রাত সাড়ে তিনটা। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। অনুভব করলাম চোখ ভিজে গেছে। খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু এমন কোনো কিছুই দেখিনি যাতে এত কষ্ট হচ্ছে আমার।

শুধু দেখলাম অস্পষ্ট এক বাচ্চা মেয়ের হাত থেকে তার মাটির পুতুলটা ভেঙে গেল। তারপর বাচ্চা মেয়েটা খুব কাঁদতে লাগলো আর কোথায় যেন চলে গেল। আমি তার পিছু নিলাম কিন্তু আর খুঁজে পেলাম না সেই মেয়েটাকে।

যাই হোক ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। হাতে ফোনটা নিয়ে নম্বরটা ডায়াল করে ফোন দিলাম। ঐ পাশ থেকে ফোন রিসিভ করেই বলে উঠল, ”হ্যাঁ, বাবা বলো।“আমি বললাম, ”মা,তুই ঠিক আছিস?” ”বাবা তুমি চিন্তা করো না আল্লাহর রহমতে আমি এখন পর্যন্ত ঠিক আছি।“ “কি বলিস তুই আমি চিন্তা করবোনা? প্রতিনিয়ত খবরে যখন দেখছি কত মানুষ মারা যাচ্ছে তখন কি আমি চিন্তা না করে থাকতে পারি। আবার শুনলাম তোর ঢাকার বাড়ি নাকি লকডাউন করা হয়েছে।“ “হ্যাঁ,বাবা। আমাদের এখানকার অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের পাশের বাড়ির একটা পরিবারের সবাই এখন আমাদের হাসপাতালের আইসোলেশনে ভর্তি আছে। আমি ওদের চিকিৎসায় নিয়োজিত আছি।“ “মা,ছেড়েদে এই ডাক্তারি। তোর কিছু হলে আমি বাঁচবো কি নিয়ে?“ “বাবা তুমি তো আমাকে কষ্ট করে এত দূর পড়াশোনা করিয়েছ। তোমার কারণেই তো আজ আমি এত বড় ডাক্তার।“ “না, মা তুই ডাক্তারি ছেড়েই দে। চাইনা আমার কোনো ভবিষ্যৎ। আগে তোকে বাঁচতে হবে তাহলে তো তুই অন্যকে বাঁচাতে পারবি।“ “বাবা এই পেশাতে শুধু আমি না,অনেকেই নিয়োজিত। সবার পরিবার তোমার মতই চিন্তিত। এখন সবাই যদি ডাক্তারি ছেড়ে দেয় তাহলে অন্যদের বাঁচাবে কে? নিজের স্বার্থের কথা আমি কখনই ভাবি না। আমি তোমাকে যতটা ভালোবাসি ঠিক ততটাই ভালোবাসি আমার দেশকে,আমার দেশের মানুষকে। তাদেরকে বাঁচাতে গিয়ে যদি আমাকে মরতে ও হয় তাতে আমি রাজি আছি।“ কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে গেলাম আর ভাবলাম সত্যিই কি আমি স্বার্থপর? আমি বললাম “মা,আমি আজ নিরুপায়। আমার হাত পা আজ এক অদৃশ্য রশিতে বাঁধা আছে।“ “বাবা,জানো আজ আমাদের হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কি যে কষ্ট হচ্ছিল আমার। তাকে দাফন করবার সময় তার মা বাবা সেখানে ছিলনা। কেন জানো? কারণ তার বাবা মা আগেই করোনাতে মারা গেছে। এর থেকে কষ্টের কথা আর কি হতে পারে।“আমি আর পারলাম না নিজেকে সামলাতে অশ্রুকণাগুলো গড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। আমি বললাম,” আচ্ছা মা অনেক রাত হয়েছে। এখন ঘুমিয়ে পড়। তোর ওপর অনেক দায়িত্ব আছে।“ এই বলে ফোনটা কেটে দিলাম।

নিরবে অশ্রু মুছতে মুছতে হার্টবিটের গতি অনুভব করতে শুরু করলাম। ঘুম আসছেই না আমার। মনে শুধু ভয় হচ্ছে আমার মেয়ের কিছু হবে না তো। না, আমার মন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।

আমার মেয়েকে ডাক্তারি করতে দেওয়া কি আমার ঠিক হচ্ছে নাকি আমি খুব স্বার্থপর যে দেশের মানুষদের এত কঠিন সময়ে আমার মেয়েকে পাশে দাঁড়াতে দিতে চাচ্ছি না। নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগলো। আমি আর কিছুই চাইনা শুধু আমার মেয়েকে চাই। না আমি শুধু আমার মেয়ে কে না ,দেশের সব মানুষকেই চাই। হে আল্লাহ তুমি কি আমাদের রহমত করবেনা? কি দোষ করেছিল সেই শিশুটা যাকে তুমি এভাবে পৃথিবী থেকে নিয়ে গেলে। সেই শিশুটা তার শেষ সময়ে তার মা বাবাকে পাশে পায়নি। এর থেকে নিষ্ঠুর ঘটনা আর কি হতে পারে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেও বুঝতে পারিনি।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো। তাড়াতাড়ি করে টিভিটা চালু করলাম। দেখলাম আজকের করোনার মৃত্যুর হার কালকের থেকে বেশি। হঠাৎ বুকের ভিতরটা ধুপ করে উঠল। এভাবে আর কত? কবে হবে এর প্রতিকার ? ৪ মাসের বেশি সময় হলো বাসা থেকে বের হইনা। অনেক দিন হলো খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে পারিনা। মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নিতে পারিনা। মুক্ত হাওয়াকে আজ বিষাক্ত মনে হয় আমার কাছে। কেমন যেন মেনে নিতে পারিনা। মেয়েকে কত মাস হলো দেখিনা। শুধু ভয় হয় এরপর আর কখনও কি পারবো আমার মেয়েকে দেখতে। ৫ বছর বয়সে যখন ওর মা মারা যায়,কখনও ওকে সেই কষ্টটা বুঝতে দেইনি। আমি আজ একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। ২ বছর হলো আমার মেয়ে ডাক্তার হয়েছে। ১ বছর হলো ভালোবেসে বিয়ে করেছে। ছেলে এক প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। আমি ওদের বিয়েতে খুব খুশি। আমার বড় চাকরী করা কোনো ছেলে প্রত্যাশিত ছিল না, শুধু বলেছিলাম মা তুই এমন কাউকে পছন্দ করে বিয়ে কর যে মন থেকে বড় হবে ,চাকরী দিয়ে নয়। তাই হয়েছে। পুরানো সৃতিগুলো চোখের সামনে ভাসতে লাগলো।

হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠল। দেখলাম আমার বোনের ছেলে রাফি ফোন দিয়েছে। ওরা ঢাকাতেই থাকে। আমি ফোন রিসিভ করে বললাম,“হ্যালো“ ঐ পাশ থেকে উত্তর এলো,“ মামা ভালো আছেন?“ “হ্যাঁ বাবা ভালো আছি। তোমরা ঠিক আছো তো?” যদিও আমি মোটেও ভাল ছিলাম না তাও ওরা যেন চিন্তা না করে তার জন্য ভালো আছি কথাটা বলতে হলো। “মামা একটা খারাপ খবর আছে।“ বুকটা আবার কেঁপে উঠল। তবুও শান্ত গলায় বললাম,“কিহয়েছে?“ “জয়িতা আপুকে আইসোলেশনে ভর্তি করা হয়েছে।“ কথাটা শোনামাত্রই হাত থেকে ফোনটা পরে ভেঙে গেল। আমার মেয়ের নাম জয়িতা। ও যেন যেকোনো বাঁধা জয় করতে পারে তার জন্য ওর মা ওর এই নাম রেখে ছিল। নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলাম। নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে। মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছে ওর কিছু হবেনা তো।

হঠাৎ মনে পড়ল কালকে রাতের সেই স্বপ্নটার কথা। ছোটবেলায় ও যখন বায়না করেছিল পুতুলের। তখন একটা মাটির পুতুল কিনে দিয়েছিলাম। ও বলত যে বাবা এই মাটির পুতুলটা হলাম আমি। ছোটবেলায় ওর যখন খুব জ্বর হয়েছিল তখন ঐ মাটির পুতুলটা ভেঙে গিয়েছিল। ও খুব কেঁদেছিল। আমি আরেকটা পুতুল কিনে দিতে চাইলে ও মানা করে দেয়। হয়ত আমার স্বপ্নের সেই অদৃশ্য মেয়েটাই ছিল আমার মেয়ে। তাহলে সেই স্বপ্নটা আমাকে কিসের ইঙ্গিত দিল। তাহলে আমি কি আর কখনো আমার মেয়েকে ফিরে পাবো না। না ওর কিছু হবে না। হে আল্লাহ তুমি এর বিচার করো। আমার মেয়ের কি অপরাধ ছিল। ও তো সবার ভালো করতেই চেয়েছিল। থামছেই না আমার চোখের পানি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। আজ সেই বৃষ্টি দেখার কোনো ইচ্ছা আমার হচ্ছে না।

আজ থেকে শুরু হচ্ছে আমার নতুন প্রতীক্ষা। নিঃস্ব, পরাজিত এই পিতার মনে আজ শুধু আমার মেয়ে ফিরে পাবার প্রত্যাশা । ক্ষমা করে দিস আজ নিরবে অশ্রু ঝরানো ছাড়া আমি তোর জন্য কিছুই করতে পারব না। আমি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর এক স্বার্থপর পিতা মাত্র।।