"এই বার যে সম্বন্ধ আনছি, আপনি চাইলেও আর না করতে পারবেন না", লম্বা হাতল ওয়ালা কালো ছাতাটা বন্ধ করতে করতে বললেন ঘটক মমিন গাজী। 
- পাত্র কে ?
- পাত্র আপনার পরিচিত। 
- কে সে ? তার বাবা কি করে? 
-- পাত্র এই বয়সেই অনেক টাকা-পয়সার মালিক, ব্যবসা করে, বাড়ি-গাড়ি সবই আছে, এলাকায় প্রভাব-প্রতিপত্তিরও কমতি নেই। এলাকার সব লোক তারে মানে, পরিবারও ধার্মিক, ছেলের বাবা মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ। 
- এখনো বলতে পারলে না ছেলেটা কে? 
- ছেলে আপনারে খুব ভালো জানে, অনেক সম্মান করে, একেবারে সোনার টুকরো ছেলে ! 
- "তুমি কি শুধু প্যাঁচালেই পারবে?", বিরক্ত হয়ে বললেন কলেজ শিক্ষক আফজাল সাহেব। 
- ছেলে আমাদের এলাকার সন্তান রকি, সরকারের উপর মহলের সাথেও তার ভালো সম্পর্ক। 
শুনে চমকে উঠার সাথে সাথে কিছুটা কেঁপেও উঠলেন আফজাল সাহেব। 
রকি এলাকার চিহ্নিত চাঁদাবাজ, প্রকৃত নাম রইস উদ্দিন। তার মেয়ে অঞ্জলীর সাথেই এসএসসি পর্যন্ত পড়েছে, নেতা হয়ে উঠার তাগিদে পড়াশুনা আর হয়ে উঠেনি। মামলা আছে তার নামে কয়েকটা, বার কয়েক জেলও খেটেছে। 
- এই প্রস্তাব নিয়ে তার বাবা আসেনি কেন? 
- মফিজ সাহেব নিজেই আসতেন। কিন্তু মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে কমিটির সাথে তার মনোমালিন্য চলছে, আর আপনি কমিটির সেক্রেটারি। এজন্য তিনি আর আসেননি, আমাকে পাঠিয়েছেন। বিষয়টি রকির কানেও গেছে, শুধু আপনার দিকে চেয়ে কিছু বলেনি। 
- আমি ভেবে জানাবো, চা খান। 
- অন্যান্য প্রস্তাবের মতো এক্ষেত্রে কিন্তু 'না' বললে চলবে না, একজন উপযুক্ত পাত্রের যা যা থাকা দরকার, মাশাল্লাহ সবই আছে রকি বাবার। 
আর জানি, আপনি পড়াশোনার কথা বলবেন তো? চিন্তা কইরা দেখেন, পড়াশোনা কইরা কি কেউ এমন কামাই করতে পারবো ? আজকালকার দিনে পড়াশুনার চেয়ে টাকা পয়সার দাম অনেক বেশি। 
- বললাম তো, ভেবে জানাবো। 
- আরেকটা কথা আপনাকে জানাই, দিনকাল তো এখন কেমন, আপনি ভালোই জানেন। তার পরেও আপনার ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া সুন্দরী মেয়ের দিকে এলাকার কেউ চোখ তুলে তাকায় না এই রকির জন্যই। 
"সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তাড়াতাড়ি জানায়েন" বলে সালাম দিয়ে বিদায় নিলো ঘটক মমিন গাজী। 
ফুলস্পীডে ফ্যান চলতে থাকলেও ঘেমে ভিজে উঠলেন আফজাল সাহেব। ঘটক চলে যেতেই ড্রয়িং রুমে ঢুকলো অঞ্জলীর মা। 
- আমি ভেতর থেকে সব শুনেছি, চলো মেয়েকে তাড়াতাড়ি অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেই। 
- তুমি কি চাও, আরেকটি মিন্নি-রিফাতের মতো আরেকটি কাহিনী ঘটুক ?
- রকির সাথে বিয়ে না দিলে ওরা যদি আমাদের অঞ্জলীর সাথে নুসরাতের মতো কিছু করে বসে?
- তাইতো ভাবছি। 
- চলো আমরা পুলিশকে এ ব্যাপারে জানিয়ে রাখি। 
- তোমার কথা শুনলে মনে হয়, তুমি এই দেশের হালচাল কিছু বুঝ না !
- আসলে আজকালকার জমানায় মেয়েদের অধিকারের কথা বলা হলেও তারাই সবচেয়ে অরক্ষিত। 
আফজাল সাহেব জানেন, কাল সকাল হতে না হতেই সিদ্ধান্ত জানতে বাসায় হাজির হবে ঘটক মমিন। 
এই প্রথম নিজের একমাত্র মেয়েকেও তার কাছে 'বোঝা' বলে মনে হলো। একবার মনে হলো, মেয়েকে এলাকায় আসতে বারণ করে দিবেন তিনি, কিন্তু এভাবেই চলবে কতদিন? 
তনু-নুসরাত-মিন্নি-রিফাতদের বাবা মায়ের অসহায়ত্ব তিনি স্পষ্টতই এখন উপলব্ধি করতে পারছেন। ভাবতে ভাবতে আসর নামাজের জামাতের সময় পার হয়ে গেলো। তাই বাসায়ই নামাজ শেষ করে চোখ বন্ধ করে লম্বা মোনাজাত ধরলেন। 
মোনাজাত শেষ করে পাশে তাকাতেই দেখতে পেলেন চমকে দেয়ার জন্য কাউকে না জানিয়ে বাড়িতে চলে আসা অঞ্জলীকে। 
কিছু না বলে অঞ্জলীকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন আফজাল সাহেব। ঘটনার আকস্মিকতায় অঞ্জলীও বাবার সাথে কান্নায় যোগ না দিয়ে আর থাকতে পারলো না !