আম্মার সবকিছুতেই আদিখ্যেতা- বিশ-বাইশ বছরের কল্পনাবিলাসী তরুণীর জন্য এগুলো মানায়, কিন্তু মধ্যবয়সী একজন মহিলার এমন খেয়াল অদ্ভূত লাগে। এমনিই কী হুমায়ুন আহমেদের রোমান্টিক গল্পের সব নায়িকা অল্পবয়সী হয়!

‘অপি, আমি ছাদে পাটি বিছিয়েছি। তুই অথইকে নিয়ে আয়, সাথে তোর গিটারটাও আনিস।’ ছাদ থেকে আম্মার কন্ঠস্বর শুনে ধড়ফড় করে ওঠে অপি। আজ রাতে নেটফ্লিক্সের সিরিজটা দেখে শেষ করা হলো না আর।

একটা বয়সের পর এরকম জ্যোৎস্নারাতে মা-বোনের সাথে গানের মজলিশ করতে যে ভালো লাগে না সেটা আম্মাকে কে বোঝাবে? অন্যসময় আপাও খুব তাল মিলিয়ে শাড়ী পরে, সাজুগুজু করে। কিন্তু আজ সে ঘর অন্ধকার করে বিছানায় শুয়ে আছে। ‘আম্মাকে বল, আমার মাথাব্যাথা।’ অপির পায়ের শব্দ শুনে আপা বলে।

‘আবির ভাই ফোন করেনি?’ অপি সহানুভূতির দেখাতে চায়।

কিন্তু এতে হিতে হয় বিপরীত। ‘বেরিয়ে যা এখান থেকে। আর একবার পাকামো করলে কান মলে দেব।’

অপি কথা না বাড়িয়ে ছাদে চলে আসে। এই ছাদটা অপির খুব প্রিয়, সকাল-সন্ধ্যায় যখনই আসে মনটা ভালো হয়ে যায়। নানান ধরণের ফুল, ফল আর সবজীর টবের জন্যই কী না কে জানে, সকালে এখানে ভীড় করে কিচির-মিচির করা নাম-না-জানা সব পাখি। আর দিনের শেষের শীতল হাওয়ায় ছাদটা হয় বাতাসপুরী। আজ মা পাটি বিছিয়েছে পশ্চিম দিকে ছাদের দেয়াল ঘেষে, যেন চাইলে হেলান দিয়ে বসা যায়।

‘চাঁদটা আজকে কেমন অন্যরকম লাগছে, দেখ!’ অপিকে দেখে আম্মা বলেন।

আম্মার কাছে প্রকৃতির সবকিছুই অসাধারণ লাগে - সে আকাশের চাঁদ হোক আর গ্রীষ্মের কাঁচাআমের ভর্তা বা শীতের ভোরের কুয়াশা। হেমন্তে তারা নিয়ম করে নবান্ন উদযাপন করে, বৈশাখের রমনা বটমূল, আর শরতের বকুলতলার উৎসব কোন কিছুই বাকি থাকে না। তাই আম্মার মুগ্ধতাকে অপি খুব একটা পাত্তা না দিয়ে নিরুৎসাহী স্বরে বলে, ‘আপার মাথাব্যথা, আসবে না বলল।’

‘ডাক না। কী সুন্দর চাঁদ! আচ্ছা, চাঁদের আলোয় মন না ভরলে তোদের গল্প শোনাব।’

‘মা, আমরা কি পাঁচবছরের বাচ্চা যে গল্প শোনার লোভে কিছু করব?’

‘তাও ঠিক। আচ্ছা যা, আজ তোদের প্রেমের গল্প বলব।’

‘প্রেমের গল্প তোমার কাছে শুনতে হবে কেন? সেটার জন্য তো গল্প-উপন্যাস আছে, নাটক-সিনেমা আছে।’

‘এই গল্প তো কোথাও লেখা নেই রে পাগল! এটা আমার প্রেমের গল্প।’

এবার অপি নড়েচড়ে বসে। সন্দিহান স্বরে বলে, ‘মানে মানুষের সাথে তোমার প্রেমের গল্প নাকি আকাশ-বাতাসের সাথে প্রেম?’

আম্মার মিটিমিটি প্রশ্রয়ের হাসি দেখে অপি লাফ দিয়ে নিচে গিয়ে বোনকে ডাকতে যায়। আম্মার প্রেমের গল্প শুনতে আপারও অনেক আগ্রহ, তার মানে আপাও আগে শোনেনি এটা।

ছাদে এসেই আপা মূগ্ধচোখে চাঁদের দিতে তাকিয়ে বলে, ‘ওয়াও! এটা তো মুন রিং!’

এতক্ষণে অপি ভালো করে দেখে। চাঁদেটা চারপাশে অনেক বড় আকারের একটা জ্বলন্ত বৃত্ত। হঠাৎ দেখে গায়ে শিহরণ জাগে। ‘এটা কী, আপা?’

‘এটার নাম মুন রিং বা ২২ ডিগ্রি হ্যালো। বাংলায় মনে হয় জ্যোতিশ্চক্র বলে। অনেকে বলে চাঁদের চারিদিকে এমন বর্ণচ্ছটা দেখা যাওয়া হল ঝড়বৃষ্টির আগাম-বার্তা।’ আপা বিজ্ঞস্বরে বলে। ‘‘আম্মা, থ্যাংক ইয়ু। প্রেমের গল্পের বাহানা দেখিয়ে ডেকে না আনলে প্রকৃতির এ অপরূপ শোভা দেখা হতো না।’

‘বাহানা কেন? সত্যিই প্রেমের গল্প বলব।’ আম্মা হেসে ফেলেন।

‘এটা কি আব্বার সাথে প্রেমের গল্প? সেই যে আব্বার আবৃত্তি দেখে তুমি মূগ্ধ হলে, সেটা?’ আপা জিগ্যেস করে।

‘না, এটা প্রথম প্রেমের গল্প।’

এবার অপির অস্বস্তি লাগে। আম্মা কখনও আব্বাকে ছাড়া অন্য কারও প্রেমে পড়েছিলেন ভাবতে কেমন যেন লাগে।

আপা নড়েচড়ে বসে। ‘এটা কবের কথা, আম্মা? ভার্সিটির? ছেলেটা কি হ্যান্ডসাম ছিল?’

‘নাহ! সেরকম কিছু না। ছেলেটাকে আমার প্রথম ভালো লেগেছিল খুব আজব কারণে -- সে মুগ্ধ চোখে বৃষ্টি দেখছিল এই দেখে।’ আম্মা পা ছড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেন, ‘তখন ছিল বর্ষাকাল। কথা নাই বার্তা নাই, যখন-তখন বৃষ্টি হয়। অসময়ের অনাকাংখিত বৃষ্টি কেউ ভালোবাসে না, অহেতুক ঝামেলা বাধায় এ বৃষ্টি। কিন্তু আমার বৃষ্টি খুব ভালো লাগত। সবাই দোয়া করত ক্লাস ছুটির সময় যেন বৃষ্টি না হয়, আর আমি চাইতাম ঐ সময়ই যেন বৃষ্টি পড়ে।’

অপির হঠাৎ খেয়াল হয়, আম্মার এই বৃষ্টিপ্রেমের কথা তার জানা ছিল না। আগে কখনও ভেবেও দেখেনি -- যেই মানুষ জোৎস্না, কুয়াশা, বৈশাখ, শরত, হেমন্ত, সবকিছু উৎসব করে উদযাপন করে সেই আম্মাকে কখনও বর্ষায় ভিজে বা ভুনা খিচুড়ি বানিয়ে বৃষ্টি বিলাস করতে দেখেনি।

‘সেদিন ছিল বৃহষ্পতিবার। আমার আজও মনে আছে,’ আম্মা আবার তার গল্প শুরু করে, ‘বায়োলোজি ক্লাস চলছিল। বিকেলবেলা ক্লাস করতে এমনিতেই ভালো লাগে না তার উপর সেদিন কি সব পাকতন্ত্র নাকি না কী যেন পড়াচ্ছিল। আমার মাথায় কিচ্ছুটি ঢুকছিল না। আমার মন পড়ে ছিল বাইরে -- সেখানে ঝরছিল ঝুম বৃষ্টি আর বইছিল তুমুল বাতাস। বৃষ্টির আগে ধূলো ঝড় হচ্ছিল বলে ক্লাসের সব জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কাজেই জানালা দিয়ে বৃষ্টি উপভোগও করতে পারছিলাম না। এমন মেজাজ খারাপ হচ্ছিল! হঠাৎ চোখে পড়ল কোণায় ছেলেদের দিকে একটা জানালা খোলা। আর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে একটি ছেলে। দৃশ্যটি দেখেই আমার ছেলেটাকে ভালো লেগে গেল।’

আম্মার মুখের হাসিটা কেমন যেন অপার্থিব দেখায়। অজানা, অচেনা ছেলেটার উপর অপির প্রচন্ড রাগ হয়। কী দরকার ছিল ক্লাস বাদ দিয়ে বৃষ্টি দেখতে যাওয়ার? সে বৃষ্টি না দেখলে তো আর তার গল্প শুনে এত বছর পর হিংসে করতে হতো না! আচ্ছা, এটাও আশ্চর্যের ব্যাপার, আম্মার প্রাক্তন প্রেমিকের প্রতি কেনই বা এত ঈর্ষা হচ্ছে!

‘এরপর থেকে যখনই বায়োলোজি ক্লাস হয়, তখনই কেন যেন ছেলেটার দিকে আমার চোখ পড়ত। সেসময় কো-এড ক্লাসেও আমরা মেয়েরা একদিকে বসতাম আর ছেলেরা অন্যদিকে। রুমের আকৃতিটা ছিল ইংরেজি ‘এল’ শেপের মতন। বেঞ্চগুলো এমনভাবে সাজানো ছিল যে স্যারের সামনে বসত ছেলেরা আর ডানদিকে মেয়েরা। তো স্যারের দিকে তাকাতে গেলেই চোখের কোণা দিয়ে ছেলেদের দিকটা দেখা যেত। সেই ছেলেটা আবার সবসময় লাস্টবেঞ্চে বসত। তবে আজব কী, জানিস? সে যেখানেই বসত না কেন, প্রতিদিন আমি অন্য সব ছেলেমেয়ের মাথার ফাঁক দিয়ে ওকে দেখতে পেতাম। কখনও চোখের কোণা দিয়ে, কখনও আড়চোখে, মাঝেমাঝে সরাসরিও তাকাতাম। কিন্তু আজব কী, জানিস? ছেলেটার সাথে আমার একদিনও চোখাচোখি হয় হয়নি। ছেলেটা আমার দিকে একটুও তাকাত না। আপনমনে খাতায় কী সব লিখত, আর প্রায়ই খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকত।’

‘ছেলেটা খুব চালাক ছিল। ঠিক জানত যে সুন্দরী মেয়েরা পাত্তা না পেলেই বেশি আগ্রহী হয়।’ এবার আপা মুখ খোলে।

অপি বলতে যায় যে আজকালকার মেয়েদের পাত্তা না দিলে তাদের কোন ঠ্যাকা পড়ে নাই আগ্রহী হতে। কিন্তু, তার আগেই আম্মা মাথা নেড়ে হাসেন, ‘আমিও তাই ভাবতাম। আমি কল্পনা করতাম ছেলেটিও হয়তো আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে - এজন্যই আমি টের পাই না। কিন্তু নাহ, পুরো কলেজ জীবনে একদিনও ছেলেটিকে আমার দিকে তাকাতে দেখিনি। এমনকি অন্য ছেলেদের মতন লাস্ট ক্লাসেও একবার কথা বলার চেষ্টা করেনি। পরে আর আমাদের কোন দিন দেখাও হয়নি। ছেলেটার মনে কোন প্রকার ছাপ ফেলতে পারিনি ভেবে আমার সদ্য তরুণী মন বোধহয় হতাশই হয়েছিল।’

‘যাহ! তোমার মতন সুন্দরীর প্রথম প্রেমও তাহলে ব্যর্থ হওয়া সম্ভব!’ অপি হেসে ফেলে।

‘ব্যর্থ! ব্যার্থ নাকি?’ আম্মা আনমনে জিগ্যেস করেন।

‘বাহ রে! সরাসরি না হলেও সে তো তোমার প্রেমদৃষ্টি প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই না? নাকি তুমি ভাবছ যে আজ অবধি সম্ভাবনা আছে যে সে এসে তোমাকে প্রেম নিবেদন করবে!’ অপি কৌতূকের সুরে বলে, বুকের ভারী পাথরটা যেন সরে গিয়েছে।

‘কলেজের পর আমি ছেলেটাকে ভুলেই গিয়েছিলাম এক রকম,’ আম্মা যেন আবার কাহিনী বলা শুরু করেন। ‘ভার্সিটিতে তোদের আব্বার সাথে পরিচয়। প্রেম থেকে বিয়ের প্রস্তাব, তারপর আমাদের বিয়ে ঠিক হল।’

অপি ভুরু কুঁচকে মায়ের কথা শোনে। এ সব ঘটনাই তো তাদের জানা। তাহলে আম্মা কেন আবার বলছেন? এমন কি কিছু আছে যা এতদিন বলেননি? কিন্তু আম্মা যে বললেন কলেজের পর ছেলেটার সাথে আর কোন দিন দেখা হয়নি! তাহলে?

‘বিয়ে নিয়ে আমার সে কী উচ্ছাস! সব মেয়েরই থাকে বোধহয়! একশোটা দোকান ঘুরে শপিং করা, জুতো কেনা, গহনা কেনা। একদিন একটা গহনার দোকানে কোন আংটির মাপ দেয়ার জন্য একাই গিয়েছি - হঠাৎ একটা ছেলে আমায় ডেকে বলল তার কাছে নাকি আমার অনেক ছবি আছে। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি, তখনকার দিনে তো আর হাতে হাতে মোবাইল ক্যামেরা ছিল না যে কারও কাছে ছবি থাকবে। কিন্তু তারপর কেন যেন খুব কৌতূহল হল। সে বলল তার হল নাকি কাছেই, একটু অপেক্ষা করলে সে ছবিগুলো আনতে পারবে। হাতে সময় ছিল না, তাই আমি ছেলেটার সাথে করেই গেলাম।’

কোথা থেকে যেন একটা কালো মেঘ এসে চাঁদটাকে ঢেকে দিল। খুব ইচ্ছা থাকা স্বত্তেও আম্মার চেহারা দেখতে পেল না অপি।

‘তোরা বিশ্বাস করবি না -- পুরো খাতা জুড়ে আমার ছবি- স্কেচ। আমি ক্লাসে বসে আছি, বিরক্ত হয়ে কলম চিবুচ্ছি, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি, হাসছি, লিখছি, সব, সব ছবি। আমার মনে হলো আমার সামনে যেন জীবনের আয়নাটা ধরা হয়েছে। আর আমি কি করলাম জানিস? হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম।’

‘ছবিগুলো কোথায়?’ আপা শান্তস্বরে জিজ্ঞাসা করে। অপির খুব ইচ্ছা হয় জিগ্যেস করতে যে ছবিগুলো কি তার আঁকা স্কেচের চেয়েও সুন্দর ছিল?

‘ছেলেটা দেয়নি আমাকে ছবিগুলো। আর্টখাতাটি নাকি তার বড়ভাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন। কলেজের শেষদিন সে নাকি আর বাড়ি ফিরে আসেনি। পাঁচবছর পর আমাকে দেখে ওর ছোটভাই আশা করেছিল হয়তো স্কেচবুকের মেয়েটা তার ভাইয়ের কোন খবর দিতে পারবে। ওরা আজও জানে না সে অভিমান করে চলে গেছে, নাকি হারিয়ে গেছে নাকি...নাকি মারা গেছে।’

‘যাহ! এভাবে কেউ হারিয়ে যায় নাকি?’ অপি এবার অবিশ্বাসের স্বরে বলে। চারিদিকে নীরবতা। তারপর সে নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর দেয়, ‘অবশ্য আজকাল তো শুনি মানুষকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলে। কোন হদিশ পাওয়া যায় না।’

মেঘলা আকাশ থেকে হঠাৎ ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়া শুরু করে। ‘তোরা বৃষ্টিতে ভিজবি?’ আম্মা জিগ্যেস করেন।

অপি আর অথই মায়ের হাত ধরে বৃষ্টির জলধারায় নেমে পড়ে। হঠাৎ মনে হয় আম্মার বয়সও তাদের মতন। বৃষ্টির প্রবল ঝাপটায় সবার দৃষ্টি অস্পষ্ট। এর মাঝে অপি বুঝতে পারে যে আম্মা কাঁদছেন, অপির আবার অচেনা হারিয়ে যাওয়া আঁকিয়ের ওপর খুব রাগ হয়। কিন্তু বৃষ্টি ভেজার আনন্দে একসময় সে রাগ ধুয়ে-মুছে হারিয়ে যায়।


হুমায়রা জাহান আসলেই কাঁদছিলেন। তাঁর সন্তানদের তিনি প্রবল ভালোবাসায় প্রকৃতিপ্রেমী হতে শিখিয়েছেন, বন্ধুর মতন পাশে থেকেছেন চিরকাল। কিন্তু খুব বেশিদিন মনে হয় আর সে সুযোগ হবে না। তাই তো আজ তিনি তার জীবনের না-বলা প্রেমের কথা বলে গেলেন। ওরা যদি বৃষ্টি ভালোবাসতে না শেখে, তাহলে তো মরে যেয়েও শান্তি পাওয়া যাবে না।