আজ আমিও শিক্ষক, বাবু আজ আমাদের মাঝে নেই, সেই নিষ্ঠাবান শিক্ষাগুরু না থাকলেও তার আদর্শ আর সততা বুকে লালন করে অন্যান্য বাচ্চাদের পড়াচ্ছি, তাদের মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছি। আর এর মতো পবিত্র দায়িত্ব কোন পেশাতে আছে আমি জানি না। জানি না কতজন মানুষের মতো মানুষ হবে। সকল আদর্শবান শিক্ষককে প্রণাম, বাবুকে প্রণাম। একজন আদর্শ শিক্ষক গড়ে ‍তুলতে পারে আদর্শ পরিবার, সুশিক্ষিত সমাজ, আর সুন্দর দেশ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশিক্ষক (অক্টোবর ২০১৯)

বাবা যখন শিক্ষক
শিক্ষক

সংখ্যা

nani das

comment ০  favorite ০  import_contacts ৯২
বাবারা তো বাবাই হয়, বাবা কি করে শিক্ষক হয় ? তের-চৌদ্দ বছরেও প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক করতো। উড়ন্ত-বাড়ন্ত যাই বলুন বয়সের কারণে সব কিছুই রঙিন দেখবো এটাই তো স্বাভাবিক। বাবা কে ‘বাবু’ বলতাম। বাবু’র অনেকগুলো কলিজার মধ্যে আমিও ছিলাম। মর্নিং সিফট তাই মেয়েদের ক্লাস টিচার ছিলেন। আমি তখন সবে নবম শ্রেণী’র ছাত্র । একদিন হঠাৎ করেই বাবাকে আমাদের ক্লাসে প্রবেশ করতে দেখলাম। সেদিন অংক শিক্ষক আসেন নি। সবাই আমার দিকে আঁড় চোখে তাকিয়ে হাসছে। আমি বেশ দেমাগ নিয়ে বাবু’র চোখের অন্তরালে ওদের কয়েক ঘা দিলাম। এর মধ্যে বাবু এসেই ধরলেন-
“এই ছেলে বলোতো, এই অংকটা কোন সূত্রের সাহায্যে করা হয়েছে।”

সেদিন দু’টো অপরাধ করেছি, সেই শিক্ষককে ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করেছিলাম, দ্বিতীয়ত সূত্রটাও বলতে পারি নি। অগত্যা বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে হলো, আমার সাথে বেঞ্চের উপর দাঁড়ানোর মতো সমব্যথী বন্ধু পেলাম না। খুব লজ্জা পেয়েছিলাম সেদিন। শিক্ষকের ছেলে বলে অনেক শিক্ষক আমাকে পড়া না পারলেও শাস্তি দিতেন না বোঝাতেন, সাদা খয়েরী ডোরা কাটা বেতের বারিও খাইনি কখনও, আর আজ কি’না ….

সেদিন বুঝলাম বাবারা স্কুলে বাবু হয় না, শিক্ষকই হয়। কিন্তু শিক্ষকরা তো বাড়িতে ঠিকই বাবু বা বাবা হয়। আমি সে সুযোগের অপেক্ষাতে আছি। বাসায় গিয়ে মা, বোন সবাই কে বিষয়টা অত্যন্ত ক্ষোভ নিয়ে উপস্থাপন করলাম। বুঝলাম না সবাই আমার সাথে সমব্যথী হলো নাকি আমার ক্ষোভের আগুনে জল ঢেলে দিলো। খেতে বসে দেখি বড় মাছের মাথাটা আমার পাতেই দিয়েছে, সাথে অন্যদের তুলনায় দু’চার পিচ মাংস বাড়িয়ে দিল।আমাকে আজ একটু বেশিই খাতিল করছে। নিজ বাড়িতে আমি কেমন যেন অতিথি।

খাবার টেবিলে খেতে খেতে বাবু বললেন-




‘সাজাটা তোমার দরকার ছিল, বাসায় আমি তোমার সব আব্দার মিটাই বলে স্কুলেও সেটা করবো এমনটা নয় কিন্তু। সামনে ক্লাস টেন এ উঠবে এস এস সি পরীক্ষা দেবে, পাশ মনে হয় করতে পারবে না। এখনও সুযোগ আছে আমি বাসায় মেয়েদের ব্যাচে পড়াই সেখানে ঘন্টাখানিক বসো, পড়াতে মন দাও, বন্ধুরা কেউ তোমার সাথে সহমর্মী হয়ে ফেল করবে না। দেখলে না, আজও কেউ তোমার দুঃখে পড়া না পেরে বেঞ্চে দাঁড়ায়নি’।

আমি প্লেটে খাসির মাংস ফেলে কখনই উঠবো না,শপথ নিয়ে খেয়েই যাচ্ছি, তাতে বাবু যত যাই বলুক, আবার বাসায় ব্যাচে মেয়েদের সাথেও পড়তে বসবো না । মাকে একটু ঝোল দিতে বললাম।

ততক্ষণে বাবু তার থালা থেকে আরো এক পিচ মাংস আমাকে দিয়ে বললো-
‘আজকের লজ্জাটা তোমাকে আশাকরি ভালো ছেলেদের তালিকাতে নাম লেখাবে’।

আচ্ছা যারা ভালো ছাত্র তারাই কি শুধু ভালো ছেলে? এই যে, তপন, মঞ্জু, অসিম, হারবাল, ওরা তো আমার চেয়েও খারাপ ছাত্র, কিন্তু আমাকে কত্ত ভালো জানে। কোথাও ঘুরতে গেলে আমার তো কোন টাকাই লাগে না, ওরাই দিয়ে দেয়।

মা আর বোনেরা হাসছে; মা বললো-
‘আচ্ছা এই হারবালটা কে?
ততক্ষণে বাবা হাত ধুয়ে টেলিভিশনের রুমে চলে গেছেন। হারবালটা হচ্ছে হার্দিক গোমেজ, ওর বাবা হারবাল চিকিৎসক। তাই ওকে আমরা মজা করে হারবাল বলেই ডাকি।

আর তোকে কি বলে ডাকে ?
ওরা আদর করে গিট্টু ডাকে, কেন গিট্টু নামটা কি খারাপ নাকি ? আমার তো বেশ লাগে।

বাসায় আমি কখনই নিয়ম করে বাবু’র কাছে পড়তে বসতাম না।


এক বছর পর…….

অতপরঃ সময় এলো এস এস সি পরীক্ষার । টেস্টে অংক আর ইংরেজীতে খারাপ করেছি, ফেল শব্দটা কেমন যেন। স্কুল থেকে তো পরীক্ষাই দিতে দেবে না। সহকারি হেডমাষ্টার মশাই তো বলেই বসলেন-
‘দেখ তুই এবার পরীক্ষা দিস না, সামনের বার দে, এবার যদি তুই পাশ করতে পারিস তবে তো স্কুলের চেয়ার-টেবিলগুলোও পাশ করে যাবে’।
খুব অপমান জনক কথা বলতে পারে বলে ভদ্রলোকের বেশ দুর্নাম রয়েছে।

বাবু কোন রকম হেড মাষ্টার মশাইকে বলে কয়ে পরীক্ষায় বসার অনুমোতি পত্রখানা বের করলেন। যদিও শর্ত ছিল আমাকে পাশ করতেই হবে।
যথারীতি পনের দিন বাবু’র কাছে একাই দু’বেলা করে পড়তে বসতাম, পরীক্ষা দিতাম। ঐ পনের দিন বাবু ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু । যদিও তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন আমাকে শিখিয়েছেন।

রেজাল্টের দিন-

আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, বাবু স্কুলে গেলেন রেজাল্ট আনতে। এত টেনশন নিয়ে কি সবার সামনে বসে থাকা যায় ? দোতালা বাড়ির ছাদে উঠে এক কোণে লুকিয়ে বসেছিলাম।
বাবু অনেক জোরে আমাকে ডাকছে-

‘হতচ্ছাড়া নেমে আয় বলছি, ঘরে আয়’।

বুকের ভিতরের পাঁজড়গুলো গুড়ো পাউডার হতে শুরু করলো। পা থেকে মাথা অব্দি সব ঠান্ডা হতে লাগলো। কোন বাঁধা না মেনেই চোখ বেয়ে জল পড়েছে । কি হবে আমার বেঁচে থেকে। আমি কি করে সবার কাছে মুখ দেখাবো ? ভাবতে ভাবতে হাতখানা ধরে টানতে টানতে বাবু আমাকে ঘরে নিয়ে গেলেন।

সবাই আমাকে দেখছে; আমি যেন একটা ক্রাউন, সার্কাস দেখবে এখন সবাই আর মজা করবে। সবার মুখমন্ডলে একটা আশ্চর্যের ছবি ভাসছে।

বাবু বললো কি করেছিস ? পাশ থেকে কে যেন বললো এটা কি করলি ?
আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম, মাথাটা নিচের দিকেই ছিল।
মা এসেই মিষ্টি একখানা মুখে পুরে দিল জোর করে।
‘ছেলেটাকে আর কাঁদিও না, ভয় পেয়েছে খুব’।
বাবু আমাকে তার বুকে টেনে নিয়ে বললেন-
‘তুই প্রথম বিভাগে পাশ করেছিস, সাথে তিনটি লেটারও আছে’।
সেদিন বুঝলাম আমার বাবা আমার যেমন বাবু তেমন শিক্ষকও । তিনি আমার অনেক কিছু’র শিক্ষাগুরু। বই পুস্তক ছাড়াও তাঁর কাছে আমি সততা, নিষ্ঠা শিখেছি। ভালো মানুষ কি করে হতে হয় তাও তাঁর মধ্যেই দেখেছি। আমার প্রতিটি রক্ত কণিকাতে তার সকল শিক্ষা বহমান প্রতিনিয়ত।

আজ আমি শিক্ষক, বাবু আজ আমাদের মাঝে নেই, সেই নিষ্ঠাবান শিক্ষাগুরু না থাকলেও তার আদর্শ আর সততা বুকে লালন করে অন্যান্য বাচ্চাদের পড়াচ্ছি, তাদের মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছি। আর এর মতো পবিত্র দায়িত্ব কোন পেশাতে আছে আমি জানি না। জানি না কতজন মানুষের মতো মানুষ হবে। সকল আদর্শবান শিক্ষককে প্রণাম, বাবুকে প্রণাম। একজন আদর্শ শিক্ষক গড়ে ‍তুলতে পারে আদর্শ পরিবার, সুশিক্ষিত সমাজ, আর সুন্দর দেশ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement