একটি বিয়ে শুধু একটি ছেলে আর একটি মেয়ের সামাজিক মিলন নয়। এটা অনেক সমীকরণ বদলে দেয়া একটি সম্পূর্ণ আলাদা সমীকরণ। কিছু খুশির কারণ, কিছুটা স্বস্তি কিংবা স্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া কিছু অতৃপ্ত দীর্ঘশ্বাস।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - একটি বিয়ে (আগস্ট ২০১৯)

একটি বিয়ের গল্প
একটি বিয়ে

সংখ্যা

অপরেশ চাকমা

comment ৩  favorite ০  import_contacts ৯৯
আজ আমার বিয়ে। বিয়ে উপলক্ষে সমস্ত আত্মীয়-স্বজন এসে উপস্থিত। কেউ হৈ-হুল্লোড় করছে, কেউ অকারণে চিৎকার করছে। ‘মাথা ধরেছে’ নাম করে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছি। বাইরে থেকে যে চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে, তাতে সত্যি সত্যি মাথা ধরেছে। ইচ্ছে করছে বাইরে গিয়ে বলি, ‘সবাই দয়া করে চুপ করুন। আজ এই বাড়িতে কোন বিয়ে হবে না।’ অনেক অসম্ভবের মতো এটাও সম্ভব নয়। যেমন অলীককে দেয়া ‘তুমি নিজের পায়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত তোমার জন্য অপেক্ষা করবো’ কথাটা রাখা সম্ভব হচ্ছেনা।
ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তির দিনই অলীকের সাথে পরিচয়। একটি ছেলের চেহারায় এতটা মায়া-মায়া ভাব থাকতে পারে, ওকে না দেখলে জানতাম না। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম। আসলে সে ছিল আমার একমাত্র বন্ধু। অন্যান্য সহপাঠীদের কারো সাথেই কেন জানি ঠিক জমেনি। আমাদের নিয়ে ওরা মজা করতো। আমরা দু’জন যখন ওদের কারো পাশ দিয়ে যেতাম তখন কোন না কোন টিপ্পনী শুনতে হয়েছে। প্রথম প্রথম খুব রাগ হতো। ইচ্ছে হতো আচ্ছা-মতো ঝগড়া করি। কিন্তু করা হয়নি মূলত দু’টো কারনে। প্রথম কারন, আমি কারো সাথে ঝগড়া করতে পারি না। বেশি রাগ হলে আমার কান্না আসে। আর দ্বিতীয় কারণ হল অলীক। সে বলতো, কি দরকার ঝগড়া করার? যত বেশি রিএক্ট করবে, তত বেশি খেপাবে। কিছুদিন ধৈর্য ধরো, দেখবে এমনিতে ওরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। আসলেই তাই। আমাদের কেয়ারলেস ভাব দেখে ওরা আর আমাদের নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখায় নি। বরং দেখা হলে কেমন প্রশ্রয়ের হাসি হাসত। আপনাদের কি মনে হচ্ছে, আমরা প্রেমে পড়েছিলাম? একদমই না। মাত্র দু’মাস আগে আমি বুঝতে পেরেছি, আমরা বন্ধুর চাইতে বেশি কিছু ছিলাম।
থার্ড্ ইয়ার ফাইনাল চলছিল। ভালো কথা, আমরা একই ডিপার্টমেন্টে পড়তাম। সেদিন শেষ পরীক্ষা ছিল। হিস্ট্রি অব ইংলিশ লিটারেচার। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরছিলাম। প্র্তিদিনের মতো সে আমাকে রিকশা পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছিল। দু’জন গল্প করতে করতে এগোচ্ছি। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ আমার নাম ধরে ডাকল। ফিরে দেখি শামস্‌ ভাই। শামস্‌ ভাই ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে। চকচকে ফেরারি গাড়িতে ক্যাম্পাসে আসে। ভার্সিটির কালচারাল প্রোগ্রামে গান করে। বেশ ভালো গলা। ভার্সিটির অনেক মেয়েই তার জন্য পাগল। তাকে নিয়ে অনেক নোংরা গল্প চালু আছে। জানি না তার কতটুকু সত্যি। সে সমস্ত গল্পের কারণেই হোক আর যে কারণেই হোক, তাকে কেন জানি কেমন ভয় লাগে। ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে মাঝে মাঝে দেখা হলে টুকটাক কথা হতো। কথা হতো বলতে সে প্রশ্ন করতো, আর আমি জবাব দিতাম। ব্যস এইটুকুই। শামস্‌ ভাই এগিয়ে এসে বলল, ‘কেমন আছ?’ আমি বিব্রত ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করলাম। অলীকের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘তোমার সাথে একা কথা বলতে চাই। পাঁচ মিনিট, প্লীজ।’ অকারণে গলা শুকিয়ে এল। অলীকের দিকে তাকালাম। সেও একটু বিব্রত। কেমন বোকার মত হাসল। ‘আসছি’ বলে শামস্‌ ভাইয়ের সাথে এগোলাম। কয়েক পা এগিয়ে শামস্‌ ভাই থামল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছল।
‘সরি, এভাবে ডেকে আনলাম।’
‘না, ঠিক আছে। কি বলবেন বলুন।’
রুমাল দিয়ে আবার মুখ মুছল শামস্‌ ভাই। শুকনো হেসে বলল, ‘না, তেমন কিছু না। আগামীকাল আমার বার্থডে। বাড়িতে ক্লোজড ফ্রেন্ডদের নিয়ে একটা পার্টি এরেঞ্জ করেছি। তুমি এলে ভালো লাগবে।’ আমি তৎক্ষণাৎ কোন জবাব দিতে পারলাম না। জিভ কেমন আড়ষ্ট হয়ে আছে। কোনমতে উচ্চারণ করলাম, ‘পার্টি?’
‘হ্যাঁ। অবশ্য তোমার সমস্যা থাকলে থাক।’ সরল হাসি হাসল শামস্‌ ভাই। তারপর কেমন ঘোর লাগা গলায় বলল, ‘তোমাকে আমার ভাল লাগে বীথি। বলা উচিৎ ভালোবাসি।’ মুহূর্তে কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। প্রচণ্ড ইচ্ছে হচ্ছিল, ওর সামনে থেকে চলে আসি। কিন্তু পা দু’টো কেমন আটকে গেছে। যেন আর ওখান থেকে নড়া সম্ভব নয়। সে বলে চলল, ‘প্রথম যেদিন তো্মাকে ক্যান্টিনে দেখলাম, সেদিনই তোমার প্রেমে পড়েছি। তবে...’ একটু থেমে কি যেন ভাবল, তারপর হালকা ইতস্তত গলায় বলল, ‘তুমি কি অলীককে ভালবাস?’ প্রশ্নটা শুনে প্রচণ্ড চমকে উঠলাম। কেন এভাবে চমকালাম নিজেও জানি না। আসলে কখনো ভেবে দেখিনি ব্যাপারটা। অলীককে সব সময় আমার সবচেয়ে এবং হয়তো একমাত্র বন্ধু ভেবে এসেছি। প্রশ্নটা এমন আচমকা শুনতে হল, মাথা ঘুরছিল আমার। ‘শামস্‌ ভাই, কিছু মনে করবেন না। আমি আসতে পারব না। আসি।’ বলে হনহন করে হেটে চলে এলাম। কাছাকাছি হতে অলীক অবাক গলায় জানতে চাইল, ‘তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?’ আমি অলীকের দিকে তাকাতেই পারছিলাম না। বললাম, ‘কিছু না। বাড়ি যাব।’ পাশ দিয়ে যাওয়া একটা রিকশা ডেকে নিলাম। রিকশায় উঠতে যাব এমন সময় অলিক হঠাৎ এক অদ্ভুত কাজ করল। সে আমার হাত ধরে বলল, ‘তুমি এখন যাবে না বীথি!’ তার গলায় কিছু একটা ছিল। আমি তার দিকে ফিরে তাকালাম। তার চোখ দু’টো কেমন জ্বলজ্বল করছিল। একটি মেয়ে তার এক জীবনে অনেক বার অনেক ভাবে ভুল করে। ছোট খাট ভুল না জেনে করে, কিন্তু বড় সড় ভুল সে জেনেই করে! আমিও তেমন একটি ভুল করলাম। সেদিন প্রথম অলীকের বাসায় গেলাম। কি হতে যাচ্ছে খুব ভাল মতই জানতাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন, নিজেকে আটকানোর মত শক্তি আমার সেদিন ছিল না।

‘মা বীথি, দরজা খোল।’ মা এসে এমন ভাবে দরজা ঢাক্কাচ্ছে যেন আমি সিলিং ফ্যানে ঝুলে সুইসাইড করছি, এক্ষুনি দরজা ভেঙ্গে ঢুকে যা করার করতে হবে। ‘আসছি’ বলেও শুয়ে আছি। আমি খুব ভাল করেই জানি, মা কেন এসেছে। বিয়ে ঠিক হয়ে যাবার পর থেকে যখনই সুযোগ পাচ্ছে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, যা হচ্ছে আমার ভালোর জন্যই হচ্ছে। আমার মা-টা না যেন কি। আমি কি ক্লাস টেন পড়ুয়া কোন বাচ্চা মেয়ে যে এটা বুঝবো না, কেন আমার বিয়ে শামস্‌ ভাইয়ের সাথে হচ্ছে। ওহ্‌ আপনাদের তো বলাই হয়নি, আমার বিয়ে শামস্‌ ভাইয়ের সাথেই হচ্ছে। সেই শামস্‌ ভাই, যার প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বেড পার্টনার বদলাতে হয়।
আমরা তিন বোন, দু’ভাই। আমি সবার বড়। আমার পরের দু’টো বোন ক্লাস এইটে পড়ে। তারপর ভাই দু’টোর একটা সেভেনে আরেকটা সিক্সে পড়ে। সবচেয়ে ছোট বোনটা এ বছর ফাইভে উঠল। এদের পড়ার খরচ যোগাতে একটি বেসরকারি অফিসের আমার সামান্য কেরানি বাবার নাভিশ্বাস ওঠে। তাছাড়া ওনার হার্টের অসুখটা বেড়েছে। ডাক্তাররা বলে দিয়েছে, বেশিদিন বাঁচতে চাইলে দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। এসব আমি মায়ের কাছেই শুনি। খুব মায়া লাগে আমার। আমি চাই বাবা আরো অনেক বছর বাঁচুক। আমার ভাইবোনরা ভাল খাওয়া পরার সুযোগ পাক। যেদিন শামস্‌ ভাই তার অভিভাবকদের সাথে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এ বাড়িতে এল, সেদিন মায়ের খুশি দেখে মনে হচ্ছিল, স্বয়ং কোন ফেরেশতা তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতে এসেছে! সেদিন রাতে অনেকদিন পর মা আমার সাথে থাকতে এল। আমরা তিন বোন একসাথে শুই। মা তাদের অন্য রুমে পাঠিয়ে দিল। এটা- সেটা নানা কিছু বলার পর মা মূল প্রসঙ্গে এল। ছেলের আচার ব্যবহার, স্বভাবের অনেক প্রশংসা করল। একবার ভাবলাম বলি, ‘মা তোমার নম্র-ভদ্র এই ছেলেটা প্রতি সপ্তাহে মেয়ে পাল্টায়। মেয়েরা তার কাছে তুলতুলে মাংস পিণ্ড ছাড়া কিছু নয়।’ বলতে গিয়ে কেমন বাঁধল। শুধু বললাম, ‘মা আমি অন্য কাউকে পছন্দ করি।’ ছেলে কি করে জানতে চেয়ে যখন বললাম বেকার, মা মিইয়ে গেল। শীতল গলায় বাবার অসুখের কথা, ভাইবোনদের ভবিষ্যতের কথা যন্ত্রের মত বলতে লাগল। আমি দ্বি-মত করার চেষ্টাকে গলা টিপে মেরে ফেললাম।
বাড়িতে বাবা-মা, ভাইবোন ছাড়াও আরেকজন আছেন। তিনি আমার দিদা। বয়স সত্তরের কাছাকাছি, বিছানা থেকে উঠতে পারেন না, অথচ মেজাজ এখনো টনটনে। বাড়ির সবাইকে মেজাজ দেখিয়ে সুখ পান। তবে মাঝে মাঝে আমার সাথে খুব নরম গলায় কথা বলেন। আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনে বললেন, ‘বাতিরে(কেউ কাউকে আদর করে এমন নামে ডাকে!) তোর বাপ-মায়ে মিলে তোরে নাকি এক খাটাশের লগে বিয়া দিতাছে, সত্য নাকি? মনে রাগ রাখিস না রে বাতি, অভাব রে অভাব!’ শুনে কেমন কান্না পায় আমার।
আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি, আজ মন ভাল করার মত কোন গল্প বলতে পারলাম না। হয়তো অন্য কোন একদিন, অন্য কোন জনমে, যখন আমি অলীক নামের কারো জন্য অপেক্ষা করবো, কবে সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে আর আমাদের ছোট্ট সা্জানো সুন্দর একটি সংসার হবে আর... থাক এই গল্পটা সেদিনের জন্য তোলা থাক। মা অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে, যাই দরজাটা খুলি।


advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • রুহুল  আমীন রাজু
    রুহুল আমীন রাজু অনবদ্য রচনা। শুভকামনা।
    প্রত্যুত্তর . ৫ আগস্ট
  • মোঃ মোখলেছুর  রহমান
    মোঃ মোখলেছুর রহমান চরিত্রগুলো নিঁখুত ভাবে বর্ননার চেষ্টা করেছেন। যেমন- " বিছানা থেকে উঠতে পারেন না,অথচ মেজাজ এখনো টনটনে,,,," ভাল থাকবেন।
    প্রত্যুত্তর . ১০ আগস্ট
  • কাজী প্রিয়াংকা সিলমী
    কাজী প্রিয়াংকা সিলমী ভালো লাগল।
    'সেদিন প্রথম অলীকের বাসায় গেলাম। কি হতে যাচ্ছে খুব ভাল মতই জানতাম। কিন্তু বিশ্বাস করুন, নিজেকে আটকানোর মত শক্তি আমার সেদিন ছিল না।'...গল্পের এ দিকটা আরেকটু বিস্তৃত করলে কি হত তা...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ১২ আগস্ট

advertisement