বৃষ্টির রিমঝিম বর্ষা দুপুরে পুকুর পাড়ে ঘাসে বসে বৃষ্টিতে ভেজার জন্য কখনো মন না করে না। আজও সেই অপূর্ণতা রাখতে চাইনা। জীবনের শ্রেষ্ঠ অপূর্ণতা রয়ে গেছে তাই বাকি সব পূর্ণতা দিলেও জীবন অসহ্যকর মনে হবে না।

তারিখ দিন কখনো আমি ঘুম থেকে উঠে দেখিনা দেখলে মনে হই মাস শেষ হচ্ছে না। তাই আমি হটাৎ হটাৎ তারিখ দেখি। বাসা থেকে সব ক্যালেন্ডার সরিয়ে নিয়া হয়েছে। অনেক দিন তারিখ জানিনি কিন্তু আজ ইচ্ছে করছে। আয়নার সাথে যোগাযোগ হইনা কতদিন তারও একটি হিসেব নিকেষ করার দরকার।

বৃষ্টি ভালো বেড়েছে। পুকুর পাড়ের লাল পদ্ম ভেসে চলেছে। তার বুকে দুর হতে আকাশের কান্না পড়ছে। অন্যের কষ্টে হইতো সে কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু হাসি মুখে দিয়ে দ্বিতীয় ফোঁটার জন্য অপেক্ষা করছে! মানুষও তেমন একটি কষ্ট পাওয়ার পর দ্বিতীয় কষ্টের জন্য অপেক্ষা করে। তার পর আবার হাসি দিয়ে আবার অপেক্ষা করে। আমার প্রিয় ফুল গুলোর মাঝে পদ্মফুল প্রিয়। কেনো প্রিয় তার ব্যাখা নেই। ভালবাসার ব্যাখ্যা হইনা। কেনো ভালবাসলাম বাহ্ কেনো এখনো ভালবাসি, কেনো অপেক্ষা করি, কেনোই বা দিন শেষে ভয়ানক একাকীত্বতা নিয়ে ঘুমাতে গিয়ে রাত জেগে সকাল করি তবুও তার জন্য যেই ভালবাসা রেখেছি সেইটা অন্য কেউকে এখনো দেইনি। তার কোনো কারণ নেই। ভালবাসার কারণ হইনা কিন্তু পছন্দের কারণ হই!


রফিক, ওই রফিক!
জ্বি চাচা, বলেন?
আমার কি কোনো চিঠি এসেছে?
আজ্ঞে না! আসেনি! আর কে লেখবে চিডি !
হাসবে না, যাও গামছা নিয়ে আসো!
জ্বি, চাচা!
শালা বুইড়া ব্যাটা তুই একটা খাটাস তোরে কেডা চিডি দিবো। কোন এক ফুরির লগে ফ্রেম ভালবাসা করে বিয়া খরছিস বাসর রাতে ফুরি যে গেল আর আইলো না। চে চে কি লজ্জা কথা চে। আবার তেজ দেখা, চিডি আসবো তো মেলা ফথের কথা গত চৌদ্দ বছর ধরে একডা কালির দাগ ও আহে নাই। ফতিদিন এই এখ আলাপ চিডি আসিছে চিডি। শালা বুইড়া কহানকার আর এখদিন কইলে তোরে তুতু দিয়া ফানি খাওইয়াম।

বৃষ্টিতে সব সময় একা ভিজা যাইনা, মাঝে মাঝে দুজন লাগে। তার সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পুকুর পাড়ে যাবো সে বায়না করবে পদ্ম এনে দিবার। আমি এনে দিবো বলে এনে দিবো না। সেই অভিমানে তার চোখে পানি আসবে। সেই সময় আকাশ শান্তি পাবে, কারণ তার সাথে সঙ্গিনী হয়েছে যে এক স্বপ্নরানী।তখন আমি ফুল গুলো এনে দিবো জড়িয়ে ধরে কান্না চোখে হাসা শুরু করবে। কি অপরূপ সৃষ্টি এই নারী ভাবতেই বুকের পাঁজর মেলে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে। এখন আয়না দেখতে ইচ্ছা করছে কিন্তু এই বাড়িতে কোনো আয়না নেই। আয়না চলে যাওয়ার পর কাচের আয়নাও সরিয়ে নিয়া হয়েছিল। সেই থেকে এই বাড়িতে কোনো আয়না নেই।
রফিক ওই রফিক!
জে চাচা!
গামছা আনতে এত সময় লাগে!
এইযে চাচা।
আর শোনো, আজ কত তারিখ নির্ধারণ করার চেষ্টা করো। আকাশ কিছুদিন মেঘলা সম্ভবত বর্ষা কাল। তাড়াতাড়ি আমাকে দিন তারিখ জানাও আর বাজারে যাও একটা বড় আয়না কিনে আনো। আমি আবার আমাকে দেখতে চাই!
আজ্ঞে হ্যাঁ, চাচা!


কিরে এই দুফুর রোদে পুড়ে পুড়ে কই যাস!
হাটে যাই! চল একখানা আয়না কিনা লাগবো?
চাচার বাড়ীতে না আয়না নিষিদ্ধ?
হেইডাই কাহিনী। ছুডু বেলা হিসাব পারতাম না তাই উস্তাদ মুরগি মানাইয়া পোগা তে বেত দিয়া মারছিল তাই আর লেকাপড়া করিলাই নাহলে চাচার মতই হতাম।
হাহাহা, ওই বুইরার মত হইয়া কি সাদি না খরে থাকতি!
হর তো হর হাটে যাবো হর!


আকাশে চাঁদ দেখার জন্য যদি একটিবার তোমাকে অনুরোধ করি তুমিকি আমাকে ফিরিয়ে দিবে! হাহাহা হইতো বলবে আগের মত ছেলেমানুষী এখনো রয়েছে তোমার। তোমার সাথে আমার খুব তুচ্ছ ইচ্ছে যা হইতো তোমার সংসার জীবনে এখন ছেলেমানুষী, নেকামো কিনবা লজ্জার। তোমার ছেলে ফেলে হয়েছে এখন তারা এমন করবে। তুমি করলে মানায় না আবার আমি করলে মানায় হাহাহা। আমার তো শরীলের বয়স্ বেড়েছে মনটা তো সেই ছোটই রয়েছে। সব নতুন সব নতুন। নীল খামের চিঠি আর আমার দিয়া টকটকে লাল গোলাপ ! তুমি কি এখনো জমা রেখেছো না ফেলে দিয়েছো আবর্জনার স্তূপে।


চাচা আপনার চা!
আচ্ছা রফিক?
জ্বি চাচা!
কখনো কি, কোনো চিঠি আসেনি!
না চাচা আসলে কি আপনাকে জানতাম না।
তুই আজ সুন্দর করে কথা বলছিস যে?
তেমন কিছু না চাচা।
আয়নাটা যে আনতে বলেছিলাম এনেছিস?
জ্বি চাচা গঞ্জের থেকে বড় একখান আয়না কিনে এনেছি?
ভাল করেছিস! তোকে আজ একটা কথা বলি শুন! আমার তো কেউ নেই জানিস তুই ছাড়া আমি জানি তুই আমাকে দেখতে পারিস না। আমার প্রতি তোর অনেক রাগ। আমি অনেক আগেই আমার এইযে ছোট একটা বাড়ি আর তো কিছু নাই। মাঠে যেই ফসল আসে তা দিয়েই দু বেলা তোর আমার হই। আমি মরে গেলে এই বাড়ি আর ফসলের মাঠ তোর জন্য লেখে দিয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছে আমি বেশি সময় থাকবো না।

চাচা এইটা এখখান সত্যি কথা। আমি আপনাকে আসলেই দেখতে পারিনা কেনো পারি না এইটাও আপনি হইতো জানেন। আপনি অতি ভাল মানুষ এত ভালমানুষ আমি সহ্য করতে পারি না। বাল্য কালে এক প্রেম করলেন আর সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন।
হাহাহা, আমি মোটেও ভাল মানুষ না! রফিক, একাকীত্ব অনেক খারাপ জানিষ তো পুড়ে ফেলে। পৃথিবীতে প্রায় সব মানুষ একটা না একটা শূন্যতায় ডুবে নিখোঁজ হয়ে যায় তার ভাল থাকার শহরে। নিখোঁজ বিজ্ঞাপনে গা ভাসিয়ে দেই অভিনয় নিয়ে। পৃথিবীর সব মানুষ এক একজন অভনেতা অভিনেত্রী। আহ্ আহ্ কি সুন্দর সেই অভীনয়।

চাচা, চাচির সাথে কি আপনার আসলেই বিয়ে হয়েছিল!
না, যেইদিন আমার সাথে সে পালিয়ে যাবে বলে কথা দিয়েছিল তার দু দিন আগেই সে নিখোঁজ। আমাকে একটা ছোট চিঠি পাঠিয়েছিল। লেখা ছিল ভালো থেকো আর মাফ করে দিও। মনে করেছিলাম ফিরবে আজ না ফিরলেও কাল। সেই কাল কাল করতে করতে কত কাল বৈশাখী পার করলাম। হাহাহাহা

চাচা আমি শেষ একটা কথা বলি, আমি আপনার ঘর বাড়িতে থাকবো না। আমি এই বাড়িতে আপনাকে ছাড়া ডুকবো না।


গত রাতেই চাচা মারা গেলো। কিছুক্ষন আগে জানাযার নামাজ আদায় করলাম। আমি কান্না কখনো করিনি। গত রাতে যখন চাচা কথা বলা বন্ধ করে দিল আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমার দিকে তাকিয়েই চাচার মৃত্যু হয়েছে। আমাকে চাচা বলতে চাইল হইতো, আমাকে ফেলে তুই যাইস না তুই ছাড়া এই মহা বিশ্বে আর কেউ নেই, কেউ নেই। একা থাকা খুব খারাপ খুব নির্মম, শূন্যতা আর একাকীত্বতা খুব ভয়াবহ ভয়ানক আগুন। যেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাই তবে বাহির থেকে কিছুই বোঝা যায় না।

চাচার কবর দিয়েছি ঘরের সামনে চালতা গাছের নিচে। চালতা গাছে যখন ফুল আসতো চাচা খুব আনন্দ পেত। তিনি গাছের দিকে সকাল দুপুর তাকিয়ে থাকতো। আমি এই বাড়ি ছেড়ে আর যেতে পারবো না চাচাকে রেখে। আমিও চাই আমার কবরটা এখন চাচার কবরের পাশেই হক। আমিও শূন্যতায় ডুবেছি অতলে হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অপূর্ণতা রয়ে গেল চাচার। সেই ভয়ানক শূন্যতা নিয়ে চলে গেল স্বার্থপর ভালবাসা হীন পৃথিবী থেকে। এই পৃথিবীতে প্রেম নেই। ভালবাসা নেই এই পৃথিবীতে। যেই আগুনে বসিয়া তুমি হাসো প্রেমিকা। চোখ মেলে দেখ আগুন তোমার খুব নিকটে পৌঁছে যাচ্ছে। পুড়ে যাবে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এক সাগর শূন্যতা নিয়ে বেঁচে থাকবে মৃত্যুর অপেক্ষায়। তুমিও হাসবে চাচাও হাসবো দুজনে বসিয়া হাসবে দুই মানচিত্রে । তোমরা হাসবে চাচার পাগলামিতে আমি হাসবো চাচার মুক্তিতে।