বদ্বীপের বংশী মাতার নামটি মুখে আসার সাথে সাথেই হৃদয়ে একটা মোচড় দিয়ে মনকে নিয়ে যায় সোনালী দিনের পরে নিরন্তর দুর অতিতের স্মৃতির পদটীকার বেদনাদায়ক নৈরাশ্যের এক বিভিশিখাময় অধ্যায়ে।ইতিহাস ও সংস্কৃতি হতে বাংলার প্রাচীনতম যে ইতিহাস পাওয়া যায় তার নির্যাস হচ্ছে যুগ যুগ শত বছর ধরে মানবতার উপর নির্মমতা। শক্তিশালী কতৃক দুর্বল অসহায়দের উপর আক্রমন এবং তাদেরকে জিম্মি করে গোলামে পরিনত করা।খৃষ্টীয় চার শতকে বাংলায় গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত মানবতার উপর নির্মমতার ইতিহাস বৈদ্যিক পুরানে না থাকলেও পরবর্তীতে সাত শতকে শশাংকের ক্ষমতা দখলের সময় উভয়ের প্রভাবে বাংলার সাধারণ মানুষ ছিলো আতংকে সে ইতিহাস চীরন্তন,যে দল যাকে সামনে পেতো তাঁকে সে ভাবেই তারা ব্যবহার করতো,নিরিহ মানুষ হতো বলীর পাঠা।শশাংকরা ক্ষমতায় বসার পর তাদের দলবলেরা ভোগ করতো রাষ্টের সব সুযোগ সুবিধা আর বাংলার নিরিহ মানুষরা ছিলো অসহায় প্রজার ন্যায়,তবে সপ্তদশ শতকের রাজা শশাংকই বাংলার প্রথম রাজা ছিলো।শশাঙ্কের মৃত্যুর পরবর্তী একশ বছর বাংলায় কোনো স্থায়ী সরকার ছিলো না বললেই চলে। সমগ্র দেশ অভ্যন্তরীণ কলহ- কোন্দলে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন এবং বৈদেশিক আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছিল।পাল বংশের ইতিহাসে এটাকে মৎসায়নের যুগ বলা হয়।পাল,দেব,সেন যত দলের ক্ষমতার পালা বদল হয়েছে সব সময় নির্যাতিত নিপিড়িত হয়েছে এবং বলীর পাঠা হয়েছে এ দেশের আপামর নিরিহ জনগণ।লক্ষন সেনের পরাজয় এবং পর্যায়ক্রমে বাংলার স্বাধীন প্রথম সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ থেকে শেষ সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ পর্যন্ত এবং বাংলার নবাব মুর্শিদকুলিখাঁ থেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত বাংগালী জাতি ত্যাগের মহিমায় রক্তস্নানের সাথে বেশি পরিচিত।বৃটিশ বেনিয়াদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনেও অসংখ্য বলিদান জাতি দেবার পর ইংরেজরা বিতাড়িত হয়েছিল। জাতি তখন কিছুটা সস্থির নিঃশ্বাস ফেলে ছিলো।পূর্ব বাংলার মানুষেরা নীল কুঠির গোলামী মুক্ত হয়েছিলো। মনে করেছিলো এখন হইত মুক্তির দিন। সামনে আরো কঠিন বলিদান ত্যাগ অপেক্ষা করছে এটা তখনও মনে হয়নি।ভারত স্বাধীনের পর ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রান হারিয়েছে হাজারো জনতা।রক্ত ঝরা যেন থামছেই না।একদিকে সরদার প্যাটেল অন্যদিকে লিয়াকত আলী খানদের মতাদ্বন্দে সাধারন মানুষকে বলির পাঠায় পরিনত করেছিল।ভারত ভাগের পক্ষ শক্তি জওহারলাল নেহেরু সরদার প্যাটেল পরবর্তীতে মিঃগান্ধিও রাজী হলো,ভারত বিভক্তির বিরোধিতা করেছিলেন শুধু মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। সে ইতিহাস আজো চোখে ভাসে।সাহিত্যে আমি ইতিহাস লিখতে চাইনা।আমরা বাংগালী আমাদের অতীতের আত্মদান ত্যাগগুলো পরবর্তীরা যাতে জানতে পারে কোথায় থেকে কিভাবে বাংলাদেশ পেলাম সে জন্য কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছি মাত্র।আবার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিভক্ত হলো ভারত।জন্ম নিল পাকিস্তান,আমরা বাংগালীরা পড়লাম পূর্ব পাকিস্তান নামে,পাকিস্তানের রাষ্টীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করলো পশ্চিম পাকিস্তানের রাঘোব বোয়ালদের দ্বারা,পূর্ব পাকিস্তানের বাংগালীরা যেন আবার নীল কর্তাদের গোলামীর মত পশ্চিম পাকিস্তানের গোলামীর খপ্পরে পড়তে যাচ্ছে এবং পড়ে গেছে।মুখের ভাষা,মায়ের ভাষা,ন্যায্য সব মৌলিক অধিকার কাড়া শুরু করলো ওরা।অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাংগালী জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলো শুরু হলো এক নুতন বিপ্লব।এতদিন যত বিপ্লব হয়েছে তা বাংলা,উর্দ্ধু,হিন্দি মিলে আর এখন তেজ দীপ্ততা সামনে নিয়ে মনে হচ্ছে বদ্ধ বারুদ বিষ্ফোরিত রূপ ধারন করেছে বাংগালীর বিপ্লব।বিশ্বের মানুষ অনেক যুদ্ধ সংগ্রাম দেখেছে,অনেক দেশের স্বাধীনতা কামীরা যুগ যুগ বিপ্লবের পর স্বাধীন হয়েছে তা আবার কখনো এগিয়ে কখনো পিছিয়ে কিন্ত আমার বদ্বীপের বংশীমাতাকে উদ্ধারে সোনার বাংলাদেশের সোনার বিপ্লবী সন্তানেরা সম্মুখ সমরে পিছিয়ে বিজয় অর্জন করেনি।পৃথিবীর মানচীত্রে বদ্বীপের বংশী মাতার স্থান করে নেবার জন্য দীপ্ত শপথে মায়ের কদমে সালাম করে ঘর হতে বেরিয়ে নেমেছিল রনাঙ্গনে বিজয় পতাকা না নিয়ে আর ঘরে ফিরবেনা।পাক হানাদার নিয়মিত বাহিনীর নির্মমতার সম্মুখ সমরে বাংগালী জাতি বদ্বীপের বংশী মাতার জন্য নিজের বুকের তাজা রক্ত,ইজ্জত সম্ভ্রম, সন্তান,স্বামী নিবেদিত প্রানে সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছিল।বাঙ্গালীর প্রতি যে নির্মমতা চলছিল তা দেখে দূর হতে শয়তানও হইত সেদিন কেঁদেছিল,কিন্ত পাক হানাদারদের নৃশংস নির্মমতায় মনে একটু দয়া হয়নি।আধো আধো বলে তোতলামীতে ডাকা আদরের শিশুটিকে মায়ের কোল হতে যখন ছিনিয়ে নেয় শিশুটি ঘাড় কাত করে মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে ছিলো তখনো ওদের মনে ওদের সন্তানদের কথা মনে হয়নি,ওকে নির্মম ভাবে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল সেদিন মা দেখেছিলো তার আদরের সন্তানকে আগুনে পুড়তে।আজো মায়ের মনে সে সন্তানের আর্তচিৎকার শোনা যায়। এ রকম হাজার কোটি হৃদয় বিদারক ঘটনায় জর্জরিত হয়েই স্বাধীন করেছিলো বাংলাদেশ। বংশী মাতাকে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে দিতে যারা মজলুম হয়ে শহীদ হয়েছে মনে হয় যেন সেই মজলুমদের আর্তচিৎকার মাটি ফুড়ে প্রতিধ্বনীত হচ্ছে।বাংলার মায়েরা আপনজন হারানোর হাজারো দুঃখ বেদনা বুকে লালন করে বংশী মাতার ন্যায় বাশির মত করে স্বাধীনতাকে ধরে আছে।বাড়িতে শুধু বিচ্ছিন্ন বিরহ বেদনার সুর ভেসে আসছে।মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলো মুক্তির,স্বপ্ন দেখেছিলো ন্যায়ের,সাম্যের।দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ক্লান্ত জাতি চেয়েছিল নিরাপদে বদ্বীপের বংশী মাতার কোলে মাথা রেখে একদন্ড ঘুমাবে।আশা আকাংখা প্রত্যাশা সবই ঠিক ছিলো কিন্ত দুইশত বছরের সাদা চামড়ার পাগলা কুত্তার কামড়ের বিষ নিঃশেষ হয়নি।হিংসা,বিদ্বেশ,খুনাখুনি,রাহাজানি,হত্যা,গুম,ধর্ষন,ঘুষ,লুটপাট সবই বৃটিশ আর পাকদের শিখানো চরিত্রের অংশ যার কারনে স্বাধীনতা পেয়েও শান্তি পাচ্ছেনা আমার বদ্বীপের বংশী মাতার সন্তানেরা।এদেশের মানুষ কবে শুনবে আর অফিসে ঘুষ নেই,কবে শুনবে বাঙ্গালী দ্বারা আর বাঙ্গালী খুন হবেনা?কবে শুনবে কোন মায়ের সন্তান আর গুম হবেনা?পথে ঘাটে মায়েরা কবে চলবে নিরাপদে? কবে বন্ধ হবে স্কুল কলেজে নির্যাতন? কবে শুনবো যে শিক্ষক দ্বারা আর ছাত্রী নিপিড়নের স্বিকার হচ্ছেনা।কবে শুনবো পিতামাতার কাছে আবার সন্তান নিরাপদ? আর কত শূন্যতা।এ সবই বদ্বীপের বংশী মাতার সন্তানদের চাওয়া।জানিনা তাদের এ প্রত্যাশা পূরনে আবার কোন বঙ্গ বন্ধুর আবির্ভাব হবে বদ্বীপের বংশী মাতার কোলে।