এক প্রান্তিক সর্বহারা মানুষ,তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া অন্তঃস্বত্তা স্ত্রীর গর্ভে তার নিজের সন্তান কে খুঁজে ফেরে। ফিরে পেতে চায়। তারপর একদিন অকস্মাৎ আবিষ্কার করে তার সন্তান ফিরে এসেছে তার গ্রামে। সেই সন্তানও হয়ত তার পিতৃ-পরিচয় জানার তাগিদে চলে এসেছিল সেই গাঁয়ে। পরে তারা দুজনেই পরস্পরের পরিচয় আবিষ্কার করে। এক প্রান্তিক মানুষের বাবা হয়ে ওঠার স্বপ্ন কিন্তু বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়না। তবুও সন্তানের প্রতি বাবার টান চিরকাল অক্ষয় হয়ে থাকে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২২ জুলাই ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাবারা এমনই হয় (জুন ২০১৯)

বিষাণ ওঝা ও তার স্বপ্নের সন্ততি
বাবারা এমনই হয়

সংখ্যা

সুপ্রিয় ঘোষাল

comment ২  favorite ০  import_contacts ৫৪
একসঙ্গে পাঁচজন ওঝা তাকে ঘিরে নাচছে। তার সঙ্গে ক্রমাগত মাদল আর নাকাড়া পেটানোর একঘেঁয়ে শব্দ ক্রমশ গ্রাস করছে তার চেতনা। কিন্তু কৃশানুর মনে হচ্ছে যেমন করেই হোক তাকে সচেতন থাকতেই হবে নয়ত অমোঘ মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে রক্ষা নেই তার। ঐ শব্দ আর ওঝাদের ঘুরে ঘুরে নাচ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সময় যেন ঘনিয়ে আসছে তার । আর ওই শব্দসমূহ তার মস্তিষ্কের কোষগুলোতে এসে মিশে যাচ্ছে, আর্দ্র করে দিচ্ছে তার জ্ঞান, রক্তাক্ত হয়ে উঠছে মস্তিষ্ক আর মস্তিষ্কের সেই ক্ষরিত রক্ত তার কান নাক বেয়ে গড়িয়ে আসছে। জিভে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে রক্তের নোনা স্বাদ।
কি করবে কৃশানু? ডা; কৃশানু ধর। মেডিকেল কলেজের কৃতি ছাত্র, ঝকঝকে উজ্জ্বল কৃশানু। এই মৃত্যুকে কি সে মেনে নেবে? এত সহজে মেনে নেবে হার? জীবন্ত, প্রাণবন্ত কৃশানু, যে কিনা শহরের আকর্ষক কেরিয়ার ছেড়ে ডাক্তারি পাশ করে চলে এসে ছিল মাদিয়ার বিন পাড়ায় কুসংস্কারপ্রসূত অকালমৃত্যু আর অচেতনতার সঙ্গে লড়াই করবে বলে। বোধহয় নিজের অকালমৃত্যুই তাকে সেই লড়াইতে হেরে যেতে বাধ্য করবে।
আবার যেন জ্ঞান হারাচ্ছে সে। ক্রমশঃ এগিয়ে আসছে ওঝারা। কৃশানুর যেন মনে হচ্ছে তাদের সবার মুখ ঠিক বিষাণ ওঝার মত। এটা কি সত্যি ? নাকি ওঝার ব্ল্যাক ম্যাজিক? কিন্তু ম্যাজিকও তো বিজ্ঞান। ওঝাদের হাতে ওটা কি? সড়কি? বিঁধিয়ে দেবে নাকি পাঁজরে? তারপর কি বুকের প্রকোষ্ঠ থেকে ছিঁড়ে নেবে হৃদপিন্ড তার। না আর সহ্য হচ্ছে না। এবার ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে বিষানের মুখ। বাকি চারজন থেমে গেছে, শুধু বিষাণ এগিয়ে আসছে। সড়কি ছুঁড়বে তার দিকে। জ্ঞান হারাল কৃশানু । তার প্রাণ যেন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।সে যেন খানিকদূর থেকে তাকিয়ে আছে তার নিজের মৃতদেহের দিকে। কি অসম্ভব যন্ত্রণা, কি প্রবল আকুতি অদূরে পড়ে থাকা প্রাণ-বিচ্ছিন্ন দেহটার কাছে ফিরে যাবার জন্য। কথা বলতে চাইছে সে। তার এই অব্যক্ত বেদনার কথা সবাইকে জানাবার জন্যে সে ব্যাকুল। কিন্তু কিছুতেই যেন পারছে না সে ।
ও এই তাহলে মৃত্যু । আপন মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। মুখথেকে নিঃসৃত হয় একটা অব্যক্ত গোঙানির শব্দ। ঘুমভাঙ্গা চোখে কৃশানুকে প্রবল ঝাঁকুনি দেয় মৌসুমি।
‘কী হল? স্বপ্ন দেখেছ নিশ্চয়ই?’ জিগ্যেস করে মৌসুমি। আজকাল প্রায়শঃই দু:স্বপ্ন দেখে কৃশানু।
‘জল খাও’। মৌসুমি জলের বোতল বাড়িয়ে দেয় কৃশানুর দিকে। বিমূঢ় কৃশানু কথা না বলে জলটুকু নিঃশ্বেষ করে তাকায় মৌসুমির দিকে। তারপর বলে ওঠে ‘ও কিছু না। একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। ‘
‘সে তো বুঝলাম। আজকাল প্রায়ই কিন্তু এরকম হচ্ছে তোমার। ‘
‘আরে নানা সব ঠিক আছে। তুমি ঘুমোও। মৌসুমির ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় কিছুটা অস্বস্তি লাগে কৃশানুর। তারপর ধীরেধীরে আবার ঘুমিয়ে পড়ে দুজনে।
২.
কৃশানু যখন হাউস্টাফশিপের শেষ পর্যায়ে পোস্টগ্র্যাজুয়েট এন্ট্রান্সের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন একদিন বালুরঘাট থেকে ছোটমামু এসে হাজির। এ কথা সে কথার পর কথাটা পাড়ে ছোটোমামু –‘আসবি আমাদের ওখানে। চিকিৎসার বড় অভাব। মানুষ অপুষ্টিতে মরছে, অশিক্ষায় মরছে, বিনা চিকিৎসায় মরছে। মরার নানা ধাপ পার হতে হতে শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর ঠিকানা থেকে। তোদের মত ছেলেরা এলে মানুষগুলো হয়ত বেঁচে যেতে পারে অশিক্ষা আর কুসংস্কারের করাল গ্রাস থেকে।‘
সে জানত তার ছোটমামু মানবাধিকার কর্মী আর তাছাড়া কোন একটা রাজনৈতিক দলের মাঝারি মাপের নেতা। রাজনীতি যদিও তার পছন্দের বিষয় নয়। কিন্তু ছোটমামু বরাবরই তার কাছে বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র। তাই কোন এক আশ্চর্য প্রত্যয় থেকে বলা কথাগুলো মাথায় গেঁথে যাচ্ছিল কৃশানুর। আবর্তিত হচ্ছিল নানা চিন্তাসূত্র ধরে। খানিক বাদে সে ছোটমামুকে বলেছিল –‘ দুদিন সময় দাও, একটু ভেবে দেখি।দুদিনের ভেতর তোমাকে জানিয়ে দেব।‘
৩।
ট্রেন থেকে নেমে বাস , ঘন্টা দুয়েকের পথ পেরিয়ে সোজা ছোটমামুর ডেরায়। ডেরাটা না চিনলেও অবিশ্যি খুঁজে পেতে খুব বেগ পেতে হয়নি । দু- একজনকে জিগ্যেস করতেই পথ বাতলে দিয়েছিল। ছোটমামু এখানে বেশ চেনামুখ , রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্রেই বোধহয়।
একটা টিনের চালের আধপাকা বাড়ী। সেটাই ছোটমামুর অফিস-কাম-বাসা-কাম-কর্মভূমি। তার পেছনদিকে আমগাছে ঘেরা মাটির দেয়ালে টিনের ছাদ দেওয়া স্কুলবাড়ী। বিনপাড়া স্কুল। তারপর আমবাগান পেরিয়ে চাষের মাঠ বাঁদিকে রেখে ব্রিক-ব্যাটসের এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে খানিক এগোলেই বিনপাড়া । কাছাকাছি বাসস্টপ বলতে মাদিয়াঘাট। ফেয়ার-ওয়েদার রোড, বর্ষাকালে জলে ডুবে যায়। সড়কপথে নিকটবর্তী শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় গ্রামটি। তখন খেয়া নৌকাই একমাত্র ভরসা। তারপর ভ্যানরিক্সা। এই বিনপাড়া স্কুল ছোটমামুর হাতে গড়া। ছাত্র সাকুল্যে ঊণত্রিশ। তাও পাঁচবছরের অনলস চেষ্টায় এই অবধি আসা গেছে।
ডাক্তার ভাগ্নেকে পেয়ে নতুন আশায় চাঙ্গা হয়ে ওঠেন অমিয় বিশ্বাস।
‘জানতাম তুই আসবি’। তাকে দেখে জড়িয়ে ধরে ছোটমামু।
‘তুমি জানতে?’ হেসে খানিক টা অবিশ্বাসের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে কৃশানু।
প্রাথমিক উচ্ছাস কাটিয়ে নিয়ে ছোটমামু বলতে শুরু করে – পাশের ঘরটাকে গুছিয়ে নিয়ে তোর জন্যে একটা রুগী দেখার চেম্বার বানাতে হবে। আর যোগাড় করতে হবে কিছু জরুরি ওষুধপত্রও । তুই আমাকে একটা লিস্ট বানিয়ে দিস তো, জরুরি ওষুধের। আমার যা পুঁজি আছে তার সাথে মায়ের পেনশনের থেকে জমানো টাকা কিছু নিই তাহলে আপাততঃ কাজ চলে যাবে মনে হয়। লিস্টটা কিন্তু চটপট বানিয়ে ফেল।‘
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ছোটমামু আবার বলতে শুরু করে –‘ গাঁয়ের লোকেদের বোঝাতে হবে আমাদের, যে ওই সব ওঝা ডেকে আর ঝাড়ফুঁক করে রোগ সারে না। রোগ সারাতে লাগে ডাক্তার। রীতিমত মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা , ট্রেনিং নেওয়া ডাক্তার। তুই-আমি একসাথে যাব লোকেদের বোঝাতে।‘ বলতে বলতে ডাক্তার ভাগ্নের গর্বে কিছুটা যেন উচ্ছসিত হয়ে ওঠে ছোটমামু।
ওঝা? এই যুগে?– প্রায় আর্তরব বেরিয়ে আসে কৃশানুর গলা থেকে।
