তুমি কি বলছো? তাহলে বেরিয়ে পড়ি।
আরে বাবা বলছি তো কোন ভয় নেই। ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকলে হবে। কাজ না করলে আমাদের দিন আনা দিন সংসার চলবে কি করে শুনি। পেট খালি রেখে আর যাই হোক ভয়কে জয় করা যায় না।
বিকাশ মনের জোর এনে মাস্ক পরে পকেটে একটা ছোট্ট স্যনিটাইজারের বোতল নিয়ে জয় মা বলে বেরিয়ে পড়ল। জয়তি হাত নাড়ল। দশ বছরের ছেলে বিহান হাত নাড়ল। বলল - তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, বাবা।
বিকাশ হাত নাড়ল। জলের বোতল টিফিন বক্স বিস্কুটের প্যাকেটসহ ছোট্ট ব্যাগটা হাতে দোলাতে দোলাতে বাস স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেল।
বাসস্ট্যাণ্ডে গিয়ে দেখে কত মানুষ। বিকাশের মনে আরও ভয় চেপে বসল। যদি কিছু হয়ে যায়। সবাই এমন চাপাচাপি করছে যে কিছু একটা হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পেট বড় দায়। যেতে তো হবে। লাইন দিয়ে তিনটে বাস ছাড়ার পর একটা বসার সিট পেল। পাশে যে ভদ্রলোক বসে আছে তাকে দেখে বিকাশের মনে হল এর তো নির্ঘাত কিছু একটা হয়েছে তার থেকে ওরও হয়তো কিছু একটা হয়ে যেতে পারে।
জিজ্ঞেস করলে এক্ষুণি নানান কথা বলবে। সেই কথা বলার নিশ্বাস এসে বিকাশের নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে তাই বিকাশ চুপ করে থাকে। কিন্তু তার পাশের ভদ্রলোক তো চুপ করে বসে নেই। সে লাগাতার বকবক করে যাচ্ছে। তাকে সঙ্গত দিচ্ছে আরো দু একজন।
- এ দেশের কি হবে? বিনা দরকারে মানুষই এদিক থেকে ওদিকে যায় আর ওদিক থেকে এদিকে।
- তাই তো দেখছি হে মশাই। কত লোক? কোথায় যায় কে জানে?
- ঐ দেখুন বয়স্ক মানুষ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এই ভরা রোদ্রে কোথায় চলেছে বলুন তো?
বিকাশ বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করল আপনি কোথায় চললেন?
একটু গম্ভীর হয়ে ষাটোর্ধ্ব ভদ্রলোক বললেন - ব্যাঙ্কে।
বাস ছেড়ে দিল। বাস থেকে নামার সময় কিছুতেই বাসের মুখটা ফাঁকা পাচ্ছিল না। লোকজন ঝুলে চলছে। যাইহোক করে নেমে একটু এগিয়ে গিয়ে পাশের গলিতে গিয়ে বিকাশ একেবারে থ।
গেট খোলা তবে সে রকম কোন সাড়া শব্দ নেই। আবার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল বিকাশের।
এবং তাই সত্যি হল। বন্ধ। বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। বলেছিল এবার খুলবে। তাই খোঁজ খবর নিয়ে এসে দেখল এই অবস্থা। হাতের কাছে পেয়ে জিজ্ঞেস করতেই প্রাণেশ কেমন উদ্ভ্রান্তের মত জবাব দিল। তাতেও ভয় পেয়ে গেল বিকাশ। কি করে সংসার চলবে? মনে হয় কিছু একটা করে ফেলতে পারে প্রাণেশ। উল্টে বিকাশই কিছু সান্ত্বনা বাক্য শোনাল। এই কিছুদিনের মধ্যে নিশ্চয় খুলবে। ঔষধ তো লাগবে। তাহলে তার শিশি তো লাগবে। তাহলে সেই শিশি কারখানা বন্ধ হতে পারে না।
কিন্তু আমাদের বাকী মাইনে প্রভিডেন্ট ফান্ড তার কি হবে? কোন ম্যানেজমেন্ট নেই। ফোন ধরছে না। কিন্তু কিছু করার নেই। জমায়েত আন্দোলন প্রতিবাদ সরকারের কাছে সবই অন্যাহ্যা।
আবার অনেক কষ্টে বাড়ি ফিরে সাবান স্যাম্পু দিয়ে স্নান করতে করতে জয়তি বলল - পঞ্চায়েত দাদা এসেছে। তোমাকে ডাকছে।
ঠিক গন্ধ পেয়েছে। ঘরের বাইরে পা রাখতেই জয়তি বলল - বলছি একদম মাথা গরম করবে না। আমরা ছাপোষা মানুষ।
সামনে দাঁড়াতেই হঠাৎ করে কলার ধরে জয়ন্ত রায়। বলে - খুব বাড় বেড়েছে তাই না রে। ট্যাঁ ফোঁ করলে গায়েব হয়ে যাবি। তোর নাম তো প্রধানমন্ত্রী রোজগার যোজনায় তোর নাম তো দিয়েছি। তা ফেলো কড়ি কে করবে শুনি? মাত্র দুদিন। আর যদি মুখ খুলেছিস তো?
বড় বড় ভয়ের চোখ। ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ার চেয়েও নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ওই আমার দিকে আসছে। আমি আটকাতেই পারব না। বাঁচা ও বাঁচানোর সব ব্যবস্থা আছে। অথচ কিছু করা যাবে না। প্রোটেকশন নেওয়ার কথা ভাবলেই মৃত্যু। প্রোটকশনই আপনাকে মেরে দেবে।
কিন্তু ব্যাক্টেরিয়া ভাইরাসে রোগে আপনি প্রোটকশন নিলে বেঁচে যাবেন। কিন্তু এখানে এই সামাজিক ব্যবস্থায় ভয়ে কুঁকড়ে বেঁচে থাকা।
ঘরে এসে চা খেতে খেতে জয়তিকে বলল - যা পাই নিয়ে নেওয়া ভাল। আমার এই ফোকটে পাওয়া থেকে ও যদি কামাই করে করুক। ছেলেটা মানুষ করতে আমি মিথ্যার আশ্রয় নেব। জালিয়াতি করে ছেলের সামনে কি নজির রাখব।
জয়তি প্র্যাকটিক্যাল হল - জীবনকে ওভাবে ভাবলে হবে না। সব বন্ধ হলে খাব কি?
উদাস দৃষ্টিতে বিকাশ আকাশের দিকে তাকাল। ভয়ে।