এ গল্প নবান্নের উৎসবে হারিয়ে যাওয়া এক প্রান্তিক মানুষের।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২২ জুলাই ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ১০টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - নবান্ন (অক্টোবর ২০১৯)

ওখানেই ঝরেছিল মানুষের ঘাম
নবান্ন

সংখ্যা

সুপ্রিয় ঘোষাল

comment ২  favorite ০  import_contacts ৫৭
এক।
এ আখ্যান ঘোর বর্ষার স্রোতস্বিনী নয়। জীবনের কামনা আর আকাঙ্খার কাছে কখনো হেরে যাওয়া , কখনো বা অমীমাংসিত হার-জিতের বাঁকে প্রোথিত, ব্যর্থ দীর্ঘশ্বাস বহন করা, কখনো বা হার জিত মেলাতে না পারা, সময়ের রুদ্ধদ্বারে আটকা পড়ে যাওয়া এক সাধারণ প্রান্তিকের। যার কথা কেউ মনে রাখে, কেউ বা ভুলে যায়। সময়ের স্রোতে ভেসে যায় স্মৃতি। কখনো-সখনো কোনো নিকটাত্মীয়ের স্মরণে সে মানুষ আবার ভেসে ওঠে, বর্তমান হয়। বর্তমান হয় ? আসলে সত্যি সে কি বর্তমান হয়। হয় না গো। যে অতীত সে চিরটা কালই অতীত হয়ে হারিয়ে যায় ভবিষ্যের গর্ভে। আজ যে বর্তমান কাল সে অতীত। আগামীতে যে ভবিষ্যৎ, কালের স্পর্শে সে ও অতীত হয় একদিন। যেন নদীর জল। স্থির নয়। সদাই চঞ্চল। কথায় বলে এক নদী কেউ দুবার দেখে না।
নদী? হ্যাঁ নদীই তো। নদী প্রকৃতির এক বিচিত্র খেলা। খেলা না খেলাঘর? আজ এ পাড় ভাঙে তো কাল ও-পাড়। কখনো সে দাঁড়িয়ে থাকে স্থির জলরাশি বুকে নিয়ে। আবার কখনো বা সে বেগবান প্রাণোচ্ছল যুবকের মত। কখনো বা লোহার কারখানার শ্রমিকের মত সে পেশীবহুল, বলবান। কখনো বা মনক্ষুণ্ণ বালিকার মত সে দুখিনী হয়ে ফুলে ফুলে কাঁদে। কখনো চঞ্চলা কখনো স্থির। সে প্রকৃতির লীলাবতি কন্যা। প্রকৃতির বেগবতী কন্যা সে।।
কিন্তু এ গাঁয়ে তো নদী নেই। গাঁ শুধু নয়, তল্লাটেই নদী কোথাও। সবটাই ডাঙা। নামটাও তাই সেই রকম – ঘোলাডাঙ্গা। তবে নদী যে একেবারেই নেই সেটা ঠিক নয়। আছে একটা মজে হেজে যাওয়া নদী। নাম তার সুবর্ণবতী। লোকের মুখে মুখে তা এখন সুঁটি। সুঁটি নদী আর তার খাত। সুঁটি নদী এখন হেজে মজে গিয়ে খালের রূপ পরিগ্রহ করেছে। কোথাও বা সেটুকুও অবশিষ্ট নেই। সেটেলমেন্টের বাবুদের কেরামতিতে ক্ষমতাশালী লোকেদের নামে রেকর্ড হয়ে গেছে ডাঙা জমি হিসেবে। সে এক গভীর চক্কর। এ আখ্যানের চরিত্রও তাই বদলে যেতে থাকে।
নদীর পাড় দেখেছে বিজন। গঙ্গা আর ফুলহরের মাঝের চরে বাড়ি ছিল তাদের। সে বাড়ির কথা আবছা মনে আছে তার। উঁচু দাওয়া-ওলা মাটির বাড়ি। টালির চাল। তার সাথে উঠোন, রান্নাঘর আর বাড়ির সামনে এক চিলতে জমিতে সব্জির বাগান। বাড়ির ঠিক সামনেটার পূব দক্ষিণ কোণে একটা ক্ষীরাসাপাত আমের গাছ। একটা ঘরে ঠাকুরদাদা মতি মন্ডল আর অন্যটাতে বিজন আর তার বাপ । বাড়িতে কোনো মেয়েছেলে নেই । বাড়ির সব কাজ তার বাপই করত । শুধু রান্নাবাড়া করে দিত বুড়ি অন্নদা দিদি। বলত ‘তোদের মাগ-খেগোর বংশ। তোর মা যেমন চলে গেল এয়োতি, তোকে ফেলে রেখে তেমনি তোর ঠাকমাও চলে গেছলো তোর বাপেরে এট্টুনি রেখে’। থেলো হুঁকোয় তামুক টানতে টানতে আর কাশতে কাশতে ঠাকুরদাদা মতি মোড়ল শুনত সব কথা আর গাল পাড়ত অন্নদা দিদিকে – ‘চুপ কর, চুপ কর আবাগি, আমার একটাই মা-মরা পোতা। আমার বংশের পুঁজি। তারে এসব কথা বলতি লজ্জা করে না’। তা সে কথা অন্নদাদিদি কানে তুললে তো। বলত ‘ একশোবার বলব। তোমরা সব মাগ-খেগো । মাগ-খেগোর গুষ্টি তোমাদের’।
বাপ তারে নিয়ে যেত ফুলহরের চরে আর দূরে নদীর মাঝখানে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলত ওখানে নাকি তাদের আগের বাড়ি ছিল। তিনটে ঘর, গোয়াল, বাগান সব। সেসব নাকি ফুলহরের ভাঙনে কবে তলিয়ে গেছে। বাপের দুঃখ সবটা বুঝত না বিজন। বাপ তাকে মাঝে মাঝে মাঠেও নিয়ে যেত। তখন সে নওগমা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেলাস থিরি। সবুজ ধানের ক্ষেত। যেদিকে তাকাও চোখ যায় জুড়িয়ে। তারপর কার্তিকে সোনালি রঙ ধরতো তাতে। আহা পাকা ধানের গন্ধ। কি যে মধুর সে বাস। সেই ফুলহরের চরে। সে গন্ধ এখনও পায় বিজন মোড়ল। এই করতে করতে সে আরেকটু বড় হল। আফতাব মাস্টার। তাহেরপুর হাইস্কুলের অঙ্কের মাস্টার গো । বাপকে ডেকে বলল -‘তোর ছেলের যা মাথা, তাতে ওর স্টার পাওয়া কেউ আটকাতে পারবে না’। বাপ বলত- ‘চাষার ব্যাটা, মাঠের কাজ না শিখলি চলবে ক্যামনে’?
তারপর আষাঢ় মাসে ঠাকুরদা গেল মরে। বুকে ব্যধি ধরেছিল গো, ক্ষয়কাশ তাতেই তার এন্তেকাল। আর তার দুমাস কাটতে না কাটতেই তাদের ভিটে সমেত দুবিঘে জমি জলের তলায়। সেই থেকে বাপ-ব্যাটা জন মজুর। অন্যের জমিতে কাজ। ঝুপড়িতে বাস। আবার কখনও বা মাটি কাটার কাজ। সরকারি লেবার। সে-ও তখন সপিন্দির সরকারের ইটভাটাতে কাজে জুটে গেল। লেখাপড়া বন্ধ। আফতাব মাস্টার দুঃখ করে বলত ‘নদীর ভাঙন তোর জীবনটাই তছনছ করে দিল রে বিজন। তোর মত অঙ্কের মাথা আমি খুব বেশি পাইনি জীবনে’। বাপ জনমজুর, ছেলে ইটভাটার শ্রমিক। দিনের শেষে সে-ই দুমুঠো ফুটিয়ে নিতো দুজনের জন্যে। কিন্তু সেসবও বেশিদিন সইলে তো?
দুই।
শুনশান দুপুর। কার্তিক মাসের শেষ। মাঠের কাজ এখন অনেকটা কম। বলতে গেলে নিড়েন দেওয়া ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। আমনের ক্ষেতে সোনালি আভা। আহা দেখলে বুক জুইড়ে যায় গো। মাঠ থেকে নিড়েন দিয়ে ফিরেছে বিজন মন্ডল। খানিক আগে। তারপর চাট্টি ডালভাত খেয়ে, দাওয়ার খুঁটিতে পিঠ ঠেকিয়ে থেলো হুঁকোয় তামুক টানছিল সে। একটু ঝিমুনি মত এসেছিল যেন। ঠিক সেই সময় নইমুদ্দিনের ভটভটির আওয়াজটা তার দাওয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো। ভটভটির আওয়াজে মেয়ে সন্ধ্যাও ঘর থেকে বেরিয়ে দাওয়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।
-‘তোমারে ডেকেছে কাকা। অঞ্চল আপিসে। কাল দুপুর নাগাদ একবার আসতি বলেছে’। আড়চোখে সন্ধ্যাকে দেখতে দেখতে হড়বড় করে কথাগুলো বলে নইমুদ্দিন। নইমুদ্দিন অঞ্চল আপিসের পিওন। বেশিদিন চাকরি নয়। ইদানীং মোটরবাইক কিনেছে। তার মানে হাতে বেশ টু-পাইস আসছে এখন। তার দৃষ্টিটা ভালো লাগে না সন্ধ্যার। সে তাড়াতাড়ি ঘরের ভেতর ঢুকে যায়।
- ‘ কেনরে? আমারে আবার অঞ্চল আপিসে কেন’? থতমত খেয়ে কথাগুলো বলে ফেলে বিজন।
- ‘তা জানিনি। প্রধান সাহেব তোমায় খপরটা দিতি বলল’। বলে সে দেখার চেষ্টা করে সন্ধ্যা কোথায় গেল। তারপর খানিকটা নিরাশ হয়েই বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে আবার বলে – ‘থালি কাকা কাল দুপুরবেলা মনে থাকে যেন’। কথা প্রায় শেষ না করেই হুশ করে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায় সে। বিজনের মনে একটা খটকা যেন আশঙ্কার মেঘের মত জমা হতে থাকে, হতেই থাকে।
শুধু এ গাঁয়ে কেন, গোটা ঘোলাডাঙ্গা থানা এলাকাতেই কোনো নদী নেই। আছে একটা মরা নদীর সোঁতা। সেটা কোথাও খাল কোথাও বা ডাঙা। ক্ষেতের ফসল ফলে সেখানে কোথাও কোথাও। এক বাবুদের কায়দায় অন্য বাবুদের নামে রেকর্ড হয়ে যায়। নদী থাকলে মন উদাস হয়। নদীর কূল বড় সাংঘাতিক জায়গা হে । সেখানে বসলেই ভেসে যেতে ইচ্ছে হয়। দূর দিয়ে যখন ভেসে যায় পালতোলা নৌকা। মনটা তখন ব্যাকুল হয়ে যায়। ভেসে পড়তে ইচ্ছে করে। সংসারের বাঁধন ভুলে মন প্রজাপতি হয়ে যায়।
ফিডার রোডের ধারে ঝুপড়ি থেকে ঘোলাডাঙ্গা থানার আড়খালি গ্রাম অনেকখানি পথ। সে পথ পেরিয়ে আসার কথাও অনেক। সব কথা জমে ভারি হয়ে আছে বিজনের ফাঁপা বুকে। নদীর পাড় ভাঙার শব্দ সে যেন এখনো শুনতে পায়। সেও তো প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর হতে চলল। সে তখন গভীর ঘুমে প্রায় অচেতন। বাবার ঝাঁকুনি আর মানুষজনের চীৎকারে ধড়মড় বিছানায় উঠে বসল। তারপর বাপ-ব্যাটায় এক দৌড়ে ভিটের বাইরে। তারপর শুধু ঘুমচোখে তাকিয়ে দেখা, তাদের ভিটেমাটি, তুলসী মঞ্চ, সব্জির বাগান, গোয়াল ঘর সব গাই-বলদ সব সমেত ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল ফুলহরের জলে। আহা সে কি বুক ফাটা আর্তনাদ মানুষের। শুধু কি তাদের ঘর? আরো অন্তত পনেরোটা গেরস্তর ঘর গরু-বাছুর, হাল-বলদ সমেত ফুলহরের গ্রাসে তলিয়ে গেল । সবাই তারা উঠে এল শ্রীপুর স্টেশনে যাবার রাস্তার ধারে রেলের জমিতে। সার-সার ঝুপড়ির একটাতে তাদের ঠিকানা।
মাঝে মাঝে মাঠ থেকে ফিরে বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠত – ‘আমি মলে তোরে কে দেখবে রে বিজু । কী হবে তোর?’। মাঝে মাঝে নেশাও করত বাবা। তার নাকে গন্ধ আসত। এ গন্ধ তার চেনা। সপিন্দির সরকারের ইটভাটার ম্যানেজার বলাই নাথের মুখেও এই গন্ধ সে পেয়েছিল। সেদিন নাথ চড়াও হয়েছিল তার ওপর। ঘেঁটি ধরে তাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ইটভাটার পেছনের দিকে একটা ঘুপচি ঘরে। সে যেন একটা গুম-ঘর। দম বন্ধ হয়ে আসছিল বিজনের। তার ওপর বলাই-এর মুখের ওই দূর্গন্ধ। প্রায় আধঘন্টাটাক বাদে সে যখন হাফপ্যাণ্টটা পায়ের নীচ থেকে ওপরে ওঠাতে পেরেছিল তখন তার শরীর, মন দুটোই ক্লেদাক্ত। ঘোরের মধ্যে সে শুধু শুনতে পেয়েছিল বলাই-এর গলা- ‘যদি কাউরে বলিস, তবে তোর লাশ তোর বাবাও আর খুঁজে পাবে না। এখন যা ভাগ’। সেদিন ইটভাটা থেকে বেরিয়ে আসে সে। তারপর সোজা ফুলহরের চরে। মরে যেতেই ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু বাধ সাধল সেই আফতাব মাস্টার। সন্ধের মুখে সাইকেল নিয়ে ফিরছিল পাশের গ্রাম ধরমপুর থেকে। দূর থেকে তাকে ঠাহর করে হাঁক পাড়ল – ‘ কে? কে ওখানে? বিজন নাকি? সাঁঝের বেলা এখানে কী করছিস’? কাছে এসে তার চোখে জল দেখেছিল মাস্টারমশাই। তারপর জিগ্যেস করেছিল – ‘কিরে কাঁদিস কেন’? তাকে কিছু বলেনি বিজন। তার শরীর আর মনের অসহ্য যন্ত্রনা কেমন করে যেন টের পেয়েছিল মাস্টারমশাই। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল তার। তারপর তাকে সঙ্গে করে ঝুপড়িতে পৌঁছে দিয়ে বাবাকে বলেছিল। এখানে আর থাকিস না। এখানে কী আছে তোর ? কাল সকালে আমার কাছে আসিস । ঘোলাডাঙ্গায় চলে যাবার বন্দোবস্ত করে দেবো। আমার কলেজের বন্ধু ভবেশ মুখুয্যেকে চিঠি লিখে দিচ্ছি কিছু একটা হিল্লে হয়ে যাবে তোদের বাপ-ব্যাটার। ওদের অনেক জমিজমা, দেখভালের লোক নেই। তোদের পেলে বর্তে যাবে। আর হ্যাঁ পারলে ছেলেটাকে লেখাপড়া শেখাস’।

- ‘বাবা’। সন্ধ্যার ডাকে চমক ভাঙে বিজন মোড়লের। অন্যমনস্ক ভাবে সাড়া দেয়। ‘কী মা’?
- ‘কী বলে গেল লোকটা?’
- ‘পঞ্চায়েতে ডেকেছে আমারে। কাল দুপুর বেলায়।‘
- ‘কেন?’
- ‘তা তো বলল না ।‘
- ‘একা যেও না যেন। ভাইকেও সঙ্গে নিয়ে যেও।‘
- ‘তোর ভাই তো কলেজে থাকবে তখন’।
- ‘যাবে না। আমি বারণ করে দেব। তোমার সাথে যেতে বলব’।
মা-মরা দুই ছেলে মেয়ে কে নিয়ে বিজনের সংসার। অন্নদাদিদির কথা তার বেলাতেও হুবহু ফলেছে। মাগ-খেগোর গুষ্টি। ছেলে হবার সময় তার বউ সারদাও গেল মরে । মেয়ে সন্ধ্যা তখন পাঁচ বছর। এখন চব্বিশ। সেই সন্ধ্যাই এখন তাদের বাপ-ব্যাটার অভিভাবক।
তিন।
অঞ্চল আপিসের একতলায় বেশ ভিড়। দোতলায় উঠতে গিয়ে একটু হাঁপ ধরে গেল বিজনের। বয়েস সবসময় জানান দেয় শরীরকে। বয়েস? তা প্রায় ষাট ছুঁই ছুঁই হতে চলল। চাষের কাজে কিন্তু তার ক্লান্তি নেই। শুধু ধান রোয়ার কাজটা তার ভালো আসে না কোনোকালে। ড়োয়ার কাজে তাই সে ডেকে নেয় মধু ওঁরাও আর তার বউকে। হতদরিদ্র মধুর মুখে কিন্তু অনাবিল হাসিটি প্রতীক চিহ্নের মত লেগে থাকে সর্বদা। কোত্থেকে তোর এত হাসি আসে মধু? আকাশ ঠেঁয়ে গো বিজনদা। না হাসলি বাপ পিতামো কষ্ট পাবেনি।
দোতলার ঘরে প্রধান দিলীপ বোস বসে আছেন চেয়ারে। তার আসেপাসে আরো দুচারজন ভদ্রলোক। তার মধ্যে জমির আপিসের আমিন আইনুদ্দিকে চিনতে পারল বিজন। বাকি লোকেদের একজনকে খুব চেনাচেনা লাগল। দিলীপ বোস স্থানীয় কোদলা হাই ইস্কুলের মাস্টার। এখন পার্টির নির্দেশে ছুটি নিয়ে প্রধানগিরি করছেন। বিজন মোড়লকে ঢুকতে দেখে বোস বলে উঠলেনঃ
-‘এস বিজন এস।সঙ্গে কে? তোমার ছেলে’?
-‘হ্যাঁ দিলীপদা। আমার ছেলে’।
- ‘ও কী করে লেখাপড়া’?
- ‘এই তো কলেজে ভর্তি হয়েছে এই বছর’।
- ‘বা বেশ। কই হে সমর তোমার যেন কী বলার ছিল বিজনকে? বলে ফেল’।
সমর? এতক্ষন পরে চেনা চেনা লাগা লোকটার পরিচয় বুঝতে পারে বিজন। ভবেশ মুখুয্যের নাতি। এ তল্লাটে বেশি দেখা যায় না। বেশির ভাগ সময়েই জেলা শহরে থাকে। পার্টির উঠতি নেতা। তাই বোধহয় প্রধান সাহেবও অতিরিক্ত খাতির দেখাচ্ছেন ওকে।
‘হ্যাঁ’। বলে খানিক গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করে সমর। ‘আচ্ছা বিজনকা তুমি যে আমাদের চার বিঘে জমি লিজে চাষ কর, সেটা সেটা দাদু কবে লিজ দিয়েছিল তোমাদের’?
-‘লিজ’! মাথায় প্রায় বাজ পড়ে বিজনের। ‘ লিজ তো নয়, ভবেশ জ্যাঠাতো বাবার নামে বর্গা করে দিয়েছিল ওই জমি’।
- ‘লিজ নয়? জমির রেকর্ড কি বলছে হে আইনুদ্দি’? সমর এবার প্রশ্নটা করে আমিন আইনুদ্দিকে।
- ‘পড়চা তো বলছে ভবেশ মুখুয্যের নামে রায়তি জমি। বর্গাদার তো কেউ নেই। বিজন বা ওর বাপের নাম কোথাও রেকর্ডে নেই’। আমিনুদ্দিন কী একটা কাগজে চোখ বুলওতে বূলোতে বলে কথাগুলো।
- ‘ রেকর্ডে না থাকাটা তো আপিসে বাবুদের কারসাজি। আর নতুন আইন বলে যে রেকর্ড না করলেও বর্গাদারের সত্ত্ব বিলোপ হয় না’। এবার কথাগুলো বলে ওঠে মানব, বিজনের ছেলে।
- ‘আচ্ছা’! কপট বিস্ময়ের ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে সমর।‘তোমার ছেলে তো বেশ আইন-বাজ হয়েছে দেখছি। তা কলেজে রাজনীতি টাজনীতি করছে নাকি আজকাল? তা ভালো, চাষার ছেলে সবসময় যে চাষবাসই করবে তারই বা কী মানে আছে’?
ছেলে মানব কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল। থাকে থামিয়ে দেয় বিজন।
-‘তুই চুপ কর’। বলে ছেলেকে কর্কশ ধমক লাগায় । তারপর গলাটা খানিক মোলায়েম করে বলে ‘আসলে আমি তো জানি ওটা বর্গা জমি’?
- ‘মানুষ চলে যায় বিজনকা। রেকর্ড থেকে যায়। তোমার কাছে যদি কোনো কাগজ থাকে দেখাও। না থাকলে আইনুদ্দি যা বলছে সে তো শুনলেই’।
- ‘আসলে কী হয়েছে জানো বিজন, ওই চার বিঘের মধ্যে দুবিঘে সুঁটির নদীর খাত। আর বাকিটা সমরের দাদুর নামে। এখন সমরই তার ওয়ারিশ’। এবার কথাগুলো বলেন প্রধান সাহেব। ‘সরকার প্রকল্প নিয়েছে সুঁটি খাল আবার নতুন করে কাটবে,। তাতে করে ওই জমি তো গেলই’।
- ‘আর বাকি দুবিঘে আমি আর রাখতে চাই না। আমাদের পার্টির সরকার কম্পেনসেশন যাই পাই না কেন সরকারকেই দিয়ে দেব। মানুষের কাজে লাগবে। আর তা ছাড়া তোমাদের ভিটেটাও তো আমাদেরই জমি। সেটা তো আমি আর ফেরত চাইছি না এখনি’। কথাগুলো এক লপ্তে বলে দম নেয় সমর।
- ‘তার মানে? আমি খাবো কী? আমার সম্বচ্ছরের খোরাক তো ওই জমি থেকে’। অসহায়ের মত কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বিজন।
কেউ কোনো উত্তর দেয় না তার কথার। ধীরে ধীরে বিজন আর মানব বেরিয়ে আসে অঞ্চল আপিস থেকে। নদী না থাকলেও ভাঙ্গন থেকে যায়। তার কোনো সাক্ষী থাক বা না থাক।

চার।
ফিকিরচাঁদ ফকির বলে খেদে, দিন থাকিতে,
আপনার হিসেব নে রে দেখে;
যদিরে থাকে বেঠিক; কর তা ঠিক;
তবেই নিকাশ দিবি সুখে।
আজ গাঁয়ে নবান্ন উৎসব। বারোমাসের তেরো পার্বণ। শুধু বিজনের ঘরেই টিমটিম করে একটা হলুদ লাইট জ্বলছে। সেই প্রায়ন্ধকার ফুঁড়ে শোনা যায় মানবের গলা।
-‘বাবা আর ফিরবে নারে দিদি? আজ নদিন হয়ে গেল মানুষটার দেখা নেই’। যেন কিছু একটা আশ্বাস সে চায় সন্ধ্যার কাছে।
-‘অলুক্ষুণে কথা থামাবি’? সন্ধ্যার মনটা খাঁ খাঁ করতে থাকে। ভাইকে থামিয়ে দিলেও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে তার।
নদিন আগে শেষ বিকেলে মধু ছুটতে ছুটতে এসে তাদের উঠনের কাছে হাঁপাতে থাকে।
- ‘কি হয়েছে রে মধু’? বিজন জিগ্যেস করে।
- ‘তোমার জমিতে কারা নেমেছে। ধান সব কেটে নিল মনে হচ্ছে’।
- ‘সে কী রে দাঁড়া আসছি’। বলে গামছাটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যায় বিজন।
সত্যিই জনা পাঁচেক লোক হেঁসো হাতে তার জমিতে।
ভাঙনের শেষ পর্যায়ে সুঁটি নদীর খাতে সুর্য ততক্ষণে অস্তে গেছে। অঘ্রানের সন্ধ্যা ঝুপ করে নেমে এসেছে তখন।
- ‘কে তোমরা’?
বিজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে একটা ভারি কিছুর আঘাত তার মাথার ওপর নেমে আসে। পড়ে যেতে যেতে বিজন দেখতে পায় কাকে? ঠিক ঠাহর হয় না। বলাই কি? কিন্তু বলাই নাথ তো তো মরে গেছে বলে সে শুনেছিল। তাহলে এরা কারা। এরা কি সবাই বলাই। এদের মধ্যে কি একটাও আফতাব মাস্টার নেই? নাকি আফতাব মাস্টার এখনি এসে পড়বে। দূর থেকে তার সাইকেলের ক্রিং শুনতে পাবে বিজন। মাটিয়ে লু্টিয়ে পড়তে পড়তে সে শুনতে পাবে আফতাব মাস্টারের গলা – ‘ কিরে বিজন কী করছিস এখানে।
বিজন আর বাড়ি ফেরেনি। পুলিশের খাতায় সে নিঁখোজ। ভাই বোন বেশ কবার গিয়েছিল ঘোলাডাঙ্গা থানায়। প্রতি বারই শুনে এসেছে তদন্ত চলছে। আসলে সেই তো রেকর্ড কথা বলে মানুষ নয়। মানুষের মুখ বন্ধ হয়। কখনও খোলেও আবার। কে যেন জীবনানন্দের কবিতা শোনায়, মানবের কানের কাছে মুখ এনে -
তুমি সেই নিস্তব্ধতা চেনোনাকো; অথবা রক্তের পথে পৃথিবীর ধূলির ভিতরে
জানোনাকো আজো কাঞ্চী বিদিশার মুখশ্ৰী মাছির মতো ঝরে;
সৌন্দর্য রাখিছে হাত অন্ধকার ক্ষুধার বিবরে;
গভীর নীলাভতম ইচ্ছা চেষ্টা মানুষের— ইন্দ্রধনু পরিবার ক্লান্ত আয়োজন
হেমন্তের কুয়াশায় ফুরাতেছে অল্পপ্রাণ দিনের মতন।
ফুলহরের বুকে একটা সাদা পালতোলা নৌকা দেখা যায় আজকাল। আর তাইতে ভেসে যেতে দেখা যায় সন্ধ্যা আর মানবকে। ধীরে ধীরে অঘ্রানের কুয়াশায় তাঁরা ক্রমশ মিলিয়ে যায়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement