আমেরিকায় বাড়ির খুব কাছেই আছে নাসা গবেষণা কেন্দ্র। আত্মীয় স্বজন আসলেই ঘুরতে চলে যাই এই নাসাতে। সেদিন বিকেলে নাসা থেকে ঘুরে এসে রাতে ডিনার পর্ব শেষ করে বসে ছিলাম জানলার ধারে। সন্ধ্যা গড়িয়ে নিশুতি ঘনিয়ে এসেছে। অন্ধকার আকাশে তারারা ঝিকমিক করে জ্বলছে। আজ সারাদিন নাসাতে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাতেই সারাদিনে নাসাতে কি দেখলাম সেগুলো স্মৃতির মণিকোঠায় কড়া নাড়লো। আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নির্ণয়, চন্দ্র অভিযানের ইতিহাস, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকদের মহাকাশ পাড়ীর ইতিহাস, মহাকাশে বিভিন্ন রকেট অভিযানের ইতিহাস - কত কিনা দেখলাম নাসাতে। কৌতুক বৈজ্ঞানিকরা যুগ যুগ ধরে গবেষণা করেছে বিভিন্ন নতুন গ্রহ আবিষ্কারের জন্য । সেসব ইতিহাস নিয়ে ডকুমেন্টারি বানিয়ে ছোট করে একটা ভিডিও দেখানোর ব্যবস্থা ছিল নাসাতে। খুব মন দিয়ে সেসব ভিডিও গুলো দেখছিলাম। বুঝলাম বৈজ্ঞানিকদের কত অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আবহাওয়া দপ্তর থেকে শুরু করে স্যাটেলাইটের বিভিন্ন কার্যক্ষমতার সুফল আজকে আমরা পাচ্ছি।
যাই হোক, ঘুরতে যাওয়ার ক্লান্তি ততটা মনে হচ্ছে না, কারন মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক অনেক তথ্যের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছি তাই । মনে হচ্ছে আমিও মহাকাশ গবেষকদের মত নতুন অভিজ্ঞতার পথে বেরিয়ে পড়ি। আপাতত একটি গান বাজিয়ে দিলাম ফোনে, রাতের বেলা গান শুনতে ভালো লাগে। আজ কেমন যেন ভৌতিক পরিবেশ, নিঃশব্দ চারিদিক। জানালার দিকে দৃষ্টি গেলো। পূর্ণিমার চাঁদ আকাশে। আজ ডিনারে খাওয়া হয়েছে ভালোই। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে যখন বিছানার দিকে যেতে গেলাম, তখন জানালার দিকে চোখ গেলো। কিছু একটা যেন আমাকে দেখছে। হয়তো আমার ভ্রম হবে এটা। ক্লান্তিটা বেশ বুঝতে পারছি।
এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ করে আকাশ থেকে একটা আলোক বিচ্ছুরণ খসে পড়ল আমার জানলার সামনে। কিছুক্ষণ পর একটি অদ্ভুত ধরনের প্রাণী আমার জানলার সম্মুখে উপস্থিত হল। ঠিক যেমন বলিউডের ‘কহি মিল গায়া’ সিনেমার সেই অদ্ভুত প্রাণী জাদু চরিত্রের মত। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কে তুমি ভাই? সে বলল সে নাকি অন্য গ্রহ থেকে এসেছে। আমি তো শুনে অবাক হয়ে গেলাম। নাম জিজ্ঞেস করতেই সে বলল তার নাম নেক্স। কি অদ্ভুত নাম রে বাবা। অন্য গ্রহ থেকে আসা অদ্ভুত প্রাণীর বৈশিষ্ট্য হল এরকম - চোখগুলো বিশাল বড় আকৃতির শরীরটা অনেকটা ব্যাঙের চামড়ার মত, মানুষের মতো গঠন হলেও আকৃতি ছিল বিরাট বড়। প্রায় ১০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এবং ২০০ কেজিরও বেশি ওজন বিশিষ্ট কোন পশু মানুষ মিশ্রিত এক ধরনের প্রাণী বলা যায়।
যদিও আমার কিছুটা ভয় লাগছে কিন্তু কৌতুহল আমার বড্ড বেশি বরাবরই। তাই সাহস করে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি কেনইবা এসেছো এখানে। ঠিক তখনই মনে হলো কোনো যন্ত্র আমার মাথাটা ধরলো। অতঃপর, বাংলা ভাষাতে বললো, “জানি অবাক হয়েছেন। আমি আমার ভাষায় কথা বলছি। কিন্তু সেটা কনভার্ট হয়ে আপনার ভাষায় আপনি শুনছেন। আমি একটি বিশেষ পোশাক পরে আছি। পৃথিবী গ্রহতে আমার নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। তাই এই পোশাক পড়েছি। এই পোশাকের সাথে আমার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র লাগানো আছে ।”
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম “মা..মানে?!”
সে আমাকে বলল “আমি পৃথিবী থেকে বিভিন্ন প্রাণী ধরে নিয়ে যায়।” সেই কথা বলতেই খপাত করে জানলার ভেতর দিয়ে হাতটা গলিয়ে আমাকে ধরে টেনে নিয়ে হুস করে উড়ে গেল আকাশের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে উড়াল দিলো। কিছু সেকেন্ড পর আমি পৃথিবীটাকে আর দেখতে পেলাম না। ওটা আমার দৃষ্টির বাইরে। একটা যান্ত্রিক কণ্ঠ বলে উঠলো, “আমরা আলোর বেগে যাচ্ছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।” আমি বাইরে তাকালাম। অন্ধকার, অন্ধকার আর অন্ধকার। তার মাঝে মিটিমিটি আলো। উড়ে চলছি কোনো অজানার পথে।
আমার তো ভয়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। নিমেষের মধ্যে আমাকে নিয়ে চলে গেল পৃথিবী থেকে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূরে একটি অন্য গ্রহ তে। আমি বললাম যে আমি কোথায় এলাম। সেখানে তার মতো আরও অনেক প্রাণী ছিল যারা তার সঙ্গী সাথী, তারা বলল “নেক্সাস গ্রহে আপনাকে স্বাগতম।” আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু নতুন গ্রহে এসে আমার কৌতুহল বাড়তে থাকল। জানার চেষ্টা করতে লাগলাম এদের গতিবিধি। আমার অদম্য
জানার আগ্রহ নতুন কিছুকে তাই সব কিছু থেকে সেখানে অবগত হলাম এটা নেক্সাস গ্রহ। মহাজাগতিক প্রাণীর খোঁজে আগেও অনেক অভিযান পরিচালিত হয়েছে । এদের উদ্দেশ্যে বার্তা‌ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে মহাবিশ্বের নানা প্রান্তে, মানুষের পক্ষে যতদূর সম্ভব। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা ল্যাব থেকে এসব বার্তা ছড়িয়ে গেছে বহু আলোকবর্ষ দূরে । ভাবতে লাগলাম নাসাতে মহাকাশ গবেষকরা দিনাতিপাত করছে কত নতুন নতুন গ্রহ আবিষ্কারের জন্য। আমি আজ চলে এসেছি একটি নতুন গ্রহে। এখান থেকে ফিরে যদি যেতে পারি তাহলে পৃথিবীতে আমি একটি নতুন গ্রহের সন্ধান দিতে পারব, যার খবর ছাপা হবে কাগজে । অজান্তেই আবিষ্কার করে ফেললাম একটি নতুন গ্রহ ‘নেক্সাস’। এসব ভাবতে ভাবতেই এই গ্রহের প্রাণীরা আমাকে গ্রহ থেকে এমনভাবে ঠেলে ফেলে দিল ঠিক যেমন চলন্ত বিমান থেকে যদি কাউকে ফেলে দেওয়া হয়, সে যেমন আকাশপথে ভাসতে থাকবে ঠিক সে রকম একটা অনুভব হতে লাগল। চিন্তা করার সময় পেলাম না যে, আমি কি পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবো নাকি আকাশ পথেই কোথাও হয়তো প্রাণ হারাবো। এই ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে আমার এলার্ম টা বেজে উঠল। কখন যে ভোর হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি। ওমা এটা তো স্বপ্ন দেখছিলাম।
কী হতে কী হলো। তখন, অসহ্য এলার্মে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তবে, ঘটনাটা কি সত্য নাকি মিথ্যা ছিলো? এতক্ষণ যা হলো! সেটা ভাবতে ভাবতে বিছানা ছাড়লাম।
স্বপ্নের মধ্যে কল্পবিজ্ঞানের জগতে কল্পনায় নিজের অজান্তেই কখন যেন আবিষ্কার করে ফেললাম নেক্সাস নামক একটি নতুন গ্রহ। যেখানে স্বপ্নের মধ্যে পদার্পণ করেছিলাম সেটা ছিল নেক্সাস গ্রহ।
কল্পবিজ্ঞানের দৌলতে এই হল আমার নতুন গ্রহ আবিষ্কার করার গল্প।