এমবিএ শেষ সেমিষ্টারে এসে পড়ার চাপ, ভালো গ্রেডের টেনশন, ভবিষ্যত পরিকল্পনা সব মিলিয়ে রিতিমত হিমশিম খাচ্ছি। এরমধ্যে আবার বন্ধুদের সাথে মজা করতে করতে ঢাকায় অবস্থিত এক আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরীর বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন পত্র জমা দেই। আমাকে হতবাক করে দিয়ে ইন্টারভিউর জন্য আমন্ত্রণপত্র চলে আসে। কয়েকদফা পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের পর চাকরীটা আমি পেয়েও যাই। জীবনে প্রথম চাকরী, আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে জয়েন করলাম।

কয়েক মাস পরের কথা, অফিসে একদিন আমার বস বললেন, আজ ওনার জরুরী একটা মিটিং আছে এক ভদ্রলোকের সাথে। ওই ভদ্রলোক ইতিমধ্যে এ্রসে পরেছন এবং রিসেপশনে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু ঠিক তখনই বসকে জরুরী বিদেশী একটা ভিডিও কল এটেন্ড করতে হবে। যেহেতু ভদ্রলোকের সাথে পূর্ব নির্ধারিত এপয়েন্টমেন্ট ছিল, বস তাই আমাকে দায়িত্ব দিলেন উনাকে রিসেপশন থেকে বোর্ড রুমে নিয়ে বসাতে। সাথে অনুরোধ করলেন বস না আসা পর্যন্ত আমি যেন ভদ্রলোককের সাথে কথা বলতে থাকি। কেমন ভদ্রলোক, কি কথা বলবো না বলবো ভাবতে ভাবতে আমি রিসেপশনে গেলাম। অবাক হয়ে গিয়ে দেখি অসম্ভব স্মার্ট এক ভদ্রলোক বসে আছেন। শ্যাম বর্ণের লম্বা সুঠামদেহী মাথা ভর্ত্তি কাঁচাপাকা চুলের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। ভদ্রলোকের বয়স হবে আনুমানিক ৬০ বছর। দৃষ্টিকাড়া মায়াময় অসম্ভব সুন্দর দুটি চোখ। পরনে ইংলিশ টাইপের একটা ব্লেজার সাথে মানানসই একটা চামড়ার অফিস ব্যাগ।

আমি গিয়ে আমার পরিচয় বলে ওনাকে নিয়ে বোর্ড রুমে বসালাম। চা কফি কিছু খাবেন কিনা জানতে চাইলাম। ভদ্রলোক তখন প্রথম কথা বললেন. শুধু বললেন, প্লেইন ব্ল্যাক কফি, প্লিজ। মূহুর্তের জন্য আমি থমকে গেলাম। মানুষ এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে। অসম্ভব গম্ভীর এবং সুন্দর গলার স্বর। আমি রিসেপশনে কফির অর্ডার দিয়ে ফিরে এসে ভদ্রলোককে বললাম যে আমার বস এখুনি এসে পড়বেন। হঠাৎ একটা জরুরী কল আসাতে একটু দেরী হচ্ছে। উনি আসা পৰ্যন্ত আমি আছি। স্মিত হেসে উনি ধন্যবাদ দিলেন। এরমধ্যে কফি এসে গেল। তারপর কোন কিছু না ভেবেই আমি হেসে বলে বসলাম, ''আপনার গলার স্বর অসম্ভব সুন্দর। সম্পূর্ন আলাদা। আপনার মতো গলার স্বর আছে এমন কারো সাথে আমার আগে কখনো পরিচয় হয়নি। আপনি বুঝতে পারছেন আপনার গলার স্বর অনেকটা ড্র্যাগের মতো। আপনার কথা শুনলে যে কেউ মাদকের মত নেশাগ্রস্থ হয়ে পরবে’’!

ভদ্রলোক আবারও খুব মেপে অল্প হাসলেন. তারপর বললেন, ''ইয়াং লেডি, তোমার নাম কি বললে’’?
আামি বললাম,’’ নীলাঞ্জনা রহমান, আমাকে আপনি নীল বলে ডাকতে পারেন’’।
উনি বললেন, “তোমাকে তুমি করেই বলি, কিছু মনে করো না আবার। আচ্ছা নীল, তোমার বয়স কতো''?
আমি হেসে বললাম, '' জ্বি, কোন অসুবিধা নাই, আমাকে তুমি বলতে পারেন। আর আমি কিছুদিন আগে ২৩ এ পা দিয়েছি''.
উনি বললেন, ‘’তুমি আমার ছোট মেয়েরও ছোট! আমার তিন ছেলেমেয়ে, পিঠাপির্ঠি. ছোটটার বয়স ২৩’’।

আমি প্রশ্ন চোখে নিয়ে তাকালাম ভদ্রলোকের দিকে। উনি পুনরায় স্মিত হেসে বললেন, '' আমার বয়স যদি এখন ৩০ হতো তবে তোমার কাছে এমন প্রশংসা শুনে আমি হয়তো তোমার প্রেমে পড়ে যেতাম। কিন্তু আমার বয়স ৬৫ এবং ভাবনার জগতও ভিন্ন’’।
আামি বললাম,’’ আমরা এখনও কিন্তু ভালো বন্ধু হতে পারি। তাই নয় কি? অবশ্য আপনার যদি কোন সমস্যা না থাকে এখানে’’।
ভদ্রলোক উত্তরে বললেন, ‘’সমস্যা আছে. প্রথমেই কেন আমি তোমার বয়স জানতে চাইলাম, জানো’’?
আমি, '' নাহ! কেন বলুনতো ''?

ভদ্রলোক উত্তরে বললেন, ‘’আমার যখন তোমার মতো বয়স ছিলো, আমিও তখন তোমার মতই ছিলাম। আমার স্ত্রীকে জীবনে যখন প্রথমবার দেখি, তখনই তাকে সরাসরি বলেছিলাম যে তাকে আমার খুব পছন্দ। যদি কোন আপত্তি না থাকে তবে তাকে আমি বিয়ে করতে চাই। ঠিক তোমার মতই যা ভালো লাগতো তা সরাসরি বলে ফেলতাম! এটা দোষের কিছুনা। এটা অসম্ভব ভালো একটা গুণ যা সবার থাকে না’’।
আামি একটু লজ্জিত হলাম, বললাম, ‘’ধন্যবাদ’’! আমি কি খুব বেশী কিছু বলে ফেলেছি? তাহলে আমি দুঃখিত’’।

ভদ্রলোক উত্তরে বললেন, ‘’না, না, তুমি এতটুকুও বেশী কিছু করোনি, দুঃখিত কেন বলছো? ওই যে তুমি বললে না, আমরা এখনও ভালো বন্ধু হতে পারি, সেটাই ভাবছি’’!
আামি বললাম, ‘’আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে জীবনে প্রথমবার দেখেই তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে থাকতে পারেন এবং সেটা সর্ঠিক মনে করেন তাহলে আমার ভুলটা কোথায় হলো’’? আমিতো আপনার গলার স্বরের প্রশংসা করেছি মাত্র’’!

ভদ্রলোক উত্তরে বললেন, ‘’ তোমার কোন ভুল নেই। আসলে ভুলটা হয়েছে আমার। আমিই তোমাকে বলেছি, আমার বয়স যদি এখন ৩০ হতো তবে হয়তো তোমাকে আমার বন্ধু হবার কথা বলতাম। আমি পারলে আনন্দচিত্তে তোমার বন্ধু হয়ে যেতাম। কিন্তু সেটা আসলে সম্ভব নয়। আমি আবারো দুঃখিত তোমাকে বন্ধুত্বের কথা বলে সাথে সাথে আবার অপারগতা জানানোর জন্য। কিছু মনে করো না তুমি। আচ্ছা, তুমি কখনও ইউরোপে গিয়েছো?
আামি মাথা নেড়ে বললাম, না।

উনি বললেন, ‘’কখনও ইউরোপে গেলে ট্রেনে করে যদি এক শহর থেকে আরেক শহরে যাত্ত তবে ট্রেনে বসে দেখবে একটু পর পরই বাইরে সারি সারি পাইন ট্রি। কিছু কিছু গাছ অনেক পুরানো এবং বয়স্ক, অনেকটা আমার মতো! বছরের পর বছর গাছ গুলো একই যায়গায় দাড়িয়ে আছে। জায়গা বদল করে বা সামান্য একটু নড়ে পাশের গাছটাকে বা উপরের অসম্ভব সুন্দর নীল আকাশটাকে ছোঁয়ার অধিকারও তাদের নেই। আমিও ঠিক তেমনি একজন। তোমাকে বন্ধু হিসাবে পেলে আমি নিঃসন্দেহে খুশী হতাম। কিন্তু আমাদের সমাজ, পরিবার এটা ভালো চোখে দেখবে না। ওরা কখনোই বুঝবে না যে একজন ৬৫ বছরের বুড়োও তোমার মতো একজন ২৩ বছরের বুদ্ধিমান এবং স্মার্ট মেয়ের ভালো বন্ধু হতে পারে। আমাদের চারপাশের কঠিন কঠিন সব নিয়ম কানুনের জন্য নিজের অজান্তেই আমরা প্রতেকেই এক একটা পাইন ট্রিতে পরিনত হই।

ঠিক তখনই আমার বস এসে ঢুকলেন বোর্ড রুমে। আমি উঠে দাড়ালাম। ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম দরজার দিকে। ভদ্রলোক উঠে এসে আমার সাথে তার বিদায়ী করমর্দন করলেন। মায়া ভরা দৃষ্টি দিয়ে আমার দু’চোখের দিকে তাকিয়ে একটু স্মিত হেসে বললেন, ‘’ভালো থেকো নীল!’