প্রেমের ছোঁয়া

ভালবাসি তোমায় সংখ্যা

Dipok Kumar Bhadra
মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১৬
  • ১১
  • ৩৪৩
ঈষান কলিং বেল টিপল জ্যাবিনের বাসায় গিয়ে।ক্রিং ক্রিং ক্রিং শব্দ হতে লাগল।
বাসার ভিতর থেকে রবিন চাচা বের হয়ে আসল।
“চাচা,জ্যাবিন আজ স্কুলে যাবে না?“ বলল ঈষান।
“হাঁ তো যাবে । রেডি হচ্ছে।“ বলল রবিন চাচা।
ভিতর থেকে আওয়াজ আসল,“এই তো আসছি।“ বলল জ্যাবিন।
তারপর জ্যাবিন ও ঈষান দু‘জনে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হল।
জ্যাবিন এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে। জ্যাবিনের বাবা রহমান সাহেব একজন বড় ব্যবসায়ী।তিনি তাঁর ব্যবসা নিয়েই দিন রাত ব্যস্ত থাকেন। জ্যাবিন তার বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে।জ্যাবিনের মা হঠাৎ করে গত বছর মারা গেছেন।জ্যাবিনের জন্য ওর বাবা আর বিয়ে করেন নাই।
ঈষাণ এক গরীব হিন্দু পরিবারের সৎ ছেলে।ঈষানের বাবা এক বেসরকারী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন । তিনিও মারা গেছেন। এখন ঈষানের সংসারে সে এবং তার মা ছাড়া আর কেও নাই। তাদের পরিবারের কর্মক্ষম কেও না থাকায় জীবিকা নির্বাহই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।ঈষাণ প্রাইভেট পড়ায়ে সংসার এবং পড়াশুনার খরচ চালায়।
ছোট বেলা থেকেই জ্যাবিন ও ঈষাণের মধ্যে খুব ভাব ছিল । দু‘জনে প্রায় একসাথে খেলতো, স্কুলে যেতো। নিজেদের মনের কথা এক অপরের সাথে শেয়ার করত। কালের আবর্তনে তারা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। বর্তমানে তারা নবম শ্রেণীতে পড়ে।দু‘জনেই বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী । পড়াশুনায় জ্যাবিন একটু অমনোযোগী। তবে ঈষাণ খুবই মেধাবী ছাত্র।পড়াশুনা ছাড়া কিছুই বোঝে না। প্রত্যেক ক্লাসেই সে প্রথম হতো। ঈষান খুবই নম্র,ভদ্র. বিনয়ী এবং নীতিবান ছেলে ।ক্লাসে প্রথম হওয়ার কারনে ঈষাণকে স্কুলে কোন মাসিক বেতন দেয়া লাগত না।এজন্য সে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে অসুবিধা হতো না।
অন্যদিকে জ্যাবিন একজন অহংকারী এবং উৎশৃংখল একজন মেয়ে। লেখাপড়া করতেই চায় না।বাড়ী থেকে বাবার অর্থ এনে বে-হিসাবী খরচ করে।মাঝে মাঝে ঈষাণ লেখাপড়া বিষয়ে সহযোগীতা করে।এতে জ্যাবিনের পড়াশুনার ব্যাপারে অনেক উপকার হয়।
ঈষাণের বাড়ীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় স্কুলের বেতন/প্রাইভেটের টাকা যোগারে অসমথ্য হলে জ্যাবিন তাকে আর্থিক সাহায্য করতে চাইলেও ঈষান তা নিত না। কারন ঈষাণ স্কুল শেষে প্রাইভেট পড়ায়ে যা পায় তাই দিয়ে তার নিজের পড়ার খরচসহ সংসার চালায়।
যখন ওরা দশম শ্রেণীতে পড়ে, তখন একদিন জ্যাবিন ঈষাণকে বলল, তুমি খুব ভাল। তোমার ব্যাক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করেছে।
“তাই নাকি ? “বলল ঈষাণ।
”কেন তোমাকে ভাল লাগে জোনো?” বলল জ্যাবিন।
“না তো জানিনা ?“ বলল ঈষাণ।
“থাক,পরে একদিন বলব, কেমন?“ বলল জ্যাবিন।
“আচ্ছা বলো।“ বলল ঈষাণ।
সেদিন দু‘জনে স্কুল থেকে এসে যার যার বাড়ী চলে গেল।
স্কুল গ্রীস্মের ছুটি হয়েছে। বেশ কয়েকদিন আর স্কুলে যেতে হবে না।জ্যাবিন মনে মনে ভাবছে কয়েকদিন আর ঈষাণের সাথে দেখা হবে না।কি করে যে সময় কাটবে? ঈষানের কোন মোবাইল ছিল না। কি করে ঈষাণের সাথে যোগাযোগ রাখবে?
জ্যাবিন ভাবছে, আচ্ছা এতো দিন তো ঈষাণকে এতো মনে পড়ে নাই? তবে এখন কেন এতো মনে পরে?
ঠিকমত খেতেও ইচ্ছা করে না। লেখাপড়ায়ও মন বসছে না।সব সময় ঈষাণের কথাই মনে পরছে। এতো ওর কথা মনে পড়ে কেন এখন ?কেন জানি এখন ঈষাণকে খুব, খুব বেশী ভাল লাগে আর
ওর কথা ভাবতে ভাল লাগে।একথা গুলো কি করে বলবে ঈষাণকে? ভাবছে জ্যাবিন।
চিন্তায় চিন্তায় ঠিকমত নাওয়া খাওয়াও করে না জ্যাবিন। লেখাপড়া তো দূরের কথা।
জ্যাবিনের চোখমুখের দিকে তাকালেই মনে হয় ,কি যেন সে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
জ্যাবিনের এই অবস্থা দেখে একদিন তার বাবা বললেন, কি রে মা জ্যাবিন, লেখাপড়ার খুব চাপ পড়েছে নাকি ? ঠিকমত নাওয়া খাওয়া করিস্ তো মা ?
“না বাবা, তেমন কিছু না।“ বলল জ্যাবিন।
এদিকে রাতে ঠিকমত ঘুম আসে না। শুধু মনে পড়ে, ঈষাণ এতো ভাল কেন?ও এতো গরীব কেন? ওর এতো কষ্ট কেন?এতো কষ্ট থাকা সত্বেও ও লেখাপড়ার প্রতি এতো আসক্ত কিভাবে?
ছেলেটারে কোন বাজে নেশা বা অভ্যাস নেই। মেয়েদের দেখলেই মাথা নিচু করে চলে। আবার ক্লাসে ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে। শিক্ষকরাও ওকে খুব ভালবাসে। এক কথায় সবার মুখেই ওর প্রসংশা ।ওরা গরীব,ওদের টাকা নাই তবুও।আর আমার বাবার এতো টাকা,আমার চেহারাও দ খারাপ নয়,তবুও আমার চালচলন নাকি কারো পছন্দ না।ভাবছে জ্যাবিন।
একদিন রাতে জ্যাবিন,ঈষানের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরে। ঘুমে স্বপ্নে জ্যাবিন দেখছে,
জ্যাবিন আর ঈষাণ সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গেছে। দু‘জনে হাত ধরে পানির মধ্যে ছুটাছুটি করছে। হঠাৎ জ্যাবিন, ঈষানের হাত থেকে ছুটে ঢেউ এ ভেসে যায়।জ্যাবিন একবারই চিৎকার করে বলে, ঈষান আমাকে বাঁচাও !ঈষাণ হতবম্ব হয়ে যায়,তারপর ঝাপিয়ে পড়ে সমুদ্রে মধ্যে। অনেক খুঁজাখুঁজির পর যখন জ্যাবিনকে ঈষাণ হাতের নাগালে পেল, ততোক্ষণে জ্যাবিনের জীবনাবসান হতে চলেছে।
তাড়াতাড়ি জ্যাবিনকে মাটিতে শোয়াইয়া বুকের উপর হাত রেখে চাপ দিতে লাগল ঈষাণ।অমনি মুখ দিয়ে পেটের ভিতরের পানি বের হতে লাগল । এরপর হাত ও পায়ে তালু ঘষতে ঘষতে একসময় মুখে মুখ রেখে শ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগল ঈষাণ। তারপর হঠাৎ জ্ঞান ফিরতেই জ্যাবিন ,ঈষাণকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল,তুমি আমার প্রাণ বাঁচালে?আজ তুমি না থাকলে তো আমি আর বাঁচতাম না।
ঈষাণ দু‘হাত দিয়ে, জ্যারিনকে ছাড়ানোর ব্যার্থ চেষ্টা করতে লাগল।
আজ আমি ছাড়ব না, আমি তোমায় ভালবাসি। ভালবাসি তোমায়।জ্যাবিন ঈষাণকে জড়িয়ে ধরে বলছে।
“না না এটা হয় না।আমিও তো ভালবাসি তোমায়। তবে এভাবে নয়।“ বলল ঈষাণ।
তুমি শান্ত হও। তোমায় আমি ভালবাসি। তোমার সুখ দু:খে পাশে থাকব।এর বেশী কিছু নয়। এবার ছাড়।একথা বলতে বলতে ঈষাণ একটু জোড়ে নিজেকে সরিয়ে নিতেই জ্যাবিন ছিটকে দূরে পরে গেল। অমনি জ্যাবিনের ঘুম ভেংঙ্গে গেল।
জ্যাবিন ঘুমের মধ্যে মৃত্যুর আশ্বাদের সাথে যেন ঈষানকেই অনুভব করছে।
এ কি দেখলাম। এমন কেন স্বপ্ন দেখলাম?ভাবতে লাগল জ্যাবিন।
ঘুম থেকে উঠেতে পারছে না জ্যাবিন,মাথাটা কেমন যেন ঘুরছে। জ্বর জ্বর লাগছে তার।
জ্যাবিনের মা বেঁচে না থাকায় কে তাকে দেখবে। একজন আধলা বয়োসী মহিলা সকালে এসে সারাদিন রান্নাবান্নার কাজসহ অন্যান্য কাজ করে আবার সন্ধায় চলে যায়।
“রবিন চাচা, রবিন চাচা?“ চেঁচিয়ে ডাকছে জ্যাবিন।
“আমাকে ডাকছো মা-মনি ?“ বলল রবিন চাচা।
“দ্যাখো আমার কপালে হাত দিয়ে ,জ্বর এসেছে কি-না।“বলল জ্যাবিন।
“ইস্ তাইতো? অনেক জ্বর মনে হচ্ছে ? আমি বড় সাহেবকে ডেকে আনি।“ বলল রবিন চাচা।
রবিন চাচা রহমান সাহেবকে ডেকে আনলেন। রহমান সাহেব মেয়ের অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি ড্রাইভারকে ডাক্তার ডেকে আনতে বললেন।
ডাক্তার এসে জ্যাবিনকে দেখে প্রেসস্ক্রিপশন করে দিলেন। বললেন, এই ঔষুধগুলো এনে খাওয়ান সেরে যাবে।
রহমান সাহেব ঔষুধগুলো আনিয়ে দিলেন এবং প্রেসস্ক্রিপশন দেখে ঔষুধগুলো মেয়েকে খেতে বললেন।
এদিকে আজ রহমান সাহেবের জরুরী মিটিং আছে। সেখানে না গেলেই নয়।
একথা মেয়েকে বলতেই মেয়ে বলল,“আচ্ছা তুমি যাও বাবা। আমি তো ঔষুধ খাচ্ছি, একটু পরেই কমে যাবে।“
তারপর রহমান সাহেব ব্যবসায়ী কাজে মিটিংএ অংশগ্রহনের জন্য চলে গেলেন।
জ্যাবিন নাস্তা খেয়ে ঔষুধগুলো খেলে একটু পরেই জ্বর কমে আসল।
জ্যাবিন তার ঘরে শুয়ে শুয়ে আবারো ডাকলো রবিন চাচাকে। চাচা আসলেন।
“আচ্ছা রবিন চাচা, বাগানে কি লাল গোলাপ ফুটেছে?“ বলল জ্যাবিন।
“দেখতে হবে মা-মনি।“ বললেন রবিন চাচা।
এইকথা বলে রবিন চাচা গিয়ে বাগান থেকে বেশ কয়েকটা লাল গোলাপ তুলে এনে জ্যাবিনকে দিলেন।
এবার জ্যাবিন রবিন চাচাকে বলল, চাচা আপনি একটু পাশের পাড়ার ঈষাণকে ডেকে আনতে পারবেন? একটু পড়াশনার ব্যাপারে আলাপ করব।
“থাক না মা-মনি, তোমার তো অসুখ করেছে। পড়াশুনা অসুখ সারলে না হয় করো।“বললেন রবিন চাচা।
“ না চাচা, খুব দরকার। ওকে একটু ডেকে আনুন, না?“বলল জ্যাবিন।
রবিন চাচা কি আর করবে মা মরা মেয়ে ,সব কথাই তাকে শুনতে হয়।
এদিকে শিক্ষকদের দেয়া বাড়ীতে লেখা ও পড়ার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ঈষান। ঈষাণ ভাবছে, জ্যাবিন লেখাপড়া করছে তো? অনেকদিন খোঁজ খবর পাই না।একদিন একটু দেখা করা দরকার।
এমন সময় রবিন চাচা ঈষানের বাড়ী গিয়ে হাজির।
“ মা-মনির খুব জ্বর। তবুও পড়াশুনার ব্যাপারে তোমাকে এখনি দেখা করতে বলেছে।“বললেন রবিন চাচা।
কথাটা বলেই রবিন চাচা চলে এলেন।
জ্বরের কথা শুনে ঈষাণের বুকের মধ্যে কেমন যেন ঝড় উঠল।আর দেরী না করে জ্যাবিনদের বাড়ী যায় ঈষাণ।
ঈষাণকে দেখেই কাঁদো কাঁদো কন্ঠে জ্যাবিন বললো, তুমি এসেছো ঈষান?
“হাঁ এসেছি। তোমার অসুখের কথা শুনে কি আমি থাকতে পারি?“ বলল ঈষাণ।
এক পলকে জ্যাবিন,ঈষাণের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখছে।
“কি দেখছো জ্যাবিন এক ধ্যানে?“ বলল ঈষাণ।
“কি যে দেখছি, তা বলতে পারব না। তবে তুমি এসেছো আমার অসুখ সেরে গিয়াছে।“বলল জ্যাবিন।
“তা ছুটিতে পড়াশুনা কেমন করছো ?“বলল ঈষাণ।
“রাখো তোমার পড়াশুনা? সব সময় শুধু তোমার পড়া পড়া আর পড়া।“ একটু রেগেই বলল জ্যাবিন।
“আর কি, আমরা শিক্ষার্থী তাই পড়াশুনাই আমাদের ধর্ম।লেখাপড়া না করলে তো বড় কিছু হওয়া যাবে না। তাই সর্বাগ্রে আমাদের পড়াশুনা করতে হবে।কোন কিছু টার্গেট নিয়ে লেখাপড়া করলে জীবনে সফলতা লাভ করা যায়।“ বলল ঈষাণ।
“আজ না হয় পড়াশুনার কথা থাক্ । জানো ঈষাণ গত রাতে তোমাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখেছি। তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো সমুদ্রে ডুবে যাওয়া থেকে।তারপর...................।“ বলল জ্যাবিন।
কথা থামিয়ে দিয়ে ঈষাণ বলল,“ স্বপ্ন তো স্বপ্নই। তুমি ওগুলো নিয়ে ভেবো না। লেখাপড়া করো, জীবনে মানুষের মত মানুষ হও।“
“আরে শুনোই না। আমার কথা তো শেষ হলো না। তুমি শুনতে চাচ্ছো না কেন? আমি তোমাকে যে বলতে চাই। আমার ভাল লাগছে না। তোমাকে না বলে আমি থাকতে পারছি না।“বলল জ্যাবিন।
এই কথা বলে বালিশের আড়াল থেকে লাল গোলাপগুলো ঈষাণের হাতে দিল।
ঈষাণ ফুলগুলো ইতস্তত অবস্থায় হাতে নিতে নিতে বলল, কি পাগলামি করছো জ্যাবিন?
জ্যাবিন অন্যদিকে তাকিয়ে লজ্জাবতী নারীর মত কন্ঠে বলল, ভালবাসি তোমায়,ঈষাণ।
তখন ঈষান বলল, এগুলো কি হচ্ছে জ্যাবিন? ভাললাগা,ভালবাসা তো এক জিনিষ নয়?এনিয়ে বেশী মাখামাখি করা উচিৎ নয়।তবে,ভাললাগা থেকেও ভালবাসা হয়।কিন্তু ভালবাসাটা নিস্কাম হওয়া উচিৎ। ভালবাসা দুই রকমের যেমন নি:স্বার্থ ভালবাসা আর স্বার্থে ভালবাসা।নি:স্বার্থ ভালবাসা চির অমর বা স্বর্গীয়।আর স্বার্থে ভালবাসা যেতে পারে বিয়ে পর্যায়ে বা বিরহ পর্যায়ে ।
“আমি অন্তরের অন্তরস্থল থেকে তোমাকে ভালবাসি, হতে পারে সেটা স্বার্থে ভালবাসা। তুমি কিন্তু এ ব্যাপারে না বলো না।“ বলল জ্যাবিন।
“ছি: জ্যাবিন ছি:? তুমি পড়াশুনা বাদ দিয়ে এগুলো চিন্তা করছো? আসলে এখনো জীবনের বেশীরভাগ সময়ই লেখাপড়া করতে হবে ।জীবনে মানুষের মত মানুষ হতে হবে।তাছাড়া আমিও তোমায় ভালবাসি। তোমার মা নেই। বড় লোকের মেয়ে বলে লেখাপড়াও ঠিকমত করো না। এগুলো থেকে তোমাকে বের হয়ে আসতে হবে।আমিও কিন্তু তোমায় ভালবাসি তবে নি:স্বার্থভাবে,যা পবিত্র।তুমি কেন এই বয়সে বাড়াবাড়ি করছো বুঝতে পারছি না। তোমার এই অনুভূতিকে আবেগ বলে।তাছাড়া সামাজিক ব্যাপারও কিন্তু আছে?“বলল ঈষাণ।
জ্যাবিন ঠাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঈষাণের কথাগুলো শুনছিলো।আর জ্যাবিনের চোখ দিয়ে টস্ টস্ করে পানি পড়ছিল।
“আমি তোমায় ভালবাসি এই ভেবে যে, তুমি লেখাপড়া শেষ করে বড় কিছু হবে। তারপর ভাল একটা ছেলের সাথে বিয়ে হবে। সুখে সংসার করবে,তাতেই আমার আত্মা শান্তি পাবে এবং আমার ভালবাসা সার্থক হবে।সামাজিক ব্যাপারটাও তোমার মাথায় আসল না?তুমি কি জানো না ,তেল এবং পানি কোনদিন একসংঙ্গে মিশে না?তোমার বাবার সামাজিক একটা সম্মান আছে ? সেদিকেও তুমি তাকাচ্ছো না ?এ কেমন তোমার ভালবাসা?“ বলল ঈষাণ।
“অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে জ্যাবিন।কাঁদতে কাঁদতে বলে আমি নিজেকে বুঝাতে পারছি না,ঈষাণ।“বলল জ্যাবিন।
“ভালবাসলে নিস্কাম এবং নি:স্বার্থ ভালবাসাই শ্রেয়:।তাছাড়া যে কাওকে ভাল লাগলেই ভালবাসা উচিৎ নয় । যে ভালবাসা অভিভাবকদের সম্মান ক্ষুন্ন করতে পারে,এমন ভালবাসা কারো কাম্য হওয়া উচিৎ নয়।“বলল ঈষাণ।
“এই বয়সে আমাদের কারোরই এই হিতাহিত জ্ঞান থাকার কথা নয়। তবুও আমার অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারনে ভালবাসার জীবনে যে রাত্রি চলে আসতে পারে, তা আমি বুঝতে পারি।তার কারনে আমিও তোমাকে ভালবাসি তা তোমার জীবনের মঙ্গলের জন্য । আর তোমার বাবার অঢেল ধনসম্পদ তোমাকে অন্ধ করে দিয়াছে। যার জন্য তুমি সামাজিক বা অভিভাবকের কথা না ভেবে তুমি ভালবাসার এক অবাস্তব চিন্তায় মঘ্ন রয়েছো।স্রষ্টা তোমাকে সুবুদ্ধি প্রদান করুন যার জন্য জীবনে মানুষ হতে পারবে।আমি ভালবাসি তোমায়,তুমিও ভালবাস আমায় এই কথাটি সত্য।তবে দু‘জনে দু‘জনার মঙ্গল কামনায়।“বলল ঈষাণ।
“ঠিকই বলেছো। আমরা দু‘জনা দু‘জনাকেই ভালবেশে এসেছি এবং চিরদিন ভালবাসব, যার ভিতর কোন খাদ থাকবে না।আমি তোমায় ভালবাসি আর তুমি আমাকে ভালবাস-এটা অমর হয়ে থাকবে।“বলল জ্যাবিন।
শুধু বন্ধনে জড়ালেই ভালবাসা হয় না,মন থেকে ভালবাসার উদ্ভব হয়। ধর্মীয় অনুভুতিতেও আঘাত আসবে না আবার পরিবারের মানসম্মান তথা অভিভাবকদেরও সম্মান হানি হবে না,অথচ ভালবাসা থাকবে। এটাই নি:স্বার্থ ভালবাসা। এটার কিন্তু একটা সুন্দর অনুভূতি আছে।“ বলল ঈষাণ।
ঈষাণ আর জ্যাবিন এসএসসি পাশ করে কলেজে উঠল।
দেখতে দেখতে দু‘বছর কেটে গেল। ঈষাণ ভাল ফলাফল করে ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল। রেজাল্ট ভাল হওয়ায় বৃত্তি নিয়েই লেখাপড়া করতে লাগল ঈষাণ।
এদিকে জ্যাবিনের রেজাল্ট খুব একটা ভাল না হওয়ায় ঐ কলেজেই ডিগ্রী পাশ কোর্সে ভর্তি হতে হল।অনেকদিন কেটে গেল দু‘জনের সাথে আর দেখা সাক্ষাৎ নাই।কিন্তু দু‘জনার মনেই একে অপরের স্মৃতি বিজরিত মন নিয়ে যার যার জায়গা থেকে নিজেদের জীবনের সফলতার জন্য নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে লেখাপড়া করে যাচ্ছিল।দেখা সাক্ষাৎ খুব কমই হতো তবে মোবাইলে কুশলাদি বিনিময় হতো।
জ্যাবিন বিএ পাশ করে ঢাকায় একটা প্রাইভেট কলেজে এমএ ভর্তি হল।
বেশ কিছুদিন হলো ঈষাণের সাথে জ্যাবিনের মোবাইলেও কথা হয় না। কারন ঈষাণ তার মোবাইলটা হারিয়ে ফেলেছে।নতুন একটা সিম তুলেছে যে নম্বরটি আর জ্যাবিনকে দেয় হয়নি, কারন জ্যাবিনের নম্বরও ঈষাণের কাছে ছিল না। তাছাড়া ইদানিং পড়াশুনার চাপে কোনদিকে খেয়াল করতে পারছে না ঈষাণ।
জ্যাবিনের কথা মনে পড়ছে,কিন্তু ঈষাণ ভেবে রেখেছে সামনের ছুটিতে বাড়ী গেলে জ্যাবিনের সংঙ্গে দেখা করবে এবং নতুন মোবাইল নম্বরটাও দিবে।
এদিকে অনেকদিন হয়ে গেল ঈষাণের সংঙ্গে দেখা নাই তারপর আবার মোবাইলেও কথা হয় না,মনটা ছটফট করছে জ্যাবিনের।
কিছুদিন পর জ্যাবিনের আব্বার এক বন্ধু খুব বড়লোক।ঢাকায় ওনার বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা, গার্মেন্স,কন্সস্ট্রাকশন ফার্ম এর মালিক।ওনার একমাত্র ছেলে জেসি এর সাথে জ্যাবিনের বিয়ের কথা হচ্ছে।বিষয়টি ঈষাণকে জানাতে চেয়েও জ্যাবিন জানাতে না পেরে খুবই দু:খিত।
এখন বিয়েতে অমত থাকা সত্বেও বাবার কথায় জেসিকে বিয়ে করতে বাধ্য হতে হল।
জেসির বাবা তার নিজস্ব কোম্পানির ব্যাবস্থাপনা পরিচালক।
ঐ কোম্পানীর সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে জেসিকে দায়িত্ব পালন করতে হয়।তাছাড়া ব্যবসায়িক কাজে মাঝে মাঝে জেসিকে দেশের বাইরেও যেতে হয় ।
ইঞ্জিনিয়ার সহ অনেক ধরনের লোক তাদের কোম্পানীতে কাজ করে।
এদিকে কিছুদিন আগেই কোম্পানীতে ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে ঈষাণ নিয়োগপ্রাপ্ত হন । অল্পদিনের মধ্যেই ঈষাণের চৌকষ দক্ষতা মালিকের মন জয় করেছে।
এদিকে জেসির বাবার বয়স হওয়ায় জেসিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দিয়ে নিজে সকল ব্যবসায়িক কাজ থেকে অবসর নিয়েছেন।
ঈষাণের কাজের দক্ষতা মালিক পক্ষকে মুগ্ধ করায়, তাঁকে সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। ঈষাণ অনেক পরিশ্রম আর মেধার বিকাশ ঘটিয়ে কোম্পানীর সুনাম অক্ষূন্ন রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল।
ধীরে ধরে ঈষাণের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে লাগল।চারিদিকে ঈষানের সুনাম ছড়ায়ে পড়ল।খুব সৎ এবং পরিশ্রমী ঈষাণ। অনেক মেয়ের বাবাই ঈষাণ ছেলেটিকে তাদের মেয়ের জামাই হিসাবে পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে এখন।অনেক কদর বেড়েছে ঈষাণের।
অবশেষে এক বড়লোকের এমবিএ পাশ করা মেয়ে স্মৃতির সাথে ঈষাণের বিয়ে ঠিক হয়।বিয়ের জন্য ঈষাণ অফিস থেকে সাত দিনের ছুটি নিয়েছে ।
জেসি, জ্যাবিনকে সংঙ্গে নিয়ে ঈষাণের বিয়েতে যায়।
ঈষাণ তার মালিক এমডি স্যার জেসিকে বিয়েতে আসায় স্বাগত জানায় এবং খুবই খুসি হয়।কিন্তু একটা বিষয়ে ঈষাণ অবাক হয়ে যায় এমডি স্যারের সাথে জ্যাবিনকে দেখে।ঈষাণ কি স্বপ্ন দেখছে নাকি বাস্তব? ম্যাডাম কি তার সেই পূর্ব ভালবাসার কলিজার টুকরা জ্যাবিন?না বিশ্বাস করতে পারছে না ঈষাণ।
জ্যাবিনও অবাক হয়ে যায় ঈষাণকে দেখে। যাকে সে এতোদিন বুকের মধ্যে লালন করা ভালবাসায় সিক্ত করে অন্তরে ধারণ করে আছে, এই কি তাহলে সেই ঈষাণ?
“আসুন স্যার,বসুন। ম্যাডাম বসুন।“বসবার জায়গা দেখিয়ে দিয়ে ঈষাণ ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল।
জ্যাবিনের গলা শুকিয়ে আসছে। কিছু বলতে পারছে না। একটু বলতে ইচ্ছা করছে এখনো ভালবাসি তোমায় ঈষাণ?ঈষাণও ঠিক তাই ভাবছে।
দু‘জনে চোখে চোখ রেখে কি যেন বলতে চেয়েও থেমে গেল।তারপর খাওয়া দাওয়া শেষে ঈষানের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে দেখতে গেল জেসি ও জ্যাবিন।সেখানেও এক অদ্ভুত কান্ড ঘটে গেল।
নববধূ মাথাটা একটু উঠায়েই জেসিকে দেখে মুখটি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।এদিকে জেসিও স্মৃতিকে দেখে কেমন যেন হয়ে গেল।দু‘জনের বুকের মধ্যেই যেন ঝড় উঠল।কি এমন হলো?
জেসি ও স্মৃতি একসাথেই বিদেশে এমবিএ পড়ত। তাদের মধ্যে খুব ভাব ছিল। একজন আরেকজন ছাড়া কিছুই বুঝতো না।এক কথায় তারা একে অপরকে খুব ভালবাসত।জাতিগত কারনে তাদের সম্পর্ক গড়তে একটু সমস্যা ছিল।তবুও তারা ভালবাসাকেই প্রাধান্য দিত। চিন্তা করেছিল লেখাপড়া শেষে এব্যাপারে চিন্তা করা যাবে।কিন্ত লেখাপড়া শেষ করে বিদেশ থেকে চলে আসার পর পরই দু‘জনের পিতাই কিছু ভেবে উঠার আগেই তাদের অনত্র বিয়ে ঠিক করে।
আজ শুভক্ষণে দু:খ ভারাক্রান্ত মনে অতীত স্মৃতি জেগে উঠছে,জেসি ও স্মৃতির মনে।মনের মধ্যে যে ঝড় উঠল তা আর থামবার নয়।
প্রত্যেকেই তাদের অন্তরে লালন করা ভালবাসা আজ প্রকাশ করতে না পেরে পরিবেশের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছে।শুধুই যেন বাতাসে ভেসে বেরাচ্ছে তাদের অন্তরের বাঁশীর সুর “ভালবাসি তোমায়।“
ভালবাসা বুকে ধারণ করে সবাইকে বাঁচতে হয়।প্রকৃত ভালবাসা ,জীবনের বন্ধন থেকে আসে না।জীবনের বন্ধন সুন্দর হয়, প্রকৃত ভালবাসা থেকে।
তাদের মধ্যে বন্ধন না হলেও তাদের প্রকৃত ভালবাসা প্রত্যেকের সুন্দর জীবন যাপনের কামনায় ব্যাকুল।
মনে মনে ভাবছে তারা,
“কি করে বুঝাবো আমি, তোমায় কত ভালবাসি
অন্তরদৃষ্টি দিয়ে দ্যাখো,আমি তোমারই পাশে আছি।
সারা জীবন পাবে না কাছে,তবুও আমি বলি
রেখো কিন্তু যতন করে,অতীতের স্মৃতি গুলি।
ভেবো না মোর কথা,জীবন সাথী নিয়ে করো সুখের সংসার
ভাবলে অতীতের স্মৃতি কিন্তু ব্যথ্যা পাবে বার বার।
তুমি আমায় যেমনটি ভালবাস, আমিও ভালবাসি তোমায়
এখন আর কিছু করার নাই,শুধু মনে রেখো আমায়।
আমি খুব খুসি হবো, দাম্পত্য জীবনে যদি সুখী হও
মনের মধ্যে ভালবাসা রেখো, মুখে না কিছু কও।
হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই, একথাটি সবাই মনে রাখি
জাতিভেদ ভুলে গিয়ে একটিবার ভালবাশ দেখি?
ভালবাসায় কি যে শান্তি, বুঝতে যে না পারে
আমি তোমায় ভালবাসি, এ কথাটি বলব কারে?“
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
sweet bokshi valo laglo
Dipok Kumar Bhadra গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
Yousof Jamil বিজয়ী হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন।
জামাল উদ্দিন আহমদ অনেক অনেক অভিনন্দন।
মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী অনেক অনেক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা প্রিয় কবি
বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত লেখাটির উপস্থাপনা খুব ভাল লাগল । ধন্যবাদ ।
ভালো লাগেনি ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
Dipok Kumar Bhadra ধন্যবাদ
ভালো লাগেনি ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
Prianka Bhadra very nice
ভালো লাগেনি ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
Koushik Kumar Guha মন ছুঁয়ে গেল।
ভালো লাগেনি ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
Dipok Kumar Bhadra ধন্যবাদ
ভালো লাগেনি ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

“ভালবাসি তোমায়“ কথাটি মুখে বলতে না পারলেও অন্তরে লালন করে সবাই। ভালবাসা জাতিভেদকে হার মানিয়ে দেয়।গল্পটিতে ভালবাসায় প্রেমের ছোঁয়া সকলকে বিমহিত করবে।মন ছুঁয়ে যাবে সবার ।ভালবাসা সামাজিক বিধিনিষেধ মানে না।অর্থসম্পদের কারণে ভালবাসার পরিণতি খারাপের দিকে যেতে পারে।বিষয়টি সবার খেয়াল রাখা দরকার।প্রকৃত ভালবাসা স্বর্গীয় সুখ এনে দিতে পারে।

২০ মে - ২০২০ গল্প/কবিতা: ১ টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১৬

বিচারক স্কোরঃ ২.৭৬ / ৭.০ পাঠক স্কোরঃ ১.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "মা আমার মা”
কবিতার বিষয় "মা আমার মা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ এপ্রিল,২০২১