সুলতানা বানু তার স্বামী জহির উদ্দিনকে বললেন----
-আপনার আর কিছু লাগবে?
-নাহ! এখন আর কিছু লাগবে না।
-এখন আমি একটু বাইরে যাই? চুলার কাজগুলো সেরে আসি।
-যাও, যখন আওয়াজ দিব ঘরে আসবা, ঠিক আছে?
-জ্বি...
সুলতানা বানু বাহিরে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। মনে হল বুকের উপর থেকে চাপ নেমে গেল। স্বামী জহির সামনে থাকলে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে তার। নিজের স্বামী সামনে থাকলে এই অস্বস্তিটা কেন হয় সুলতানা বানু বুঝতে পারেননা। তার কাছে মনে হয় কৈশোরের সেই ব্যাপারটা এজন্য দায়ী। আট বছর আগে ক্লাস সিক্সে থাকতে এক আত্মীয়ের বিয়েতে গিয়েছিলেন তিনি। দূর সম্পর্কের ভাই সম্পর্কীয় এক পুরুষের বলপূর্বক আচরণের শিকার হয়েছিলেন সেই অল্প বয়সেই। তার মা ঘটনাটা জানতে পেরে তাকে চুপ করে থাকতে বলেছিলেন। ভাগ্য ভালো সুলতানার দূরসম্পর্কের মামা কবিরাজি ওষুধ জানতেন। সেই ওষুধের গুণে সুলতানার মা বিষয়টা সামলে নিয়েছিলেন। সে ঘটনার পর থেকে সুলতানা অচেনা পুরুষ দেখলে এখনও কিছুটা বিচলিত হন। তিনি ভাবেন তার মা তাকে ছোট বেলায় জ্বীন-ভূতের ব্যাপারে সাবধান না করে এসব দৃশ্যমান ভূতের ব্যাপারে সাবধান করে দিলে কাজে লাগত।
বিয়ের পর সুলতানা বানুকে তার বাবা মা পরামর্শ দিতেন স্বামীর মন যুগিয়ে চলতে। মা বলে দিয়েছেন 'আগে যা ঘটেছে ভুলে যা। স্বামী এখন তোর আপনজন। অন্য সব পুরুষের থেকে আলাদা।'
পতিভক্ত সুলতানার স্বামীর মন যোগানোর অভ্যাসটা এখন কিছুটা ভয়ে পরিণত হয়েছে। সর্বদা তিনি ভয়ে থাকেন কোন কিছুতে জহির অসন্তুষ্ট কি না?
তিন বছর আগে বাবার বাড়ি থেকে দুই গ্রাম পরের গ্রামে বিয়ে হয়েছে তার। তখন বয়স ছিল ১৭ বছর। জহিরের ছিল ৩২ বছর। তিন বছরের বিবাহিত জীবনে স্বামীসেবার কোন ত্রুটি করেননি তিনি। স্বামী জহির স্থানীয় বাজারে ধানের ব্যবসা করেন। সকাল ৮টায় বের হয়ে রাত আটটায় ফেরেন। কোন কোন দিন দুপুরে ফ্রি থাকলে বাড়ি আসেন। আজ দুপুরে জহির বাড়ি এসেছেন। খাওয়া দাওয়া সেরে ঘরে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। একটু পরে তিনি 'সুলতানা সুলতানা' বলে ডাকলেন। সুলতানা এঁটো থালাবাসন পরিস্কার করছিলেন। সেগুলো ফেলে রেখে পড়িমরি করে ছুটে আসলেন। ঘরে ঢুকেই বললেন--
-আমারে ডাকছেন?
-ডাকছি তো, কিন্তু তোমার হাতে ময়লা কেন?
সুলতানা হাতের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন হাতে সাবানের ফেনা লেগে আছে। বাসন পরিস্কার করতে করতে ছুটে আসাতে হাতের দিকে খেয়াল হয়নি তার। তিনি বললেন---
-কাজ করছিলাম তো....
