আমারা যারা সমাজে বসাবাস করি তারাই সামাজিক জীব। এখানে পশু-পক্ষীর কোন স্থান নেই, ভোলারও নেই। ভোলাকে কুকুর হিসেবে দেখি না, অথচ আমারা সমাজের কতটুকুই বা দায়িত্ব পালন করি, ও করে। অন্তত ঘেউ ঘেউ করে জানান দেয় ‘তোমরা সাবধান হও, কেউ একজন হয়তো তোমাদের অনিষ্ট করতে আসছে’। এটুকুই বা কয়জন মানুষ করে? অথচ মানুষই শুধু সামাজিক ও শ্রেষ্ঠ জীব। ভোলা নামটা বেশ ভালো লাগে আমার, কে বা কারা যেন নামটা দিয়েছিল। হলুদ আর লালে মিশিয়ে যে রঙটা পাওয়া যাবে ভোলার গায়ের রঙটা ঠিক সেটাই। সমস্ত শরীর পোড়া ইটের রঙ । লেজটা সাদা । পেটের তাগিদে অনেক ময়লা ঘেটেঘুটে খেতে হয়। সারাদিন রাত আমাদের অনেকগুলো বাসার চারিপাশে ঘুরে বেড়াবে আর কোন খাবার পেলে খাবে, না পেলে হয়তো না খেয়েই কাটাবে। তবে ওরা ঠিকই কিছুনা কিছু খাবার পেয়ে যায়। ওর খাওয়া না খাওয়া নিয়ে ভাবার সময় কই। খাবার নিয়ে ওরাও খুব একটা চিন্তিত নয়। মানুষ আজকাল পেট ভরে খেতে পারছে, হয়তো বেশিই খাচ্ছে, খেতে খেতে গলা অব্দি চলে আসে তখনই গতর খানা কোন রকম নাড়িয়ে উচিষ্ঠ কিছু খাবার রেখেই হাত ধুতে চলে যায় । তাই বলে ভোলাদের জন্যই ফেলে এমনটাও নয়। আর খেতে পারে না বলেই ফেলে । অপরিচিত কাউকে দেখলেই ঘাউ ঘাউ করে; ওর ডাকে দুরের কিছু সাঙ্গো পাঙ্গোরাও সিগন্যাল দেয় “তুমি চালিয়ে যাও ভোলা তোমার সাথে আমরাও আছি”। তবে ভোলা এখন আর সীমানা অতিক্রম করে না , ও জানে সীমা অতিক্রম করা ভালো না, তাতে বিপদ বাড়বে। ও যেটা জানে, মানুষ কি সেটা জানে ? হয়তো জানে, নয়তো জানে না । যৌবনে দু’চার বার প্রেমের টানে হয়তো সীমা অতিক্রম করেও ছিল, বেশ তাগরা আর সুগঠন চেহারা; দু’চারকে ঘায়েল করে ঠিকই হয়তো নিজের প্রেয়সীকে সময় দিতে পেরেছে। এখন কিছুটা বৃদ্ধ, বাসার নিচ তলার কলেস্টেবল গেটের বাহিরে সটান হয়ে ঘুমিয়ে থাকে । বর্তমানে ভোলাই আশে পাশের সকলের চেয়ে বৃদ্ধ, চেহারাতেও বেশ একটা মুরব্বি মুরব্বি ছাপ পরেছে । কড়মড় করে হাঁড় চিবিয়ে খেতেও পারে না । এক সময় পরতো । অথচ আমি এখন যৌবনের টাগরা যুবক। ইচ্ছে মতো সীমানা অতিক্রম করি । বেইলী রোড টু শাহবাগ সবখানে বিচরণ করতে পারি। চুটিয়ে প্রেমও করি দু’চারখানা সুন্দরিদের সাথে ।আজকাল একটা প্রেম করা তার জন্য জীবন যৌবন সপে দেয়া সে সব বাংলা সিনেমা নাটকে চলে । আমার অঢেল অর্থ।যদিও এত অর্থ কামাই করার মরদ আমার নেই। বাপের অর্থে ফুটানি করি।ভোলা যে পরিমাণ পরিশ্রম করে এঠো খাবার সংগ্রহ করে খায়, আমি তেমন মরদও নই। মাঝে মাঝে নিজেকে ভোলার চেয়েও বৃদ্ধ মনে হয়। বাবা না চাইতেই অনেক কিছু দেয়।বাইকে চড়ে এপfড়া ওপাড়া করি। বন্ধুরাও আমাকে বেশ সমাদর করে। জানি ওই সমাদরটা আমাকে না, আমার অর্থকে করে। আজকাল অর্থহীনদের আবার সমাদর আছে নাকি? এই যে ভোলা সেও তো আমায় কত্ত সমাদর করে। অল্প কিছু খাবার পাবে সেই লোভে ।