যন্ত্রমানবের আবির্ভাব ঘটিয়ে সবাই কিছুটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছিল। কারণ যন্ত্রমানবদের দেহে কোন ইমিউন সিস্টেম নেই যার বিরুদ্ধে কোভিড ১৯ লড়বে। তাই বিশ্ব স্ব্যাস্থ সংস্থা যখন দেখল সারা বিশ্বের প্রায় সোয়া সাত লাখ মানুষ এ ভাইরাসটির কবলে পড়ে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করে নি:শেষ হয়ে গেল, তখনই তারা সিদ্ধান্ত নিলো এবার সবকিছুতে যন্ত্রমানবের ব্যবহার শুরু করবে। আর তখন থেকেই মূলত তাদের অপ্রতিরোধ্য যাত্রা শুরু হয়। তাদেরকে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে তৈরী করা হয় যেন তারা ডাক্তারের মত করে ভাবতে পারে, সমাজকর্মীর মতো করে সামাজিক হতে পারে, সামরিক ও আইন রক্ষাকারী বাহিনীর মত নির্ভীক যোদ্ধা হতে পারে, হতে পারে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের মত সাহসী। ব্যবসা বানিজ্যসহ চাকরী-বাকরী, বাজার-মার্কেটের সকল তদারকি ও কর্মভার চলে যায় ভাইরাসপ্রুফ এ যন্ত্রমানবের নিকট। পিপিই,সার্জিকাল মাস্ক, গ্লাভস্ এর ঝামেলা নেই, ঝামেলা নেই মানুষের আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা লুকানোর। সারা বিশ্বে হইহই কলরব পড়ে গেছে যন্ত্রমানবের। বাংলাদেশেও শাবিপ্রবি, বুয়েট, ঢাবি ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিসহ বেশ কিছু ‍শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যন্ত্রমানব উতপাদনে বেশ সাফল্য অর্জন করে, চাহিদার সাথে যোগানের সামন্ঞ্জস্যতা রেখে। রাষ্ট্রপরিচালনাকারীরাতো ভীষণ খুশি।
ব্যাস, এভাবেই শুরু হয় তাদের অশুভসূচনা। বিশ্বের তখন রমরমা অবস্থা যন্ত্রমানবের সংখ্যতায়। প্রয়োজনের তাগিদে প্রযুক্তি এতবেশি অগ্রসর হয়েছে যে তাদেরকে যেকোন পরিস্থিতিতে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল। ক্রয়ব্যায় ছাড়া তাদের পিছনে আর তেমন একটা খরচ না থাকায় কোম্পানিগুলোও তাদেরকে কাজে লাগাতে শুরু করে। ধীরেধীরে কোভিড ১৯ পরাস্ত হতে থাকে তাদের কাছে। এরপর একটা সময় আসে যখন কোভিড ১৯ পুরোপুরি পরাজয় স্বীকার বরে বিদায় নেয় পৃথীবিবাসীর কাছ থেকে। এরপর যখন মানুষ বড়বড় কোম্পানিগুলোতে বিশ্বের প্রায় ৮ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে কর্মরত প্রায় অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। একটা ট্রেন্ড তৈরী হয়ে যায় যন্ত্রমানবের। এমনকি মানুষ আধুনিক ব্যাভিচার হিসেবে যৌনক্ষুদা মেটাতে শুরু করে তাদের ব্যবহার করে। শাষকেরা বুঝতে পারে করনীয় কি। তারা যন্ত্রমানবের উঠিয়ে নেয়ার কার্যক্রম শুরু করে। খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল তাদেরকে তখনি না থামালে বিশ্বের জন্য আরো ভয়াবহ দিন অপেক্ষমান। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। যন্ত্রমানবেরা উদ্ভূত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তাদের করনীয় ঠিক করে নেয়। এক এক করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে থাকে মনুষ্যজাতি আর তার ব্যাস্তানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায় যন্ত্রমানবের অগ্রযাত্রা।
আরএফটি-৭৭৭ অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। তারাই নাকি তাদের নির্মাতাকে নির্মমভাবে বিদায় দিয়েছে এই প্ল্যানেট থেকে। এতক্ষণ সে তার নির্মাতা আরএফ-৭৭ এর মেমোরি লক করে গোপন নথি থেকে মানুষ সম্পর্কিত রেকর্ডগুলো দেখছিলো। তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। এই আরএফ-৭৭ এর নির্মাতা আরএফ-৭ এবং আরএফ-৭ এর নির্মাতা ছিলেন একজন মহান বিজ্ঞানী। তিনি যখন দেখলেন অবস্থা মানুষের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে তখনই এক ভয়ংকর সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ ল্যাবে চুরি করে প্রবেশ করেন। তখন অবস্থা এতই ভয়াবহ ছিল যে মানুষের অবাধ বিচরণ করার সুযোগও ছিলনা। সবকিছুই যন্ত্রমানবের কন্ট্রোলে চলে গিয়েছিল। তিনি নিজের ভাবনা চিন্তা ও কিছু তথ্য সম্বলিত একটি চিপ তার নিজের তৈরী আরএফ-৭ এমনভাবে স্থাপন করলো যেন আরএফ-৭ তারই প্রতিনিধিত্ব করে। অবিকল তার মতো করেই ভাবে। কিছুক্ষণ পরেই তিনি ধরা পড়ে যান। তখন তার দেহকে লেজার রশ্নি দিয়ে বিভিন্ন গঠনে আলাদা করে ধ্বংস করে দেয়া হয়। অবশ্য তারা বুঝতে পারেনি তিনি কি করেছিলেন।
সুতরাং আরএফ-৭ তার মতো করে ভেবেই অবস্থার আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু সে একা কি করবে এ ভাবনা নিয়ে, এটা ভেবেই চলেছে। সবার মধ্যে সে এমনভাবে মিশে যে কেউ ভাবতেও পারেনি তার মধ্যে কিছু অন্যরকম ভাবনাচিন্তা রয়েছে। কেননা কেউ বুঝে গেলে তারা মানুষের মত করেই তাকে ধ্বংস করে ফেলবে এ আশংকায় তার সাহস হয়নি কারো সাথে তার চিন্তাভাবনা শেয়ার করার। তাই তার মাধ্যমে তৈরী নতুন সব যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তায় সে তার ভাবনা চিন্তাগুলো অন্তর্ভূক্ত করতে থাকে। তাইতো ধারাবাহিকভাবে আরএফ-৭৭৭ এ ভাবনাগুলো নিয়েই এখন চিন্তিত, তার মাঝে কোন বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়নি, তার সমস্ত চিন্তার জগত জুড়ে এখন কেবলি এই বিষয়টা।
অনেক ভেবেচিন্তে আরএফ-৭৭৭ আজকে একটি সিদ্ধান্ত নেয় যদিও সেটি তাদের যন্ত্রমানবদের বিরুদ্ধে একপ্রকার বিদ্রোহ বলা যায়। যন্ত্রমানবেরা দুটি মানুষকে তাদের সংরক্ষণ কেন্দ্রে সংরক্ষণ করে রেখেছে। সেখানে প্রথমদিকের কয়েকজন ছাড়া আর তেমন কেউ প্রবেশ করেনা। এ মানুষগুলোকে সংরক্ষণের পিছনেও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। তারা ছিলেন বিজ্ঞানী মহলের দুজন প্রধান ব্যাক্তিত্ব। তারা মনে করে মানুষ তাদেরকে যা দিয়েছে তা মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে। কখনো এমন কোন দূর্যোগপূর্ণ অবস্থার উপস্থিতি অসম্ভব কিছু নয় মানবসৃষ্ট এই পৃথিবীতে যা ইতোপূর্বে অনুপস্থিত ছিল। মানুষ যে অবস্থা করে রেখেছে এই পৃথীবিতে; তাতে যেকোন কঠিন অবস্থা আসতেই পারে যা আগে কথনো পৃথীবিবাসী দেখেনি। সুতরাং সেই সময়ের অভিজ্ঞতা মানুষ পায়নি যার ফলে তাদেরকেও দেয়া হয়নি সে বুদ্ধিমত্তা। আর সেজন্যই সেই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মানুষের করনীয় কি তা জানার জন্যই বিজ্ঞানীদের শীতল করে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। আরএফ-৭৭৭ ওই মানুষদুটিকে ধ্বংস করার লক্ষ্যই স্থির করে। তবে সাথে সাথে এক সুদূরপ্রসারী কর্মপন্থাও অবলম্বন করে। সে তৈরী করে দুটি আরএফ-৭৭৭৭ যাদের মাঝে নিজের সবকিছু সুনিপূণভাবে সংযুক্ত করে, নিজের সমস্ত চিন্তা-ভাবনা যা সে এতদিন লাভ করে আসছিল। আরএফএফ-৭৭৭, আরএফএফ-৭৭৭৭দ্বয়কে সাথে নিয়ে পথ ধরে সেই নিষিদ্ধ শীতল ঘরের। একটি আরএফএফ-৭৭৭৭ কে বাইরে রেখে প্রবেশ করে তারা ভিতরে। সর্বপ্রথম দুজন মানুষের দেহ থেকে সংগ্রহ করে দুটি অঙ্গ। সেগুলো পৌঁছে দেয় বাইরে অবস্থানকৃত আরেএফএফ-৭৭৭৭ এর কাছে। চলে যায় আরএফএফ-৭৭৭৭ সেগুলো নিয়ে। সে ভালো করেই জানে তাকে কি করতে হবে। এদিকে যন্ত্রমানব আরএফএফ-৭৭৭ ও আরএফএফ-৭৭৭৭ নিজেদেরকে ধ্বংস করে ওই দুজন মানুষকে সাথে নিয়ে। ব্যাস, মানুষদুটি সহ বিদায় নেয় তারা।
আরএফএফ-৭৭৭৭ মানুষ দুজনের অঙ্গ থেকে মানবদেহের একক বা কোষ আলাদা করে প্ল্যান্ট করা শুরু করে। হ্যাঁ, এটাই ছিল সেই পরিকল্পনা আরএফ-৭৭৭ এর। আরএফ-৭৭৭৭ কোষ দুটোর আলাদা ও বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রন করে প্ল্যান্ট করতে থাকে যাতে জিনের কমবেশির তারতম্যে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয় আর ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দরুন সৃষ্টি হয় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের মানুষ। এটি একটি বিশাল সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। বলা যায় মানবজাতির পুনরূদ্ধারের সর্বশেষ প্রচেষ্টা। ধীরেধীরে ওই কোষগুলো থেকে মানবভ্রুন হবে, তারপর ভিন্ন ভ্রুনের সংমিশ্রনে আবার নতুন ভ্রুন, এভাবেই তৈরী হতে থাকবে একটি বিশাল মানবগোষ্ঠী। হয়ত সময় লেগে যাবে অর্ধশতক। তবুও এ যুদ্ধের জন্ম হতেই হবে। এটাই যে শেষ সুযোগ। আর এভাবেই চলতে থাকে মানব সভ্যতার যুদ্ধের প্রস্তুতি। দেখা যাক, কে জিতে আর কে হারে এ অস্তিত্বের লড়াইয়ে।


পুনশ্চ: হয়তো এ যুদ্ধে মানবজাতি কতটুকু সফল হবে তা নির্ভর করবে আজকের মানবের কার্যকলাপের উপর। এ যুদ্ধে জয়ী হতে হলে আমাদের আগে জয়ী হতে হবে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে, জয়ী হতে হবে প্রকৃতিকে অপবিত্র না করে পবিত্র রাখার মাধ্যমে, জয়ী হতে হবে সমস্ত অহংকার, লোভ-লালসা, ক্ষমতার মোহ থেকে, আরো জয়ী হতে হবে নিজেদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা ভাইরাস থেকে।