‘হ্যাঁ, তাহলে আর বলছি কি? রোগ-বালাইতে তো ওঝাই ভরসা এদের। ডাক্তার পাবে কোথায় এরা? একটা হাতুড়ের চেম্বার আছে মহারাজনগরে। এখান থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূর, তাও আবার নদী পেরতে হবে দু-দুবার। তাছাড়া লেখাপড়া না করার ফলে ডাক্তারের প্রয়োজনীয়তাও বোঝেনা এরা। সাপে কাটা, ধনুষ্টঙ্কার, কলেরা কিম্বা টাইফয়েড সবেতেই ওঝাই ভরসা এদের। দারিদ্র্যকে এরা ভাগ্য মানে, মৃত্যুকেও তাই’। খানিকটা যেন শোকার্ত অভিভূতের মত বলে ওঠে অমিয় বিশ্বাস।

৪।
আশ্চর্য, সেদিন বিকেলেই গ্রামে ছোটমামুর সাথে ঘুরতে ঘুরতে কৃশানু মুখোমুখি হল বিষাণ ওঝার। দড়ি পাকানো শিরা-ওঠা চেহারা। একটু ঢ্যাঙ্গা মত। খোঁচাখোঁচা দাড়ি চুল সব সাদা। গায়ের রঙ বেলেমাটির মত। চোখদুটো ঘোলাটে কিন্তু তীক্ষ্ণ। বয়েস আন্দাজ ষাট। অমিয় বিশ্বাসের সাথে কৃশানুকে দেখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বিড়ি ধরিয়েছিল, তারপর যেন তাদের অগ্রাহ্য করে চলে গিয়েছিল অন্যত্র ।
‘এ ব্যাটাই যত নষ্টের গোড়া বুঝলি’। বলেছিল ছোটমামু। ‘একে যদি বাগে আনতে পারি তাহলে অন্যদের বিশ্বাস অর্জন অনেক সহজ হয়ে যাবে। তবে বাগে সহজে আসবে না, সেটাও সত্যি’।
কৃশানু কিছু বলে না। ছোটমামুর দিকে তাকায় একবার। তারপর দুজনেই নীরব হয়ে যায়। পরে সে জেনেছিল বিষান ওঝাকে সবাই সমীহ করে, খানিকটা ভয়ও পায় বোধহয়। সে নাকি তার নিদ্রাহীন রাতে ঘুরেবেড়ায় গাঁয়ের বাড়ি বাড়ি। উঁকি দিয়ে বেড়ায় তাদের অন্দরে। উপায়ান্তর না দেখে গাঁয়ের লোকজন মেনে নিয়েছিল এইসব।
৪.
দেখতে দেখতে দুবছর কেটে গেল। মহানন্দা, কালীন্দির জল গড়িয়ে গেল অনেক দূর। ।কিন্তু এই বিনপাড়াতে অগ্রগততির আলো ঢুকলেও ঢুকছে বড় ধীর গতিতে। প্রথমদিকে নিজেকে ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল কৃশানুকে। বহুপুরনো সংস্কার, অপরিবর্তিত সমাজচেতনার সাথে সাথে যোগ হত অবিশ্বাস, সুঁই আর বিলিতি দাওয়াইএর ভয়। তাছাড়া ওষুধের অভাব আর ভাষা সমস্যাতো ছিলই। ওষুধের অভাব এখন আর তেমন নেই অবশ্য। তাদের সাহায্য বেশ কিছু এনজিও এখন এগিয়ে। এনজিওরা শুধু নাম যশ চায় – প্রচার ছাড়া চাহিদা আর তেমন কিছু চায়নি এখনও পর্যন্ত। সরকারী দরবা্রেও যেতে হয় নি আজ অবধি।

অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল সে আর ছোটমামু। স্কুলের সাথে সাথে ডাক্তারখানাকে দাঁড় করানোর জন্যে। এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে তাদের অবস্থাও স্বচ্ছল হয়েছে অনেক। বা-মাও মেনে নিয়েছেন কৃশানুর পাগলামি খানিকটা বাধ্য হয়েই হয়ত।
এর মধ্যে, দিনকয়েক আগে ছোটমামু শহর থেকে ফিরে এসে বলল – ‘ আমাকে এবার যেতে হবে শানু, এখান থেকে’।
‘মানে’
‘মানে পাততাড়ি গোটাতে হবে এইবার, এখান থেকে আমাকে’।
‘সেকি? কেন’?
‘পার্টির নির্দেশ। সংগঠনের নেতৃত্ব আমাকে এখান থেকে অন্য জায়গায় পাঠাচ্ছে কাজ করতে। চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে, আরও উত্তরে’।
‘কিন্তু তোমার স্কুল? তার কি হবে’? আমি তো দু’টো একসাথে চালাতে পারবো না’। অস্বস্তি নিয়ে বলে কৃশানু।
‘সে ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। যে দুজন লোকাল ছেলে পড়ায় তারাই আপাততঃ চালিয়ে নেবে। আর আমার উদ্দেশ্য ছিল এদের মাথায় লেখাপড়া আর আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্বন্ধে ধারনা তৈরী করে দেওয়া। সে কাজটা আপাততঃ হয়ে গেছে। তুইও এবার শহরের জীবনে ফিরে যেতে পারিস’। এক নাগাড়ে এতক্ষণ বলে বোধহয় একটু দম নেওয়ার জন্যেই থামে ছোটমামু।
‘ফিরে যাব? কি বলছ তুমি? ফিরে যাবার জন্যে কি অভ্যস্থ চেনা পথ ছেড়ে এসেছি? আর এখানে থেকে থেকে গেঁয়ো হয়ে গেছি। শহর আর আমার পোষাবে না। শহরের জীবনে আর ফিরতে পারব বলে মনেও হয় না’। এ পর্যন্ত বলে চুপ করে যায় কৃশানু।
ছোটমামুও আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ সরে যায় সেখান থেকে । পরদিন সকালে ‘আসছি তাহলে’ বলে ব্যাগ-তোরঙ্গ নিয়ে চলে যায় ছোটমামু।
অমিয় বিশ্বাসের ভ্যান-রিকশায়-বসা অপসৃয়মান, শীর্ণকায় চেহারাটাকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে দেখে কৃশানু। কিন্তু সে ভেঙ্গে পড়ে না, বরং আরও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে।
৫.
স্কুল কিন্তু উঠল না। তার কারণ মৌসুমি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের মেধাবী ছাত্রী মৌসুমি হঠাৎ করে চলে এল তার জীবনে। আলাপ তাদের আগেই ছিল। কলেজ ফেস্ট থেকে। তারপর বন্ধুত্ব, আরও গভীর বন্ধুত্ব। কিন্তু মৌসুমি যে হঠাৎ করে তার সাথে এই অজ গাঁয়ে থাকতে চলে আসবে তা ছিল কৃশানুর স্বপ্নেরও অতীত। জিগ্যেস করাতে সে বলেছিল মায়ের সাথে মনান্তর হওয়ায় সে চলে এসেছে। কিন্তু কৃশানুর মনে হয়েছিল সে বোধহয় কিছু লুকোতে চাইছে, যা তার একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু সে আর কোন প্রশ্ন করেনি। মৌসুমির হৃদয় খুঁড়ে বেদনা আর জাগাতে চায় নি সে।
প্রথমে ভেবেছিল তারা লিভ-ইন করবে কিন্তু পারিপার্শ্বিকের কথা ভেবে সে ঝুঁকি আর নেয়নি তারা। সিদ্ধান্ত বদল করে রেজিস্ট্রিই করে নিয়েছিল।
অসম্ভব পরিশ্রম শুরু করে মৌসুমি স্কুলটাকে দাঁড় করাবার জন্যে। মূলত তার উদ্যোগেই এনজিওদের সাথে যোগাযোগ, স্কুল আর ডাক্তারখানার জন্যে টাকা যোগাড়। মৌসুমির হাতের ছোঁয়ায় তাদের বাসস্থানও রূপ বদলাল। এখন এই গ্রামের সব থেকে সুন্দর বাড়ির মালিক ওরা। যদিও সেটাকে পুরোপুরি পাকা বলা যায় না হয়ত কিন্তু ভেতরে তাদের সাজানো-গোছানো সংসার দেখে গাঁ-এর লোকেরা অবাক হয়। ঈর্ষাও করে বোধহয়। ক’দিন আগে ইলেক্ট্রিসিটিও চলে এসেছে তাদের বাড়িতে।
এই ক’বছরে গ্রামের লোকের মনোভাবও যেন তাদের ওপর কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন তাদের গ্রামের লোকেরা আর শহুরে শত্রু ভাবে না। পুরোপু্রি আপন না হলেও কিছুটা শ্রদ্ধা-সমীহ তারা আদায় ক’রে নিয়েছে। শুধু একজন ছাড়া। বিষাণ ওঝাকে কিন্তু কিছুতেই বাগে আনা গেলনা। গ্রামে ওঝার প্রভাব অবিশ্যি এখন অনেকটাই খর্ব হয়েছে। কেউই আর আগের মত তার কাছে রোগ সারাতে যায় না। খানিকটা গ্রামবাসীদের দয়ার দানেই প্রায় পরান্নভোজীর মত তার জীবনধারণ বর্তমানে। তবে সে কিন্তু আগের মতই ঘুরে বেড়ায় গ্রামের যত্রতত্র।
৬.
একরাত্রে হঠাৎ রাত্রে মৌসুমির চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে যায় কৃশানুর। অন্ধকারে ঠাওর করে দেখে জানলার গরাদ ধরে প্রবল চিৎকার করছে মৌসুমি। জানলার বাইরের দিকে চোখ পড়তে দেখে ধীর পায়ে চলে যাচ্ছে কেউ। অবয়বে মনে হয় তার এ আর কেউ না, বিষাণ। মৌসুমিকে টেনে নিয়ে চলে আসে সে জানলার ধার থেকে। তাকে শুইয়ে দেয় বিছানায়। স্থির করে পরের দিনেই মুখোমুখি হবে বিষাণের।
পরেরদিন দুপুরবেলা রুগী দেখা শেষ করে বিষাণের কুঁড়ে ঘরের দিকে রওনা দেয় কৃশানু। আলোর থেকে দরজা ঠেলে প্রায়ান্ধকার ঘরে ঢুকে সে প্রথমে কিছুই ঠাওর করতে পারে না। কিন্তু শুনতে পায় কে যেন পরিষ্কার বাংলায় বলছে –‘ এসো ডাক্তারবাবু এসো। তা হঠাৎ কি মনে ক’রে’? বিস্ময় যেন কাটতেই চায়না কৃশানুর। চোখে অন্ধকার সয়ে আসতে বিষাণেরর অবয়ব খানিকটা স্পষ্ট হয় তার কাছে। কিন্তু বিষাণেরর গলার স্বর এই প্রথম শুনল সে। বিষণ্নতা নেই বরং কৌতুক যেন মনে হল তার । কিছুক্ষণের জন্যে যেন বাকরোধ হয়ে গেল কৃশানুর। খানিকটা চিত্রার্পিতের মত অবাক হয়ে সে শুনতে লাগল বিষাণের কথা।
‘খুব অবাক হয়ে গেলে? তাই না ডাক্তারবাবু? আমার আসল নাম শুনলে আরও অবাক হবে ? হ্যাঁ বিশ্বনাথ রায়। আদিবাড়ি নাটোরে। দেশভাগের পরেও বেশ কিছুদিন টিঁকে ছিলাম ওদেশে তারপর আর পারছিলাম না, চলে আসি এদিকে ? বাপ মা আগেই মারা গেছিল, ভাইবোনেরা কে কোথায় ছিটকে গেলাম কে জানে? আমি ভাসতে ভাসতে ঠেকে গেলাম এখানে। পাঁচপুরুষের কবিরাজ আমরা। নাড়িজ্ঞান ভালোই ছিল তার ওপর গাছপালা শিকড়-বাকড়ের মাহাত্যও বুঝতাম ভালই। ডাক্তার বনে গেলাম এখানে। তুমি আসার আগে অবধি আমিই ছিলাম রোগ-বালাইয়ে এদের একমাত্র ভরসাস্থল’।
থেমে থেমে এই পর্যন্ত বলে চুপ করে বিষাণ। খানিকক্ষণ সাদা দাড়িতে হাত বোলায়। তারপর আবার বলতে শুরু করে –‘ ধীরে ধীরে এদেরই একজন হয়ে যাই। এরাই আমাকে বিশ্বানাথ রায় থেকে বিষাণ ওঝা বানিয়েছে। বিয়েও করেছিলাম এক সময়। কিন্তু স্ত্রী যখন আমাকে ছেড়ে চলে যায় তখন সে দু-মাসের অন্তস্বত্ত্বা। যার সঙ্গে চলে গেল সে নির্বোধ, কিছুই বোঝেনি। আমি কিন্তু সব জানতাম। শুধু একটা সন্দেহ ছিল? তখন বুঝতে পারিনি বাচ্চাটা কার? ভেবেছিলাম আপদ গেছে’।
