শহরের কাঁচঘেরা কর্পোরেট অফিসের ২০তলায় বসে নীল যখন বাইরের ধূসর আকাশটার দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল জীবনটা আসলে একটা বৃত্ত। মানুষ যত দূরেই যাক না কেন, দিনশেষে তাকে সেই শুরুতেই ফিরে আসতে হয়। নীলের সামনে রাখা কফিমগ থেকে ধোঁয়া উড়ছে, কিন্তু তার মন পড়ে আছে অনেক দূরে—যেখানে ধুলোবালির পথ আর একটা জীর্ণ দর্জির দোকান ছিল।
ত্যাগের কারিগর
নীলের বাবা রমজান আলীর জগতটা ছিল সুতো, বোতাম আর মেপে কাটা কাপড়ের টুকরোয় সীমাবদ্ধ। গ্রামের বাজারের এক কোণায় তাঁর ছোট দোকান 'মমতা টেইলার্স'। নীল যখন খুব ছোট, তখন থেকেই দেখত বাবা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে গভীর মনোযোগে সেলাই মেশিনের চাকা ঘুরাচ্ছেন। মেশিনের সেই একঘেয়ে শব্দটা যেন ছিল তাদের সংসারের হৃৎস্পন্দন।
একবার নীলের খুব শখ হলো সে একটা দামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়বে, যেখানে বড়লোকদের ছেলেরা পড়ে। রমজান আলী জানতেন তাঁর সামর্থ্য নেই, কিন্তু তিনি ছেলেকে বুঝতে দিলেন না। তিনি রাতে দোকানের কাজ শেষ করে অন্যের জমিতে কামলার কাজ নিতে শুরু করলেন। নীল গভীর রাতে মাঝেমধ্যে ঘুম ভেঙে দেখত, বাবা লণ্ঠনের আলোয় বসে পিঠ কুঁজো করে কাজ করছেন।
নীল একবার জিজ্ঞেস করেছিল, "বাবা, তুমি ঘুমাও না কেন?"
রমজান আলী মৃদু হেসে বলেছিলেন, "ঘুমিয়ে পড়লে তোর স্বপ্নের পাহাড়টা কে গড়বে রে পাগল?"
বড় হওয়ার দূরত্ব
নীল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেল। হোস্টেলে যাওয়ার দিন রমজান আলী স্টেশনে এসে ছেলের হাতে একটা পুরনো খাম গুঁজে দিলেন। তাতে ছিল অনেকগুলো কুঁচকানো টাকা। নীল জানত, এই টাকাগুলো বাবার কয়েক বছরের জমানো পুুঁজি। ট্রেনের বাঁশি বাজলে বাবা শুধু বলেছিলেন, "শহরে অনেক চাকচিক্য থাকবে, তুই শুধু তোর সততাটুকু হারাস না।"
ঢাকায় গিয়ে নীল এক নতুন জগতের দেখা পেল। ধীরে ধীরে তার জীবন থেকে বাবার সেই ধুলোমাখা জগতটা ঝাপসা হতে শুরু করল। সে কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে উঠল, ইংরেজিতে কথা বলা শিখল, দামী ব্র্যান্ডের পোশাক পরতে শুরু করল। ঈদ ছাড়া বাড়ি যাওয়া হতো না। বাবা যখন ফোন করতেন, নীল বিরক্ত হয়ে বলত, "বাবা, এখন মিটিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।"
রমজান আলী ওপার থেকে শুধু বলতেন, "আচ্ছা বাবা, সাবধানে থাকিস। সময়মতো খেয়ে নিস।" সেই 'পরে' আর সহজে আসত না।
সেই শেষ ফেরা
মাস খানেক আগে হুট করে গ্রাম থেকে খবর এল বাবা অসুস্থ। নীল যখন পৌঁছাল, তখন বাড়ির উঠোনে সাদা কাপড়ে ঢাকা এক নিথর দেহ পড়ে আছে। রমজান আলী আর কোনোদিন জিজ্ঞাসা করবেন না, "নীল, খেয়েছিস?"
বাবার দাফন শেষে নীল যখন বাবার সেই ছোট্ট অন্ধকার ঘরে ঢুকল, তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করল। বিছানার পাশে রাখা ছোট টেবিলটাতে বাবার সেই পুরনো চশমাটা পড়ে আছে, যার একটা ডাঁটি সুতো দিয়ে বাঁধা। নীল ভাবল, সে মাসে লাখ টাকা বেতন পায়, অথচ তার বাবার চশমাটা ঠিক করে দেওয়ার কথা তার একবারও মনে পড়েনি।
সেখানে একটা পুরনো ট্রাঙ্ক ছিল। নীল সেটা খুলতেই দেখল তার ছোটবেলার সেই প্রথম স্কুল ব্যাগটা যত্ন করে রাখা। তার ভেতরে পাওয়া গেল একটি ডায়েরি।
ডায়েরির পাতায় বাবা
নীল ডায়েরিটা খুলতেই স্তব্ধ হয়ে গেল। এটি কোনো সাধারণ ডায়েরি নয়। সেখানে রমজান আলী নীলের জীবনের প্রতিটা সাফল্যের খবর কেটে কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে রেখেছেন। খবরের কাগজে নীলের ইন্টারভিউ বের হয়েছিল একবার, সেই কাটিংটাও সেখানে আছে।
ডায়েরির মাঝখানে এক জায়গায় লেখা ছিল:
"আজ নীল ফোন করে খুব বকা দিল। বলল আমি নাকি বারবার ফোন করে ওকে বিরক্ত করি। হয়তো ও ঠিকই বলেছে। ও এখন বড় অফিসার, ওর অনেক কাজ। কিন্তু আমার এই অবুঝ মনটা যে শুধু ওর গলার স্বরটুকু শোনার জন্য সারাদিন ছটফট করে।"
আরেক জায়গায় লেখা:
"নীলের মা মারা যাওয়ার পর আমিই ওর মা, আমিই বাবা। ওর যখন গায়ে জ্বর আসত, আমি সারা রাত ওর শিয়রে বসে থাকতাম। এখন আমার শরীরটা আর চলে না, কিন্তু নীলকে বললে ও মিছেমিছি দুশ্চিন্তা করবে। ওর উন্নতিই আমার আয়ু বাড়ায়।"
নীল ডায়েরিটা বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। যে মানুষটা নিজের জীবনের সব রঙ বিসর্জন দিয়ে নীলের জীবনটাকে রঙিন করতে চেয়েছিল, নীল তাকেই জীবনের 'বিরক্তি' ভেবে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
উপসংহার
নীল এখন আর মিটিংয়ের ব্যস্ততায় বাবাকে ভুলে থাকে না। অফিসের ডেস্কে সে বাবার সেই পুরনো চশমাটা রেখে দিয়েছে। ওটা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, সাফল্য মানে শুধু দামী গাড়ি বা উঁচু পদ নয়। সাফল্য মানে সেই শেকড়কে সম্মান করা, যার ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এই বিশাল অট্টালিকা।
আকাশে মেঘ জমলে নীল এখন আর ভয় পায় না। সে জানে, তার মাথার ওপর বাবার দোয়ার এক অদৃশ্য ছাতা এখনো প্রসারিত হয়ে আছে। বাবা মানে এক নিঃশব্দ বটবৃক্ষ, যে নিজে রোদে পুড়ে সন্তানকে আজীবন শীতল ছায়া দিয়ে যায়।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
১. মূল সুর (Central Theme)
গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত "নীরব ত্যাগ" এবং "অপ্রকাশিত ভালোবাসা"—এই দুটি বিষয়কে মূল ভিত্তি হিসেবে রাখা হয়েছে। বাবা চরিত্রটি মুখে ভালোবাসা প্রকাশ না করলেও তাঁর প্রতিটি কাজ (যেমন: রাতে জেগে দর্জির কাজ করা বা ছেলের সাফল্যের কাটিং জমানো) সেই ভালোবাসারই প্রমাণ দেয়।
২. চরিত্রের বিবর্তন (Character Arc)
বাবার চরিত্র: তিনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্থির। তাঁর ত্যাগ এবং অভাবের সংসার সামলানোর লড়াই একই ধারায় চলেছে।
ছেলের চরিত্র (নীল): তার চরিত্রে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন আনা হয়েছে। শৈশবের সরলতা থেকে যৌবনের অবজ্ঞা, এবং পরিশেষে অনুশোচনার মাধ্যমে সত্য উপলব্ধি। এই বিবর্তনটি গল্পের বিষয়ের গভীরতা বাড়িয়েছে।
৩. প্রতীকী ব্যবহার (Symbolism)
গল্পে কিছু প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে যা বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ:
দর্জির কাঁচি ও সেলাই মেশিন: এটি কেবল জীবিকা নয়, বরং জীবনের ছেঁড়া অংশগুলো জুড়ে দেওয়ার সংগ্রামের প্রতীক।
পুরনো চশমা: এটি বাবার জরাজীর্ণ অবস্থা এবং ছেলের উদাসীনতার প্রতীক।
বটবৃক্ষ বা ছাতা: যা গল্পের শেষে বাবার চিরন্তন ছায়াকে নির্দেশ করে।
৪. আবেগের ভারসাম্য (Emotional Balance)
গল্পটিকে কেবল বিয়োগান্তক না করে একটি শিক্ষণীয় রূপ দেওয়া হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর ছেলের উপলব্ধি দেখানোর মাধ্যমে বিষয়ের পূর্ণতা পেয়েছে। এটি পাঠককে নিজের বাবার কথা ভাবতে বাধ্য করে, যা "বাবা" বিষয়ক গল্পের প্রধান সার্থকতা।
৫. পরিবেশ ও বর্ণনা
গ্রামের টিনের চাল, লণ্ঠনের আলো এবং শহরের কাঁচঘেরা অফিস—এই বৈপরীত্যগুলো ব্যবহার করা হয়েছে যাতে বাবার সংগ্রাম এবং ছেলের বর্তমান অবস্থানের দূরত্বটা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
১৪ ডিসেম্বর - ২০২০
গল্প/কবিতা:
৪ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জুন,২০২৬