ছুটির ঘন্টা পড়তেই ছেলে মিয়ে গুলো দৌড়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে আসলো, তাদের বাধভাঙ্গা উচ্ছ্বাসের ঢেউ ছরিয়ে পড়ছে চারিদিকে। প্রত্যন্ত গ্রামের ছোটবড় গাছের ভিড়ে নদীর কাছে এই স্কুলটারর চারদিক তাদের কোলাহলে প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। বই গুল হাতে নিয়ে দল বেধে গল্প করতে করতে বাড়ির পথ ধরে ছোট ছেলে মিয়ে গুলো।
তুহিনেরর দলে ওরা ৪ জন। তুহিন, সোহাগ, শাপলা, নয়ন। স্কুল থেকে পূর্বদিকে একটা বাঁকা পথ, মেহগুনি তেতুল, দেবদারু, ডুমুর, নিম, গুটুল সহো আরো গাছে ঢাকা রাস্তাটা কয়েক টা বাড়ির এপাশ ওপাশ দিয়ে ঘুরে নদীতে ঠেকেছে। ছোট নদী পার হয়ে একটু হেটে গেলে সড়কের ব্রীজ, ব্রীজটা পার হয়ে একটু দুরে শিমুল গাছ। ওদের গ্রাম ওখানে। তুহিনদের এই চার জনের দল এ গ্রামের। সবাই এক ক্লাসে পড়েনা। সোহাগ ক্লাস ফোর, শাপলা ওয়ান, তুহিন আর নয়ন ফাইভে পড়ে। শাপলা ছোট, তুহিন সোহাগরা যেদিন স্কুলে যায়না শাপলারও যাওয়া হয়না। স্কুলে যাওয়ার সময় শাপলার মা ওদের সাথে শাপলাকে এগিয়ে দেয়, বার বার বলে বাবা একসাথে আইসো কিন্তু হ্যাঁ, ওকে একা ছাড়িয়োনা। তুহিনরা মাথা নাড়ায়, আচ্ছা চাচি, একসাথে আসবো।
একদিন স্কুলে খেলা ছিল, পূর্ব পাড়া, উজান পাড়া। তুহিনরা শাপলাকে নদী পাড় করে দিয়ে বলে একা যেতে পারবিনা? শাপলা ঘাড় বাকা করে বলে পারবো। নয়ন ব্রিজের উপরে উঠে দেখতে থাকে, শাপলা শিমুল গাছের কাছে গেলে ওরা স্কুল মাঠে চলে যায়।
গ্রামের পথ, ঝামেলার কিছু নাই, মাঝে মাঝে দুই একজন লোক যায়।
কিন্তু শাপলা শিমুল গাছের কাছে এসে মাথা ঘুরে পরে যায়। বেশ রোদ ছিল সেদিন আর একা একা আসতে একটু ভয়ও পেয়েছে মনে হয়। পাশের গ্রাসের এক মোধ্য বয়স্ক লোক যারার সময় ওকে দেখে কোলে করে এক বাড়ির গলিতে এসে চিল্লাতে থাকে, কার মিয়ে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পরে আছে?
মরজিনার দাদি বের হয়ে এসে শাপলাকে দেখে চিল্লায় বলে ও শাপলার মা তোর মিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। মাথায়পানি দেওয়া হলো। একটু পরে শাপলা সুস্থ হয়, কিন্তু ঝগড়া বাধে পুরো গ্রাম, শাপলার মায়ের সাথে তুহিনের মা, তুহিনের মায়ের সাথে নয়নের মা, নয়নের মায়ের সাথে সহাগের মা, এর পরে দাদি চাচিরা।
সন্ধার দিকে পরিবেশ শান্ত হয়, কয়েক দিন শাপলা আর স্কুলে যায়না।
একদিন তুহিনের হাঁস হারিয়ে গেলে খুজতে খুজতে শাপলাদের বাড়ির পাশে পুকুরের দিকে আসে। শাপলার মা তুহিনকে দেখেই রেগে উঠে বলে এদিকে কি? মিয়েটাকে তোদের সাথে পাঠাইছি, ওকে সাথে নিবিনা বললেই হতো, আরার মিয়েকে তোদের সাথে পাঠাইতামনা। বদমাইসের দল। আমার বাড়ির সীমানায় যেন তোদের না দেখি। এই কয়েক দিন ওদের কেউ শাপলাদের বাড়ির সামনে ভয়ে আসেনি। আজ হাঁস খুজে এদিকে আসা। তুহিন মাথা নিচু করে বলে চাচি আমি ব্রিজের উপড় দাড়ায় ছিলাম, শিমুল গাছের ওখানে শাপলা আসার পরে আমরা খেলতে গেছি।
শাপলার মা কথাটা শুনে একটু শান্ত হয়। শিমুল গাছ থেকে শাপলাদের বাড়ি বেশি দুরে না।
হাস খুজে পাওয়া গেলনা, সকালে তুহিনের মার সাথে শাপলার মায়ের দেখা হয়, হাস নিয়ে কথা হলো দুজনের। ঝগড়া মিটেছে।
বেশ কয়েক দিন পরে পরীক্ষা শুরু হলো। তুহিন নয়নদের বুঝিয়ে শাপলার মা ওদের সাথে শাপলাকে স্কুলে পাঠায়।
বার বার বলেদেয় ওকে একা ছাড়িও না, নয়ন মাথা নারায়, চিন্তা কোরেন না চাচি।
রেজাল্ট হয় একমাস পড়ে। তুহিন ফেল করে। সোহাগ ৩য় হয়, নয়ন পাশ করে সিক্সে ভর্তি হয়।
নয়ন সিক্সে উঠার পরে নতুন গ্রুপেরর সাথে স্কুলে যায়। নয়নের মধ্যে একটু পরিবর্তন আসে। হাতে ঘড়ি পড়ে। ছোট একটা আয়না, চিরনি আর একটা ক্রিম ড্রয়ারে রাখে। ওর ড্রয়ারে তালা দিয়ে চাবি কাছে রাখে। নতুন টাকার নোট জমায়, নতুন নোট কাগজে ভাজ করে ড্রয়ারে রাখে।
তুহিন আগের ক্লাসেই থাকে। সোহাগ তুহিন শাপলা আর ওদের সাথে আর একজন যুক্ত হয় কাকলি, এবার ওয়ানে ভর্তি হলো।

--------------------------------দুই
সহোগ নবম শ্রেনিতে উঠেছে। তুহিনের পড়াশুনা ষষ্টশ্রেনীতেই শেষ। জমি দেখাশুনা করে। সংসারের কাজ করে।
শীতের সকাল, ফসলের জমিতে শিশির পরে ঢেকে যায় বিন্দু বিন্দু পানিতে। সোহাগ ধানেরচারার উপর হাত বুলায়, শিশির ঝড়ে পরে। শাপলা বারান্দায় বসে মুড়ি খাচ্ছিল। সোহাগ কে শিশির নিয়ে খেলতে দেখে বলে সোহাগ ভাইয়া ঠান্ডা লাগেনা? না তোর মতো আমার এতো ঠান্ডা লাগোনা। শাপলা মুড়ি নিয়ে নিচে নেমেআসে; সোহাগের কাছে বসে। মুরি খাবেন? সোহাগ শরিসার তেলদিয়ে মাখান মুড়ি একমুঠো নিয়ে মুখে দেয় আর খেজুর গুরের ছোট টুকরাটা। শাপলা অবাক হয়ে বলে সব গুড় খেয়ে নিলেন! আপনার কাছে আসাটাই ভুল হইছে। সোহাগ হাসতে হাসতে বলে একটা গুড় নিয়ে আমার কাছে আসিস কেনো ফকিন্নি! শাপলা উত্তর দেয় আপনে তো জমিদার এই জন্য ছেরা স্যান্ডেল তার দিয়ে বাঁধা। সোহাগ একটু লজ্জা পায়ে বলে এটা স্টাইল, তুই বুঝিস?
