ইংল্যান্ডের নামী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুজানা অধ্যয়নরত। সে থাকে মেসে। তার রুমমেট এলিজাবেদ বেল ইংল্যান্ডের ইয়র্কসায়ারের গ্রাম এলাকার মেয়ে, ক্যারিবিয়ান শেলী এ্যান আর আফ্রিকার এঙ্কিনা। সবার সাথেই সুজানার বেশ ভাল সম্পর্ক। বিশেষ করে এলিজাবেদ তার প্রাণের বন্ধু। এক সাথে থকাতে থাকতে মনে হয় পাশের বাড়ির মেয়ে সে, কখনো বোন, কখনো গাইড, কখনো অভিবাক বনে যায় এলিজাবেদ। সব রূপেই সে বেশ মানানসই। তাঁর ব্যবহারে বুঝাই যাবেনা সে গ্রাম্য ধর্ম যাজকের মেয়ে। বিভিন্ন বিধি নিষেধ পেরিয়ে সে আজকের পর্যায়ে এসেছে। ঝেড়ে ফেলেছে কুপমুন্ডকতা, ঝেড়ে ফেলেছে কুসংস্কার।

এলিজাবেদ কবিতা লিখে । তার কবিতার সমালোচক সুজানা। কবিতায় কোথায় শব্দের বিন্যাস ঠিক নেই, কোথায় উপমা ভুল আছে তা সংশোধন করাই তার কাজ। এলিজাবেদ অবাক হয়। বলে-তুমি নিজেইতো কবিতা লিখতে পারো। পারি কিন্তু আমার ইচ্ছে হয়না। কারণ আমি যখন নদী নিয়ে লিখবো তখন অবধারিতভাবেই জীবনানন্দ চলে আসে তার ধানসিরি নদী নিয়ে। যখন নির্জনতা নিয়ে লিখতে বসি তখনও আসে, আসে সোনালী ডানার চিল হয়ে, আসে ঝড়ে পড়া কাঠাল পাতায়, আসে বিষাদে, আসে মৃত্যুতে............................
এলিজাবেদ ভ্রু কুঞ্চন করে বলে-হু ইজ জীবনানন্দ?
সুজানা-সে বাংলাদেশের অন্যতম কবি। তাকে রূপসী বাংলার কবি বলা হয়, নির্জনতার কবি বলা হয়, রোমান্টিক কবি বলা হয়। শুধু তাই নয় আমি যখন কোন প্রেমিকের জন্য প্রেমিকার কথা ভাবি তখন বনলতা সেন চলে আসে তার পাখির নীড়ের মত চোখ নিয়ে।
এবারও এলিজাবেদ ভ্রু কুঞ্চন করে বলে-হু ইজ বনলতা সেন?
তখন সুজানা হেসে বলে বনলতা জীবনানন্দের সৃষ্টি একটি চরিত্র। সে সমস্ত পুরুষের প্রেমিকা।
সমস্ত পুরুষের প্রেমিকা মানে কি ? এলিজাবেদের এই প্রশ্নের উত্তরে সুজানা বলে-

কবিতায় তাকে এমনভাবে সৃষ্টি ও উপস্থাপন করা হয়েছে যে-পুরুষ মাত্র কল্পনা করে বনলতা সেনের মত হবে তার প্রেমিকা। তখন সে আবেগে উচ্ছাসে আবৃত্তি করে বনলতাসেন কবিতাটি। এটা ইংরেজীতে তর্জমা করে শোনায় এলিজাবেদকে।
ওয়াও বলে বেশ উচ্ছাশ প্রকাশ করে কবিতা প্রেমী এলিজাবেদ। বলে তুমি কি বনলতা সেনের মত?
সুনাজা বলে মানে ? মানে একদম সোজা ? যেহেতু তুমি বাংলার মেয়ে সেহেতু তুমি কি বনলতা সেনের মত নও।
সুনাজা-আমার কি অন্ধাকারের মত ঘনকালো চুল আছে?
এলিজাবেদ-আছে
সুনাজা-আমার চোখ কি পাখির বাসার মত?
এলিজাবেদ-হ্যা।
সুনাজা-আমার মুখ কি প্রাচীন কোন রাজ্যের কারুকার্যের মত?
এলিজাবেদ-অবশ্যই।
সুনাজা-আমাকে দেখে কি কোন নাবিক সমুদ্রে দিশা হারাতে পারে?
এলিজাবেদ-পারে।
সুনাজা-আমি কি প্রেমিককে দুদন্ড শান্তি দিতে পারি ?
এলিজাবেদ-পার।
সুনাজা-শিশিরের শব্দ শেষে যখন সন্ধ্যা আসে, চিল তার ডানার রৌদ্রের ঘ্রাণ মুছে ফেলে, পান্ডুলিপি করে আয়োজন জোনাকির ঝিলিমিলির মত আমার মুখোমুখি প্রেমিক পুরুষ কি বসতে চাইবে!

এলিজাবেদ-চাইবে শত বার চাইবে।

তাহলে ধরে নাও আমি বনলতা সেনের মত। এলিজাবেদ বলল- না বল তুমিই বনলতা সেন।

সুজানা মাথা নেড়ে বলল- না না সে কখনো হয়না। বনলতা সেন একজনই, সে অতীতের, সে বর্তমানের, সে আগামীর, সে চিরকালীন।

এলিজাবেদ এবার হাত তালি দিয়ে বলল- চমৎকার বলেছো। বনলতা সেন চিরকালীন। তাদের এই আলোচনায় কখন যে শেলী এ্যান ও এঙ্কিনা যোগ দিয়েছে তন্ময় ছিল বলে এলিজাবেদ ও সুজানা কেউ খেয়াল করেনি। ওরা সবাই জীবনবাবুর আরও কবিতা শুনতে চাইলো। বাহিরে রূপালী রাতের আলো আর ভিতরের ঘরে মোমের আলোয় চলছে এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশে কবিতার আসর।

সুজানা আবৃত্তি করল তার প্রিয় আরেকটি কবিতা-

আট বছর আগের একদিন
জীবনানন্দ দাশ

শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে-ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হল তার সাধ
------------------------------
------------------------------
হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হব-বুড়ি চাঁদটারে আমি
করে দেব বেনোজলে পার;
আমরা দজনে মিলে শূন্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার।

এভাবে কবিতায়, গল্পে, আড্ডায় মেতে উঠে যার তরুণ প্রাণ। সামনে গ্রীষ্মকালনি বন্ধ। কোথায় যাওয়া যায় সে নিয়ে চলল কতক্ষণ জোড় আলোচনা। তর্ক-বিতর্কের পর ঠিক হলো এশিয়ার বাংলাদেশেই যাওয়া হবে এবার। সাথে জীবননানন্দের বরিশাল ও বনলতা সেনের নাটোর ঘুড়া হবে।
এলিজাবেদের সে কি উত্তেজনা। সে প্রথমবারের মত এশিয়া মহাদেশে যাচ্ছে। তার পূর্ব পুরুষেরা এককালে যেখানে রাজত্ব করেছে। সে এর মধ্যই ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে দিয়েছে। বাংলাদেশের নাম শুনেছিল সে এর আগে হাতেগোনা কয়েকবার আর পত্রিকায় কিংবা টেলিভিশনে দু’একটা খবর শুনেছে সেই দেশকে নিয়ে। গরীব আর দুর্যোগের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার কাছে কোন আকর্ষণের বস্তু ছিলনা। কিন্তু সুজানার কথা শুনে শুনে, কবিতা পড়ে আর ইতিহাস ও পেপার-পত্রিকা ঘেটে যা জানলো তা তাকে অবাক করে দিলো। এমন সবুজ শ্যামল দেশ পৃথিবীতে বিরল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছে। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। পৃথিবীতে এমন ইতিহাস অন্য জাতির নেই। এরা প্রতিবছর প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে।

এলিজাবেদ তার প্রেমিক জোনাথনকে প্রস্তাব দিল তার সাথে বাংলাদেশ ঘুরে আসার জন্য। প্রস্তাব শুনে জোনাথন বলল-কেন ভারত নয়, কেন বাংলাদেশ ?

এলিজাবেদ- আমিও ভারতের কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে বাদ দিয়ে দিয়েছি। কারণ আমার রুমমেট ও বান্ধবীর বাড়ি বাংলাদেশে। আমি ওখানে গেলে ওদের সাথে থেকে প্রকৃত বাংলাদেশকে জানতে ও বুঝতে পারবো। শুধু ট্যুরিস্ট হিসেবে গেলে বিখ্যাত জায়গাগুলো দেখা হয়, ঘুড়া হয় কিন্তু দেশের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়না। আর এই সুযোগটা মিস করতে চাইনা বলেই এবারের জার্নিটা হবে বাংলাদেশ দেখার।

অনেক যু্ক্তি তর্কের পর জোনাথনও মত দিল সেও যাবে। তারা দুজন মিলে সুজানার পরিবারের জন্য কিছু উপহার কিনে রাখলো।

আফ্রিকার বিচিত্র সব গাল-গল্প বলে বেড়ানো এঙ্কিনা শেষ মূহুর্তে যেতে পারলনা তার মার অসুস্থার খবর পেয়ে সে গতকাল আফ্রিকা চলে গেছে। আর শেলী এ্যান তার খন্ডকালীন কর্মস্থল থেকে ছুটি ম্যানেজ করতে পারিনি তাই তারও জাওয়া হলোনা। সেজন্য শেলী মন বেশ খারাপ ছিল। পুরো সপ্তাহজুড়ে সে মন মরা ছিল যতদিন না পর্যন্ত সুজানা, এলিজাবেদ ও জোনাথন ইংল্যান্ড ছেড়েছে।

শেলীর পছন্দ বাংলাদেশের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ দেখার পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি ঢাকা শহরের রিক্সাতে চড়াও নাকি তার এক নতুন স্বপ্ন । এরকম হাজারো টুকটাক ইচ্ছার কথা প্রতিদিনই সে বলতো আর হাসতো। সে আরও বলতো সুজানার সৌজন্যে তার এই স্বপ্নগুলো পূরণ হতে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ মেষ কাজের দেয়ালের মত এভাবে ঝুর ঝুর করে ভেঙ্গে তা কে ভাবতে পেরেছিল। এজন্য সুজানারও অবশ্য খারাপ লেগেছে।

দীর্ঘ বীমান যাত্রার পর ঢাকায় নেমে মানুষ, গাড়ি, দূষন, জ্যাম এসব সত্ত্বেও তাদের এক ধরনের ভাললাগা তৈরী হলো লাল বিত্তের সবুজ পতাকা খজিত দেশটির জন্য।


ঢাকায় বোনের বাড়িতে সাপ্তা খানেক থেকে বেশ ঘুরাঘুরিকরে তারা পথ ধরল বরিশালের। সদরঘাট থেকে বরিশালগামী জলযানে তারা যখন যাচ্ছিল তখন রাতের আকাশে অসংখ্য তারা আর জোছনার আলোয় নদীর সৌন্দর্য দেখে তারা বিমহিত হেয় গেল। জোনাথন বলল- এরকম সুন্দর রাত তার জীবনে আর আসেনি। ঢাকার টস্ট্রিট খাবারও নাকি তার বেশ ভাল লেগেছে। কিন্তু নদীর দূষন তাকে ব্যাথিত করেছে।


এলিজাবেদ বলল- তোমাদের দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ম কানুন বেশ অদ্ভুত। অবিবাহিত প্রাপ্তবয়ঙ্ক ছেলে মেয়ে বিবাহ ছাড়া এক সাথে থাকতে পারবেনা এটা প্রথমে মানতে খারাপ লাগলেও এখন বুঝতে পারি অনাকাঙ্থিত কোন ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্যই এ ব্যবস্থা। নৈতিক শিক্ষাটা আসলেও জরুরী।

এই বিষয়টা নিয়ে আমরা বেশ হেসেছি-বিয়ে না করেও আমরা স্বামী, স্ত্রী হয়ে গেলাম বাংলাদেশে ঘুরতে এসে। আবার একই রুমে থাকছি, খাচ্ছি।

বরিশাল আসার পর জীবননানন্দের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দেখে এলিজাবেদ আবেগে আপ্লুত হলো। তারপর শাতলা নামক শাপলা গ্রামে গিয়ে সে বিস্মৃত। পুরো বিল জুড়ে ফুটে আছে লাল শাপলা। ছবি উঠালো জোনাথন ও সুজানাকে নিয়ে।

সাতার জানেনা বলে তার দুঃখ হলো। নৌকায় করে বেড়ানোটা বেশ উপভোগ করেছে। সুজানা নৌকা চালাতে পারে, সাতার জানে, রান্না জানে, আরও অনেক গুণ আছে দেখে তার হিংষে হচ্ছে।

সুজানা তার ভালোবাসার মানুষটিকেও পরিচয় করিয়ে দেয় জোনাথন ও এলিজাবেদের সাথে।

সুজন ওদের বরিশালের বিখ্যাত জায়গার পাশাপাশি নদীদেও ঘুরতে নিয়ে যায়। গান গায়-ওরে নীল দড়িয়া.......

তার দরাজ গলার গান শুনে জোনাথন বলে উঠে আমি ভাল পিয়ানো বাজাতে পারি কিন্তু গান গাইতে পারিনা।
এলিজাবেদ বলল- আসলে আমরা দুজন যদি সুজানা আর সুজন হতাম তাহলে ভাল হতো।

সুজন একথা শুনে বলল-কিন্তু আমরাতো এলিজাবেদ বা জোনাথন হতে চাইনা আমরা বারবার বাংলাদেশের মানুষ হয়ে জন্মাতে চাই-মরতে চাই।

সময়ের সাথে সাথে সব বদলে যায়। থেকে যায় স্মৃতি। সেই স্মৃতি নিয়ে এলিজাবেদ লিখে ফেলল লাল-সবুজের বাংলা ভ্রমণ নামে একটি নিবন্ধ। সেটা ইংল্যান্ডের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হওয়ার পর বেশ সারা ফেলে।

সুজানা অবশ্য বলে জোনাথন না থাকলে এটা হতো না। কিন্তু এলিজাবেদ সেটা মানতে নারাজ। মূল ক্রেডিটতো তার, জোনাথন শুধু এটা প্রকাশের জন্য দৌড়-ঝাপ করেছে।

এভাবেই অন্যদেশের তরুন-তরুনী ও মানুষের মনে লাল-সবুজের বাংলা হয়ে উঠে আপন।