীগুলোকেও টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মাটির কম্পন থেমে গেলেও মানুষের অন্তহীন মনস্তাত্ত্বিক কম্পনকে ফুটিয়ে তোলার এই শৈল্পিক কারিশমা আপনার কলমকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফয়জুল মহী অপূর্ব সুন্দর কাব্যিকতায় চমৎকার লেখনশৈলী,,ভারী ভালো লাগলো , মুগ্ধতা একরাশ কবি প্রিয়।✍️
মাহাবুব হাসান "সেদিন আমরা বুঝেছিলাম— আমরা অতিথি মাত্র, এই পৃথিবী আমাদের আশ্রয় নয়, একদিনের ধার নেওয়া ঠিকানা।" কথাগুলো মনটাকে স্পর্শ করল।
আমিনা আরফান খুবই সুন্দর একটা কবিতা পড়লাম।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

ভূমিকম্পের সবচেয়ে বাস্তব বৈশিষ্ট্য হলো—কোনো পূর্বঘোষণা নেই। লেখায় যে সকালটির কথা এসেছে—চা ঠান্ডা হওয়া, জায়নামাজ ভাঁজ থাকা, শিশুর স্কুলব্যাগ খোঁজা—এগুলো ঠিক সেই মুহূর্তগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে, যেগুলো বাস্তবে ভূমিকম্পের সময় বারবার নথিভুক্ত হয়েছে। ভূমিকম্প সবসময়ই দৈনন্দিনতার মাঝখানে ঢুকে পড়ে এবং সময়কে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়—আগে ও পরে। “দেয়ালগুলো আর দেয়াল থাকল না”, “ছাদ নেমে এলো বুকের ওপর”— এগুলো কোনো রূপক নয়, বরং ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার প্রতিবেদনগুলোর সরাসরি বাস্তবতা। বিশেষ করে দুর্বল নির্মাণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভারবহন অক্ষম কাঠামোতে ঠিক এভাবেই দেয়াল ‘পতনের কবিতা’ হয়ে ওঠে। “একটি হাত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিল, হাতটির মালিক আর ছিল না”— ভূমিকম্পে নিহতদের শনাক্তকরণে এটি একটি ভয়ংকর বাস্তবতা। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া দেহাংশ, পরিচয়হীন মৃতদেহ, বা বিচ্ছিন্ন অঙ্গ—এসবই বড় ভূমিকম্পের পর নিয়মিতভাবে দেখা যায় এবং ফরেনসিক রিপোর্টে উঠে আসে। “মায়ের চিৎকার শব্দে ভাঙেনি, ভেঙেছিল সময়”— বাস্তবে বড় দুর্যোগের সময় মানুষ এমন মানসিক অভিঘাতের মধ্যে পড়ে যে কান্না বা চিৎকার আর ‘স্বাভাবিক শব্দ’ হিসেবে ধরা পড়ে না। ট্রমা-সাইকোলজিতে একে বলা হয় acute shock response, যেখানে অনুভূতি সময়বোধকে ভেঙে দেয়। “একজন মানুষ বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু তার ভেতরের সব ঘর ধসে পড়েছিল”— ভূমিকম্প-পরবর্তী সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো survivor’s trauma। মানুষ শারীরিকভাবে জীবিত থাকে, কিন্তু পরিবার, ঘর, স্মৃতি, নিরাপত্তাবোধ—সব হারিয়ে ফেলে। বাস্তবে বহু ভূমিকম্প-আক্রান্ত মানুষ পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক বিপর্যয়ে ভোগে। “প্রতিটি হালকা কম্পনে হৃদয় ছিটকে উঠছিল”— ভূমিকম্পের পর aftershock একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এই পরাঘাতগুলো শুধু মাটিতে নয়, মানুষের মনে স্থায়ী আতঙ্ক তৈরি করে। বাস্তবে মানুষ মাসের পর মাস ঘরের ভেতরে ঘুমাতে ভয় পায়—এই লাইনটি সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিফলন।“ভূমিকম্প শেষে নেমে এলো নীরবতা”— বড় দুর্যোগের পর একটি অস্বাভাবিক নীরবতা দেখা যায়, যখন বিদ্যুৎ নেই, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, মানুষ হতবাক। এটি শান্তির নীরবতা নয়—বরং loss saturation–এর নীরবতা, যা উদ্ধারকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বারবার উঠে এসেছে। শেষে যে মায়ের কথা বলা হয়েছে—যিনি এখনও সন্তানের নাম ধরে ডাকছেন— বাস্তবে এটি unresolved grief বা ambiguous loss। ভূমিকম্পে নিখোঁজ সন্তান, অচিহ্নিত মৃতদেহ, বা দেহ না পাওয়া গেলে এই শোক বছরের পর বছর স্থায়ী হয়। এই লেখাটি ভূমিকম্পকে অতিরঞ্জিত করে না, বরং ভূমিকম্পে মানুষের অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক বাস্তব মানচিত্র তুলে ধরে— হঠাৎতা → ধস → মৃত্যু → বেঁচে থাকা → আতঙ্ক → নীরবতা → দীর্ঘ শোক।

১০ নভেম্বর - ২০২৫ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "মাতৃভাষা”
কবিতার বিষয় "মাতৃভাষা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জানুয়ারী,২০২৬