-যাও বেয়াদব মেয়েছেলে!, হাত ধুয়ে আস।
সুলতানা তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। একটু পরে হাত ধুয়ে আবার ঘরে আসলেন। তাকে দেখে জহির বললেন---
-আমার কাছে সবসময় পরিস্কার হয়ে আসবা।
-জ্বি আসব।
-শুনলাম তুমি নাকি তোমার ভাইকে টাকা ধার দিছ?
-জ্বি দিছি।
-কেন দিছ?
-ভুল হয়েছে, আর দিব না।
-আমাকে না বলে কেন দিছ?
-সে বলল, 'বাবার হাতে এখন টাকা নাই। পরীক্ষার টাকা জমা দিতে হবে।'
ঠাস! জহিরের হাত সুলতানার গালে এসে পড়ল। ব্যাপারটা সুলতানার কাছে প্রত্যাশিত ছিল। জহির মাঝে মাঝেই তার কথামত কাজ না হলে এমন ঘটনা ঘটান। ভীত সুলতানা এবার ঝড়ের পরবর্তী আঘাতের জন্য প্রস্তুত হল, কিন্তু ঝড় আর এগোল না। জহির শুধু বললেন, 'এহ...ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ দিতে আসছে...কত টাকা আছে তোর হারামজাদি?'


সেদিন রাতের বেলা। খাবার পরে জহির সুলতানাকে ডাকলেন। সুলতানা ভিতরে আসলেন। জহির বললেন--
-তোমার কাজ শেষ হয়নি?
-একটু বাকি আছে।
-তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে আস। শুয়ে পড়া হোক....
-আমার মনটা আজ ভাল নাই। আপনি বললে আমি ঐ ঘরে থাকতে চাই।
-আরে আরে হারামিটা বলে কি? আর আমি কারে নিয়া থাকব? তোর বোনরে এনে দে।
-ছি! আপনি এত খারাপ হয়ে গেছেন....
-কথা না বলে তাড়াতাড়ি শুতে আয় হারামজাদি।
অগত্যা সুলতানাকে জহিরের কথা শুনতে হল।


দিন যেতে লাগল এভাবে। সুলতানা বানু স্বামীর মন যোগাতে যোগাতে স্বামীকে মালিকের আসনে বসিয়ে নিজে কর্মচারী সাজলেন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হয়ে গেল মালিক-কর্মচারীর মত। অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যে সুলতানা নিজেও বুঝতে পারলেন না, তার স্বামীভক্তিটা স্বামীভীতিতে পরিণত হয়েছে। মাঝে মাঝে অবসরে সুলতানা বানু নানা ভাবনায় ঘুরপাক খান, 'তিনি জহিরকে এত ভয় পান কেন? তার বান্ধবী নাসিমা তো স্বামীকে ভয় পায়না? এইতো গতবছর নাসিমার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। জহিরকে অনেক বলেকয়ে সেবার এক রাত থাকতে পেরেছিলেন। সেবার দেখেছিলেন নাসিমার হুকুমজারিতে তার স্বামী তাকে সংসারের কাজে সাহায্য করছে। নাসিমা যা পারে সেটা তিনি পারেননা কেন? তার মাঝে কিসের ঘাটতি আছে?' অনেক ভাবনা চিন্তার পরে দুএকটা উপায় আসে কিন্তু স্বামীর বিরুদ্ধাচরণ করতে তার পতিভক্ত মন সায়ও দেয় না।


এক বছর পর। জহির বললেন আজ রাতে তিনি ধানের ঘরে থাকবেন। ধানের কাজ সারতে সারতে রাত লেগে যাবে। রাতের বেলা সুলতানা বুঝতে পারলেন তার মাঝে একটা খুশি খুশি ভাব আসছে। তবে কি জহির আজ না থাকাতে তিনি আনন্দিত? তিনি স্বামীকে সম্মান করেন?, না ভয় করেন, নাকি ভালবাসেন বুঝতে পারলেন না।


এক মাস কেটে গেল। সুলতানা বানু লক্ষ্য করতে লাগলেন জহির কয়দিন থেকে বাহিরে যাচ্ছেন। কিন্তু দুপুরের আগে ফিরে আসছেন। কথাবার্তা কমে দিয়েছে। তার সাথে রাগের পরিমানও কমে গেছে। সুলতানা নিজে থেকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলেননা। সেদিন রাতে জহির বললেন---
-শোনো বউ বিরাট টেনসনের মধ্যে আছি।
-কিসের টেনসন?