‘কিন্তু’? – কৃশানু কিছু একটা বলার চেষ্টা করে।
তাকে থামিয়ে দিয়ে বিষান বলে ওঠে। ‘আস্তে আস্তে সামলে নিয়েছিলাম সব। আমার চাহিদাও ছিল না কিছু তেমন। কিন্তু তোমরা এসে সব তছনছ করে দিলে। না না না তোমার ডাক্তারি নয়। আধুনিক চিকিৎসা যে এদের প্রয়োজন সেটা আমিও বুঝি। কিন্তু ঐ মেয়েটি, তুমি যার সাথে থাকো, সে এসে সব হিসেব ওলট-পালট করে দিল।
‘মানে’?
‘তোমার নিজের রক্ত যদি তোমাকে অস্বীকার করে কেমন লাগবে? বল কেমন লাগবে তোমার’? বলতে বলতে খানিকটা যেন চীৎকার করে ওঠে বিষান।
কিছু বুঝতে না পেরে বিমূঢ় হয়ে যায় কৃশানু। সম্বিত ফিরলে ঠান্ডা গলায় বলে –‘ কালরাত্রে আমাদের ঘরে গিয়েছিলেন কেন’?
‘বলছি তো একটা হিসেব মেলাতে। রক্তের হিসেব, মুখের আদলের মিল। বুড়ো হলেও চোখে কিন্তু এখনও খারাপ দেখিনা’। মুখের বলিরেখা পেরিয়ে শব্দগুলো নিঃসৃত হয় বিষাণের মুখ থেকে।
একরাশ বিস্ময় নিয়ে ওঝার বাড়ি থেকে ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে আসে কৃশানু।
সে জানতেও পারেনা যে কয়েক ঘন্টা আগে ঠিক এভাবেই এখান থেকে বেরিয়ে এসেছে মৌসুমি, তার আত্মপরিচয়ের বাকি অংশটুকু জেনে।

প্রায় এক হপ্তা পরে গ্রামের প্রান্তে বিষাণের বাড়ি থেকে আগুনের লেলিহান রেখা ভোর রাত্রে দেখতে পায় লোকজন । অনেক চেষ্টার পর গ্রামবাসীরাই বালতি বালতি জল ঢেলে আগুন আয়ত্বে আনে। পুলিশেও খবর গিয়েছিল। সেখান থেকে দমকল। কিন্তু আগুন নেভানোর আগেই সব পুড়ে ছাই। দেহ টা যখন উদ্ধার হয় তখনও প্রাণ ছিল বিষাণের, কিছু যেন বলতে চাইছিল সে। অনেকে ছুটেছিল ডাক্তার-কে খবর দিতে। কিন্তু কৃশানু পৌঁছনোর আগেই সব শেষ।
চিরকালের মত হারিয়ে বিষাণ গেল এ গ্রামের থেকে নোঙর তুলে নিয়ে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement