নয়নের মণি রুহি

বাবা (জুন ২০২৬)

সাদিয়া আক্তার রিমি
  • ১৩
হৃদয় পাগলের মতো খুঁজছিল তার পাঁচ বছরের মেয়ে রুহিকে। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তার ছোট্ট পরী রুহিকে; হৃদয়ের কলিজার টুকরো তার মেয়ে, তার প্রাণভোমরা। সকালে বাজার থেকে ফিরে মেয়েকে দেখতে না পেয়ে হৃদয় প্রথমে ভাবে, রুহি হয়তো পাশের বাড়ির রিয়ার সঙ্গে খেলছে। কিন্তু সেখানেও রুহিকে খুঁজে না পেয়ে ভয়ে-আতঙ্কে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। তখন থেকেই হন্যে হয়ে পাগলের মতো রুহিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সে। কিন্তু কোথাও রুহির হদিশ নেই। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করছে, কেউ তার মেয়েকে দেখেছে কি না। কিন্তু কেউই ঠিকঠাক কোনো জবাব দিতে পারছে না। বাড়ির আশেপাশের ঝোপঝাড়ে, পুকুরে, ধানখেতে—সব জায়গায় পাগলের মতো রুহিকে খুঁজে চলেছে হৃদয় ও তার পরিবার। ‘রুহি! রুহি!’ বলে চিৎকার করে অনবরত মেয়েকে ডেকে চলেছে হৃদয়, সেই সঙ্গে রুহিকে খুঁজছে হৃদয়ের ভাই ও মা-বাবাও। ওদিকে রুহির মা রুমি মেয়ের চিন্তায় বাড়িতে হাউমাউ করে কাঁদছে। ‘আমার ছোট্ট মেয়েটা কোথায় গেল?’ এই ভেবেই রুমি ভয়ে বারবার শিউরে উঠছে।”
দিনকাল ভালো না। কখন কী হয়! রুহি কোথায় গেল, এই মুহূর্তে কোথায় আছে, কী করছে, কার সঙ্গে আছে—কোনো খারাপ লোকের পাল্লায় পড়েনি তো? এসব ভেবেই হৃদয় ও তার পরিবারের সবার রুহ কেঁপে উঠছে।হৃদয়ের মনে পড়ে, রুহি যখন রুমির গর্ভে আসে, তখন সে মনে মনে অনেক খুশি হলেও চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। কারণ তখন তার চাকরিতে যোগ দেওয়ার এক বছরও পূর্ণ হয়নি। চাকরি হওয়ার পরপরই হৃদয় তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকাকে বিয়ে করেছিল। রুমি ডিভোর্সি হওয়া সত্ত্বেও তার সুন্দর ব্যবহার হৃদয়কে ভীষণ আকৃষ্ট করেছিল। হৃদয় সবসময়ই সুন্দর মনের একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চেয়েছিল। রুমি তার জীবনে আসার পর ধীরে ধীরে হৃদয়ের অগোছালো, অসম্পূর্ণ জীবনকে সুন্দর, পরিপাটি ও পূর্ণ করে তুলেছিল।বিয়ের দুই বছর পর সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল হৃদয়ের। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় বিয়ের ছয় মাস না যেতেই রুমি প্রেগন্যান্ট হয়ে গিয়েছিল। তখন রুমির বয়স ছিল উনত্রিশ বছর। হৃদয়ের আজও মনে পড়ে, প্রেগন্যান্ট হওয়ার চার-পাঁচ মাস পর থেকেই রুমির শরীরে কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছিল। তার শরীরে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়, অল্পতেই রুমি হাঁপিয়ে যেত, তার হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ কমে যেত। অতিরিক্ত বমি হওয়ার কারণে রুমি ঠিকমতো কিছু খেতেও পারতো না, এমনকি পানি পান করতেও তার কষ্ট হতো। প্রায়ই গর্ভে থাকা সন্তানের নড়াচড়া টের পেত না রুমি। তখন সে ভীষণ ভয় পেয়ে যেত, আতঙ্কিত হয়ে পড়তো। ‘বাচ্চা ঠিক আছে তো? বাচ্চাটা বেঁচে আছে তো?’—এমন ভয় ও দুশ্চিন্তা তাকে ঘিরে ধরত। যার কারণে তার রক্তচাপও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেত।খুব ভয়ে ভয়ে তারা সেই দিনগুলো পার করেছিল। কারণ রুমির শারীরিক জটিলতায় মা ও সন্তান—দুজনের জীবনই ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা ছিল। ডাক্তার বারবার হৃদয়কে সতর্ক করেছিলেন, যেন সে তার স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের যথাযথ যত্ন নেয়। সেই সঙ্গে সঞ্চয় করার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কারণ রুমির শারীরিক অবস্থায় সিজার করানোই নিরাপদ ছিল; স্বাভাবিক প্রসব মা ও সন্তানের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারতো। ডাক্তারের পরামর্শে হৃদয় প্রতি মাসে তার বেতন থেকে কিছু টাকা আলাদা করে জমিয়ে রাখত রুমির সিজার করানোর জন্য। এভাবেই ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় টাকাও জোগাড় করে ফেলেছিল সে। যদিও আল্লাহর অশেষ রহমতে রুমি স্বাভাবিকভাবেই সন্তান প্রসব করেছিল। সিজার করানোর প্রয়োজন পড়েনি। রুহির আগমনে হৃদয়ের ঘরে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল।হৃদয় খুব ভালোবেসে তার মেয়ের নাম রেখেছিল সাবিহা আক্তার রুহি। রুহি নামটা সবারই এত পছন্দ হয়েছিল যে হৃদয়ের মেয়েকে সবাই রুহি নামেই ডাকতো। রুহি ছিল হৃদয়ের যক্ষের ধন, তার নয়নের মণি। আর আজ সেই যক্ষের ধনকেই হারিয়ে ফেলেছে হৃদয়। হৃদয়ের নয়নের মণি তার অলক্ষ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।অশ্রুসিক্ত নয়নে, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে হৃদয় তার সাত রাজার ধনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
হঠাৎ করে হৃদয়ের মনে পড়ে, সে তো বাড়ির আশেপাশের প্রায় সব জায়গায় খুঁজেছে, পাড়া-প্রতিবেশীদেরও রুহির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছে। কিন্তু তার ভাবিকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। কারণ তখন ভাবি তার ছেলে অমিতকে নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল। অমিত গৌরীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে পড়ে। অমিত ক্লাসে প্রায়ই কান্নাকাটি করে বলে তার মাকেও প্রতিদিন তার পাশে বসে থাকতে হয়।জানি না কেন হৃদয়ের মন বারবার বলছিল, একবার স্কুলে গিয়ে ভাবিকে জিজ্ঞেস করি—স্কুলে আসার পথে রুহিকে কোথাও দেখেছিল কি না। বিষয়টা মাথায় আসতেই এক মুহূর্তও দেরি না করে হৃদয় ছুটে যায় স্কুলের দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে শিশু শ্রেণির সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়। ক্লাসরুমের ভেতরের দিকে তাকিয়ে সে যা দেখে, তাতে মুহূর্তেই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ভেতরে রুহি ও অমিত মন দিয়ে ম্যাডামের পড়া শুনছে, আর তাদের পাশে বসে আছে হৃদয়ের ভাবি!এমন অকল্পনীয় দৃশ্য দেখে হৃদয় কয়েক মুহূর্তের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। মেয়েকে নিরাপদ অবস্থায় দেখার পরও রাগে তার শরীর কাঁপতে থাকে। হৃদয় ভাবে, হয়তো ভাবিই কাউকে কিছু না জানিয়ে রুহিকে অমিতের সঙ্গে স্কুলে নিয়ে এসেছে। আর তাতেই বাঁধে এমন বিপত্তি।রাগে অন্ধ হয়ে হৃদয় কিছুটা রুক্ষভাবে তার ভাবিকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,“ভাবি, আপনি রুহিকে স্কুলে নিয়ে আসার আগে একটিবারও কাউকে কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করলেন না? আর ওদিকে সবাই রুহিকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।"এরপর রুহিকে উদ্দেশ্য করে হৃদয় বলে উঠে,“রুহি, বাসায় চলো। তোর মা তোকে না পেয়ে কাঁদছে।”রুহি ঘাড় নেড়ে জানায় সে যাবে না। রুহি: “আব্বু, তুমি বাসায় যাও। আমি এখন বাসায় যাব না। আমি ভাইয়ার সঙ্গে যাব।”হৃদয় আবারও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে, তার সঙ্গে বাসায় যেতে বলে, কিন্তু রুহি নাছোড়বান্দা।তার এমন একগুঁয়ে আচরণ দেখে হৃদয়ের রাগ আরও বেড়ে যায়। রাগের মাথায় সে বলে ওঠে,“বেয়াদব মেয়ে!”কথাটা বলেই যেন তার নিজের বুকেই ধাক্কা লাগে। সে ভাবে — 'হায় হায়! এ আমি কী বলে ফেললাম!' হৃদয় এখন কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। হৃদয়ের কথা শুনে রুহির চোখ ছলছল করে ওঠে। অভিমানে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়।অবস্থা বেগতিক দেখে ম্যাডাম মৃদু কিন্তু ম্লান হেসে বলেন,“ভাইজান, আপনি বাসায় গিয়ে রুহির মাকে বলুন, রুহি স্কুলে নিরাপদেই আছে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। স্কুল ছুটি হলে রুহি অমিতের সঙ্গেই বাসায় ফিরে যাবে।”ম্যাডামের কথা শুনে হৃদয়ের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা থামে। নিজের আচরণের জন্য সে লজ্জা পায়। সে বুঝতে পারে, ক্লাসভর্তি ছাত্রদের সামনে এভাবে রাগারাগি করা তার একেবারেই উচিত হয়নি।ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও সে বাসায় ফিরে যায় এবং সবাইকে জানায় যে রুহি অমিতের সঙ্গে স্কুলে গেছে।হৃদয়ের রাগ তখনও পুরোপুরি শান্ত হয়নি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে রুহিকে বকা দেওয়ায় সে খুব কষ্ট পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারে, তার কলিজার টুকরার রাগ হয়েছে তার উপর।আরও বুঝতে পারে, অমিতের দেখাদেখিই রুহির মনে স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ জন্মেছে— এটা তো কোনো অন্যায় নয়, বরং খুশির খবর।তাই নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে হৃদয় রুহির জন্য একটি রূপকথার গল্পের বই কিনে আনে। বইটির প্রতিটি পাতায় গল্পের সঙ্গে রঙিন ছবি রয়েছে, যা গল্পের কাহিনিকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
“স্কুল ছুটি হওয়ার পর রুহি বাসায় এসে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। রুহির রাগ ভাঙাতে হৃদয় তাকে গল্পের বই দেয়, সেই সঙ্গে অনেক চকলেটও দেয়, কিন্তু তাতেও লাভ হয় না। অভিমানী রুহি মুখ ফিরিয়ে নেয়।হৃদয় অনেকভাবে রুহিকে সরি বলে, এমনকি কান ধরে উঠবসও করে, তবুও রুহির মন কিছুতেই গলে না, রাগও ভাঙে না।একপর্যায়ে হৃদয় রুহিকে গল্পের বইটি খুলে দেখায়। আর তা দেখে রুহির চোখ কপালে ওঠে। বইয়ে কত সুন্দর সুন্দর ছবি! ওমা! রুহি দেখে— রাজার মেয়ে মজার মজার খাবার খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, খেলছে; কত সুন্দর রাজার বাড়ি, কত সুন্দর বাগান; থুরথুরে বুড়ি, ভূত, পরী, রাক্ষস, খোক্কস; রাজার ছেলে ঘোড়ায় চড়ে কোথাও যাচ্ছে—এমনই সব রঙিন ছবি আঁকা আছে বইয়ে।রুহি ছবিগুলো দেখে খুব খুশি হয়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমো দেয়।হৃদয় অবাক হয়ে যায়। তার মনে পড়ে — পাঁচ বছর পার হতে চলল, অথচ রুহি আজও অক্ষর ঠিকভাবে লিখতে পারে না। অ আ ক খ শেখালে A B C D ভুলে যায়, ১ ২ ৩ ৪ শেখালে 1 2 3 4 ভুলে যায়। কিছুতেই অক্ষরগুলো মনে রেখে ঠিকমতো লিখতে পারে না।এই নিয়ে রুহির মায়ের কত অভিযোগ। রুহি পড়তে বসতে চায় না, পড়তে বসলেও ঘুমে ঢুলে পড়ে। মারধর করেও তাকে অক্ষর শেখানো কঠিন হয়ে পড়ে।কিন্তু আজ পড়তে না পারলেও রুহি বারবার বইয়ের গন্ধ শুঁকছে, ছবিগুলো দেখে গল্প বোঝার চেষ্টা করছে, পৃষ্ঠাগুলো বারবার উল্টে দেখছে।হৃদয় বুঝতে পারে, রুহির আগ্রহ কোথায়। কেন সে এতদিন পড়ায় আনন্দ খুঁজে পেত না।ওদিকে রুহি তখনও তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে আছে, তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হৃদয়ের মনে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে, হৃদয় তখন এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করে—যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। অদ্ভুত হলেও সত্যি, একপর্যায়ে খুশিতে হৃদয়ের চোখ ছলছল করে ওঠে।”
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মেহেদী মারুফ গল্পটা বেশ ভালো ছিলো। তবে বাবার তুলনায় মেয়ের দিকে গল্পের ফোকাসটা বেশি ছিলো। শুভ কামনা..!
গল্পে সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কতটা সফল হলাম জানি না

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

একমাত্র মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে এক বাবার মনের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে এই গল্পে।

০৫ মে - ২০২৫ গল্প/কবিতা: ১১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