শাপলা ঠোট উল্টিয়ে বলে ওরে আমার স্টাইল! এসব স্টাইল শিউলি আপুর কাছে দেখাইয়েন।
শিউলির কথা শুনে সোহাগ বুঝতে পারে সেদিনের ব্যাপারটা নিয়ে শাপলা ওকে খোটা দিচ্ছে।
সোহাগদের জলপাই গাছ আছে, শিউলি জলপাই চেয়েছিল একদিন। তো সেদিন শিউলিকে জলপাই দিয়েছিল আর সাথে গনিতের নোট খাতা, শাপলা সেই থেকে সোহাগকে এটা নিয়ে খোটা দেয়।
সোহাগ ওর বাবার ডাকশুনে শাপলার ডালা থেকে আরেক মুঠ মুড়ি নিয়ে নিচে নেমে যায় জমিতে পানি দিতে হবে।

----------------------------------তিন
আজ এসএসসি রেজাল্ট। নয়ন আর সোহাগ এক সাথে পরীক্ষা দিয়েছে। নয়ন পাশ করতে পারেনি গনিতে ফেল
সোহাগ পাশ কররেছে ৪.৭৫ পেয়েছে। সোহাগের বাবা মিষ্টি দেয় মসজিদে। ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চায়। উপজেলার এক কলেজে ভর্তি হয় সোহাগ।
কলেজের কাছে বিশাল বড়ো হাট বসে প্রতি সোমবার। হাটের অংশ ভাগ করা আছে, আলু পিয়াজ, ধান সরিষা, মাছ, গরু, ছাগল সহো আরো কয়েকটা অংশে ভাগ করা। সোহাগ আর তুহিন হাটে সরিষা এনেছে বিক্রয় করতে। আজ হাটে সরিষার দাম বেশ ভালো। এমাসে টাকা লাগবে, কলেজের খরচ আছে অনেক।
তুহিনের বিয়ে। নয়ন, সোহাগ, শাপলা, কাকলি সবাই একসাথে হয়েছে । শাপলা কাকলি একটু দুরে দুজনে একটা চিয়ারে বসে আছে, তার পাশে একটা টুলে তুহিনের মামাতবোন যুথি। সোহাগ আর নয়ন তুহিনের পাশে বসে গায়ে হলুদ দিচ্ছিল। শাপলার চাচি কাকলির মা তুহিনের গায়ে হলুদ দেওয়ার সময় শাপলা বলে, চাচি ঐ দুই জনের গায়েও মাখায় দেন। কাকলির মা বলে না বাবা! একটাই আগে হোক। শাপলা যুথির চুলে বিলি কেটে বলে এই যে সোহাগ ভাইয়ে পাত্রী রেডি।
গায়ে হলুদ শেষ, কাকলি নয়নকে বলে ভাইয়া গান বলেন একটা। যুথি ইংলিসে বলে sing a song. যুথির ইংলিস পারদর্শিতা শাপলা কাকলির জন্য বেশ বিরক্তির কারন হয়ে দাড়িয়েছে। যুথি ইংলিস বলে নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করতে চায় সবার কাছে।
তুহিন সোহাগ নেমে আসে হলুদের চোকি থেকে। নয়ন গান গায়
------আমার মত এত সুখী নয়তো কারো জীবন
কি আদর স্নেহ ভালবাসায় ঝরালো মায়ার বাঁধন
জানি এই বাঁধন চিড়ে গেলে কভু আসবে আমার মরণ...

নয়নের গান শেষে সবাই জুথিকে বলে সিংগ এ সংগ।
যুথির কোন গান মুকস্থ নাই গান পারেনা ও। সবাই জোড় করায় একটা গানের ২ টা লাইন বলে
যেটুকু সময় তুমি থাকো পাশে
মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে
বাকিটা সময় যেন মরণ আমার
হৃদয় জুড়ে নামে অথৈ আঁধার।।
অনুষ্টান শের করতে তাগাদাদেয় মুরব্বিরা। রাত ৯টা বাজে। সোহাগ কাকলিকে ওদের বাড়ির দিকে এগিয়ে দেয়। যেতেযেতে কথা হয় দুজনার।
-কাকোলি, মারুফ কেন আসছিল? ওদের তো দাওয়াত দেয়নি।
-এমনি আসছিল নয়ন ভাইয়ার সাথে।
-তুমি মারুফের সাথে কি কথা বললা জামগাছের নিচে দাড়ায়?
-মারুফ আমার বান্ধবি আখির সাথে কথা বলবে তাই আমাকে বলছে যেন ওর সাথে একটু কথা বলায় দেই।
-মিঠুর সাথে তোমার কি হয়েছে ?
আর বলিয়েন না ভাইয়া ও আমাকে খুব বিরক্ত করে একদিন আমাকে চিঠি দিয়েছে।আমি বলেছি আর একবার যদি দেন নয়ন ভাইয়াকে বলেদিব। তবুও রাস্তায় দারায় থাকে স্কুলে যাওয়া সময়।
- ও দাড়ায় থাক, তুমি ওদিকে চোখ কান না দিলেই হলো। কাকোলি মাথা নারায়।

সকালে সবাই বেশ ব্যাস্ত, অনেক লোকের রান্না। বাচ্চারা খেলছে। যুথি আর নয়ন তুহিরের হাতে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। শিউলি পিয়াজ কাটছে পিড়িতে বসে। পেয়াজ কাটছে দেখে সোহাগ কাছে গেলনা চোখে ঝাজ লাগবে বলে। গায়ে হলুদের চকিতে বসে শাপলাকে বললো সকালে কি রান্না করবে রে? শাপলা ওর দিকে একবার তাকাল তারপরে আবার পিয়াজ হাতেনিয়ে বললো কাকলি রান্না ঘরেই আছে বললেই বলে দিবেনি কি রান্না করছে। যাকে বাড়িতে রেখে আসেন তারোতো একটা দায়িত্ব আছে আপনাকে খাওয়ানোর। সোহাগ কিছু বললোনা। চুপ করে বসে শাপলার পেয়াজ কাটা দেখছে। সোহাগ একা বসে আছে দেখে যুথি ডাকলো ভাইয়া আসেন মেহেদি দিয়ে নেই। না থাক, আমি মেহেদি দেইনা।
নয়ন আর সহাগ ঘর সাজানোর জন্য ফুল, রঙ্গিন কাগজ আনতে গেল। দুপুর হয়েগেল ঘরসাজাতে দিয়ে। বরযাত্রী বউ নিয়ে ফিরে আসল সন্ধ্যার পরে।
পরদিন সকালে বউভাতের আয়োজন, সবাই ব্যাস্ত। তুহিনের বাবা মোবাইলে কারসাথে যেন কথা বলছে আমরা বরযাত্রী ৫০ জন গেলাম আপনাদের তো ৫০ জন আসার কথা এখন ৭০ জন আসবেন, এটা কি করে হয়। অনেক সময় কথা হলো। শেষে সিদ্ধান্ত হলো পরের বারে বউ আনতে গেলে বেশি লোক যাবে এখান থেকে।
সোহাগ আর নয়ন নতুন ভাবিকে দেখতে ঘরের ভেতর গেল। লাল শারি পরে বউ বসে আছে, বউয়ের সাথে যুথি আর একটা মিয়ে। সোহাগ সালাম দিল। নতুন বোউ ঘোমটা আরো বড় করেদিল সোহাগকে দেখে। সোহাগ বললো ভাবি ঘর সাজানো পছন্দ হয়েছে? মেয়েটা ছোট করে উত্তর দিল হয়েছে। নয়ন বললো ভাবি একদিন দাওয়াত দিবেন কষ্ট করে ঘর সাজায় দিলাম। বউয়ের পাশে বসা মিয়েটা বললো বন্ধুর জন্য ঘর সাজাইছেন আবার দাওয়াত চেয়ে নেন কেমন বন্ধু আপনারা!
পরিচয় হলো এটা নতুন বউয়ের বান্ধবি নাম মরিয়ম। বউয়ের নাম জেসমিন।

-------------------------চার
আজ সোহাগের রেজাল্ট দিয়েছে। এ প্লাস পেয়েছে সোহাগ । সোহাগের মা এ প্লাস বুঝেনা ছেলে অনেক নাম্বার পেয়ে পাশ করছে এটা শুনে খুব খুশি।
সোহাগ এডমিশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। শহরে কোচিং করছে। একটা ম্যাসে উঠেছে। কাল দুপুরে ওর বাবা ম্যাসে রেখে গেছে। যাওয়ার সময় ছেলের পিঠে হাত বুলায় বলে বেটা ভালো করে পড়, টাকার চিন্তা করোনা। যখন যা লাগে বলবা। সোহাগ বাবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে বলে আব্বা এই কয়েকটা মাস বেশি খরচ হবে, তারপরে আমি একটা ব্যবস্খা করবো।

সোহাগের বাবা চেষ্টা করছে ধান, সরিষা বেচে টাকার ব্যাবস্থা করতে। ব্যাপারিদের সাথে আগে থেকেই কথা বলে রাখে। যাতে সোহাগ টাকা চাইলেই দিতে পারে।
এই কয়েক মাসে এতো টাকা লাগবে সোহাগের বাবা ভাবতেও পারেনি। টাকা যোগার করতে হাপিয়ে উঠে সে। কয়েক দিনের জন্য কচিং বন্ধ হয় ঈদের ছুটি। সোহাগ বাড়িতে আসে। নয়নের সাথে দেখা হলে নয়নকে বলে আমাকে কিছু টাকা দে তো দরকার। আব্বার কাছে আর টাকা চাইতে পারতেছিনা।
কতো টাকা লাগবে তোর?
দে হাজার দুই যা পারিস।
আমার কাছে নাইতো এতোটাকা।
সোহাগ যানে নয়নের কাছে টাকা নাই তার পরেও চাইলো। বিকালে শাপলার সাথে দেখা হলো শিমুল তলায়। সোহাগকে দেখে শাপলা বললো সোহাগ ভাই কি খবর?
সোহাগ শিমুল গাছের শিকরের উপর বসে বললো এই তো আছি ভালই। তোর কি খববর?
ভালো আছি। কবে যাবেন শহরে?
সোহাগ বললো টাকা পয়সা নাই কি করে যে যাব। শাপলা চাচাকে বলনা কিছু টাকা ধার দিতে। কাল আব্বা চাইছিল চাচা নাকি বলছে টাকা নাই।
শাপলা সোহাগের দিকে তাকিয়ে বলে, বলবনি আব্বাকে।

রাতে শাপলা অনেক ভয় নিয়ে ওর বাবাকে বলে আব্বা মুন্ডল চাচা নাকি টাকা চাইছিল আপনার কাছে?
হুম চাইছিল না করছি। কেন কি হইছে?
আব্বা দেনন না কিছু টাকা পরে দিয়ে দিবে তো।
তুই বেশি বুঝিস, পরে কোই থেকে দিবে? ধান সরিষা যা ছিল সব বেচছে। সামনের বার আবাদ করবে কি দিয়ে সেটারই ঠিক নাই আবার টাকা দিবে।
আব্বা অল্প হলেও দেন। সোহাগ ভাই ভার্সিটিতে ভর্তি হইলে দিয়ে দিবে।
শাপলা আর কিছু বলেনা। চলে আসে ঘরে।
সোহাগ বাড়িতে এসে অনেক চিন্তায় পরে গেছে সংসারের অবস্থা দেখে। ভর্তি পরীক্ষার আর বেশিদিন নাই। ফরম তুলতে হবে। কতো জায়গায় পরীক্ষা দিতে যেতে হবে। অনেক খরচ। শিউলির কথা মনে হলো একবার। ওকে বললে মনেহয় কিছু টাকা দিত। পরে ভাবলো বিয়ে হয়ে গেছে না চাওয়াই ভালো।
সকালে এসে শাপলার বাবা সোহাগের মায়ের হাতে ৫ হাজার টাকা দিয়ে গেল। বিকেলে নয়ন আর তুহিন আসলো সোহাগের সাথে দেখা করতে। রাস্তায় বসে তিনজনে গল্পো হলো অনেক। যাওয়ার সময় নয়ন সোহাগেকে আটশো টাকা দিয়ে বললো আগে নতুন নোট যোমাইতাম, নিয়েযা।

------------------------পাঁচ
সোহাগ চলে যাওয়ার পর শাপলা কয়েকবার সোহাগের খোজনিতে ওদের বাড়ি আসে। সোহাগের মায়ের সাথে গল্প করে। চাচি সোহাগ ভাই কবে আসবে বলেগেছে?
কিছুতো বলে যায়নি, কবে যে আসবে। কঠিন পরীক্ষাআছে এটা শেষহলে তারপরে আসবে।

এডমিশন রেজাল্ট হলো । সোহাগ ক্যামিস্ট্রিতে চান্স পেয়েছে। কোচিং এর কয়েক মাসে শহরটা বেশ পরিচিত হয়ে গেছে তার কাছে। ভার্সিটিতে ভর্তি হলো। কিন্তু বাড়ি যাওয়া হলোনা। চা কফি ফেরি করে বিক্রয় করে, বিকালে পার্কে নদীর তীরে ভালো বিক্রয় হয়। এক সময় দুইটা টিউশনি পায়। কিছুদিন পরে ম্যাস ছেড়ে হলে উঠলো। খরচ বাচলো কিছুটা। অনেকদিন হলো বাড়ি যাওয়া হয়নি সোহাগের। মোবাইলে দুই এক মিনিট কথা হয় মা বাবার সাথে। শাপলাকে কয়দিন হলো কেনজানি খুব মনে পড়ছে।
রাতে মোবাইলে বাবার সাথে কথা বললো সোহাগ।
আব্বা কাল বিকালে বাড়ি আসবো।
-আসো বেটা, তোমার মা শুটকি মাছ রোদে দিল আজকে তুমি পছন্দ করো।
দুপুরে কাকোলির সাথে শাপলার দেখাহলো। কাকোলি শাপলাকে বললো সহাগভাই আসবে বিকেলে , নয়ন ভাই বললো।
শাপলা বাড়ির শেষ মাথায় দাড়িয়ে রাস্তারদিকে তাকায় যতোদুরর দেখা যায়। কয়েকবার দেখে গেছে। বিকেল শেষের দিকে কিন্তু সোহাগের কোন খবর নাই। একবার ভাবলো ওদের বাড়ি যাবে কিন্তু যাওয়া হলোনা। সোহাগের মা কুসলি পিঠা বানায়, শুটকি মাছ রান্নাকরে।
অনেকদিন পরে ছেলে বাড়ি আসছে।

সোহাগ টিউশনি শেষ করে হলে এসে জামাকপড় ব্যাগে তুলেনিল। বাইরে বেশ শোরগোল হচ্ছে। সোহাগ একবার বাহিরে এসে দেখল কি হচ্ছে। সরকার দলীয় দুইগ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছে। তারাতারি করে স্যান্ডেল আর ব্রাশটা ব্যাগে নিয়ে বেরহলো রুমথেকে। একটু পরেই হয়তো মারামারি হতে পারে। রিকসা আটো বন্ধহয়ে যাবে। ইউনিভার্সিটির গেটে এসে মনো হলো মায়ের জন্য একটা সুয়েটার কিনেছিল নেওয়া হয়নি, নয়নের জন্য ২ টা স্বারক নোট নিয়েছিল, শাপলার জন্য একটা ঘড়ি। কিছুইতো নেওয়া হয়নি। দুই পক্ষের উত্তেজনা বাড়ছিল। দূরে কয়েকটা গুলির শব্দ শোনাগেল। সোহাগ সাবধানে মাথা নিচুকরে দৌড় দিল রুমের দিকে। কিন্তু রুমে আর যেতে পারলনা। গুলি লেগে মাটিতে পরে গেল। সংঘর্ষ চললো অনেকক্ষন। ভয়ে কেউ সোহাগকে তুলতে আসলোনা। সাবকিছু সহাগের কাছে ঝাপসা মনেহলো, বাবার ক্লান্ত মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সোহাগ চোখ বুজে; যাত্রা তার অনন্ত মহাকলে।