সমুদ্রজল

বাবা (জুন ২০২৬)

মাহাবুব হাসান
  • 0
  • 0
[এক]
রোজ ভোরে ঘুম ভাঙে বাচ্চাগুলোর ট্যাঁ ট্যাঁ কলরবে। দাঁড়কাকের বাচ্চা। গাছের মগডালে বাসাটা। মাটি থেকে অনেক উঁচুতে। তবে আমাদের ফ্ল্যাট চার তলায় হওয়াতে একদম বরাবর। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ওদের দেখি। বেশ শক্তপোক্ত বাসা। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়েছে আট/দশ দিন হলো। দুটো বাচ্চা। ওদের গায়ের হালকা ছাইরঙা পশমগুলো কুচকুচে কালো হয়ে উঠতে শুরু করেছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই জেগে ওঠে। ক্ষুধায় ছটফট করতে থাকা বাচ্চাগুলোর জন্যে খাবার জোগাড় করতে তৎপর হয়ে ওঠে কাক দুটো।

প্রথম প্রথম শুধু বাবা কাকটাই খাবারের জন্যে ছুটত। এখন মা কাকটাও খাবার খুঁজতে বেরোয়। হয়ত বাড়ন্ত বাচ্চা দুটোর খাবার জোগানো বাবার একার পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না ইদানিং।

তোফা সেদিন জিজ্ঞেস করছিল, কোনটা মা আর কোনটা বাবা আমি বুঝি কী করে। আসলেই মর্দা আর মাদি কাক আলাদা করে খুব কঠিন। জেন্ডার ভেদে দাঁড়কাক প্রায় একইরকম দেখতে- যাকে বলে মনোমরফিক। আমিও শুরুতে আলাদা করতে পারতাম না। এখন পারি। হালকা ঠোঁটের যেটা দিনভর বাসায় বসে ডিমে তা দিত ওইটা মেয়ে। আর যেটা অদূরে ময়লার ডাস্টবিন ঘেঁটে খাবার খুঁজে আনত, এখনো করে, ওইটা মর্দা। ওটার ঠোঁটটা বেশি মোটা।

আচ্ছা, কাকের কি ঘ্রাণেন্দ্রিয় বলে কিছু নেই? রুমালে নাক চেপে পচাগলা আবর্জনাভরা ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়াও মুশকিল, সেই ডাস্টবিনেই ঠোঁট দিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে খাবার বের করছে! সম্ভবত জৈবিকতার টানেই পারছে। মানুষ জৈবিকতার ঊর্ধ্বে না। তবে সেই জৈবিকতা অনেক পরিশীলিত। তবু সে অন্ন সংস্থানে এঁদো নোংরায় নামে করে কী করে?

চিন্তার গভীর ডুবে সমুদ্র মন্থন করছিলাম, নীলা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে টেরই পাই নি

“ভাইয়া, হাসপাতালে যাচ্ছি”

আমি কিছু না বলে চুপচাপ মানিব্যাগ থেকে দুটো পাঁচশ টাকার নোট বের করে এগিয়ে দিলাম। নীলা স্থির চোখে আমাকে কিছুক্ষণ দেখল

“টাকা লাগবে না”
অবাক চোখে তাকালাম নীলার দিকে
“তাহলে?”
“চল না… আমার সাথে!”
“উঁহু”

এক শব্দে উত্তর দিলাম। ভাবলাম অন্যদিনের মতো আজও নীলা ক্ষান্ত দেবে। কিন্তু না

“মা বারবার করে বলে দিয়েছে তোকে নিয়ে যেতে”

দিন পাঁচেক আগে মা স্বয়ং এসে আমার হাত ধরে কান্নাকাটি করে গেছে, আমি যাই নি। তখন অবশ্য বাবার জ্ঞান ছিল। আমাকে দেখার জন্যে নাকি খুব তড়পেছেন। উনি এখন কোমায়। তোফাও আমাকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছে। আমি বুঝি, সামাজিকতার খাতিরে হলেও যাওয়া উচিত। কিন্তু আমার জন্যে বাবাকে দেখতে যাওয়া হবে বোঝার পাহাড় ঠেলে যাওয়ার সমান। যে বোঝা তিলে তিলে জমেছে গেল সতের বছরে। তার কতটা অস্বস্তি আর কতটা ঘৃণা তা আলাদা করা মুশকিল

“বুঝিস তো এই সময়টাতে তোর ভাবীর সাথে কেউ না কেউ থাকা উচিত”

নীলাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিতেই টুপ করে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। যুক্তিটা তো দুর্বল! এখনো তোফার ডেলিভারির কিছুদিন বাকি। ঘণ্টাখানেকের জন্যে যাওয়াই যেত। অথবা নীলা হাসপাতাল থেকে আসার পর গেলেও চলত। অফ ডে-তে সারাদিন তো বাসায়ই আছি।

সতের বছর অনেক লম্বা সময়। নীলা হয়ত জানে না কেন বাবার প্রতি আমার এত ক্ষোভ। কেউ কি ওকে বলে নি? নাকি যারা জানে তাদের কাছে এতদিনে থিতিয়ে গেছে ব্যাপারটা? ওদেরটা থিতালে আমারটা কেন থিতাচ্ছে না?


[দুই]

সাঁই সাঁই সাঁই… থই থই পূর্ণিমার মধ্যে ঘোড়ার ক্ষিপ্রতায় গ্রামের মেঠো পথ ধরে ছুটছি। মাঝপথে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তেও সামলে নিয়েছি। গতি কমেছে, কিন্তু থামি নি। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ঠের পানে ধাবমান মরণোন্মুখ পতঙ্গের মতো নিষিদ্ধ আকর্ষণের টানে ছুটে চলেছি তিন কিশোর। আম্মার শিথানের নিচ থেকে চুপিসারে পাঁচ টাকার ময়লা নোটটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি সবাই ঘুমিয়ে যাবার পর।

গঞ্জে দূর থেকে কোন এক খ্যাতনামা যাত্রা দল এসেছে। দিনের বেলার নিরীহ বৈশাখী মেলা রাত্রিবেলা রঙ বদলায়। যাত্রাপালা, ঝুমুর ঝুমুর নাচ… আরো কত কী! তৃষিত দর্শকের তিয়াস মেটাবার সকল উপকরণ মওজুদ। সেখানে সবাই ঢুকতে পারে না। পয়সা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়।

টিকিট মূল্য তিন-দু-গুনে ছ’টাকা, আমরা অনেক অনুনয় করে পাঁচ টাকায় রফা করেছি।

গেট থেকেই সানাইয়ের বিরহী সুর শোনা যাচ্ছে। সাথে নায়কের আবেগী সংলাপ- “না না না আনারকলি, এ হতে পারে না…”

আমরা যাবার আগেই যাত্রাপালা শুরু হয়ে গেছিল। পালার নাম ‘আনারকলি উপাখ্যান’। আমরা দর্শকসারিতে দাঁড়িয়ে মঞ্চের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছি। মুখে রঙচঙ মাখা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আজ হলে খুব হাস্যকর লাগত। সেদিন লাগে নি। আমাদের আনকোরা দৃষ্টিতে ছিল শুধুই বিস্ময়-বিমুগ্ধতা।

বয়সটাই এমন, যখন নাকের নিচে গোঁফ দৃশ্যমান হবার সাথে সাথে শরীরে জাগে অচেনা ঢেউ। কেমন একটা মদিরতার জোয়ার ক্ষণে ক্ষণে ভাসিয়ে নিতে চায় দেহতরী। বিপরীত লিঙ্গের শরীরের গন্ধকে লাগে মেশক আম্বরের খুশবুর মতো। তার দেহভাজে কী অমূল্য মণিমুক্তো লুকিয়ে আছে তা দেখবার দুর্নিবার আকর্ষণ জাগে মনে। একারণেই হয়ত আনারকলি ‘পার্ট’ করা মেয়েটাকে লাগছিল রূপকথার রাজকুমারীর মতো। তার ঘোরলাগা তনুশ্রী, ভরাট বুক, সুডৌল নিতম্ব… শতসহস্র কামাতুর দৃষ্টি আনারকলির দেহবল্লরীর কোনা কোনা ঘুরে বেড়াচ্ছে। ময়দানভর্তি পুলকিত দর্শকের মতো আমিও হা করে ওকেই দেখছি। শুধু চোখে দেখা নয়, এ যেন চেখে দেখাও!

হঠাৎ ঘটল বিপত্তি। অসাবধানতাবশত মঞ্চের একটা খুঁটির পেরেকের সাথে বেঁধে খুলে গেল আনারকলির পরচুলা। আমি হতভম্ব হয়ে দেখলাম নায়িকার সাজে সজ্জিত মানুষটি আসলে আমার বাবা!

দর্শকেরা নোংরা হাসি হাসছে, অশ্লীল মন্তব্য করছে- "সুন্দরী! উপরেরডা তো দেহাইলি, অহন নিচেরডাও খুইলা দে, দেহি কিছু আছে নি…"

অন্ধকার রজনীতে প্রলয়ঘটিত তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সমুদ্রের তীব্র কল্লোল একাকী ডিঙ্গি নৌকোকে যেভাবে ছোবলের পর ছোবল মারে, তেমনি আমোদিত দর্শককূলের বিষাক্ত বাক্যবাণ আঘাত হানছে আমার কর্ণজুগলকে। দর্শকসারিতে বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি। আব্বার একটা অন্ধকার জগত আমার সামনে এখন দৃশ্যমান। ‘ঝুমুর ঝুমুর যাত্রাপালা’ দলের নায়িকার ঘাটতি আব্বা নিয়মিতই পূরণ করে আসছে, অথচ আমরা তা জানিই না!

কাউকে বলতে পারছিলাম না, আবার চোখের সামনে থেকে সরাতেও পারছিলাম না যাত্রাপালার সেই দৃশ্যটাকে। খাবারের থালায়, বইয়ের পাতায়, স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে... সবখানে আমি শুধু ওই দৃশ্যটাকেই দেখি। আমার ওইটুকু বয়সের যে আকর্ষণ, তার থেকে বহুগুণ আকর্ষণ দর্শকসারির পুরুষগুলোর মধ্যে দেখেছি। আনারকলি সেজে কোমর ঘুরিয়ে, বুক দুলিয়ে, কুৎসিত ইশারা-ইঙ্গিত করে একদল হায়েনার মনোরঞ্জন করছিল যে সে আমার বাবা! কামাতুর মানুষগুলোর হৃদয়ে কদর্য কামনার ঝড় তোলা মানুষটা আমার জন্মদাতা বাবা!!

আমার যাত্রাপালা দর্শনের দুই সহচর হামিদ আর রানার বদৌলতে পরদিনই পুরো ক্লাসে রটে গেল বাবার কীর্তি। সহপাঠীরা তো বটেই, শিক্ষকেরাও আমাকে দেখে মুখ টিপে হাসে। আমি মুখ লুকোনোর জায়গা খুঁজে পাই না।


[তিন]

শৈশব আর তারুণ্যের মাঝে সন্ধি গড়ে দেয় বলেই বোধয় বয়সটাকে বলে বয়ঃসন্ধি। সেই আবেগী বয়সের বটমূলে দাঁড়ানো এই আমি বাবার দিকে তাকিয়ে কথা বলার রুচি হারিয়ে ফেলেছিলাম। তবু কোথাও হয়ত একটা অদৃশ্য সেতুবন্ধন রয়ে গেছিল। নইলে বাবলুর কথায় ওভাবে মেজাজ হারাব কেন?

সেদিন টিফিন পিরিয়ডে বাবলুকে খুব পিটালাম। হাতটা মচকে গেছিল ওর। হেডস্যার বাবাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। ওর আমার দুজনেরই। স্যার আর বাবা দুজনই বারংবার আমাকে জিজ্ঞেস করছিল কেন ওকে মেরেছি। আমি একটা কথাও বলি নি। শুধু আগুনে দৃষ্টিতে বাবলুকে ঝলসাচ্ছিলাম। আমায় নীরবতায় ক্রুদ্ধ হয়ে বাবা যখন আমার গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসিয়ে দিলো তখন আর চুপ থাকতে পারলাম না

“অয় আমারে হিজড়ার বাচ্চা বলছে”

আমার তারস্বরে বলা কথাটা শুনে বাবা নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার বিব্রত চেহারাটা দেখে আক্কাস কাকার একটুও মায়া হলো না। ফোঁস করে বলে উঠল

“হিজড়ার বাচ্চা কইছে তো ঠিকই কইছে! তর বাপে তো একখান হাপ-লেডিস…”
“আহ! আক্কাস মিয়া, থামেন” হেড মাস্টারের কথাতেও কাকা থামল না,
“তর বাপে এককালে ঘেঁটু আছিল, এইডা জানোস?”

আমি হতবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম। তার মাথাটা হেট হয়ে আছে।

ঘেঁটু মানে আমি জানতাম। বাবা ছোটবেলায় ওই পেশায় ছিল তা ভাবতেও পারছিলাম না।

ছোট কাকা বয়সে আমার চেয়ে তের বছরের বড় হলেও মিশত বন্ধুর মতো। সেদিন রাতেই তাকে ধরে বসলাম
“কাকু, আব্বায় কি ঘেঁটু আছিল?”

আমার ভালো-মন্দ, সিরিয়াস-দুষ্টু সব ধরণের প্রশ্নের উত্তর দেয়া ছোট কাকা প্রশ্নটা শুনে থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল

“ঠিক ঘেঁটু না, তয়… জানোস তো তর দাদাজানের সহায়-সম্পত্তি কিছু আছিল না… এই জগতে টিকা থাকতি কত কী যে করা লাগে কাকা…”

বলতে বলতে কাকা উদাস হয়ে গেল, হয়ত ইচ্ছা করেই। ওতেই আমি যা বোঝার বুঝে গেছি।

আব্বার মেয়েলী আচরণের কারণটা পরিষ্কার করে দিয়েছিল ঘটনা দুটো। বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশী সবার কাছে হাসির খোরাকে পরিণত হলাম আমরা। এসব আব্বার গায়ে কতটা বিঁধত জানি না, কিন্তু আমার কাছে অসহ্য লাগত। দুরন্ত-দুর্বার এই আমি, যে কারো পরোয়া করত না, সেই আমি ধীরে ধীরে খোলসের ভেতর ঢুকে গেলাম। অবস্থা এমন হলো, দূরে দাঁড়িয়ে দুজন হাসছে দেখলেও মনে হতো ওরা বুঝি আমাকে দেখে হাসছে! আমি গৃহবন্দি হয়ে গেলাম। ততদিনে আমরা কার্যত একঘরে হয়ে গেছি।

আমার চোখে সবকিছুর জন্যে দায়ী আমার বাবা। যতটা ঘৃণা চারপাশের মানুষগুলোকে করেছি, তারচেয়ে বেশি করতে লাগলাম আব্বাকে। পরের দেড়টা বছর আমি বাড়িতে শুধু দাঁত কামড়ে পড়ে ছিলাম। আব্বার সাথে কথা বলতাম না। স্কুলে চুপচাপ যেতাম-আসতাম। কেউ উত্যক্ত করলেও প্রত্যুত্তর দিতাম না।

পড়ালেখায় ভালো ছিলাম, স্কুলের বেতন মওকুফ হয়েছিল। বহু খাটাখাটুনি করে ট্যালেন্টপুলে স্কলারশীপ জুটিয়ে ফেলেছিলাম। আমি চাই নি টাকার জন্যে ওই মানুষটার সামনে দাঁড়াই, যে টাকা কামায় যাত্রাপালার নর্তকী হয়ে!

সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে গেল কলেজে পড়তে শহরে আসার পর।

আব্বা চিঠির পর চিঠি লিখত, আমি উত্তর দিতাম না। এমনও হয়েছে, উনি আমার মেসে এসেছে খবর পেয়ে সারাদিন বাইরে বাইরে কাটিয়েছি। তার পাঠানো মানি অর্ডার রিসিভ না হয়ে ফিরে গেছে তারই কাছে। বছরের পর বছর জমে থেকে বালি যেভাবে পাথুরে হয়ে যায়, তেমনি আমার অন্তরে ঘৃণা জমাট পাথর হয়ে গেছে। সতেরটা বছর তো কম কথা না!

জানি না আমার অবহেলায় আব্বা কতটা কষ্ট পেয়েছে। তবে মা কষ্ট পেয়েছে খুব। মানুষটা জ্ঞান থাকতে নাকি বারবার আমার কথাই জিজ্ঞেস করছিল। কোমায় যাওয়ার পর মা নিজেই চলে এসেছিল আমাকে নিতে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমার মুখে ‘আব্বা’ ডাক শুনলে মানুষটা ‘আন্ধার’ থেকে ফিরে আসবে!


[চার]

ডাক্তার আজ আব্বার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার কথা বলছিল। ইম্প্রুভমেন্ট নেই, ফিরে আসার চান্স অলমোস্ট জিরো। খামাখা মানুষটাকে কষ্ট দেয়া আর দেদার টাকা ‘অপচয়’! খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে এসে উপস্থিত। হাজার তারার ভিড়ে শুকতারা এই আমিই শুধু নেই। মানুষ এমন বেরহম হয় কী করে!

আইসিইউ-এর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছোট খালাকে আম্মা সেই কষ্টের কথাই বলছিলেন। সবাইকে চমকে দিয়ে আমি আর তোফা গিয়ে উপস্থিত হলাম। আমার কোলে তখন ফুটফুটে নবজাতক। ছেলে। কত ক্ষমতা তার! গতকালই জন্মেছে। দিনের ষোল ঘণ্টাই ঘুমিয়ে থাকে। হাত-পা নাড়ানো আর কান্না ছাড়া কিছুই করতে পারে না। তবু সে আস্ত পাহাড় ঠেলার মতো করে হাসপাতালে ঠেলে পাঠিয়েছে আমাকে!

তোফার প্রসবকালীন জটিলতায় চারদিক অন্ধকার দেখার পর যখন ফুটফুটে বাচ্চাটা আমার কোলে এলো, তখন প্রথম আবিষ্কার করলাম বাবাদের বুকের বাঁ পাশে একটা সমুদ্র থাকে। সন্তানের জন্যে সকল শ্রম-ঘাম-কষ্ট অবলীলায় ভেসে যায় তার জোয়ারে। সেই সমুদ্রেই সর্বগ্রাসী সুনামী ওঠে তলায় জাস্ট একটা আঘাত থেকে। সেই আঘাতটা আব্বাকে আমি দিনের পর দিন দিয়ে এসেছি অবহেলা-অবজ্ঞা-অপমানের মাধ্যমে। তার সুস্থসবল হার্টটা এমন বিগড়েছে কি তবে আমার দেয়া আঘাতেই?

আইসিইউর ডোর গ্লাসের ভেতর দিয়ে যাকে দেখলাম সে আমার ফেলে আসা মধুর শৈশব- আঙুল ধরে স্কুলে যাওয়া, কাঁধে চেপে মেলায় ঘোরা, তার কিনে দেয়া হাওয়াই মিঠাই কিংবা রসগোল্লায় মন ভরানো…

হয়ত ছোট্ট আমাকে কোলে নিয়ে আমার মতো তারও চোখজোড়া ভিজে উঠেছিল, হয়ত নিজের জীবনের সমস্ত হতাশা-খেদ-অপ্রাপ্তিবোধকে একপাশে রেখে আমার মধ্যেই একটা স্বর্গরাজ্য খুঁজে পেয়েছিল, হয়ত তার মনে হয়েছিল আমার মুখে হাসি ফোটাতে দুনিয়ার সমস্ত ক্লেদ-কালিমা অম্লান বদনে ললাটে মেখে নেয়া যায়, হয়ত…

আমি আর তাকে দূর থেকে দেখতে পারছিলাম না। ঢুকে পড়লাম আইসিইউর ভেতরে। পা টিপে টিপে গেলাম তার কাছে। তার নিশ্চল চর্মসার হাতটা ধরে বলতে চেয়েছিলাম, “আব্বা, আমারে আপনি মাফ কইরা দ্যান…”, কিন্তু বলতে পারলাম না। ‘আব্বা’-তে গিয়ে গলাটা আটকে গেল।

আমিও এখন বাবা, আব্বার মতো আমার বুকেও এখন একটা সমুদ্র, দু’কূল উপচে পড়ছে তারই লোনা জল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

এক বাবার আত্মোপলব্ধি আর হৃদয়ের কাছে ফেরার গল্প।

৩০ সেপ্টেম্বর - ২০২৩ গল্প/কবিতা: ৫৯ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "বিশালতা”
কবিতার বিষয় "বিশালতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