-দাঁড়াও তোমারে খুলেই বলি সব। আমার ধানের ঘরে রাতে যে থাকে, সেই হারামজাদা তৈয়বর কয়দিন আগে নাকি এক মাগিকে নিয়ে রাত ছিল। সেই মাগি নাকি মারা গেছে। পুলিস তো তৈয়বররে খুঁজছে। আমারও নাকি খোঁজ করতেছে। আমি তো ভয়ে আছি।
-বলেন কি! আপনি কোন আকাম করেননি তো?
-আরে চুপ করো তো...আমি আছি বিরাট চিন্তায়। আর উনি.....
এসময় জহিরের ফোন বেজে উঠল। তিনি ভয়ে কেঁপে উঠলেন। কাঁপা হাতে ফোন রিসিভ করে বললেন---
-হ্যালো কে?
-জহির ভাই আমি জিয়াউল, অন্য নাম্বার থেকে ফোন করছি। বাজারে এইমাত্র আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিল দুজন পুলিশ। মনে হয় তারা আপনার বাড়ির দিকে যাচ্ছে।
কথা শেষ না হতেই জহির দেখতে পেল মটর সাইকেলে চড়ে দুজন পুলিশ তার বাড়ির সামনে এসে হাজির! জহির তাড়াতাড়ি করে বাড়ির পিছন দিকের দরজা দিয়ে বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। তার এমন কীর্তিকান্ড দেখে সুলতানা যুগপৎ বিস্মিত এবং ভীত হলেন। পুলিশের লোকদুজন বাড়ির ভিতর আসলেন। সুলতানাকে একজন বললেন---
-এটা কি জহির উদ্দিনের বাড়ি?
সুলতানা আগে কখনো পুলিশের মুখোমুখি হয়নি। তার একটু ভয় ভয় করতে লাগল। কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বললেন---
-জ্বি
-উনাকে বাহিরে আসতে বলুন।
-স্যার উনি তো বাড়িতে নাই?
-সত্য?
কথাটা বলেই দুটো পুলিশ দৌড়ে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। এঘর ওঘর খোঁজাখুঁজি করে কোথাও জহিরকে না পেয়ে তারা বের হয়ে এল। সুলতানাকে তারা বলল---
-রাতে আপনার স্বামী কোথায় ছিলেন?
-জ্বি বাড়িতে।
-সকালে কখন বের হয়ে গেছে?
-এই ধরেন ১ ঘন্টা হবে।
-আপনার নাম কি?
-সুলতানা বানু।
-ঠিক আছে, আমরা দেখি সে কতদিন পালিয়ে থাকতে পারে।
-স্যার উনার অপরাধটা যদি বলতেন....উনি আমাকে তেমন কিছু বলেননা....
-উনার অপরাধ তার ব্যবসার ঘরে শারীরিক নির্যাতনের পর নারীকে হত্যা।
পুলিশ দুজন চলে যাবার পরে সুলতানা বারান্দায় বসে পড়লেন। জীবনে প্রথমবার পুলিশের মুখোমুখি হয়েছেন। পুলিশ তার স্বামীর বিরুদ্ধে এমন নোংরা অভিযোগ নিয়ে আসবে, তিনি আগে কখনই ভাবেননি।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। জহির বাড়ি ফিরলেন না। বিকেল শেষে রাত চলে আসলো। তবুও জহিরের খবর নাই। অগত্যা সুলতানা সব কাজ সেরে তার দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লেন। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুম এসেছিল, বুঝতে পারেননি। ঘুম ভাঙল রাত দুটোর দিকে জানালায় ঠকঠক শব্দ শুনে। তিনি সাহস সঞ্চয় করে বললেন---
-কে?
-বউ, আমি জহির!
-আরেকবার বলেন!
জহির কিছুটা অবাক হলেও সময় নষ্ট না করে বললেন, 'বউ আমি জহির তাড়াতাড়ি দরজা খোল।'
সুলতানা দরজা খুলে দিলেন। জহির ভিতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলেন। জহির বললেন--
-বউ ভিতরে চল।
তারা ভিতরে আসলে সুলতানা তার স্বামীকে বললেন----
-রাতের বেলা এক ডাকে দরজা খুলতে নেই জানেন তো? কিছু মনে নিবেন না।
জহির কিছুটা অবাক হলেন। তার বউকে তিনি যতটা নিরীহগোছের ভেবেছিলেন ততটা সে নয়। জহির বললেন---
-বউ ঘরে ভাতপানি কিছু আছে?
-দাঁড়ান, দিচ্ছি।
খাওয়া দাওয়া সেরে জহির বললেন---
-বউ চল শোয়া যাক...
-না
-না মানে?
-আগে আমার কথার উত্তর দিতে হবে!
-কি বললি হারামজাদি?!
-খবরদার নষ্ট পুরুষ মানুষ!, ভুলে যাসনা তুই পুলিশের পালিয়ে বেড়ান আসামি, এক্ষুণি তোকে ধরিয়ে দিতে পারি আমি!
জহির বিস্মিত এবং ভীত হয়ে তার বউ সুলতানার দিকে তাকাল। এটা যে তার বউ সুলতানা, জহিরের বিশ্বাস হচ্ছিল না! নিরুপায় জহির নরম হয়ে বললেন---
-বিশ্বাস কর বউ, আমি কিছুই করিনি। সব দোষ হারামজাদা তৈয়বরের।
-পুলিশ তো বলছে, মেয়েটার উপর আপনি অত্যাচার করছেন।
-ঘোর মিথ্যা কথা
-সেটা কয়দিন গেলেই বোঝা যাবে।
বিস্মিত জহির বউকে আর কিছু বলতে সাহস পেলেননা। সারারাত শুধু ভাবতে লাগলেন তার পতিভক্ত বউ এর আজ কি হয়েছে! খুব সকালে আলো ফোটার আগেই জহির বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন।


পরদিন দুপুর বেলা। সুলতানা বারান্দায় বসে আছেন। এমন সময়ে তৈয়বরের আগমন। সুলতানা কিছুটা অবাক হলেন। তৈয়বর বলল---
-ভাবি আপনার খোঁজ নিতে আসলাম। কেমন আছেন?
-আপনারা যে কুকর্ম শুরু করেছেন তাতে যেমন থাকার কথা...
-আমার কোন দোষ নাই ভাবি, আসলে মহাজন যে এতটা খারাপ, জানতাম না।
-মানে কি? তোমরা শুরু করছটা কি?
-আমি কি করলাম ভাবি? আমি তো আসলাম আপনার খোঁজ নিতে...
-তুমি নিজে আকাম করে সোহাগের বাপকে ফাঁসাও নি?
-কে বলছে?
-সত্য কি না?
-ভাবি বুঝছি... মহাজন ভুল কথা বলেছে আপনাকে। আসল কথা শোনেন আমি সেদিন রাতে ঘরে ছিলাম না। মহাজন বললেন আজ রাতে উনি থাকবেন। আমি বাড়ি চলে আসলাম। পরে বুঝছি উনি কেন সেদিন আমাকে থাকতে দেননি।
-ঐ মেয়েটা কি মারা গেছে?
-জ্বি

তৈয়বর যাবার পরে সারা বিকাল এবং রাত সুলতানা বানু ভেবে ভেবে সময় পার করলেন। জহিরকে তিনি অনেক সম্মান করতেন। জহির সেটা বোঝার চেষ্টা করেনি,সে মনে করেছে সুলতানা তাকে ভয় করে। সুলতানার বাবা-মা তাকে স্বামীর সেবা করার উপদেশ দিয়েছে বিয়ের পর অনেকবার। সুলতানাও স্বামীর কথার অবাধ্য হয়নি। স্ত্রীর এতটা সম্মান ও যত্ন পাবার পরও জহির এমন একটা কাজ করল কিভাবে? সুলতানা বুঝতে পারছেন তার পতিভক্ত মন এখন স্বামীকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে।


দিন যেতে লাগল। আরেক রাতে জানালায় ঠকঠক শব্দ পেলেন সুলতানা বানু। জহির আবার এসেছেন। ঘরে ঢুকে বললেন---
-বউ, আমি গ্রেপ্তার হলে উকিলের কাছে যাস। উকিলের ঠিকানা দিচ্ছি আর ঘরে কিছু টাকা আছে, দেখে রাখিস।
-আর আমি গ্রেপ্তার হলে আপনি কি করবেন?
-তুই কেন গ্রেপ্তার হবি?
-এমনি বললাম আর কি?
জহির আর কিছু বলার চেষ্টা করতেই সুলতানা বানু বললেন, 'আপনার কথা শেষ হলে এখন ঐ ঘরে যান। আমি এই ঘরে একা থাকব।'
জহির চুপচাপ তার ঘরে গেলেন। পরদিন সকাল হবার আগে বের হয়ে গেলেন।


কয়দিন পরে খবর পাওয়া গেল জহির ধরা পড়েছেন। সুলতানা বানু খবরটা শুনে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর নিজের মত করে দিন পার করতে লাগলেন। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। জহিরের রেখে যাওয়া টাকা থেকে তিনি সংসারের খরচ করতে লাগলেন। কয়েকমাস পর একদিন এক প্রতিবেশি খবর দিল জহিরের কারাদণ্ড হয়েছে।

একমাস পর। সুলতানা বানু জহিরের সাথে কারাগারে দেখা করতে আসছেন। তাকে দেখেই জহির বললেন---
-বউ এতদিন পরে আসলি? আমার তো সাজা হয়ে গেছে।
-আমি ভয়ে এতদিন আসতে পারিনি।
-কার ভয়?
-পুলিশের ভয়, আপনি তো জানেন, আমার ভয় বেশি।
-তোর তো ভয় নাই এখন? আমার মুখের ওপর কথা বলিস এখন, ঠিক কি না?
-ঠিক... কারণ আপনাকে সম্মান করা যায়না।
-বউ তুই আমাকে ভালবাসিস না?
-হাহাহা, আপনার মুখে ভালবাসার কথা! তিনবেলা ভাত খাওয়ার মত করে পিটান দিতেন, তখনও আপনার মুখের উপর কথা বলিনি। তখন আপনার ভালবাসা ট্রাঙ্কের ভিতর ছিল?, না ঐ শাহেদার কাছে ছিল? কোনদিন আপনার অবাধ্য হইনি। আজ তার এই ফল?
-শাহেদার খবর তোকে কে বলল?
-আমি সব খবর নিছি। শাহেদার মা সব বলছে। আপনার পাপ বইতে পারেনি বলে সে আত্মহত্যা করছে।
-বউ তুই আমার বিয়ে করা বউ। আমাকে বাঁচা।
-আপনাকে ভয় করতাম, সম্মান করতাম। কিন্তু এখন আপনার উপর আমার ভয়, ভালবাসা কিছুই নাই। শোনেন, আপনার সংসারের ভার এখন আমার উপর পড়ছে। আর কিছু না হোক সোহাগ আপনার ছেলে, তাকে মানুষ করতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিছি আপনার জমি কিছু বিক্রি করব।
-বউ তুই এত বুদ্ধিমান কবে থেকে হলি?
-আপনি ধরা পড়ার পর।


একমাস কেটে গেল।
সেদিন গভীর রাত। জানালায় ঠকঠক শব্দ। সুলতানা বানুর ঘুম ভেঙে গেল। উফফ...এই তৈয়বরের জ্বালাতন আর সহ্য করা যাচ্ছে না। কয়দিন থেকে জ্বালাচ্ছে। আর ভয় করে থাকা চলবে না। তিনি নির্ভীক হয়ে থাকতে চান। তিনি জবাব দিলেন----
-কে?
-ভাবি আমি তৈয়বর?
-এত রাতে কি চাস?
-ভাবি আমি তৈয়বর?
-চিনছি তো?
-একটু দরজাটা খোলেন। আপনার খোঁজখবর নিতে আসলাম।
-এত রাতে কিসের খবর নিতে আসলিরে রসের নাগর?
-ভাবি বোঝেনই তো, সব খবর দিনে নেয়া যায়না।
-ঠিক আছে, এই ঘরে সোহাগ ঘুমাচ্ছে। তুই একটু ঘুরে চুলার পাড়ের ধারের দরজাতে আয়।
সুলতানা বানু দরজা খুলে তৈয়বরকে ভিতর নিয়ে আসলেন। বাহিরে একবার উঁকি দিলেন। না, এই গভীর রাতে বাড়ির পিছনে বাঁশঝাড়ের এখানে কারো থাকার কথা না। তিনি তৈয়বরকে জহিরের ঘরে বসতে দিয়ে বললেন, 'তুই একটু দাঁড়া। কারেন্ট চলে গেছে, মোমবাতি জ্বলে নিয়ে আসি।'
সুলতানা মোমবাতি হাতে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য তার কৈশোরের সেই বিয়েবাড়ির ঘটনা স্মৃতিচারণ করতে লাগলেন। এমনি অন্ধকারে সেই রাতে মোমবাতির আবছা আলোতে তার সর্বনাশটা হয়েছিল। একটু পরে বর্তমানে ফিরে আসলেন। তার মনে হল তৈয়বর তার জন্য অপেক্ষা করছে। এই কাজের জন্য মোমবাতি লাগে না। তিনি মোমবাতি বাহিরে নিভিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা লেগে দিলেন। তৈয়বর আসন্ন আনন্দের উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল।


পরদিন সকালবেলা। জহিরের বাড়ির পেছনের দিকে যে বাঁশঝাড় আছে সেখানে এক বয়স্ক প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য এসেছেন। এসে দেখলেন তৈয়বরের লাশ পড়ে আছে। গলায় আর ঘাড়ে রক্তে মাখামাখি। পাশের গ্রামের এই লোককে কে এখানে মেরে রেখে গেছে, তিনি বুঝতে পারলেন না। মুহূর্তে গোটা গ্রামে খবর ছড়িয়ে গেল। বাড়ির পাশে চিৎকার শুনে সুলতানা বানু জহিরের ঘর, বাহিরের উঠান দেখে নিশ্চিন্ত হলেন। নাহ আর কোন চিহ্ন নাই। একেবারে লেপে মুছে পরিষ্কার। হাসুয়ার ডাঁট আর বস্তাটাও পুড়িয়ে ফেলেছেন। অতঃপর তিনি বাহিরের কোলাহলে শামিল হলেন। দরজা খুলে বাহিরে গিয়ে বললেন---
-ও চাচী, কি হয়েছে? এত ভিড় কিসের?
-তোর বাড়ির ধারে, তুই এখনো জানিসনা? সামনে যায়ে দেখ।
সুলতানা বানু দেখলেন আর বললেন, 'হায় সর্বনাশ এ তো সোহাগের বাপের ঘরে থাকে, তৈয়বর ভাই! এখানে কিভাবে আসলো? কেউ তাকে ধাওয়া করে এখানে মেরে রেখে গেল? এখন আমি কি করি? সোহাগের বাপও তো বাড়িতে নাই।'
আগত জনতা নিজেদের মধ্যে সিআইডিগিরি শুরু করলো। কেউ বলল তাকে ধাওয়া করে এনে এখানে মেরে দিয়েছে, কেউ বলল অন্যখানে মেরে জহিরকে ফাঁসানোর জন্য এখানে রেখে গেছে।

এক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ এল। অন্য অনেকের মত সুলতানাকেও জেরা করল। কিন্তু সুলতানা আর ভয় পাচ্ছেন না। পুলিশ তাকে বলল----
-এই লোককে চেনেন?
-চিনি...
-কিভাবে চিনলেন?
-ইনি আমার স্বামীর দোকানে কাজ করতেন। আগে দু-একবার আমাদের বাড়িতে এসেছেন।
-কাল কি আপনার কাছে এসেছিলেন নাকি?
-তা কিভাবে জানব? আমি সকালে দেখলাম তার লাশ।
-তার মানে খুনের আগে তার সাথে আপনার কথা হয়নি?
-না
-রাতে কোন চিৎকার বা শব্দ পাননি?
-না
-আচ্ছা সুলতানা বানু, আপনার স্বামীর কর্মচারীর লাশ গ্রামের এত জায়গা থাকতে আপনাদের বাড়ির পাশে,এটা আপনার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?
-স্যার, আমার মনে হচ্ছে...
-বলুন বলুন আপনার কি মনে হচ্ছে....
-স্যার আমার মনে হচ্ছে উনি মানে আমার স্বামী, লোক লাগিয়ে এই কাজ করতে পারেন...
-কেন মনে হল?
-উনি একবার আমাকে বলেছিলেন, তৈয়বর তাকে ফাঁসিয়েছে। প্রতিশোধ নেবার জন্য তিনি এটা করতে পারেন।
-আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে আপনি কথা বলছেন, স্বামীকে পছন্দ করেন না?
-না মানে স্যার, ভুল হয়ে গেছে...আমার আবার পেটের ভিতর কথা থাকে না। ও স্যার...আমিও কিছু জানিনা আমার স্বামীও কিছু জানে না। আমার স্বামীর মত ভাল মানুষ আর নাই স্যার...
-আপনার মোবাইল আমরা চেক করব।
-জ্বি আমার মোবাইল নাই।
-আপনার স্বামী তো জেলে?
-হ্যাঁ।
-তার মোবাইল কোথায়?
-শুনছি ধরা পড়ার আগে মোবাইল বেচে দিছে...
পুলিশরা চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল তাদের না জানিয়ে আপাতত সুলতানা দূরে কোথাও যেতে পারবেন না।
সুলতানা এসব নিয়ে ভাবছেন না। নষ্ট পুরুষদের আটকে দিয়ে তার মাঝে এখন আনন্দের বাতাস বইছে। অপরাধীকে তিনি সাজা দিতে পেরেছেন। তৈয়বরকে ঘরে বসতে দিয়ে তিনি মোমবাতি আনার কথা বলে অন্ধকারে ধারাল হাসুয়া দিয়ে যে কাজটা সেরেছেন সেটা কেউ জানবে না। জহিরের কাছে চাকরি নিয়ে তৈয়বর সুলতানাকে চিনেছিল কি না, সেটা নিয়ে সুলতানা বানুর কোন ভাবনা নাই। তবে কৈশোরের সেই ভাই সম্পর্কীয় নষ্ট পুরুষকে তিনি ঠিকই চিনতে পেরেছেন।