"একটি নক্ষত্রের গ্রহণ" গল্পটি একটি রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা ও তার অতীত -ভবিষ্যৎ নিয়ে মাত্র তিরিশ মিনিটের বর্ননা। যে ঘটনা গল্পের প্রধান দুই চরিত্র বৃদ্ধ রিক্সাচালক ও তার যাত্রীর ব্যক্তিগত জীবনে নাড়া দিয়ে যায় ! হয়তোবা ওই বিশেষ ঘটনার কারনে এই রাতটি তাদের কাছে কালরাত্রি হিসেবে পরিচিত হবে!
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ অক্টোবর ১৯৯৫

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকাল রাত্রি (মার্চ ২০১৯)

একটি নক্ষত্রের গ্রহণ
কাল রাত্রি

সংখ্যা

প্রীতম চাকী

comment ০  favorite ০  import_contacts ১০২
অন্ধকার গলির মাথায় এসে দাঁড়ায় সুরি, হাতের ফিটনেস ব্যান্ডের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল, রাত ২ টা ৪৮ বাজে। সিগারেট এর প্যাকেটটা বুক পকেট থেকে বের করে আগুন জ্বালায় আর মনে মনে ভাবে চমৎকার জিনিসটা ২২৫০ টাকা খরচ করে তার সাগরেদ বিলু গত জন্মদিনে দিয়েছে, কত কিছুইনা করা যায় এটা দিয়ে।১২ ক্লাশ পড়া সুরির প্রথম একটু সমস্যাই হয়েছিলো এত কিছু বুঝতে, তবে বিলু অল্প অল্প করে সব দেখিয়ে দিয়েছে, যত জানছে ততই অবাক হইছে সুরি ছোট এই জিনিসের কাজ দেখে, কত ধাপ হাটছে, আবহাওয়া কেমন, আবার হার্ট বিট মাপা যায়। প্রতিটা অপারেশনে যাওয়ার আগে ও পরে নিজের হার্টবিট পরিক্ষা করে সুরি, আজ আগে ঠিকই ছিলো, কিন্তু শালা কাজ শেষে হার্টবি এত বাড়লো ক্যান বুঝে উঠতে পারলো না, কথা গুলোর কারনে কি, কি যেন..."HSC পাস করছে, এক বছর বসে আছে....", ধুর চিন্তা করতেই ভালো লাগছে না! আরেকটা সিগারেট বের করলো,অন্ধকার হলেও বুঝলো আর তিনটা বাকি রয়েছে প্যাকেটে। আরেকবার হাতের দিকে তাকালো, ২ টা ৫৭. হঠাৎ খেয়াল হলো ব্যান্ডটাতে সেকেন্ড দেখায় না, আশ্চর্য কিছু আবিষ্কার করছে মনে হতেই, নিজেকে বিজ্ঞানী মনে হতে লাগলো। গুন গুন করে "এক সেকেন্ডের নাই রে হিসাব... " গানটা গাইতে গাইতে সুরি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো সিগারেটটা শেষ করেই বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিবে।
ঘৃণার সাথে অর্ধেক সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পা বাড়ালো, দুই ধাপ গেছে কি যায়নি পেছনে রিক্সার শব্দ। ফাঁকা কিনা জানার জন্য, মাথাটা ঘুরে দেখার চেষ্টা করার আগেই রিক্সাটা পাশে এসে দাড়ালো। রিক্সাচালক বয়স্ক একজন, বহুদিনের পরিশ্রমের শরীর যেনো ভেঙ্গে পরেছে, মরা চাঁদের আলোয় ফাকাসে মুখটা দেখলেই পিলে চমকে যায়, জীবন্ত লাশের মতো, কোথাও রক্তের আভাস নেই , চালকটাকে কি বিশ্বাস করা যায়।
