ভাঙ্গা মন আর সংগ্রামের গল্প।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভাঙ্গা মন (নভেম্বর ২০১৯)

প্রেম একবারই এসেছিলো নিরবে
ভাঙ্গা মন

সংখ্যা

Lubna Negar

comment ২  favorite ০  import_contacts ৩৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে গোলচত্বরে দাড়িঁয়ে আছে অনীতা । শুভর জন্য অপেক্ষা করছে । গতকাল ফোনে শুভর সাথে কথা হয়েছে ।কিছু জরুরি বিষয় তাকে আজই জানানো দরকার । এখন শরৎকাল চলছে । নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে । রোদের তাপও প্রখর নয় । তবে দুপুরের দিকে বৃষ্টি হয়েছিলো । অনীতা তখন টিউশনি করে ফিরছিল । ফুটপাথের দোকানের ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছে সে । শুভর কাছে শুনেছিলো কবিগুরুর প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা । অনীতা বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হয়েও বর্ষা ঋতু কে ঠিক উপভোগ করতে পারে না । তাকে পায়ে হেঁটে দুটো টিউশনি করতে হয়। এই সময় রাস্তায় বৃষ্টি হলে মুশকিল । তাছাড়া মিরপুরে দুই রুমের নিচ তলার যে বাসায়ে তারা ভাড়া থাকে সেখানে জোরে বৃষ্টি এলে পানি জমে যায় । বাবার অবসরগ্রহণের পর থেকে তারা এই বাড়িতে থাকে ।
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে অনীতা শখের বশে বাংলা পড়তে যায়নি । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় সে এই বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলো । তবে সাহিত্য পড়তে তার ভালো লাগতো । আর অনার্সে পড়তে এসে শুভর সাথে পরিচয় । টিউশনি এবং সংসারের কাজের ফাকেঁ লুকিয়ে কবিতা লিখতো অনীতা । কাউকে অবশ্য সে দেখতে দেয়নি । একবার কি মনে করে বাংলা বিভাগ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায় নিজের লেখা একটি কবিতা পাঠিয়েছিলো । কিছুদিন পর কবিতাটি প্রকাশিত হয় । কাউকে বলেনি অনীতা । কেউ লক্ষ্যও করেনি । তবে খুব আনন্দ হয়েছিলো । শুভ কিভাবে যেন জানতে পেরেছিলো ।
একই বিভাগে অনীতার সাথে পড়ে শুভ । লম্বা, ছিপছিপে গড়নের, সুদর্শন চেহারার শুভকে সবাই উঠতি লেখক হিসাবে জানে । খুব মেধাবী শুভ । তাছাড়া বাংলা বিভাগের সে ফার্স্টবয় । মেয়েদের মধ্যে রীতিমতো রেষারেষি চলতো, কে তার সাথে প্রেম করবে । পাস করে বের হলে শুভ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে । এহেন নিশ্চিত ভবিষ্যতের সুযোগ কোন মেয়ে হাতছাড়া করতে চায় । এসব দলাদলি থেকে দূরে থাকতো অনীতা । শুভকে তার ভালো লাগলেও এই নিয়ে মেয়েদের সাথে তার প্রতিযোগিতায় নামতে রুচিতে বাধঁতো । প্রেমের বৈষয়িক দিক সম্পর্কে সে তখনও সচেতন হয়নি । সেই শুভ যখন নিজে এসে অনীতার সাথে বন্ধুত্ব করলো, তখন সে অবাক হয়ে গিয়েছিলো ।
ক্লাসের ফাকেঁ করিডোরে দাড়িঁয়ে কথা হচ্ছিলো দুইজনের । শুভ বলেছিলো, আপনার কবিতায় মানুষের ক ল্যাণ এবং মানবিকবোধের কথা আছে । আপনি কি রোমান্টিক ভাবধারায় বিশ্বাসী ?
অনীতা উত্তর দিয়েছিলো, আমি বোদলেয়ারের কবিতা পড়েছি । তারঁ মতো আধুনিক কবিরা অমঙ্গলকে প্রাধান্য দেন । আমার ভালো লাগে নি ।
কেনো ?
অনীতা ইতস্তত করে বলেছিলো, মানুষের জীবনে দুঃখ- দূর্দশা আছে ।কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয় ।দুঃসহ অবস্থাকে অতিক্রম করার সংগ্রামই হলো মনুষ্যত্ব ।
সেই সময় থেকে বন্ধুত্বের শুরু ।এক সময় আপনি থেকে তুমি বলা আরম্ভ হয় । গতবছর শুভর সাথে বইমেলায় গিয়েছিলো অনীতা । জীবনানন্দ দাসের একটা কবিতার বই শুভ তাকে উপহার দিয়েছিলো । শান্ত কণ্ঠে শুভ কবিতা পড়েছিলো,
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাটিঁতেছি পৃথিবীর পথে ,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি , বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি, আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে,
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন ।
মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলো অনীতা । একবার শুভকে সে প্রশ্ন করেছিল, ক্লাসের এত মেয়ে থাকতে শুভ কেন তাকে ভালবাসে ? শুভ বিরক্ত হয়ে বলেছিলো , ওসব মেয়েরা বাড়িতে শুধু হিন্দি সিনেমা দেখে আর ফ্যাশন নিয়ে আলোচনা করে । প্রতিবাদ করেছিলো অনীতা , আমাদের ক্লাসের মেয়েরা পড়ালেখাও করে। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায় । শুভ বলেছিলো, বই আর নোট মুখস্থ করে অনেকেই ভালো ছাত্র হতে পারে। তার মানে এই নয় যে, রবি ঠাকুরের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতা তার মনে দোলা দেবে । শুভ বৃষ্টি হলে গুন গুন করে গান গাইতো, মন মোর মেঘেরও সঙ্গী। উড়ে চলে দিক- দিগন্তের পানে।

শুভ কে ভালোবাসলেও পরিণতির কথা অনীতা কখনো চিন্তা করেনি। শুভর বাড়িতেও কোনোদিন যায় নি। শুভর কাছে শুনেছে, তার বাবা কাস্টমসে চাকরি করেন। ঢাকায় তাদের দুটো বাড়ি আছে। শুভর বড় দুই ভাইবোন ইংল্যান্ডে পড়ালেখা করে সেখানেই সেটেল্ড হয়েছে। অনীতার বাবা একটা কলেজে অফিস সহকারীর পদে চাকরি করতেন। দুইমাস আগে রিটায়ার্ড করেছেন। তখন থেকে পরিবারটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অনীতার বড় ভাই বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেছে। সংসারে সে কোনো খরচ দেয় না। অনীতা টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালায়। কিন্তু তার ছোট আরও দুটি ভাইবোন আছে। তাদের পড়ার খরচ, বাড়িভাড়া সব চালাতে গিয়ে বাবার দিশেহারা অবস্থা। এর মধ্যে অনীতার বড় ভাই এসে পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালন করছে। সে অনীতার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এনেছে। ছেলেটি একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। মা একটু আপত্তি জানিয়েছিলেন , আর তো মাত্র দুটো বছর । তারপরই অনীতা মাস্টার্স করে বের হবে। ভাইয়া বলেছিলেন, বাংলায় মাস্টার্স পাস করে কি হবে। বেকার হয়ে ঘরে বসে থাকবে। লোকে বলবে আইবুড়ো মেয়ে। তাছাড়া অনীতা এমন তিলোত্তমা সুন্দরী নয়। পাত্র পাওয়া গেছে। কোনো দাবী- দাওয়া নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিয়ে দাও। বাবাও বড় ভাইয়ের কথায় মত দিয়েছেন।
শুভকে এই কথাগুলো বলার জন্য অনীতা এসেছে। অনীতার পরিবারের আর্থিক দৈন্যের কথা শুভ জানে। সব জেনেও কি সে অনীতার ভার নেবে? প্রশ্নটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয় অনীতা। শুভ তার কাছে মহাকাব্যের বীরের মতো। ভালোবাসার জন্য সে সবকিছু করতে পারে। কিন্তু, শুভ আসছে না কেন? বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা তারপর রাত নামলো। টিএসসির সামনে লোকজন কমতে শুরু করলো। শুভ এলো না।রাতে বিধ্বস্ত মনে অনীতা একা বাড়ি ফিরলো।
এই ঘটনার এক সপ্তাহ পর অনীতার সাথে কাসেমের বিয়ে হয়ে যায়। তারপর দশ বছর কেটে গেছে। অনীতা এখন দুই সন্তানের মা। মিরপুরে একটা দোতলা বাসায় তারা ভাড়া থাকে।বিয়ের পর অনীতা কাসেমের সাথে কবিতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছে। কিন্তু কাসেম কবিতা সম্পর্কে কিছু বোঝে না। বসার ঘরে সেলফে সাজানো অনীতার কিছু কবিতার বই আছে। কাসেম সেগুলো সের দরে বিক্রী করতে গেছে ।অনীতা বাধাঁ দেয়ায় সে বলেছে , পুরানো বই জমিয়ে রেখে লাভ কি ? বিক্রী করে দিলে কিছু টাকা পাওয়া যাবে। অনীতা ঠান্ডা গলায় বলেছে, আমি তোমার কাছে শাড়ি- গয়না কিছুই চাইনি। দয়া করে আমার বইগুলোতে হাত দেবে না। কয়েক বছর আগে পুরানো ক্লাসমেট মৌটুসির সাথে দেখা হয়েছিলো। তার কাছে অনীতা শুনেছে, শুভ ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের উপর পড়ার জন্য কানাডায় চলে গেছে। বিয়ে করেছে সে।স্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার । ওরা এখন কানাডাতে সেটেল্ড ।

মাঝে মাঝে মেয়েকে স্কুলে পৌছেঁ দিতে গিয়ে হেমন্তের ঝরাপাতা দেখে থমকে দাড়াঁয় অনীতা। জীবনান্দ দাসের কবিতার কথা মনে পড়ে । পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয় সে । বাসায় সবজী নেই। ফেরার পথে বাজার করতে হবে । ঘরের কাজ, ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনা- নেওয়া, বাজার করা এসবের ফাকেঁ একটু অবসর পেলে এখনো কবিতা লেখে অনীতা। মনে পড়ে রবি ঠাকুরের গানের কলি - আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল । শুধাইলো না কেহ । তবু তার কবিতা শুধু দুঃখ ভারা ক্রান্ত নয় । আজও অনীতা বিশ্বাস করে, জীবনের দুঃসহ অবস্থার সাথে সংগ্রাম করাই মনুষ্যত্ব ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • কেতকী মণ্ডল
    কেতকী মণ্ডল বিষাদের ভেতর থেকেও হাল না ছাড়া মানুষগুলোই অনুপ্র‌েরণার। অনীতার মতো সংগ্রামী মেয়েদের জন্য শুভকামনা। আপনার জন্য শুভেচ্ছা সহ ভোট রইলো।
    প্রত্যুত্তর . ৭ নভেম্বর
  • Hasan ibn Nazrul
    Hasan ibn Nazrul মনটা ভারি হয়ে গেল। শুভকামনা আপনার জন্য।
    প্রত্যুত্তর . ৮ নভেম্বর

advertisement