সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মি-১৯ মহাকাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। পৃথিবীর ইতিহাসে লিখা হলো নতুন একটি অধ্যায়। পিনাপ নামক গ্রহে সফল অভিযানে যোগ দিয়েছে সাত জন তরুন তুর্কী। এরিক, আব্রাহাম, মিরা, শিপ্রা, ফারহান, লুসি, ও ক্রিশ্চিয়ান। মহাশূন্যর মধ্যে ভেসে এই যাত্রায় নিজেদের সামিল করতে পেরে সবাই বেশ খুশি। টানা ছয় মাস মহাশূন্য পরিভ্রমণ করে মি-১৯ পৌঁছবে পিনাপ গ্রহে। হয়তো এদের মধ্যেই কেউ এক জন একে দিবে পিনাপে প্রথম মানব পদ চিহ্ন।

মিরা ও ফারহান একই ল্যাবে কাজ করার কারণে পরিচয় ধীর্ঘ দিনের। প্রেম এসেছে দুজনের মনে বসন্তের ফুলেল বাতাসে। জীবন-মরনের সাথী হবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দুজনেই। পিনাক জয় করার পরই তারা পৃথিবীতে ফিরে এসে বিয়ে করবে। তাই স্বপ্নের সীমাহীন প্রান্তরে তারা অভিযাত্রী আগামী দিনের।

হাসি-আন্দ, ভয়-উৎকন্ঠা নিয়ে কেটে গেল ছয়টি মাস। পিনাকে পৌঁছে গেল মি-১৯। অবতরণ করার ঠিক আগ মূহুর্তে কন্টোরল প্যানেলে ভেসে উঠল নতুন একটি কোড-০০৯। আর বিপত্তির শুরু তখন থেকেই। সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। অবতরনের সময় সবুজ বাতি জ্বলবে ও দড়জা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে কিন্তু তার পরিবর্তে
ভুল সংকেত আসছে এবং সবকিছু যেন অকেজো হয়ে যাচ্ছে। কোন সুইচ ঠিক মত কাজ করছে না। এক নিমিষেই যেন আলো নিভে গিয়ে নিরাশার অন্ধকারে ডুবে গেছে সব। অজানা ভয় গ্রাস করেছে সব কটা হৃদয়।

নিরবতা ভেঙ্গে ফালট ধরার শব্দ ধীরে ধীরে স্পস্ট হচ্ছে। মি-১৯ যে হুমকির মুখে পড়েছে তা এই সাত নভোচারী সহজেই বুঝে গেছে। আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়ছে সবকিছু। যেন টাইটানিক মুভির দৃশ্যের মত ঘটে চলেছে সব। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেল। বিশেষ প্যারাসুট নিয়ে সবাই প্রস্তুত। কমান্ঠারের মুখে মুভ করো কথা শুনে সবাই এক সাথে লাফিয়ে পড়লো শূন্যের মধ্যে।

আব্রাহাম, মিরা, শিপ্রা, ফারহান পিনাপে ল্যান্ড করেছে সফলভাবে। তারা অনেক খুজেও এরিক, লুসি ও ক্রিশ্চিয়ান এর দেখা পেলনা। জন মানবশুণ্য গ্রহটি যেন ভূতুরে কোন স্থান। এদিক সেদিক ঘুরেও এর কোন কূল কিনারা করতে পারলোনা বেঁচে থাকা ০৪ জন নভোচারী। সময় যেন এখানে স্থির। রাত-দিন কিছুই বুঝা যায়না। ২য় দিন তারা হাটতে হাটতে একটা পর্বতের কাছে চলে এলো এবং অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখলো। মানুষের ছায়ার মত কিছু ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা দেখে তারা যেমন ভয় পেল, তেমনি আনন্দিতও হলো। যাক তাহলে প্রাণের অস্তিত্ব আছে এ গ্রহে।


নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ করার সময় তারা শুদ্ধ বাংলায় একটি ঘোষণা শুনতে পেল-
“পৃথিবী থেকে আগমনকারী বন্ধুগণ আপনাদের পিনাপে স্বাগতম। পিনাপের জাতীয় কোড-০০৯ আপনাদের নভোযান এর নিয়ন্ত্রন নিয়েছে। তাই আপনারা আমাদের অতিধি ও নিয়ন্ত্রানাধীন মানব সদস্য। আমরা আপনাদের সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পেলেও আপনারা আমাদের ছায়া ব্যতীত অন্য কিছু দেখতে পাবেন না। আপনারা কেন এখানে এসেছেন সেটাও আমাদের অজানা নয়। তাই শত্রুতা নয় বন্ধুত্বের হাত বাড়ান, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিন এবং কাজ শেষে নিজেদের প্রিয় পৃথিবীতে ফিরে যান। যদি আমাদের কথা না শোনেন তবে মৃত্যুই আপনাদের এক মাত্র গন্তব্য।”

একটি গাড়ী জাতীয় ছায়া এগিয়ে এল এবং দরজা খুজে ভিতরে বসার জন্য আহ্বান জানালো। সবাই ভিতরে বসলো আর মূহুর্তেই তা চলে গেল গ্রহের রাজধানীতে।

দশটি ছায়া তাদের বিশেষ একটি স্থানে নিয়ে আসলো। শুরু হলো আলোচনা। এই গ্রহের মানুষ পৃথিবীর সব ভাষাই বুঝতে পারে কারণ বিশেষ এক প্রকার সফটওয়্যার সবার সাথেই ফিট করা আছে। আর তাদের ভাষাও বাংলায় রুপান্তরিত হয়ে ভেসে আসছে।

তাদের চারজনকে স্পে করা হলো বিষেশ পদার্থ দিয়ে যাতে পিনাপের সবাই বঝতে পারে তারা শত্রু নয় অতিথি। এক মাস কাজ করার সুযোগ পেল নভোচারীরা।

এখানের খাবার মানুষের জন্য উপযোগী নয়। পৃথিবীতে যেসব খাবার আনা হয়েছে তা দিয়ে চলে যাবে এক মাস। গ্রহের বিষাক্ত নদীতে পাওয়া গেছে হারিয়ে যাওয়া তিন নভোচারীর মৃত দেহ। পেস্ত্রো নামক এই নদীতে কেউ একবার পড়ে গেলে সে আর বেচে ফিরতে পারেনা বিষাক্ত এসিডের কারণে।

মৃতদেহগুলো একটি জারের ভিতর সাজিয়ে রাখা হলো। দেখে মনে হয় ওরা ঘুমিয়ে আছে। পিনাপ ধ্বংশ হওয়ার আগ পয´ন্ত ওরা ঘুমিয়েই থাকবে। ওদের জন্য বেদনা বুকে চেপে কাজ করে গেল চার নভোচারী।

পিনাপ গ্রহ নিয়ে ওদের গবেষণা শেষ হলো। ‍সুন্দর এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের বিদায় জানলো পিনাপবাসী। আর ভালবাসার স্মারক হিসেবে দিল-তিনটি মূল্যবান পাথর। পাথরগুলো মাহাত্ম হলো কিছুক্ষণ পর পর এরা রং বদল করে সৌন্দয´ বিলায়। পিনাপের সর্বশেষ আধুনিক সংস্করনের মহাযান দিয়ে তাদের পৃথিবীতে পাঠানো হলো। যে ভুল কোড -০০৯ তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল। সেই কোডই আবার তাদের প্রিয় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনলো।

এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট প্রকাশিত হলো পৃথিবীর স্বনামধন্য কয়েকটি পত্রিকায়। মানুস জানতে পারলো পিনাপের আদ্যপান্ত। সংবর্ধনা দেওয়া হলো চার মহাকাশ অভিযাত্রীকে যারা জয় করেছে পিনাপ গ্রহ।

আর এভাবেই তারা অংশ হলেন ইতিহাসের।