আমাকে দেখেই লেজখানা নেড়ে এগিয়ে এসে পা চাটতে থাকে। ভোলা একদমই মিশ্রিত কুকুর না। বিশুদ্ধ এ দেশিও । হয়তো সে জন্যই কৃতজ্ঞতা বোধটুকু একটু বেশি। শেষ কবে ভোরের আকাশ দেখেছি মনেই নেই।অনেক রাত অব্দি বন্ধু আর প্রেয়সীদের নিয়ে নেশায় মত্ত থাকি। পার্টি প্রায় প্রতিদিনই থাকে।এই মুহূর্তে জীবনটাকে বেশ উপভোগ করছি। আমার অবাধ্য চলাফেরা দু’চারবার থানার মুখ দেখিয়েছিল।অবশ্য বাপের খেতাবী মর্যাদা বেশি সময় সেখানে থাকতে দেয় নি। ওখানেও সমাদর করে আমাকে দু’চারখানা ভালো মন্দ কথা শুনিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল।না ছেড়ে উপায় আছে নাকি? বাবা টাকা দিয়েছে তবে না ছেড়েছে।একবার তো বেপরোয়া বাইক চালিয়ে রিক্সার সাথে সংঘর্ষ হয়েছে। বেচারা আমার থাপ্পরও খেলো রিক্সার চাক্কাও গেলো । অবশ্য সে বাবাদ দু’শ টাকাও দিয়েছিলাম; নইলে কি আর সামাজে আমার মান থাকে? মান বাড়ানোর একমাত্র আর সহজ উপায় অর্থ। সেবার তো অনেক মদ গিলে মাতাল হয়ে রাতে বাড়ি ফিরছিলাম ব্যাস আর কি পুলিশ ধরলো। ওরা ওদের কাজ করে আমি আমার কাজ করি। মা বাবাও তো মাঝে মাঝে পার্টি করে রাত্রিরে মাতাল হয়ে ফেরে। ওদের ধরে না। ওরা নাকি সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তি।আরে বাবা আমি তো ওদের গন্যমান্য একমাত্র সন্তান।এলাকাতে অত্ত সুন্দর ছ’তলা বাড়ি দু’টা বিএমডব্লিউ নিউ মডেলের গাড়ি কয়জনের আছে ? শুনেছি নতুন ভাড়াটিয়া আসছে চারতলাতে। আচ্ছা ওদের কোন সুন্দর মেয়ে নেই? থাকলে বেশ জমবে।ক’দিন ফুর্তিতো করাই যেতে পারে । আজ একটু আগেই বাড়ি যাচ্ছি; দুপুরে অনেক দিন পর বাসায় খাবো।গলিতে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেলাম ভোলার একটা নতুন সঙ্গী হয়েছে। ওকে তো এ তল্লাতে কখনও দেখি নি; ভোলা এ বয়সে পারেও বটে।বেটা এক নম্বারের লুইচ্চা।আমাকে দেখেই দুলতে দুলতে কাছে আসলো ওর সাথি তো লজ্জাতে কোথায় যে লুকালো ।ভাবছি ভোলাকে একটু বেশি বেশি খেতে দেবো বেচারা নতুন একজন সঙ্গী পেয়েছে এ বয়সেও। বাসার কাজের বুয়াটা সব খবরই রাখে ওকেই জিজ্ঞেস করবো নতুন ভাড়াটিয়াদের ব্যপারে।বুয়াটাই আমাকে জন্মের পর কোলে নিয়েছে, খেলেছে খাইছে, স্কুল অব্দি নিয়ে গিয়েছে । কই আমার মা তো কখনই স্কুলে ধারে কাছেও যায় নি। এমন কি খাইয়েও দেয় নি। মায়ের অত সময় কোথায় ? এখনও আঠের পার করিনি, খুব জাকজমক ভাবেই আমার জন্মদিন পালন করে বাবা মা। সতেরটা বছর দেখেছি কত্ত আয়োজন করে ওরা। আমার বন্ধুরাও আসে।ওরাও হাভাতের মতো খায় আর খায়। যদি আমি আলাদা একটি পার্টি থ্রো করি সেদিন। সব বন্ধুরা থাকে, চরম উত্তেজনা আর আমোদে উদযাপিত হয় আমার জন্মদিন। এবার জন্মদিনে নতুন কাউকে বাইকের পিছনে চাই।



খালা খাবার টেবিল সাজাতে সাজাতে বললো-
‘জানেন ছোড সাহেব উপরে নতুন ভাড়াইট্টা আইছে’
হু শুনেছি;
বাড়ির বেডা পুলিশে চাকুরি করে, একক্ষানই মাইয়া।
বলো কি পুলিশের লোক!
আমাদের বাড়িটা ছয়তলা হলেও তাতে দু’তলা পুরাটাই সেফারেট। আলাদা ছাদ আলাদা বেলকুনি।সিঁড়িও আলাদা। ভাড়াটিয়াদের সিঁড়িও আলাদা। আমাদের সাথে ভাড়াটিয়াদের দেখা সাক্ষাত হয় না বললেই চলে।তবে আমি আমাদের ছাদে সকল ভাড়াটিয়াদের বেলকুনি স্পষ্ট দেখতে পাই, তারাও দেখতে পায়।আজ ভাবছি ছাদে যাবো।শুধু নতুন ভাড়ায় আসা মেয়েটিকে দেখতে। বলতে বলতে কলিং বেল বেজে উঠলো।

দেখো তো খালা কে এলে;
খুলছি বলেই খালা দরজা খুলতে গেলো
কে খালা ? কোন উত্তর আসে নি।
একটু উঁকি দিতেই দেখি নীল সেলোয়ার কামিজ পরিহিত সুন্দর একজন রমনি।কোন আলাদা ফ্যাশন নেই, একদমই ঘরোয়া বাঙালী পোশাক। খালাকে তাকে ভিতরে এসে বসাতে বললাম।
আমরা উপরে ভাড়া আসছি; আমাদের বেসিনের কল থেকে পানি পরছে না। বাকি কলগুলো ঠিকই আছে।কল যদি একজন মিস্ত্রী এনে ঠিক করে দিতেন ভালো হতো।
খালা তো অবাক, বলেন কি আফা সেজন্য তো কেয়ার টেকর আছে তাকে গিয়ে বলেন, এহানে আইছেন ক্যান ?



আপনাদের কেয়ারটেকার সাহেবের নাম্বারটা দেয়া যাবে, কারণ আমি তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি হাতটা কোন রকম ধুয়ে মেয়েটির সামনে গিয়েই বললাম আসুন না আসুন ভিতরে।
খালা তো আমার এমন কথাশুনে আকাশ থেকে পড়লো।
কি বলেন ছোড সাহেব? ভাড়াটিয়াকে ঘরে বসাইবেন! বড় সাহেব কিন্তু রাগ করবে, তাছাড়া এ যাবৎ তো কেউ ঘরে এসে বসেছে বলে আমি দেকি নি।
কেন? ভাড়াটিয়া বলে কি তারা মানুষ নয়?
আহা! খালার কথায় কিছু মনে করবেন না; ও একটু বেশি বেশিই বলে।আসুন না বসুন;
না বসবো না, আমাকে আপনাদের কেয়ারটেকারের নাম্বারটা দিন।



নাম্বার নিয়েই মেয়েটি চলে গেলো। কই নামটাই তো জানা হয় নি, কোথায় পড়াশুনা করে কিছুই তো জানা হলো না। আরেক দিন দেখা হলে জানা যাবে। তবে খালাই সব মাটি করে দিল। খালাটাও; যাচ্ছে তাই। ধুর।হেব্বি জমিয়ে তুলতে পারতাম। এটাকেই আমার জন্মদিনের ট্রফি করে সারা এলাকায় ঘুরবো।
অবশ্য মেয়েদের কে এতটা সস্তা ভাবাটাও ঠিক নয়। সব মেয়ে কি আর টাকার কাছে বিক্রীত পণ্যের মতো ধরা দেয়।মেয়েটার মধ্যে আগুন আছে। আমাকেও পানির মতোই রঙ পাল্টাতে হবে। এ ধরনের মেয়েরা সাধারণত রাফ টাফ ছেলেদের পছন্দ করে না।নম্র ভদ্র আর সাহসি ছেলেদেরই এদের ভালোবাসার মানুষ করে নেয়।আমার মতো অনেকগুলো প্রেমের মধ্যে এরা বিচরণ করে না। এরা যাকে ভালোবাসবে তাকেই বিয়ে করতে চাইবে। তাকে নিয়ে হাজার স্বপ্ন দেখবে, যত্তসব সনাতনি চিন্তা ভাবনা ।



একরাশ বিরক্তি নিয়ে খালাকে ডাকলাম;
খালা খালা, কোথায় গেলে ?
তোমাকে না বলেছি আমি যখন কারোর সাথে কথা বলবো তুমি কোন কথা বলবে না। মেয়েটার সামনে ওসব কথা বলার কি দরকার ছিল?
ওমা! আমি আবার কি কইলাম? ভাড়াটিয়া এ পর্যন্ত কেউ এ বাড়ির ভিতরে এসে বসে নি, তাই তো শুধু কইলাম।
না; এথন থেকে ওসব কথা বলবে না। কখনই না।তাদের সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসতেই পারে। শোন আমি বাইরে যাচ্ছি বাবা মাকে মেয়েটি কথা বলার দরকার নেই।আর আমি যে দুপুরে বাসায় খেয়েছি সেটাও বলার দরকার নেই।


এইতো এলেন ছোড সাহেব আবার কই যাইবেন?
সেটা তোমার না জানলেও চলবে বুঝলে।
বিকেল হতে তখনও প্রায় ঘন্টাখানেক সময় আছে।ছাদে গিয়ে ইজি চেয়ারে রেষ্ট নিতে নিতে নিশ্চই বেলকুনিতে মেয়েটি আসবে।চোখাচোখি হলেও হতে পারে।ধুর একটা মেয়ে পটানোটা সত্যিই খুব কঠিন কাজ। অথচ ভোলা সেই কাজটা কত্ত সহজেই করে। যদিও ভোলা পরিশ্রমি,সৎ আর এলাপাথাড়ি জীবনযাপনও করে না। ভোলাকে দেখলে সত্যি হিংসে হয়। কি’যে ভাবি না আমি; ভোলা কুকুর জাতের, আর আমি মানুষ।আমার সাথে ওর সাথে কখনই যায় না। মুচকি হেসে ছাদের দিকে রওনা দিলাম। অনেক অপেক্ষা করেছি যদিও এই অপেক্ষা টপেক্ষা করার মতো ধর্য্য আমার মোটেও নেই, শুধু এই মেয়েটার জন্য একরাশ বিরক্তি নিয়েও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এলো না; প্রথমবার কোন কাজে ব্যর্থ হলাম।আমি তো ব্যর্থ হতেই জানি না। সকাল বিকেল অনেক অপেক্ষা শেষে একদিন তো দেখা হবেই। হলোও তাই-
শুনছেন; শুনুন প্লিজ
আমি মোহনা; মোহনা বলে ডাকলেই খুশি হবো।
আমি ধূসর, মানে আমার নাম ধূসর।
আপনাদের বেসিন কি ঠিক হয়েছে ?
আপনারা তো কেয়ারটেকার দিয়ে ভাড়াটিয়াদের খবর নেন। তা আজ আপনি নিজেই নিচ্ছেন। কেন ?
দেখুন সেদিনের খালার কথায় কিছু মনে করবেন না। আসলে বাবা মা তো বাসায় থাকেন না তেমন দু’জনই কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকে, আমিও খুব একটা বাসায় থাকি না।
কেন? আপনিও কি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন নাকি?
ইয়ে মানে, না আমি একটু বন্ধুদের বেশি সময় দেই।ওদের নিয়েই আড্ডা দিতে দিতে সময় পার করে দেই।
ও আচ্ছা!আমাদের বেসিনটা ঠিক করানো হয়েছে। তো আর কিছু বলবেন ?
জ্বি; আপনি তো পড়াশুনা করছেন তাই না ?
হু; ইলেভেন অব্দি পড়ে এখানে সেকেন্ডিয়ারে ভর্তি হয়েছি।
কোন কলেজ জানতে পারি;
অবশ্যই; ঢাকা ইম্পেরিয়াল কলেজ, বনশ্রী শাখায়। কেন বলুন তো ? হঠাৎ এত কিছু জানতে চাচ্ছেন।
কলেজে;
আচ্ছা; পরে আমাদের নিশ্চই কথা হবে।
দেখা হলে অবশ্যই হবে;



মেয়েটার চোখে কি যেন একটা মায়া আছে। একটা যাদু আছে; নিমিশেই অভদ্রকে ভদ্র করে করে দেয়। নইলে আমার মতো একজন অভদ্র আর নষ্ট ছেলেকেও কেমন ভদ্রতার বেঁড়া জালে আঁটকে দিয়েছে।আমি জানি চাইলেই ভদ্র নামক শব্দটার সাথে আমার কখনই বন্ধুত্ব হবে না। তবু মেয়েটাকে আমার বন্ধু করতে চাই। অন্তত সে জন্য হলেও আমাকে কিছুদিন ভদ্রতার লেবাস ধরতেই হবে। বাবাকে বলে আমি আবার কলেজে ভর্তি হবো। আবার পড়াশুনা করবো।আমাকে আবার ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হতে হবে। অন্তত মোহনার সাথে বন্ধুত্বটাতো হবে। যদিও ইম্পেরিয়াল কলেজটায় ভর্তি একটু কঠিন তবু বাবা নিশ্চই তার লোক জন ধরে সেটা করতে পারবে। এবং সেটাই হলো-

বন্ধুদের সাথে আড্ডা নেই, কোন নেশা করি না, বাইকটাতেও ধুলো জমে গেছে। রীতিমতো প্রতিদিন ক্লাস করতে হচ্ছে। মোহনার সাথে প্রায় প্রতিদিন আমার কথা হয়। দু’জনে বেশ ভালো বন্ধু হলাম। জীবনটা সত্যিই অনেক সুন্দর লাগতে শুরু করলো। একটা সময় তো নিজেকে নষ্ট নর্দমার কীট মনে হতো। এখন সেখান থেকে আমি আস্ত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি। বাবা মা তো বদলায় নি, তারা তো নিয়ম মতো সেই রাত করে বাসায় ফেরে, পার্টি করে,ড্রিং করে বাসায় আসে। আমি তা দেখেও না দেখার ভান করি। নিজের পড়াশুনাতেই মনোযোগ দেই। মোহনা আমার জীবনাটা পাল্টে দিয়েছে। ওর কাছে ভিশন ভাবে আমি কৃতজ্ঞ।

ইদানিং মোহনার বাসায় একটি ছেলে এসেছে, বেশ সুঠাম, আর ভদ্র। হয়তো মোহনাদেরই কোন আত্মীয়। মোহনা তাকে নিয়ে মার্কেট কিংবা খাবার খেতেও বাহিরে যায়। ওকে কি আজ জিজ্ঞেস করবো; কে এই সুবদ বালক ? নাকি মোহনা নিজেই বলবে? ও যদি বলে তো ভালো। না বললে আমি নিজেই জিজ্ঞেস করবো।

সেদিনই মোহনা ছেলেটাকে নিয়ে কলেজে গেলো, আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
ধূসর এ হচ্ছে আমার কাজিন; সাইফুল।
ও হায় আমি ধূসর।
সেদিন অনেক আড্ডা হলো কলেজ ছুটির পর।
সাইফুল ডাক্তারি পড়তে চায়। খুব ভালো স্টুডেন্ট।কিন্তু যখন শুনলাম মোহনা আর সাইফুল দু’জন দু’জনকে ভালোবাসে মনে হচ্ছে নিজেকে শেষ করে দেই। অনেক কেঁদেছি-

কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিলাম, ধূলোমজা বাইকটাকে আবার সচল করলাম। বন্ধুদের আড্ডা আর মদে মদে নিজেকে শেষ করা শুরু করলাম। ভেবেছিলাম মোহনা আমার একান্ত আমারই। আমার জীবনটাই এমন। ভালোবাসা আমার জন্য নয়। কেউ আমাকে ভালোবাসে না। বাবা মা এমন কি মোহনাও না। শুধু মাত্র এই মদই আমাকে ভালোবাসে। মোহনাকে পাবো না জানি; ভোগ তো করতেই পারি। শপথ নিলাম। সেই নোংরা ধূসরে পরিণত হলাম আবার।


রাত তখন ক’টা নয়টা হবে হয়তো; বন্ধুদের নিয়ে প্রচন্ড মদ খেয়েছি, দেখলাম মোহনা সেই ছেলেটির সাথে বাসায় দিকেই যাচ্ছে। সাথে তিনজন বন্ধু; কাছে গিয়ে মোহনার কে বললাম তুমি কেন এই ছেলেটাকে ভালোবাস? আমি কি’সে অযোগ্য আমার এত্ত বড় বাড়ি, গাড়ি, অর্থ সম্পদ কি নেই আমার। আমি তো এই গাধাটার চেয়ে দেখতেও সুন্দর। মোহনা আমার গালে চরটা না বসালে হয়তো আমি তাকে সেদিন ছেড়েই দিতাম। কিন্তু তা করতে দিল না। মাথাটা গরম হয়ে গেলো।এই প্রথম কেউ আমার গায়ে হাত তুললো। আর সেই সাইফুল গাধাটাও সুযোগে দু’চারটে কথা শোনালো।

হাতের বোতলা ভেঙ্গেছি সাইফুলের মাথায়; আর মোহনাকে কাঁধে করে আমাদের ঢেঁড়ায় নিয়ে গেলাম।মোহনা চিৎকার করেও কোন লাভ হয় নি। ওর সমস্ত শরীরটাকে আমি ভোগ করেছি। সারা রাত ভোগ করেছি।


আমার এ বয়ানেই হয়তো আমার যাবৎ জীবন নয়তো ফাঁসি হবে। এমন নষ্ট জীবন দিয়ে কি হবে ? আমার মতো ধূসর সমাজের কীট। বাবা বহু উকিল ব্যারিস্টার লাগিয়েও আমার জন্য কিছুই করতে পারতে পারবেন না। আমার স্বীকারোক্তি আমাকে এই নষ্ট জীবন থেকে অন্তত বাঁচাবে। একজন কে আহত করেছি, ধর্ষন করেছি ষোরশি যুবতীকে। আমার কি আর রক্ষা আছে ? এমন জীবন কে বা চায় ? যাদের বাবা মা থাকতে তাদের স্নেহ মমতা থেকে বঞ্চিত থাকে, অর্থের দম্ভে মানুষকে মানুষই কখনও ভাবে নি। বাবা আর মাকে কে শুধু শেষবারের মতো একটি কথাই বলেছিলাম, আমার চিন্তা করো না, তোমাদের আদর,স্নেহ আর ভালো ভালো খাবার সবটাই পাড়ার ভোলাকে দিও । আমি তোমাদের কু-সন্তান তাই বলে ভোলা তোমাদের সাথে বেঈমানী করবে না। যেটা মানুষে করে সেটা কুকুরে করে না। ওরা খুব প্রভু ভক্ত।