আসাদ সাহেব আজকে অসময়ে বাড়ি এসেই অকারণে চিতকার চেঁচামেচি করে যাচ্ছেন। ফেরার সময় তিনি এক ভিক্ষুকের সাথে রাগারাগি করে আসলেন। পিত্তথলিতে তিনটা পাথর হওয়ার কাহীনি শুনার পর ৫ টাকার একটা ছেঁড়া নোট বের করে দিলেন। ভিক্ষুক ডাক দিয়ে বলল, স্যার, আপনোর টেকা আপনেই লইয়া যান। এই টেকা আমি নিমুনা। মেজাজ গেল চরমে উঠে। হাত থেকে টাকাটা নিয়ে ছিঁড়ে ফেলে দিলেন রাস্তায়। আসাদ সাহেবের রাগটা কিন্তু অন্য জাগায়। কিছুদিন হল স্কুলে এক নতুন মাস্টার জয়েন করেছে। বেটাছেলে এসেই প্রাইভেট টিউশন শুরু করে দিলো! বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা ছেলে। এখনো কোথাও চাকরী হয়নি। তাই গ্রামে আসার পর তার এক চাচা যিনি ওই স্কুলের একজন ম্যানেজিং ডিরেক্টর বললেন অযথা এদিক সেদিক ঘুরে সময় নষ্ট না করে গ্রামের একমাত্র মাধ্যমিক স্কুলটাতে জয়েন করলেই পারে। চাকরী হলে না হয় সেদিকে যাওয়া যাবে। প্রস্তাবটা মন্দ লাগেনি ফরহাদের। কিছুদিনের মধ্যেই অতিথি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে দূরত্ব খুব কম হওয়ায় কিছু নতুন পদ্ধতিতে পড়ানো শুরু করে। তার বন্ধুসুলভ আচরণ ও পড়ানোর নতুনত্ব দেখে গ্রামের ছাত্ররা ভাবতেই পারেনি ‍শিক্ষক এমন হতে পারে। তারা সবাই দলেদলে ফরহাদের কাছে পড়ার জন্য ছুটে যেতে থাকে।
সবকিছু ঠিকাছে, কিন্তু সমস্যা এক জাগায় আর তা হল ছেলেটা বেছেবেছে আসাদ সাহেবের পড়ানোর বিষয়গুলোই পড়ায়। এতে তারই বা দোষ কি! সে এ বিষয়গুলোতেই পারদর্শী। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে তা মোটেই ভালো হবেনা আসাদ সাহেবের জন্য। কারণ গ্রামের স্কুলের বেতন দিয়ে কোনভাবেই চলেনা আজকের দিনে। প্রাইভেট পড়ানোর উপরই অনেকটা নির্ভর করতে হয়। আজকে ক্লাসের পূর্বে প্রাইভেট পড়াতে গিয়ে দেখেন প্রায় অর্ধেক পরিমান ছাত্র অনুপস্থিত। কারণ জানতে চেয়ে জানলেন তারা ফরহাদ স্যারের কাছে পড়বে। রাগে গজগজ করতে লাগলেন তিনি। ইদানীং তিনি আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন। বয়স বাড়ার সাথেসাথে তার প্রতি ছাত্রদের অনুভূতি ও সম্পর্ক ব্যাস্তানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন আর আগেরমত পড়াতে পারছেননা। এদিকে যখনি তিনি কোন কারনে বেশ চিন্তিত হন, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় তখনি তার প্রেশার অনেকখানি বেড়ে যায়। অল্পতেই হাঁপাতে থাকেন। শিক্ষক মিলনায়তন রুমে বসার পর ফরহাদ বলল, স্যার আপনাকে বেশ অসুস্থ মনে হচ্চে। আপনি বরং বাসায় চলে যান আমি আপনার ক্লাস নিয়ে নিবো। আসাদ সাহেব আরো ফুঁসতে থাকেন। তিনি যেতে রাজী নন, তাও ফরহাদ তার ক্লাস নিবে! কিন্ত সবার জোরাজুরিতে অগত্য রাজী হতে হল। প্রধান শিক্ষক অবশ্য বলেই রেখেছেন উনি চাইলে স্কুলে না ‍আসলেই পারেন। আর এক বছর পরেই উনার অবসর। তাই অসুস্থ শরীরে এত ধকল না নিয়ে মাঝেমধ্যে এসে দুএকটা ক্লাস নিলেই চলবে। কিন্তু তিনি রাজী হননি। তিনি চান পরিশ্রম করেই পারিশ্রমিক নিতে।
বাড়িতে এসে দুই মেয়ে এক ছেলেকে বকাঝকা করে রাগ কমানোর জন্য শুয়ে পড়লেন। এরপর ভাবতে লাগলেন কি হবে অনাগত দিনগুলোতে! ফরহাদের ওপর কেনইবা তিনি রেগে গেলেন! তার পড়ায়তো ছাত্ররা আনন্দ পায়। তারা পড়ালেখায় আরো ভালো করবে। বরং সে স্কুলটাতে এসে সবার উপকারই করলো। কিন্তু তার কি হবে? দিনদিন তো সবদিক থেকেই অবনতি হচ্ছে। বড় মেয়েটার বিয়ে, সংসারের খরচ, আরো দুই সন্তানের পড়ালেখা। এদিকে ছোটভাই মারা যাওয়ায় তার সংসারে কিছু দেয়া লাগে, এক খালাতো ভাই কিছুদিন আগে রোড এক্সিডেন্টে ডান পাঁ হারিয়ে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছে। বিবেক তার দিক থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারছেনা............বাবা, তোমার চা। ভাবনার গভীরে হারিয়ে গিয়ে মেয়ের কথায় ফিরে আসলো বাস্তবতায়। দুধচা খাওয়া সেই কবেই ছেড়ে দিয়েছেন। দুপুরে রান্নার সময় জাহাঙ্গীরদের বাড়ি থেকে বাতাসে ভেসে আসতে লাগলো গোশতের ঘ্রাণ। আসাদ সাহেব চিন্তা করতে লাগলেন শেষ কবে তিনি গোশতো কিনে বাড়িতে আনলেন। মাস চারেক আগে খালাতো ভাইকে দেখতে গেলে তার বাচ্চারা মায়ের কাছে গোশতের জন্য বায়না ধরলে তিনি বাজার থেকে নিয়ে আসেন। ভালো ভালো অনেক খাবার তিনি ছেলেমেয়েকে খাওয়াতে পারেননা যা অন্যের বাড়িতে যেতে নিয়ে যান।
হঠাত জাহাঙ্গীরের কথা মনে পড়ে গেলো। ছোটবেলায় জাহাঙ্গীরের ভাইয়েরা তার পড়াশুনার ভার নিতে অস্বীকৃতি জানালে আসাদ সাহেব তাকে নিজ খরচে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ায়। আজ তার মস্ত পাকা বাড়ী। শহরে নাকি দামী চাকুরী করে। সময়ের অতীতের সাথে সাথে কয়েকজন অসাদ সাহেব কিছু শিক্ষিত মানুষের জীবন থেকে অতীত হয়ে যাওয়া খুব অসাধারণ কিছু নয়। হঠাত বাতাসের ঝাপটায় গোশতের ঘ্রানটা তীব্রভাবে নাকে এসে বিধলো। ছেলেমেয়েদের জানি কতটুকু মনে পড়ছে গোশতের কথা ভাবতে ভাবতে ঠিক করলেন কালকে এক কেজি গোশত কিনে আনবেন।
রওনা হলেন বাজারে। একটা ছেলেকে দৌড়ে আসতে দেখে তাকিয়ে রইলেন। -কিরে বাসার, কই যাস এমন পাগল হইয়া?
স্যার, আমি আপনের খোঁজেই যাইতেছিলাম। আমার মায়ের আইজ সাত দিন থেইকা খুউব জ্বর। ডাক্তারসাব ৫০০ টেকার ঔষুধ দিলো। এগুলা খাওয়াতেই অইবো। স্যার, আমি অনেক কষ্টে ৩০০ টেকা জোগাইলাম। শেষ ভরসায় আপনার কাছে আইলাম।
আসাদ সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেটের ৪৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা তার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, মায়ের খেয়াল রাখবি। যা, ঔষুধ কিনে নিয়ে আয়‘। ছেলেটি একটি হাঁসি দিয়ে বলল,‘আস-সালামু‘আলাইকুম স্যার‘। বলেই বাজারের দিকে দিলো দৌড়।
আসাদ সাহেব আদা কেজি গোশত নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। গোশত রান্না হচ্ছে, ঘ্রাণ ভুরুভুরু করে নাকে ঢুকছে আর তিনি ভাবছেন আদা কেজি গোশতের বিনিময়ে তিনি একটি ছেলের তার মায়ের প্রতি ভালোবাসা কিনলেন যদিও কসাইয়ের কাছে আদাকেজি গোশত কেনার অজুহাতে একটি মিথ্যে বলতে হল।
সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যাদের অন্তরটা অন্যের জন্য খুব করে কাঁদে। কিন্তু সাহায্য করার মত সম্পদ বিধাতা তাদের দেননি। আবার অনেক সম্পদশালী আছে যাদের হৃদয়টা মোহরে ঢেকে অন্ধকার হয়ে আছে।
খাবার সময় কিন্তু বললেন,‘সাদাতের মা, আমাকে কেবল একটুখানি ঝোল দিও। ডাক্তার আমায় গোশত খাইতে নিষেধ করেছে, ওদেরকে দাও‘।
পাতে যখন মাছের টুকরো আসে তখন বলেন, ‘আজকাল মাছের স্বাদ-ই পাওয়া যায়না। ফরমালিনে সব ভরপুর। দেশটার যে কি হবে সামনে! নে, ধর, তোরা কেউ খেয়ে ফেল। মাছের এমন কটু গন্ধ আমার সহ্য হয়না।‘
মাঝরাতে যখন মাঝেমাঝে ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন আসাদ সাহেবরা ভাবতে থাকেন কি করে নিজের খরচটা আরেকটু কমানো যায়। নিজের খরচতো কমে কিন্তু এতে মিথ্যে বলা কমেনা। বাবাদের অনেক মিথ্যে বলতে হয়। আল্লাহ হয়তো এই মিথ্যেগুলা মাফ করে দিবেন। সবার কথা ভাবতে ভাবতে হঠাত একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে নিচে পড়ার আগেই মুছে ফেলে বলেন,“বাবাদের কাঁদা বারণ“।
পরের সপ্তাহে একটা চিঠি আসে আসাদ সাহেবের কাছে। তিনি খাম
ছিঁড়ে দেখেন কিছু টাকও সাথে। চিঠিটা খুললেন-

শ্রদ্ধেয় স্যার,
আমি আপনার একজন দূর-পরিচিত মানুষ। আপনার সম্পর্কে আমি অনেক কিছুই জানি। কথা না বাড়িয়ে আাপনাকে একটি অনুরোধ করবো। আমার এ ক্ষুদ্র উপহারটুকু আপনি গ্রহণ করলে আমি আশাতীত খুশি হব। প্রতি মাসেই আপনার নামে একটি চিঠি আসবে। দয়া করে আপনি এড়িয়ে যাবেননা। তবে আমি, আপনার এক শুভাকাঙ্খি, খুব করে কষ্ট পাবো।
শুভাকাঙ্খী।

আসাদ সাহেবের চিঠি পড়ে কেন জানি মনে হল এ চিঠির প্রেরক ফরহাদ। তিনি দাঁড়িয়ে ভাবছেন এটি গ্রহন করবেন কি করবেননা। পরিশ্রম ব্যতীত কোন উপহার কি পারিশ্রমিক হয়, তিনি ভাবতে থাকলেন। তিনি ভাবতে থাকলেন স্বার্থের টানে কত প্রিয়জন অচেনা হয়, আবার ভালোবাসার বন্ধনে কত অচেনা চিরচেনা হয়!!!