নিরব নিস্তব্ধ নিসর্গ । একে তো শীতের রাত তাতে আবার কুয়াশার ঘন আচ্ছাদন । যেন ঝিঝি ঝিমিনিরাও ঘুমিয়ে গেছে ।কোন সাড়া শব্দ নেই ।গাছের পাতার কাঁপুনিও শুনতে পাওয়ার কথা নয় । কেননা জানালায় লাগানো আছে থাই কাচ ।তবুও কেন যেন হঠাৎ মিনুর ঘুম ভেঙ্গে যায় ।
প্রথমে সে মনে করে সকাল হয়েছে। একটু পরেই দিনের আলো ফুটবে । আবার শুরু হবে রোবটের মত কাজ টানা। কিন্তু না অনেক ক্ষণ হয়ে গেল সকাল হচ্ছে না ।দেয়াল ঘড়িটা যদিও বা তার মাথার উপরে টাঙ্গানো আছে ঠান্ডার ভয়ে মাথা বের করে দেখার ইচ্ছা হচ্ছে না ।
পাশেই শুয়ে আছে সাত বছর বয়সের তিন্নি । তিন্নি অঘোরে ঘুমাচ্ছে । মিনু ওকে একটু কাছে টেনে লেপ্টা ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করে নেয় । মনে মনে বলে ওর জন্যই তো এখানে আসা ।এই যে নরম বালিশ নরম বিছানা বাড়িতে থাকলে পেতাম না । যার মা নেই তার আর কী থাকতে পারে !
মিনু গ্রামের মেয়ে । যখন ওর বয়স দুই কি তিন তখন ওর মায়ের সাথে বাবার,কি নিয়ে যে মত বিরোধ ঘটে তখন থেকে তার দাদীর কাছে থাকা ।মা থাকে নানার বাড়িতে । বাবা পরে বিয়ে করেছে । যুগ হিসাবে সৎ মা মেরিনা অনেকটাই ভালো ।
মিনুর বয়স এখন এগারো বারো বছর । যখন সে ক্লাস থ্রিতে পড়ত তখন তার এক দূর সম্পর্কীয় চাচা তার বাচ্চাকে দেখাশোনার জন্য অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে ঢাকায় এনেছে । যদিও বা মা নেই দাদী তাকে দিতে প্রথমে রাজি হয়নি । অনেক বলে কয়ে দাদীকে তারা রাজি করিয়েছিল ।
লোক হিসাবে চাচা মানিক মিয়া মন্দ নন । তিনি মিনুর যথেষ্ট কদর করেন । স্ত্রী সালমাও তাই ।
এসব ভাবতে ভাবতে এক সময় তার বাড়ির কথা মনে পড়ে । কেমন আছে তার দাদী ! কত বড় হয়েছে তার সৎ বোনটি । সৎ হলেও তো বোন । মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয় বটে । কিন্তু ফোনের কথা - ভালো থাকলেও ভালো না থাকলেও ভালো বলে।
শীতের রাতের এই একটি সুবিধা । রাত বড়- যথেষ্ট ঘুম হয় , আবার কিছু ভাববারও সময় পাওয়া যায় ।
এসব ভাবতে ভাবতে মিনু এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে ।
সকাল হলে তিন্নির মা সালমা তাকে দরজায় ডেকে দিয়ে যান । মিনু প্রতিদিনের মত সালমা কে কাজে সাহায্য করল এবং যথা সময়ে সে তিন্নি কে নিয়ে স্কুলের পথে রওয়ানা হলো ।
আজ পথের মোড়ে ভাপা পিঠার দোকান বসেছে। দোকানের চারদিকে অনেক লোকজন কেউ চেয়ারে বসে, কেউ বা বেঞ্চে বসে ভাপা পিঠা খাচ্ছে ।
তিন্নি- আপু , আপু- দেখ ও গুলো কি বানাচ্ছে ।
মিনু – ওগুলো কে ভাপা পিঠা বলে ।
তিন্নি – ভাপা পিঠা কি দিয়ে বানায় ?
মিনু – চাউলের গুঁড়ো , কোরা নারকেল আর খেজুরের গুড় দিয়ে বানায় ।
তিন্নি – আপু ও গুলো খেতে কেমন লাগে ?
মিনু – খুব মজা লাগে ! দেখছ না মানুষ কেমন খাচ্ছে ।
তিন্নি – আপু , আমিও খাব ।
ওরা দুজনে পিঠাওয়ালার দিকে এগিয়ে যায় । মিনু বলে একটি পিঠার দাম কত ?
পিঠা ওয়ালা – বিশ টাকা ।
মিনু মনে মনে ভাবে ঢাকা শহরের এই একটায় দোষ । এখানে সব পাওয়া যায় কিন্তু দাম অনেক।
মিনু বলল - এর চেয়েতো ঢের ভাল আমার দাদীর হাতের পিঠা । আমরা কত খাই ; পড়শিদের বাড়িতে দিই , ওরাও আবার আমাদের বাড়িতে দেয় । আর কিনা এত ছোট ছোট পিঠার দাম বিশ টাকা ।
সে তিন্নির হাত ধরে চলে যাচ্ছিল কিন্তু তিন্নি নাছড় বান্দা । সে জিদ ধরে বসল সে পিঠা নিবেই ।
মিনু পিঠা কিনতে বাধ্য হলো । সে বেঞ্চে তিন্নিকে বসিয়ে দিয়ে পিঠা কিনল । তিন্নি মজা করে পিঠা খাচ্ছে । সে তিন্নির পিঠার সামান্য অংশ ভেঙ্গে মুখে দিল ।অল্প খাওয়ায় মনে হলো সে অনেক গূলো পিঠা খেতে পারবে । ক্ষুদার্থ বাঘ যেমন শিকারীর খোজ করতে থাকে তেমনি যেন মিনুর মনটা পিঠার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল । কিন্তু উপায় তো নেই , চাচি তাকে হিসাবের টাকা দিয়েছেন । মনে মনে ভাবে বাসায় গিয়ে দাদিবাড়িতে যাওয়ার কথা চাচা চাচি কে বলব ।
তিন্নি বাসায় ফিরে ভাপা পিঠার নাম ভুলে গিয়ে মাকে বলল – আম্মু ,আম্মু জান ! , আমি আজ পাপা পিঠা খেয়েছি ।
সালমা –ওকে কি খাইয়েছিস রে মিনু ?
মিনু – ও আজ ভাপা পিঠা খেয়েছে ।
এই নিয়ে ওদের মাঝে উচ্ছ্বাস হাসাহাসি চলছিল। সালমা মেয়েকে শিখিয়ে দিলেন পাপা পিঠা নয় ভাপা পিঠা ।
তিন্নি – আচ্ছা মা , ও গুলো কি বাসায় বানানো যায় না ?
মা – বানানো যায় ! কিন্তু আতপ চাউলের গুড়ো পাব কোথায় ? তাছাড়া আরো অনেক কিছূ লাগে ।
তিন্নি - আপু বলেছে ওর দাদী নাকি আরো সুন্দর করে পিঠা বানাতে পারে । চল না মা ওর দাদীর বাড়িতে যাই ।
সালমা – আরে পাগল , ওখানে তো তোরও দাদীর বাড়ি ।
তিন্নি – ও কি মজা ! আমার দাদী পিঠা বানাতে পারে ?
সালমা – হ্যাঁ গ্রামের সবাই বানাতে পারে । শীতের সময় গ্রামে পিঠা পুলি খাওয়ার ধুম পড়ে যায় ।
তিন্নি - আমি যাব, আমি যাব । দাদী বাড়ি যাব ।
দুই
মিনু , তিন্নি, সালমা ও মানিক সাহেব গ্রামের বাড়িতে চলেছেন । বরাবরই তিনি রাতের টিকেট কিনেন । কিন্তু ইচ্ছে করেই আজ দিনের গাড়ির টিকেট কিনেছেন ।শীতের রাতে কুয়াশায় রোড এক্সিডেন্ট হতে পারে তাই । এতে দেশের রুপ দেখার মিনুর একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছে ।
মিনু এক সময় দেখল অনেক গুলো পাখি- যা সে ইতিপূর্বে দেখি নি । চাচিকে বলল –চাচি , এগুলো আবার কী পাখি ?
চাচি- এগুলো অতিথি পাখি ।শীত প্রধান দেশ থেকে এরা এসেছে ।
মিনু – ভারি সুন্দর তো ! সে তিন্নি কে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় ।
চাচা চাচি দুজনে বাসের সিটে মাথা লাগিয়ে ঘুমিয়ে গেছেন । এক সময় তিন্নিও ঘুমিয়ে পড়ে। মিনু দেখে সবজি বোঝাই বোঝাই গাড়ি । সে মনে মনে ভাবে এখন শীত কাল , গ্রামে এখন নানা সবজি হয়েছে । উঃ গেলে টাটকা সবজ়ি খেতে পাব ।
তারা দুপুরের পর পর গ্রামে ঢুকল । গ্রামটা যেন আর আগের মত নেই । রাস্তা পাকা হয়েছে , ঘরে ঘরে বিদ্যুত বাতি ।ওরা মনে মনে খুব খুশি হলো ।
মানিক সাহেব প্রথমে নিজের বাসায় ঢুকলেন । ফোনে আগে থেকেই বলা ছিল । তার ভাইয়ের বৌয়েরা সুন্দর করে বাড়িঘর লেপেছে। বিছানায় নক্সি কাথা পাতা ।
বারান্দায় কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার । বহুদূর জার্নি করে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে । পাশে ব্যাগ রেখে বসে পড়ল ।
মানিক সাহেব অনেকগুলো কমলা ও মাল্টা এনেছেন । বাড়ির সবাই দাঁত দিয়ে ছিলে ছিলে খেতে শুরু করেছে । তিনি বললেন – এগুলো আমাদের দেশেই চাষ হচ্ছে ।
তার ভাবী আলেয়া শুনে অবাক হয়ে বললেন –তাই নাকি? আমি তাহলে আগনায় দুটি কমলা আর মাল্টার গাছ লাগাব ।
সে মিনু কে বলল- বস ।
মিনু - বসব না , দাদীর কাছে যাব ।
সালমা মিনুকে কিছু কমলা দিল। সে কমলা নিয়ে দাদীর কাছে এল । দাদী ওকে পেয়ে মহা খুশি।
উঠানে সিদ্ধ ধান ছড়ানো রয়েছে । ছোট বোন শাপলা ধানের উপর খেলছে । মিনু দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকল- আসো । শাপলা মাথা নিচু করে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করছে । যখন মিনু নিজে উঠে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল আর জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে হাতে দিল শাপলার লজ্জা ভাংল । সে অনেকটা সহজ হলো ।
মিনু বলল , দাদী , আব্বু কই ?
দাদী – তোর আব্বু ধান কাটতে গেছে । আসার সময় হলো , এখনি আসবে । আয় ভাত খেতে আয় । কখন বা কি খেয়েছিস।
মিনু ভাত খেতে বসে অনেক গুলো ভাত খেল । বলল –দাদী, এগুলো কী মাছ ? খুব স্বাদ ।
দাদী – তোর আব্বা কাল বিলে ধরেছিল । আমি তোর জন্য রেখে দিয়েছিলাম ।
মিনু ভাত খেয়ে উঠে হাত মুছতে মুছতেই আব্বু বিরাট ধানের বোঝা মাথায় নিয়ে উঠানে এল । ধানের বোঝা রেখে বাবা হাঁপাচ্ছেন । বাবার মুখে চোখে হাসির ঝিলিক ।
বাবা-মিনু কখন আসলি মা !
মিনু- এই তো একটু আগে । ভাল আছ আব্বু ?
বাবা – হ্যা মা, আল্লাহ রাখছেন ।
মিনু – আব্বু , এগুলো কি ধান ?
আব্বা – জিরাধান , পোলাও করে না! ওগুলো ।
মিনুর মুখে শুদ্ধভাষা আর তার পোষাক পরিচ্ছেদ দেখে বাড়ির সকলেই নিশ্চিন্ত যে মিনু ভালো আছে ।
মিনু ছোট বোনের হাত ধরে বাড়ীর বাইরে এল। দেখে গ্রামে আমন ধান কাটার ধুম পড়েছে । কৃষকদের চেহারা দেখে তার মায়া লাগল । সবারই মলিন কাপড় চোপড়। সারা শরীরের চামড়ায় চিরচিরে ফাটা ফাটা দাগ । পায়ের গোড়ালী গুলো বেশি ফাটা । কথা বলতেও যেন তাদের ঠোটে টান পড়ছে । তবুও তারা প্রাণ খুলে হাসছে । পাকা ধানের সাথে যেন সে হাসির মিল রয়েছে ।
তার দামি কাপড় চোপড় আর পরিপাটি চেহারার দিকে ওরা তাকিয়ে আছে । মিনু কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে যখন কথা বলে প্রথমে যেন ওরা চিন্তেই পারে না । পরে দু চারটি কথা বলার পরে চিনতে পেরে হেসে উঠে বলে – ও তুই মালেকের বেটি মিনু ! তো কখন আলি ? পোথথমে তো তোক চিন্তেই পারিনি !
তিন
পরদিন সকাল বেলায় মিনুর ঘুম ভাংল দাদীর ডাকে । উঠানের চুলার পাশটায় সবাই গোল হয়ে বসে খেজুরের গুড় দিয়ে ভাপা পিঠা খাচ্ছে । মিনুর ছোট মা পিঠা বানাচ্ছে । মিনু মুখ ধুয়ে এসে পিঠা খেতে বসল ।পিঠা খেতে খেতে সে তিন্নির ভাপা পিঠাকে পাপা পিঠা বলার গল্পটা বলল । সবাই উচ্ছ্বাস হাসিতে ফেটে পড়ল ।
পিঠা খাওয়ার পর সে ছোট বোন শাপলার হাত ধরে বেরিয়ে এল । দূর থেকে দেখা যাচ্ছে একটা লোক কাধে করে দু দিকে দু টি কলসির মত কী নিয়ে আসছে । মিনু সহজেই বুঝতে পারল ওটা খেজুরের রস ওয়ালা । রস ওয়ালার হাঁক শুনে দাদী বাড়ী থেকে বেরিয়ে এল এবং ওদের ঘড়া টাতে এক ঘড়া রস নিল । কিছু রস ওরা খেল আর কিছু রস দিয়ে পায়েস রান্নার জন্য মা চুলায় বসালেন ।
মিনু শাপলার হাত ধরে গ্রামের মধ্যকার রাস্তাটা দিয়ে হাঁটছিল । দু দিকে রয়েছে বাড়ি । এই ক বছরে বাড়িগুলোও যেন বদলে গেছে । মাটি ও টিনের ঘর ভেঙ্গে ইটের বাড়ি তৈরি করছে ।কয়েকটি ইতি মধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে । ওর বাবাও রাতে বলেছে এবারের ধান ও বড় গরুটা বিক্রি করে ইট কিনবে । এবার যখন সে আসবে ইটের বাড়ি দেখবে , কী মজাটাই না হবে!
মিনু আরো দেখল ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা মুড়ির মোয়া আর জিলাপি হাতে খেতে খেতে মক্তব যাচ্ছে। সে বুঝতে পারল নিশ্চয়ই ওদিকে মোয়া জিলাপি ওয়ালা এসেছে । ও দাঁড়িয়ে থাকল , একটু পরেই মোয়া জিলাপি ওয়ালা এল । ওর দাদী ওকে জিলাপি মোয়া নিয়ে দিল ।
মিনু ও শাপলা মোয়া খেতে খেতে গ্রামের ও পাশে স্কুল টার দিকে যাচ্ছিল । সে লক্ষ্য করল যে গ্রামে আর আগের মত অভাব নেই । সকলের গায়ে মোটা মোটা শীতের কাপড় । দু একজন দামি জ্যাকেটও পরেছে । এখন আর কেউ আগুন জ্বালেনা – যাক একটা দূর্ঘটনা থেকে তো বাঁচা গেল !
ঘুরতে ঘুরতে সে এক সময় তাদের ক্ষেতের দিকে গেল । গ্রামে বিদ্যুত আসার ফলে সেচ ব্যাবস্থার উন্নতি হয়েছে । মাঠ জুড়ে সবজির সমারোহ । সে তাদের জমি থেকে কয়েকটি বেগুন , পাতা সহ পেয়াজ আর ধনিয়া পাতা তুলল । ইচ্ছা বেগুন পুড়ে ভরতা বানাবে আর ধনিয়া পাতার চাটনি । ওহ! কি মজাটাই না হবে!
দাদী আর মা উঠানে কুলা দিয়ে ধান ঝাড়ছে ।রান্নাঘরে মিনু বেগুন গুলো পোড়ার চেষ্টা করছে । দাদী হাঁক ছেড়ে বলল - কী করছিস মিনু , বেগুন পোড়াবী ?
মিনু – হ্যাঁ ভত্তা বানাবো ।
মিনুর মা গিয়ে বলল - সর দেখি পুড়ে দেই ।
মিনু সরে দাঁড়াল । মা বলল ঢাকায় বেগুনের ভত্তা খেতে পাস ?
মিনু – ওখানে কি চুলা আছে ?
মা- তাহলে তোরা কিশে রান্না করিস ?
মিনু – বিদ্যুতে না হয় গ্যাসে ।
মা –খুব সুখ তো , ছাই নাই মাটি নাই কত সুখ! শাপলা আরেকটু বড় হলে ওকেও নিয়ে যাস তো !
মিনু – ওহ যে কষ্ট !
মা- কী কষ্ট রে ?
মিনু – আলো বাতাস কিচ্ছু দেখতে পাওয়া যায়না । সারাদিন শব্দ ।
ধনে পাতার চাটনি আর পোড়া বেগুনের ভর্তা দিয়ে ওরা দু বোন বারান্দার ঢেঁকিতে বসে ভাত খাচ্ছে । খাওয়া শেষের দিকে, মিনু হাত চাটছে । এমন সময় গোয়াল ঘরে একটি মুরগি পক—পক—পকাস করে উঠল । মিনু দৌড়ে গিয়ে একটি ডিম তুলল ।
দাদী বলল- ডিম টা দে বুবু ।এক্মুঠ সরিষার ফুল তুলে নিয়ে আয় যা । ডিম টা দিয়ে বড়া তুলে দেব , তুই খাস।
মিনু সরিষা ফুল তুলতে গিয়ে এতটাই বিমোহিত হল যে মোবাইলে অনেকগুলো ছবি তুলল ।
বাড়িতে ফেরার পথে দেখল গ্রামের অনেক ছেলে মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে । কেউ হাইস্কুলে কেউ প্রাইমারীতে । ওদের গ্রামের স্কুলটা সরকারি হয়েছে । শুনে সে খুব খুশি হলো ।
দুপুরের একটু আগে এক বিরাট বিজ্ঞাপন নিয়ে এসেছে ভাঙ্গাচুরা দিয়ে জলপাই বদল ওয়ালা । সে নাকি বাংলার মাটিবাদে সব কিছু নিবে । মিনু ও শাপলা কয়েকটি ভাঙ্গাচুরাও শিশিবোতল দিয়ে জল্পাই নিল । নুনুনের ছিটা দিয়ে জলপাই ! আহা কী স্বাদ !
দুপুরে দাদী বলল – গোসল করে নে বুবু। কল চাপতে পারবি । না হয় তোর ছোট চাচার বাড়িতে যা , ওরা ট্যাপ বসিয়েছে ।
মিনু – আমাদের কেন ট্যাপ বসাও নি ?
দাদী – বসাব , বসাব , এবার ধান বিক্রি করে বসাব ।
বিকালে দাদী ও মা দুজন মিলে একটি লাল কাপড়ের কাঁথা পাতছে । দাদী বলল – এটা তোর জন্য পাতছি বুবু । এটা তুই নিয়ে যাইয়া যখন সুযোগ পাবি সেলাই করিস । তোর তো মা নেই ! কে দিবে তোকে ? আমি আর ক দিন ?
মিনু একটু ভারি হয়ে বলল – দাদী আমার মা নেই কেন ?
দাদী – কি শুনবি বোন , দুক্ষের কথা ! তোর মা ছিল খুব ভাল , কাজে কামেও পাকা । তোর দু বছর পরে তোর দুটি জমজ বোন হয়েছিল । তোর বাপের যে কী মনে হলে বৌটাকে আর আনলই না । কত কহিনু শুনলই না ।তোর মাও আর নিজে থেকে এল না, ও রকমই থাকল ।
মিনু মাটির নিচে তাকিয়ে একটা কাঁঠি দিয়ে আঁচড় কাটছিল। সে বুঝতে পারে বাবা অশিক্ষিতের জন্য এ কাজ টি করেছে । মেয়ে হওয়ার জন্য বাবা মাকে আনেনি । কেমন আছে তার মা ! তাকে দেখার ভারি ইচ্ছে হচ্ছে তার । এক সময় বলল দাদী আমি আর ঢাকায় যাব না , স্কুলে ভর্তি হব ।
দাদী – তোর ইচ্ছা , স্কুলে ভর্তি হলে হবি ।সে টা ভালো কথা ।
রাতে মানিক সাহেব মিনুকে বলতে এলেন , রেডি হয়ে থাকিস মিনু , খুব সকালেই রওয়ানা দেব ।
দাদী- কি করব বাপু , ও তো আর ঢাকায় যেতে চায় না , বলছে স্কুলে ভর্তি হবে ।
মানিক সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন । একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন - বেড়াতে এসে তোর মন কেন বদলিল রে । ঢাকায় তো ভালই ছিলি ।আর যখন স্কুলে ভর্তি হবি হ আমি ও না হয় তিন্নি আর ওর মাকে রেখে যাই । গ্রামে এখন রাস্তা ঘাট হয়েছে , স্কুল হয়েছে , বিদ্যুত এসেছে , -আর তো কোন সমস্যা দেখছি না ।
চার
পরদিন সকাল বেলায় মানিক সাহেব ভ্যানে উঠলেন । পাশে দাঁড়িয়ে রইল মিনু, তিন্নি , তিন্নির মা ও আরো অনেকেই । তিনি মিনুকে একটি নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন - ভালো করে লেখা পড়া করিস ।
বেলা দশটার দিকে তিন্নি , তিন্নির মা ও মিনু গ্রামের স্কুল টাতে গিয়ে উপস্থিত হলো । খুব সুন্দর মনোরম পরিবেশ । বিল্ডিংটাও বেশ বড় ও মজবুত । শিক্ষকদেরকেও যেন ভাল লাগছে ওদের। তারা প্রধান শিক্ষকের কাছে গেল ।
সালমা - আসসালামু আলাইকুম স্যার ।
স্যার – ওয়ালাইকুম সালাম ।
সালমা – স্যার , আমাকে চিনতে পারছেন ? আমি সালমা , মানিকের স্ত্রী ।
স্যার- ও, হ্যাঁ -হ্যাঁ - চিনতে পেরেছি । তোমরা নাকি ------
সালমা - জি স্যার আমরা ঢাকায় থাকতাম ।
স্যার- তা কি সমাচার , বল।
সালমা – এই বাচ্চা দুটাকে আপনার স্কুলে ভর্তি করতে চাই ।
মিনুর দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন – এটা মালেকের মেয়ে না !
সালমা – জি স্যার , ও আমার সাথে ঢাকায় থাকত । বেড়াতে এসে আর যেতে চাচ্ছে না । বলছে স্কুলে ভর্তি হব । আমিও বলছি আর শহরে গিয়ে কী করি ! এখানে তো প্রাইমারী স্কুল হাই স্কুল সবই হয়েছে । তা ছাড়াও রাস্তা, বিদ্যুত সবই তো হয়েছে । এখন তো আর কোনো সমস্যা নাই ।
স্যার- হ্যাঁ আল্লাহ দিয়েছেন আমাদের গ্রামে এখন সব কিছুই হয়েছে । হাসিনার সরকার তো সর্বসাধারণ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে । এই দেখ না স্কুল গুলোতে হান্ড্রেট পার্সেন্ট উপবৃত্তি দিচ্ছে ।আবার ধরো প্রতিটি গ্রামে স্কুল হলো ।
এসব বলতে বলতে তিনি ছাত্র ভর্তি খাতায় সালমার স্বাক্ষর নিচ্ছেন । সালমার হাতের লেখা দেখে তিনি বললেন - কত দূর লেখাপড়া করেছ ? লেখা তো সুন্দর ।
সালমা – স্যার ডিগ্রিতে ভর্তি হয়ে আর পড়িনি ।
স্যার- আমাদের করিম স্যার তো এক বছরের জন্য ট্রেনিং এ যাচ্ছেন । তো তুমি যদি আমাদের স্কুলে পড়াতে তাহলে তো ভালই হতো । তোমাকে মাসে কিছু বেতন ভাতা দিতাম । তোমার সময়টাও কাটত আবার লেখা পড়াটারও চর্চা থাকত।
সালমা খুশি হয়ে বলল – তাহলে তো স্যার ভালই হত। আমার বাচ্চাকেও দেখাশোনা করতে পারতাম ।
স্যার ওদের কে বই দিলেন । মিনু বইগুলো উল্টে পাল্টে দেখছে । বইয়ের শেষ কভারে শেখ হাসিনার ছবি আছে ও “ শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ শেখ হাসিনার বাংলাদেশ “ এই স্লোগানটি লেখা আছে। মিনু মনে মনে ভাবল-মেয়ে মানুষ দেশ চালাচ্ছেন আর কিনা মেয়ে হয়েছে বলে আব্বু মাকে আনেনি ।
স্যার কে ধন্যবাদ জানিয়ে ওরা বই নিয়ে খুশি মনে রওয়ানা দিল ।
স্কুলের গেটে রয়েছে একটি প্রকান্ড আম গাছ। ঝর ঝর করে কয়েকটা পাতা ওদের মাথায় পড়ল। উপর দিকে তাকিয়ে দেখল আম গাছটার পাতা পড়ছে ও কচিপাতা দেখা দিচ্ছে ও মুকুল এসেছে ।
ওরা স্কুল গেইট থেকে বেরিয়ে এক পরিচিত বৃদ্ধকে দেখতে পেল। বুড়ো লাঠিতে ভর দিয়ে চলছে। গায়ের পোষাকের ভরে যেন উলটে পড়ার উপক্রম ।সোয়েটার গুলো অতিশয় নোংরা ও ঢিলেঢালা । পরিবার নেই বললেই চলে ।তার প্রথম স্ত্রী মারা গেছে দ্বিতীয় স্ত্রী ধার ধারে না । একটিমাত্র মেয়ে আছে সে স্বামীর বাড়িতে থাকে । বাবাকে তার বাড়ি নিয়ে যেতে চাইলে বাবা বলে বাড়িতে না থাকলে সব ভূতালন্ডি ওয়ে যাবে । তার সম্পদ বলতে দুচালা একটি সাত আট হাতি লম্বা ঘর কয়েকটি প্রো্য়োজনীয় পুরাতন জিনিস পত্র ও একটি প্রকান্ড বাঁশের থোপ । সরকার থেকে বয়স্কভাতার টাকা পায় আর মাঝে মাঝে দু একটি বাঁশ বিক্রি করে এই দিয়েই চলে তার একক পরিবার । সে একা একা রেঁধে খেত কিন্তু ইদানিং শীতে আর রান্না করতে পারছে না । তাই সে তার এক দূর্সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়িতে দুই বেলা খেতে আসে ।
মিনু বলল- দাদু কোথায় যাবে?
বৃদ্ধ লাঠি উচিয়ে দেখাল –এই বাড়িতে ।
মিনু – এরা তোমার কে হয় ?
বৃদ্ধ- কুটুম হয় ।
ওখানেই ছিল ওই বাড়ির মহিলা । সে বলল , ও আমার নন্দাই হয় । শীত আসা হোনে আমার এখানেই খায় । রান্ধিতে পারে না।
সালমা বলল- কাকা কাল থেকে আর এত দূর খেতে আসিয়েন না । আমার বাড়িতে খাইয়েন ।
বৃদ্ধ- তাহলে তো ভালোই হয় । শীতে আমি এত দূর আসতে পারি না ।
মিনু বলল – দাদু , তাড়াতাড়ি আসো তোমার জামাকাপড় গুলো ধুয়ে দেব ।
বৃদ্ধ মনে মনে খুশি হলো । সে ঘোলাটে দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে রইল ।
স্কুলে যাওয়া আসার পথে আছে বিরাট একটি তেতুঁল গাছ ও পাশেই রয়েছে একটি মাঝারি বরই গাছ । তেঁতুল গাছটিতে যেমন ঝোপা ঝোপা তেঁতুল ধরেছে বরই গাছটাতেও । মিনুর ও তিন্নির বরই দেখে মন মানছে না । সালমার বারন স্বত্বেও মিনু ঢিল ছুড়ল ।তড় তড় করে অনেকগুলো কাঁচা পাকা বরই পড়ল । ওরা তাড়াতাড়ী কুড়িয়ে চাদরের কোচায় নিয়ে খেতে খেতে চলতে লাগল ।
তিন্নি ঘ্যান ঘ্যানি শুরে বলল – আম্মু তেঁতুল নিব ।সালমা ধমক দিয়ে বলল-উহঃ ওগুলো কাঁচা । পাকুক তো একদিন চেয়ে নিয়ে দিব।
প্রতিটি বাড়ির সামনে রয়েছে লাউ ও শিমের মাচা । লাউ ও শিম ধরেছে যে কত !
সালমা বলল- দেখ মিনু দেখ , কত লাউ আর শিম ধরেছে। আমিও লাউ আর শিমের গাছ লাগাব।
পথে দু একজনের সাথে কথা বলতে বলতে ওরা বাড়িতে এল ।
বিকাল বেলায় মিনু দাদীর ঘরের এক পাশের চৌকিটায় নিজের জন্য বিছানা পাতল । ভাঙ্গা টেবিলটার উপরে নিজের একটা পুরাতন ওড়না বিছিয়ে দিয়ে বই গুলো গুছিয়ে রাখল । মনে মনে বলল বিছানা বালিশ গুলো কাল ধুব। সন্ধ্যার সময় পড়তে বসল । ঘর ভরা আলো । এখন আর কেরোসিন কিনাকিনির ঝামেলা নেই । মিনুর আজো মনে আছে পড়তে বসলে তেল বিনা
চেরাগ নিভিয়ে যেত, আর পড়া হত না ।
পাঁচ

সকাল নয়টা বাজে ।প্রতিদিনের মত আজও বড় আপা স্কুলে এসেছেন । স্কুল কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র ছাত্রীরা ।গরমের দিন হলে এতক্ষণ অনেক ছাত্র ছাত্রী আসত শীতের দিন তো তাই কম । কিন্তু কম হলে কি হবে ওদের মধ্যে সব সময় প্রতিযোগীতা চলে কে আগে ঘরে ঢুকতে পারে ।এতে তারা অনেক সময় হুড়মুড় করে পড়ে যায় । কিন্তু এযাবৎ যে কারো দাঁত ভাঙ্গে নি এটায় ভাগ্য ।সবাই যে সামনে বসবে তা নয় । কেউ পিছনের জন্য কেউ সামনের জন্য । আপা তাদের মেরে দেখেছেন, গাল টেনে দেখেছেন , উপদেশ দিয়ে দেখেছেন না কিছুতেই কাজ হয় নাই । তাই তিনি ইদানিং বুদ্ধি বের করেছেন প্রশ্ন ধরা । যে আগে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে সে আগে ঘরে প্রবেশ করবে । আজ প্রশ্ন ধরেছেন , একটি গরুর চারটি পা হলে ষোলটি গরুর কয়টি পা । এই প্রশ্নটি ওদের বন্ধু মহলের মধ্যে ধরাধরি হলে তা বুদ্ধি খাটিয়ে সহজেই উত্তর দিতে পারত । কিন্তু আপা ধরেছেন একে বারে থ লেগেছে ।আপা দেখলেন, ওদের পরনে রয়েছে অতি অযত্নের সোয়েটার গুলো । কারো চেইন নষ্ট কারো বা দু তিনটি বোতাম নেই। তবে সবারই সোয়েটার গুলো ময়লা । হয়তবা একটি করে সোয়েটার শীতের কারণে পরিস্কার করতে পারে নাই ।সবারই পায়ে সেন্ডেল, কারো পায়ে সু নেই । ময়লাতে পায়ের চামড়ার আঁকগুলো মোটা মোটা হয়েছে । আর একটু হলেই ফেটে যাবে ।
তিনি বললেন – শহীদ মিনারে রোদ এসেছে ওখানে বসে হিসাব কর ।
ছাত্ররা রোদে বসে খুব চেষ্টা করছে ।
বড় আপা উদাস মনে পতাকা উত্তলোন করছেন । এদেশের পদ্মা, মেঘনা, যমুনার বুকের ঢেউ গুলো যেমন দুলতে দুলতে একসময় মোহনায় গিয়ে পৌছে যায় তেমনি তার মন পলাশীর মাঠ থেকে শুরু করে বংগ বন্ধুর স্বাধীনতার ডাক থেকে পতাকায় এসে সবে মাত্র পৌচেছে । এমনি সময় এক মহিলার কথায় তার স্বপ্ন ভাংল ।
মহিলা বলল- আপা আমার বাচ্চাটাকে দেখখিও ।
কথাটা যেন কেমন বেসুরা হয়ে তার কানে বাজে । তিনি বললেন- কোনটা তোমার বাচ্চা ? মহিলা বাচ্চাটাকে দেখিয়ে বলল এটা ।
বড় আপা এ গ্রামের প্রায় সব মহিলাকেই চেনেন কিন্তু এই মহিলার কথা মনে মনে হাতড়াচ্ছেন চিনতে পারছেন না । সব মহিলাকে চিনেন এ কারনেই যে বাচ্চার বয়স চার পাঁচ হলেই তারা বড় আপার কাছে আসে উদ্দেশ্য বড় আপা উপবৃত্তির ব্যাপারে হেড স্যারকে সহযোগীতা করেন ।
আপা বললেন , ওর বাবার নাম কী ?
মহিলা বলল- মালেক ।
আপা বললেন – ও তুমি তাহলে মিনুর ছোট মা !
মহিলা বলল- জি ।
তার কথাবার্তাগুলো যেন এ এলাকার নয় বলে মনে হলো । আপা বললেন তোমার বাবার বাড়ি কোথায় ?
মিনুর মা – কি আর বলব দুক্ষের কথা আপা, আমার মা এ গ্রামেরই মেয়ে । স্বাধীনের দু দিন আগে পাকিস্তানী কি রাজাকর রা আমার নানা নানীকে এই বিলের ধারেই মেরে ফেলে ।আমার মা এ রকম শীতে রক্তের মধ্যে পড়ে কাঁন্না করছিল । আর ও দিক দিয়েই আবার পালাচ্ছিল আমার এই পালক নানানানীরা । আমার মা শীতে নীল হয়ে গিয়েছিল । মা তখন নয় দশ মাসের বাচ্চা।
বড় আপা অবাক হয়ে শুনছেন ,মনে মনে ভাবছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সাথে এ ঘটনা জড়িত । নিশ্চয়ই ওর নানা বিশেষ কোন ব্যক্তি ছিলেন । তিনি বললেন – তারপর কোথায় নিয়ে গেল ?
মিনুর মা – চাঁপাই নবাব গঞ্জ । ওখানেই আমার মা বড় হয় বিয়ে সাদিও হয় ।
বড় আপা – তোমার মায়ের এখানে কেউ আছে কিনা বুঝতে পার ?
মিনুর মা – না ! আজো বুঝতে পারিনি ।
বড় আপা – তোমার মা এখানে আসে ?
মিনুর মা বলল , আসে । বড় আপা বললেন – এবার আসলে আমার কাছে আনিও তো ! দেখব কার মত ! বংশের টান কিন্তু বোঝা যায় । আমি অনেক দিন থেকে এ স্কুলে পড়াচ্ছি, আমি কিন্তু বুঝতে পারি কে কার ভাই বোন ।
মিনুর মা বলল –মনে মনে কত খুজি পাই না ।
বড় আপা – মালেকের সাথে তোমার বিয়ে হলো কিভাবে ?
মিনুর মা- কি করব আপা , কপাল মন্দ । আমার বয়স যখন ছয় কি সাত তখন আমার বাবা মারা যায় । আমারও বিয়ে হয়েছিল। একটা ছেলে হওয়ার পর সেও আমাকে রেখে চলে যায় । তখন আমরা মা ওমেয়ে ঢাকায় চলে যাই ।ওখানেই এর বাপের সাথে দেখা হয় । কথায় কথায় মা জানতে পারল যে ও এই গ্রামের ছেলে তাই মা আমার ওর সাথে বিয়ে দেয় । মায়ের আশা ছিল ভাইবোন কি চাচা মামা কেউ থাকলে পরিচয় পাবে , কিন্তু আজো মিলেনি ।
এরই মধ্যে ছাত্ররা প্রশ্নের উত্তর বলে দিয়ে রুমে ঢুকে নিজ নিজ স্থান দখল করে বই রেখে চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ।তারা মিনুর মার কথা শুনছে । কথা শেষে সে বলল যাই আপা বাড়িতে কাজ আছে ।
মিনুর মা চলে গেলে আপা কথাগুলো মনে মনে ভাবছেন । একটা চেয়ার এনে নিয়ে তিনি রোদে বসেছেন । ছেলেমেয়েরা খেলছে । স্কুলের মাঠের ধারে কয়েকটি গরু বাঁধা । গরু গুলো ঠান্ডায় কোকঁড়া লেগে গেছে । গায়ে চটের বস্তার ঝুল দেওয়া আছে । আর একটু দূরে ছাইয়ের পালায় কয়েকটি কুকুর বাংলা বর্ণ ভ -য়ের মত হয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে ।আপা মনে মনে বললেন শীত সকলের জন্য কষ্টকর বটে কিন্তু উপায় তো নাই এ আল্লাহর দান । এরও মধ্যে কিছু মহিয়ান রহস্য রয়েছে । তিনি ফুল বাগানটির দিকে নজর রাখলেন । কী সুন্দর মৌসুমী ফুল্গুলো ফুটেছে।কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে ফুল গাছে পানি দিতে লাগালেন । সকলের উদ্দেশ্যে বললেন । কেউ ফুল তুলবে না । শহীদ দিবসে আমরা মিনারে ফুল দেব । আর নিজেদের বাড়িতেও যে সব ফুল আছে সে গুলোর যত্ন নেব ।
রুপালী মেডাম এসে পাশে দাঁড়াল, বলল – আজ খুব শীত , কাপড় চোপড় ধুয়েছি গোসল করেছি হাত পা গুলো যেন ফুঁড়ছে । সেও একটি চেয়ার এনে নিয়ে রোদে বসল ।করিম স্যার বড় আপাকে ফোন করলেন , বললেন শীতে তার দাদা শ্বশুর মারা গেছে আজ স্কুলে আসতে পারবেন না ।
কিছুক্ষণের মধ্যে মিনু, সালমা সহ আরো অনেক ছাত্র ছাত্রীও শিক্ষকেরা এল । সুন্দর সোনালী রোদ উঠেছে ঠাণ্ডাটাও একটু কমল । সকলেই ক্লাসে প্রবেশ করল ।
ছয়
সে দিনের মতো আজ রাতেও মিনুর ঘুম ভেঙ্গে যায় । প্রথমে সে মনে করল সকাল হয়েছে, কিন্তু না , রাত পোহাচ্ছে না ।বাইরে কুয়াশা পড়ছে । পাতার টুপ টাপ শব্দ শোনা যাচ্ছে । দূরে শেয়াল কুকুর ডাকছে । এখন ব্যাং আর ঝিঝির ডাক তেমন নাই ।মিনু শুনেছে শীতে নাকি বনের বাঘ ও কাঁদে । সে একটু একটু ভয় পাচ্ছে বাঘ কাঁদছে নাকি ? আবার নিজে নিজেই ভাবে সুন্দর বনেই নাকি বাঘ নাই আর এসব বনে কী বাঘ আসবে ?
পাশের বিছানায় দাদী খক খক করে কাশছে । মাঝে মাঝে উহঃ উহঃ শব্দ করছে । কদিন থেকেই দাদী ঔষুধ খাচ্ছে কিন্তু অসুখ সারছে না । স্কুলে সে তুলশি গাছ দেখেছে ,দাদীকে পাতা এনে রস করে দেবে । তুলসি পাতার গুণাগুণ সে ঢাকায় থাকতে মানিক সাহের এক পত্রিকায় পড়েছে ।
পাশের ঘর থেকে বাবার নাকের ডাক শোনা যাচ্ছে । বাবা সারা দিন কাজ করে । অল্প জমাজমি তা দিয়েই তাকে কষ্ট করে সংসার চালাতে হয় । মাঝে মাঝে রাজ মিস্ত্রিতেও যায়।
কাল সে দেখেছে এত শীতেও বাবা কীভাবে মাঠে ইরি ধানের বিছনের কাছলা তৈরি করছে । মিনু বলেছিল,এখানে কি লাগাবে আব্বু?
আব্বুবলেছিল - ইরি ধানের বিছন বুনব।
মিনুবলেছিল - তুমি তো এখনেই ধান কাটলে ।
বাবা – আবার যে ইরি ধান লাগাতে হবে রে পাগলি !
মিনু শুনতে পায় পাশের গ্রামে মাইকে ওয়াজ হচ্ছে । ইস রে দাদীর কাশি না হলে যাওয়া যেত । শীতের রাতে মাদ্রাসা গুলিতে ইসলামী আলোচনার আয়োজন হয় । সে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে কেন শীতের দিনে হয় ? আবার নিজের মাঝেই উত্তর খুজে পায় “রাত বড় তো তাই বুঝি হয় আবার বৃষ্টি পাত ও কম হয় ।
ভাবতে ভাবতে এক সময় তার মনে পড়ে স্কুলের কথা । সে ঢাকায় দেখেছে মেয়েরা অনেক কিছুই করছে । সে তাদের মত একজন হতে চায় ।তাকে বড় হতে হবে । ফিরে আনতে হবে মায়ের মুখে হাসি । এই শীতে কেমন আছে তার মা ? কত বড় হয়েছে তার জমজ বোন দুটি ? মা কি তাদের শীতের কাপড় কিনে দিতে পেরেছে ?সে শুনেছ নানু খুব গরিব । কী এর সমাধান ? সে কি এর সমাধান আনতে পারবে -------------।
সাত
দিন যায় দিন আসে , বারোটি মাস পেরিয়ে হল বছর ।মিনু স্বচক্ষে দেখল প্রাকৃতিক অবলিলা । কখনও শীত কখনও গরম কখনো বা বৃষ্টি ঝরে অঝর ধারায় , এ দেশের শহর প্রান্তর আর পাড়ায় পাড়ায় । পালাক্রমে আসে ছয়টি ঋতু ।প্রকৃতিও সাজে বিভিন্ন সাজে । মিনু এখন জানে পৌষ ও মাঘ মিলে হয় শীত ঋতু।শীত ঋতু তে কি কি ঘটে তাও সে জানে ।
এখানে বিরাট দালান দিগন্ত ঢেকে রাখে না , পাখির সুমধুর ধ্বনি- বিরাট কলকারখানা আর যানবাহনের শব্দে চাপা পড়ে না । এখানে ঘরের দুয়ারে বসে দেখা যায় ঊষার রবির অপ্রুপ দৃশ্য ।সূর্য্য ডোবার দৃশ্য দেখতে যেতে হয় না বহুদূরে । এসবের মাঝে মিনু লেখা পড়া চালিয়ে যায় । সে সমাপনি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে পাশের গ্রামের হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে ।
ডিজিটাল যুগের ছোঁয়ায় এ গ্রামটিও যেন ডিজিটাল হয়েছে । এখন আর আগের মত বাল্য বিবাহ নেই । মিনু বান্ধবীদের সাথে দল বেঁধে স্কুলে যায় । ওরা খুব খুশি ।আগের মত আর মায়েরা ইশারা দিয়ে মেয়ে কে অন্তরালে পাঠিয়ে দেয় না । তবে দু একটা বাল্য বিবাহ নজরে পড়ে । যেমন ধরো এই তো কদিন আগে হারুনের বিয়ে হলো । বউ ক্লাস সেভেনে পড়ে ।চুরি করে বিয়ে হয়েছে । বিয়েতে কোন অনুষ্ঠান হয়নি । যেন কারো বাড়িতে বেড়াতে এসেছে এরকম ।এতে দু পক্ষই খুব খুশি । টাকা পয়সাও বাঁচল , সরকারি লোকজনো বুঝতে পারল না, মেয়ের বাবাও কন্যা দায় থেকে মুক্ত হলো । নিজেদেরকে তারা অতি চালাক মনে করছে । কিন্তু ক্ষতিটা যে হলো কোন জায়গায় পরে তা বুঝতে পারবে ।এ শীতে বউটা বিড়াল বাচ্চার মত চুপটি মেরে থাকে । প্রাণ খুলে হাসেও না , কথাও বলে না । এ তার স্বভাব কী দুঃখ কিছুই বোঝা যায় না ।
এ গ্রামের মেয়েরা এখন বিকেল বেলায় দল বেঁধে স্কুল মাঠে ক্রিকেট খেলে । মায়েরা মেয়েদের খেলা দেখে প্রাণ খুলে হা হা করে হাসে । খেলোয়াড়দের নেতা মিনু । সে ঢাকায় থাকতে টি ভি তে খেলা দেখত । সে ক্রিকেট খেলা সম্পর্কে বেশ জানে ।সে বলে শীতের সময় খেলতে মজা, সূর্যের তাপ নেই , গা ঘামে না ।