"কই যাবিন বাজান? "
রিক্সচালকের কথায় চিন্তায় ছেঁদ পরে সুরির, অত না ভেবেই রিক্সায় উঠে বলে
"এই তো চাচা সামনের আমতলী বাজারে।"
না এত চিন্তা করে কাজ নাই, একবার যখন উঠেই পরেছে বিশ মিনিটের রাস্তা এমনিতেই পার হয়ে যাবে। বিশ্বাস বরই হারামী জিনিস, ময়মনসিংহ থেকে হাসিব ভাইয়ের উপর ভরসা করে যখন ঢাকায় আসলো তখনই বুঝেছিলো এই শহরে বিশ্বাস করলেই ঠকতে হয় সে রাস্তার ভিখারি কিংবা সরকারি মন্ত্রি । তারপর থেকেই আর সবাইকে মাপ করলেও, বিশ্বাসঘাতককে কখনো সুরি মাফ করে না। বড় বসের সাথে এই জন্যই এত মিল তার, সাড়ে তিন বছর যখন প্রথমবার দেখা করতে গেলো, বড় বস শুধু একটা কথাই বলেছিলো, "দেখ সুলেমান হয়তোবা তোর সব ভুল মাপ করে দিতে পারি, কিন্তু আমার বিশ্বাসঘাতকতা করবি তো শাস্তি একটাই।" সুলেমান! হঠাৎ বাপ-মায়ের দেওয়া নামটা মনে হতেই বুকের বাম পাশটা ফাঁকা মনে হয়, এই রাস্তায় কেউ আসল নাম নিয়ে চলে না, গত তিন বছর সুরি নাম নিয়ে চলছে, মাধ্যমিকে জেলার সেরা দশের সুলেমান হোসেন, পিতা মকবুল হোসেন, মাতা...।
"এত রাতে এহানে কি করছিলিন? "
রিক্সাচালকের প্রশ্নে অতীত থেকে বর্তমানে আছড়ে পরে বিরক্ত হয় সুরি।
"কাজ ছিলো। "
ছোট উত্তর দিয়ে কথা শেষ করতে চায়।
"তোমার বাড়ি কি এই এলাকায়?"
"হুম"
এত জেনে এই লোক কি করবে, ভেবে পায় না সুরি!
আরেকটা সিগারেট না জ্বালালেই নয়, প্যাকেটে বাকি আছে আর দুইটা! বরাবরের মতো এবারো কাজটা সময়ের আগে শেষ করতে পেরেছে এই চিন্তা মাথায় আসতেই একটু ভালো লাগে, এত রাত হয়ে গেছে বলে বসেরে ফোন করা হয়নি, সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানাতে হবে, এবারের পেমেন্টটা খুব দরকার, এই জন্য এত চাপ নিচ্ছিলো সে, পাশের বাসার মনুর মা হাসপাতালে ভর্তী, সরকারি হাসপাতালে খরচ কম হলেও, ওষুধ তো সেই বাইরে থেকে নিতে হবে, মনু আর একা কত সামলাবে। বাসার নিচের ফুল বিক্রি করা মেয়েটার কি যে নাম.. আরজু মনে পরছে, ওর নাইট স্কুলের জন্য কিছু খাতা-কল্ম লাগবে বলেছিলো, বস-এ যদি কিছু বোনাস দিত, সব খরচ হেসে খেলে করা যেত! কালকে সংবাদটা দিয়ে বসকে ব্যাপারটা বলতে হবে।
"বাজান তুমি তো এই এলাকার থাকো?"
ধুর বাল, এই বুড়া কিছু চিন্তা করতেই দেয়না, মাঝে শুধু শুধু প্রশ্ন করে।
"হুম, তাতে আপনের কি দরকার?"
বিরক্ত ভরা কন্ঠেই পরের প্রশ্নটা করে সুরি।
"রাগ করো না, এত রাতে কই যাবা তাই চিন্তা করে জিগাইছি!"
রিক্সাচালকের কথায় কিছুটা ভয় পাওয়া কন্ঠে নরম কন্ঠ শুনে সুরির ভালো লাগে। প্রত্যেকের ভেতরের পশুই চায় আরেকজনকে দূর্বল প্রতিপন্ন করে তার উপর ছড়ি ঘুরাতে। আর চিন্তা করতে ভালো লাগে না, সুরি ভাবে বাকি রাস্তা এই বুড়ার সাথে গল্প করে কাটানো যাক। সিগারেটটা প্যাকেট থেকে বের করে, একা নিসঙ্গ হয়ে শেষ সিগারেটটা প্যাকেটের কোণায় পরে থাকে!

"যাওয়ার জায়গা না থাকলে কি করতেন চাচা?"
" তা এই গরীবের বাসায় মেহমান হয়ে যাইতেন, আমার বাসা কাছেই!"
রিক্সাচালক চাচার পরিবার সম্পর্ক জানার ইচ্ছা জাগে সুরির, জিগ্যেস করা ঠিক হবে কিনা ভাবে সুরি! সাহস করে বলেই ফেলে
" বাসায় কে কে আছে? "
"এখন আমি আর তোমার চাচি।"
"পোলাপান?"
"এক পোলা আছে, তবে কই জানি না। HSC তে খুব ভালো রেজল্ট করছে, কইলো আব্বা ভালো জায়গায় ভর্তি হতে হলে নাকি কোচিং না কি করা লাগবো, তা নাকি অনেক টাকা দরকার, আমি কইলাম কত লাগবো...."
সুরির কানে আর কিছু ঢোকে না, ২ দিন আগের ঘটনা, রাতে কাজ থাকে তাই, সকাল ১০ টার আগে সে কখনোই উঠেনা, তবে বড় বসের ফোন পেয়ে সাড়ে আটটার মধ্যে তার অফিসে হাজির!
"বুজছিস সুরি বড় চিন্তায় আছি!"
"ক্যান ভাই?"
সুরি জানে বিপদে না পরলে বস এত তারাহুরো করে ডাকতো না, তবে জানতে চাওয়া ভদ্রতা তাই প্রশ্নটা করা।
"আরে দুদিনের পোলা আমার টাকা নিয়া পালায, কত বড় সাহস!"
"কোন পোলা?"
"আরে কয়দিন আগে আসছিলো একজন, সবুর না কি যেনো নাম। ভালো মনে কাজ দিলাম, গত সপ্তাহে ব্যংকে জমা দেওয়ার কথা সেই টাকা নিয়ে নিরুদ্দেশ।
" এখন আমারে কি করতে হইবো?"
নতুন কাজ মানেই নতুন একটা অভিযান, ভেবেই সুরির ভালো লাগা কাজ করে।
"তুই তো জানোসই, আমার টাকা নিয়া চিন্তা নাই, কত টাকা খাবে? কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা একদমই সহ্য হয় না, এদের বেচে থাকার অধিকার নাই।"
বসের এই রাগি চেহারা আগেও দেখছে সুরি, বুঝে যায় কি করতে হবে, বিস্তারিত জেনে রাস্তায় বেরিয়ে পরে, হাতে সময় মাত্র ৪৮ ঘন্টা।
মোবাইল সেটের ভাইব্রেশনে আবার চিন্তায় ছেদ পরে, পকেট থেকে বের করে দেখে নূপুরের কল, মুখে বিরক্তির ভাব এনে কলটা কেটে দেয়, মধ্যরাতেও কল দিয়ে খোঁজ নেওয়া ছাড়লো না, মুখে বিশ্রি একটা গালি আসলোও তা মনে মনে দিয়ে রাগ মেটানো মিথ্যে চেষ্টা করে। বাপ মায়ের থেকে দূরে চলে আসার এই একজনই হয়েছে যে তার খোঁজ না নিয়ে ঘুমাবে না। এ সম্পর্ক যেন একটা পিছুটান হয়ে দাঁড়িয়েছে, পিছুটান মানেই ভয়, মানে কাজে ব্যাঘাত।
"....তারপর ওই যে পোলায় বের হলো তারপর গতকাল পাশের বাড়ির মতিকে ফোন করে বলছে আজ আসবে, তাইতোনা শরীর জুতের না, কদিন ঘরে জ্বর, তারপরেও রিক্সা নিয়ে বের হইছি, এতদিন পর পোলা আসবো, ভালো মন্দ কিছুতো খাওয়াতে হবে! ঘরে তো কিছুই...."
সুরি বুঝতে পারেনা চাচা কার গল্প করছে, কেনই বা করছে! আজকাল সুরির অতীত নিয়ে ভাবনা বেরে গেছে, বর্তমানে মনোযোগই দিতে পারছে না।
"আমতলী আইয়া পরছি, এখানে নামবে।"
যদিও সুরির বাসা আরেকটু সামনে, তবে এই রিক্সায় আর তার ভালো লাগছে না, প্রচুর ভারী লাগছে শরীরটা নাকি মনটা বুঝে উঠতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেয় বাঁকি পথটুকু হেটেই যাবে, ঠান্ডা বাতাসে যদি ভালো লাগে এই চিন্তায়। রিক্সা থেকে নেমে পকেট থেকে একটা একশ টাকার নোট এগিয়ে দেয়।
"পুরোটা রাখেন, পোলা আসবে বললেন, তার জন্য বাজার-সদা করেন।"
একটা ধন্যবাদ সুচক হাসি দিয়ে লুংগির ট্যাঁকে টাকাটা রাখতে যায় রিক্সাচালক। সুরি লক্ষ্য করে কিছু একটা তার ট্যাঁক থেকে পরে গেলো, রিক্সাচালক চাচাকে আবার নামতে হবে দেখে মোবাইল এর ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে খুজে সুরি জিনিসটা মাটি থেকে তুলে আনে। তেমন কিছুই না একটা পাসপোর্ট সাইজের একটা ফটো। রিক্সাচালকের দিকে ফটোটা এগিয়ে দেয়। সে হাসি মুখে ফটো নিতে নিতে বলে
"আমার পোলা, সব সময় কাছে রাখি, পোলা কাছে নাই তবে ফটো দেখে মনে শান্তি পাই।"
সুরি আর কিছুই বলার ইচ্ছা করে না, সোজা হাটা শুরু করে নিজের বাসার লক্ষ্যে। কিন্তু হঠাৎ মনে হয় ফটোর ছেলেটাকে সে চেনে। কবে দেখেছে, কোথায় দেখছে মনে করার চেষ্টায় মাথা কাজ করা শুরু করে দেয়।
মনে পরতেই শরীর কাটা দিয়ে উঠে। না শেষ সিগারেটটা ধরাতেই হচ্ছে। এইতো ঘন্টা খানেক আগের ঘটনা, ছেলেটা বারবার বলছিল যে সে কোনো টাকা নেয় নাই, সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চান্স পাইছে, তাই কাজ ছেড়ে দিয়েছে, ভর্তি কোচিং এর খরচ চালাতে এই অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছিলো।
সুরির এত কিছুর শোনার ধৈর্য নেই, স্টিলের ছুড়িটা শুধু কয়েকবার যাতায়াত করে খুবই নিরবে, তারপর সব আর্তনাদ চুপ। অন্ধকার গলির মাথায় এসে দাঁড়ায় সুরি।
সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে হাত কাঁপতে থাকে, ফিটনেস ব্যান্ড এর আলো জ্বলে জানান দেয় রাত তিনটা তেইশ বাজে। সেই দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে, একটা কথা সে ভাবতে থাকে, হাতের ব্যান্ডটা দিয়ে কত কিছু মাপা যায়, কিন্তু এই হাত দিয়ে করা পাপ গুলো মাপবো কি দিয়ে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement