আশার আলো

প্রত্যাশা সংখ্যা

Dipok Kumar Bhadra
  • ২৫১
জসিম মিঞা একজন গরীব কৃষক। নিজের জমি নাই,অন্যের জমি চাষ করে ।তা থেকে যা পায় তাই দিয়ে কোন রকমে সংসার চালায় । তাঁর পরিবারে স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তান ছাড়া আর কেও নাই। জসিম মিঞা তার পিতার একমাত্র সস্তান ছিলেন।তাঁর পিতা একজন বেসকারী প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক ছিলেন।পিতার আশা ছিল জসিম মিঞাকে পড়াশুনা করায়ে ডাক্তার বানাবেন। বাড়ীর অল্প জায়গা ছাড়া তাদের মাঠে কোন জমি-জমা ছিল না।
অল্প আয়ের এই শিক্ষক সব সময় তাঁর মনের মধ্যে এই প্রত্যাশা লালন করতেন । একদিন তিনি ছেলেকে ডেকে বললেন, “ভাল করে লেখাপড়া কর, তোমাকে ডাক্তার হতে হবে কিন্তু ।“
কিন্তু কপালের কি লিখন, জসিম মিঞা যখন ৫ম শ্রেণীর ছাত্র তখন হঠাৎ একদিন তাঁর বাবা স্টোক করে মারা গেলেন ।কিছুদিন পর জসিম মিঞার মা-ও মারা গেলেন।
জসিম মিঞার আর লেখাপড়া হল না। অন্যের বাড়ী বাড়ী কাজ করে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করতে লাগলেন। এভাবেই নতুন করে তার জীবনের পথ চলা শুরু হল ।ধীরে ধীরে জসিম মিঞা বড় হতে লাগলেন ।
গ্রমের এক দু:সম্পর্কীয় চাচা এক গরীব পরিবারের অশিক্ষিত মেয়ের সাথে জসিম মিয়ার বিয়ে দিলেন ।জসিম মিঞা অন্যদের কিছু জমি চাষ করে যে ফসল পেতো তাই দিয়ে কোন রকমে সংসার চালাতেন।
কিছুদিন পর জসিম মিঞার স্ত্রী এক কণ্যা সস্তান জন্ম দিলেন।জসিম মিঞা তার নাম রাখলেন”“ আশা “।তাঁর চিন্তা ছিল, পিতার সেই অপূরনীয় প্রত্যাশা মেয়ে বড় হলে তার মাধ্যমে পূরণ করবেন।কষ্ট করে মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে ডাক্তার বানানোর প্রত্যাশা তিনিও মনে মনে পোষন করতে লাগলেন ।
মেয়ে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল । ছাত্রী হিসাবে খুব একটা ভাল ছিল না । ৫ম শ্রেণী পাশ করে আশা যখন মাধ্যমিকে ভর্তি হল,তখন একদিন জসিম মিঞা মেয়েকে ডেকে বললেন, “মা তুমি ভাল করে লেখাপড়া করিও তোমাকে ডাক্তার হতে হবে “।মেয়ে বলল, বাবা “এতো টাকা পাবে কোথায় ? এখনি তো পড়ার খরচ যোগার করতে পারো না ।“ বাবা বললেন, ঐটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না ।জসিম মিঞা বললেন, “ আমার বাবা আমাকে ডাক্তার বানানোর যে চিন্তা ভাবনা করেছিলেন, তা তোমার মধ্য দিয়ে প্রতিফলন ঘটানোর দৃঢ সংকল্প করেছি ।“ মেয়ে কিছু না বলে মাথা নিচু করে চলে গেল ।মেয়েও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,সে এখন ভালভাবে লেখাপড়া করবে । ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হয়ে তার বাবার লালন করা প্রত্যাশা পূরণ করবে ।
মেয়ের চিন্তা, শুধু মনে মনে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেই হবে না,কঠোর পরিশ্রম এবং সাধনায় মাধ্যমে ভাল করে লেখাপড়া করলেই একদিন তার বাবার ডাক্তার বানানোর চিন্তা বাস্তবে রুপ নেবে ।মেয়েটি রাত জেগে জেগে লেখাপড়া করতে লাগল এবং শিক্ষকদের সহযোগীতায় প্রত্যেক ক্লাসেই ১ম স্থান অধিকার করল ।তারপর আশা বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বৃত্তি নিয়ে কৃতকার্য হল ।
এবার তার শহরের একটি ভাল কলেজে উচ্চ-মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার খুবই ইচ্ছা ।কিন্তু মেয়েকে শহরে হোস্টেলে রেখে পড়ানো মত অর্থ জসিম মিঞার ছিল না।
জসিম মিঞার ছোট বেলার এক বন্ধু শহরে এক বড় চাকুরী করে ।তার একমাত্র ছেলে রহিম সবে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি হয়েছে।
বাসায় শুধু জসিম মিঞার বন্ধু এবং তাঁর স্ত্রী থাকেন।মেয়েকে বন্ধুর বাসায় রেখে কলজে পড়ানোর কথা বললেন জসিম মিঞা।জসিম মিঞার বন্ধু আর অরাজি হলেন না।কারন বাসাতে আর কেও থাকে না ।একজন ছোটবেলার গরীব বন্ধুর মেয়ে থেকে লেখা পড়া কববে এতে আর আপত্তি কি ? অবশেষে জসিম মিঞার বন্ধুর বাসায় থেকেই কৃতিত্বের সাথে আই এস সি পাশ করল আশা ।এবার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ন হতে হবে আশাকে।
আশার বাবার প্রত্যাশা পূরনের লক্ষ্যে লেখাপড়ায় কঠোর সাধনায় ব্রত নিজের যোগ্যতায় ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তির সুযাগ পেল আশা ।এবার ভর্তি হবার পালা । পড়াশুনা করাতে অর্থের জোগান দিবে কিভাবে, এ নিয়ে জসিম মিঞা চিন্তায় অস্থির ।
মনে মনে ভাবল, জসিম মিঞার বাবার ইচ্ছা ছিল তাকেই ডাক্তারী পড়াবে , তাতো আর হয়নি, এখন মেয়েকে দিয়েই বাবার ইচ্ছা পূরণ করতে তার একমাত্র সম্বল না হয় বাড়ীর জায়গা টুকুই বিক্রি করবেন। আগে থেকেই কিছু জমানো টাকা দিয়ে আশাকে মেডিক্যালে ভর্তি করে দিলেন, জসিম মিঞা।
মেয়ে হোষ্টেলে থেকে লেখাপড়া করছে। একদিন শহরে গিয়ে জসিম মিঞা তাঁর অসুবিধার কথা বন্ধুকে সব খুলে বললেন।বন্ধু শুনে বললেন, “ বাড়ীটুকুই তোমার সম্বল, বিক্রি করে থাকবে কোথায় ?“ ওর থেকে বাড়ীটা বন্ধকী রেখে টাকা নিয়ে মেয়েকে পড়াও।মেয়ে পাশ করে চাকুরী করে শোধ করে দিবে।এভাবে কি কেও নিবে ? বললেন জসিম মিঞা।
শহরের বন্ধু বললেন, “ কেও তোমাকে ভালবাসলে তোমার এই প্রত্যাশা পূরনের কথা শুনলেই দলিল রেখে বন্ধকী বাবদ টাকা দিতে পারে ।কেও কি নিবে এভাবে ?
তখন শহরের বন্ধু বললেন, “যদি কিছু মনে না কর তাহলে, আমিও নিতে পারি ।“ এরপর বন্ধু বললেন, দলিলটা নিয়ে আসবে,তবে মেয়ের পড়ার খরচ বাবদ মাসে মাসে টাকা দিব ।তাতে মেয়ের মেডিক্যাল পড়া শেষ করতে টাকা যত লাগবে দিব ।মেয়ে পাশ করার পর চাকুরী করে ধীরে ধীরে শোধ করে দিলেই হবে ।এতে মেয়ের লেখাপড়াও হবে। তদপুরি তোমার, তোমার বাবার এবং তোমার মেয়ের সারা জীবনের সাধ পূরণ হবে ।
তারপর একদিন জসিম মিঞা তাঁর বাড়ীর দলিলটা নিয়ে গিয়ে উক্ত শর্ত গুলো একটা কাগজে লিখে দলিলসহ বন্ধুর কাছে রেখে এলেন ।
তারপর থেকে জসিম মিঞার বন্ধুর টাকায় মেয়ে মেডিক্যাল পড়া শেষ করল ।
ইতোমধ্যেই বন্ধুর ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করে একটা চাকুরীও পেল ।
অবশেষে আশা ডাক্তারী পড়া শেষ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে চাকুরি পেল । জসিম মিঞা তাদের প্রত্যাশা পূরণে খুবই খুসি ।
একদিন জসিম মিঞা মেয়ের প্রথম মাসের বেতন নিয়ে মেয়ের লেখাপড়ার খরচের টাকা পরিশোধ করার জন্য শহরে বন্ধুর বাড়ী গেলেন ।এভাবে পরিশোধ করতে অন্তত ২/৩ বছর লাগবে । তারপর তার বন্ধকী রাখা দলিলটা ফেরৎ আনবে ।
শহরের বন্ধু আগে থেকেই তার স্ত্রীর সাথে আলাপ করে ডাক্তার আশার সাথে তাদের ইঞ্জিনিয়ার ছেলের বিয়ের কথা ভেবে রেখেছিল ।
জসিম মিঞাকে বন্ধু বললেন, মেয়ের প্রথম মাসের বেতনের টাকা দিয়ে তোমরা ধুমধাম কর । আর তোমাদের গ্রামে একদিন আমরা বেড়াতে যাব ।শুনে জসিম মিঞা খুব খুসি হল ; বলল,তা কবে আসছো ? বন্ধু বললেন,“আগামী শুক্রবার যাব । “
পরের শুক্রবার বন্ধু তাঁর স্ত্রী এবং ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে নিয়ে জমির দলিলসহ গ্রামে জসিম মিঞার বাড়ীতে গেলেন । জসিম মিঞা বন্ধু দম্পতিকে খুবই আপ্যায়ন করলেন ।ডাক্তার মেয়ে আশাও ঐদিন বাড়ীতে এসেছিল ্
খাওয়া-দাওয়া শেষে সবাই গাছ তলায় বসে গল্প করছিলেন ।
শহরের বন্ধু জসিম মিঞাকে বললেন, “ তোমার বাবার ইচ্ছা ছিল তোমাকে ডাক্তার বানাবে কিন্তু তিনি তা না পারায় তুমি তার প্রত্যাশা পূরনের লক্ষ্যে মেয়েকে ডাক্তারী পড়ায়ে তোমার বাবার সেই আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়েছো ।তেমনি আমার বাবারও ইচ্ছা ছিল আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াবে এবং একজন ডাক্তার মেয়ের সাথে বিয়ে দিবে ।কিন্তু তিনি তা করে যেতে পারেন নি । তাই আমিও আমার বাবার প্রত্যাশা পূরনের লক্ষ্যে ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াইয়াছি এবং সে এখন চাকুরীও করছে।এখন একজন ডাক্তার মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে পারলেই আমার মনের আশা পূর্ন হবে ।তাই বলছি, তোমার মেয়েকে তো আমি জানি, যদি মেয়েটিকে আমার ঘরে দাও , তাহলে আমার মৃত বাবার আত্না শান্তি পাবে যে, তার ছেলেকে দিয়ে আশা অপূর্ন থাকলেও নাতি ও নাতবৌ দ্বারা আশা পূর্ন হয়েছে।“
একথা শুনে জসিম মিঞা খুসিতে আত্মহারা । জসিম মিঞা বললেন , “আমাদের কোন আপত্তি নাই।“
শহরের বন্ধু জসিম মিঞার বাড়ীর দলিলটা বের করে, তার হতে দিলেন এবং বললেন মেয়ের ডাক্তারী পড়ানোর টাকা আর ফেরৎ দিতে হবে না ।এবার তোমার মেয়েকে আমাদের হাতে তুলে দাও, বললেন শহরের বন্ধু ।
তারপর একদিন ধুমধাম করে জসিম মিঞার মেয়ের সাথে তার বন্ধুর ছেলের বিয়ে হলো ।
সবারই সরাজীবনের লালন করা প্রত্যাশা পূরন হল ।
সৎচিন্তা, একাগ্রচিত্ত এবং দৃঢমনোবল থাকলে কারো প্রত্যাশাই অপূর্ন থাকে না । আশার অন্তরালেই থাকে সেই কাঙ্খিত প্রত্যাশা,যা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত হয় ।।
তাং ০২/০৭/২০২০ ইং

মানুষের প্রত্যাশা পূরনের অন্তরালে থাকে কঠোর পরিশ্রম ,সাধনা আর দৃঢ় মনোবল, যা এই গল্পটিতে প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে ।গল্পটিতে বিভিন্ন চরিত্রে একাগ্রচিত্তে সবাই ভবিষ্যত পরিকল্পনারে মাধ্যমে আশা নিয়ে কাজ করায় সবারই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে । মনের মধ্যে লালন করা আশা নিয়ে সঠিক এবং দৃঢ় মনোবল নিয়ে কাজ করলে কারো প্রত্যাশায় অপূর্ণ্ থাকে না । এটাই গল্পটির প্রতিপাদ্য বিষয় ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী শুভ্রোজ্জল শ্বেত নির্মল ও স্বচ্ছ কলমের ছোঁয়া
Dipok Kumar Bhadra ধন্যবাদ ।
ভালো লাগেনি ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

২০ মে - ২০২০ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

বিজ্ঞপ্তি

“নভেম্বর ২০২১” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ নভেম্বর, ২০২১ থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।

প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী