এটি একটি অতিপ্রাকৃত গল্প। আপন মুখবন্ধে লেখা মূল চরিত্রের মৃত বাবার সাথে সংযোগ, তার মৃত্যু রহস্য উৎঘাটন এবং অলৌকিকভাবে নিশ্চিত খুনের হাত থেকে বেঁচে আসার ঘটনায় কিছুটা অস্পষ্টতা রেখে ভৌতিক আবহ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। মূল চরিত্রের পাশাপাশি একটি ভৌতিক চরিত্র এই গল্পের উপজীব্য।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ ডিসেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভৌতিক (ডিসেম্বর ২০১৮)

অন্ধকারের সন্ধানে
ভৌতিক

সংখ্যা

ফাহমিদা নীলা

comment ১  favorite ০  import_contacts ২৭
মেডিকেলে চান্স পেয়ে ঠিক যতোটা উচ্ছ্বসিত ছিলাম, ততোটাই চুপসে গেলাম এনাটমীর ডিসেকশন রুমে ঢুকে। ওখানে বসেই প্রতিদিন ঘন্টাদুযেক ক্লাশ করতে হবে জেনে মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। বিশালাকার হলরুমে ঢুকতেই কি ঝাঁঝালো প্রকট গন্ধ! বমি তো আসেই, চোখমুখও জ্বালা করে। সেইসাথে সামনে রাখা বিশাল সাইজের ক্যাডাভার (সংরক্ষিত মরা লাশ) দেখলেই ভয়ে কেমন গলা শুকিয়ে যায়। আমাদের ডেমো রুমটাতে ছিল মোট চারটে ক্যাডাভার। এগুলোকে দেখলে মনে হয়না, এরাও রক্ত-মাংসে গড়া চলেফিরে বেড়ানো মানুষ ছিল কোনকালে। বিশাল লম্বা উলঙ্গ দেহ, কালো মোটা চামড়া, চেহারাগুলো একটা আরেকটার থেকে আলাদা করা যায় না।
ক্লাশ শুরু হল। আস্তে আস্তে ডিসেকশনের রুমের গন্ধটা গা সওয়া হয়ে গেল আমাদের। ক্লাশ ছাড়াও ওই রুমে বসে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা পড়া আলোচনা করি, ভিসেরা অর্থাৎ মরা মানুষের কাটা অঙ্গ নিয়ে পড়ি, ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা দেই, এমনকি নাস্তাও করি। মাঝে মাঝে ভিসেরা নেড়ে হাত ধুতেও ভুলে যায়। এতসবের ভিতরে তবু কেন যেন এই ক্যাডাভারগুলোকে আমি ঠিক মেনে নিতে পারিনা,ভীষণ ভয় পাই । কিছুতেই এদের স্পর্শ করি না। স্যার যখন ক্যাডাভার ডিসেকশন করে ভেতরের মাসল,রক্তনালী,নার্ভ এসব দেখায়, আমি একটু দূরে দাঁড়িযে ঘাড় উঁচু করে দেখি, তবু কাছে ভিড়ি না। স্যাররা মরা লাশগুলোকে সম্মান করতে শেখান। একদিন একটা ছেলে মজা করে একটা ক্যাডাভারের গোপনাঙ্গে লম্বা স্টিক দিয়ে মজা করছিল, স্যারের চোখে পড়ে গেল। স্যার ওকে অনেক বকাঝকা করে সময় নিয়ে আমাদের সবাইকে বোঝালেন, 'এই যে লাশগুলো তোমরা দেখছো, এরাও একদিন তোমাদের মতই মানুষ ছিল। তোমাদের মতই হেসেখেলে বেড়াতো, গল্প করতো, আড্ডা দিতো। ওনারা আজ নিজেদের দেহ তোমাদের জন্য উৎসর্গ করেছেন বলেই তোমরা আজ শিখতে পারছো। এই শিক্ষা তোমাদের ডাক্তারী জীবনের ভিত্তি। কাজেই ওদের সম্মান করবে সবসময়।'
এই ঘটনার পর থেকে আমি ওদের কাছাকাছি গেলেই মনে মনে সালাম দিতাম। তবুও স্পর্শ করতাম না। শুধু ভয় নয়, কেমন যেন একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করতো আমার, ঠিক তেমনটা যেমনটা সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী দেখলে হয়। কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়। একদিন ডেমোনেশট্রেশন ক্লাশ শেষে বের হতে গিয়ে দেখি আমার প্র্যাকটিকাল খাতা ফেলে এসেছি। পেছন ফিরে দৌড়ে ঢুকলাম ডিসেকশন রুমে যেটাকে আমরা সংক্ষেপে ডেমো রুম বলতাম। বিশাল রুমে একমাত্র জীবিত মানুষ আমি। আমার গা ছমছম করতে লাগল। খাতা নিয়ে বের হতে যাব, এইসময় মনে হল কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে, রিমঝিম। আমি চমকে তাকালাম পেছনে। বহুদিন এই নাম ধরে কেউ আমাকে ডাকে না।
আমার নানু গত হয়েছেন প্রায় সাত বছর। শেষ ডাকটা তিনিই ডেকেছিলেন তার মৃত্যুর ঠিক দশ মিনিট আগে। বলেছিলেন, রিমঝিম তোকে আমি একটা অন্ধকারে রেখে যাচ্ছি।সেই অন্ধকারের সন্ধান আমি পাইনি। ছোটবেলা থেকে নানুর কাছে মানুষ হওয়ায় নানান প্রশ্ন মাথায় কিলবিল করতো। আমার আরো দুটো ভাইবোন আম্মু-আব্বর কাছে থাকলেও আমি কেন নানুর কাছে?কেন আব্দু-আম্মুর সাথে আমার এতোটা দুরত্ব? কেন অন্য বাচ্চাদের মত আমার আব্দু-আম্মুকে যখনতখন কাছে পাইনা? নানুর লাশের সাথে সাথে আমার ক্ষুদ্র মনের সব প্রশ্ন দাফন করে আমি চলে এলাম আম্মু-আব্দুর কাছে। আমার আম্মুর মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা লক্ষণীয় হলেও আমার ব্যস্ত ডাক্তার আব্দুর নির্লিপ্ততাও আমার চোখ এড়ায়নি। দীর্ঘদিন চোখের আড়ালে অবস্থানের কারণেই বোধ হয় যখন আমার অন্য ভাইবোনের প্রতি আব্দুর স্নেহ ছিল সীমাহীন, তখন আমার প্রতি তার আচরণটা ছিল নিতান্তই দায়সারা গোছের। অবশ্য এ নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন অবকাশ আমি পাইনি। যা কিছু ঘাটতি ছিল আব্বর দিক থেকে, তা যেন সুদেআসলে পূরণ করে দিয়েছেন আম্মু। সিমি আর মনির চেয়ে রিমি নামটাই বোধ হয় আম্মু বেশী ডাকতেন।
'কিরে ভয় পাইছোস নাকি?' রিমঝিম ডাকটা শুনে ডেমো রুম থেকে দৌড়ে বের হতেই পড়লাম জুয়েলের খপ্পরে।
'আরে না। কি যে বলিস!' জুয়েলের সামনে ভাব নিলেও মনে তখনো আয়াতুল কুরশী আউড়াচ্ছি আমি।
দ্বিতীয় দিন আবারো আমি ওই ডাকটা শুনলাম। সেদিন নিজের বইখাতা গুছাতে গুছাতে দেখি সবাই বেরিয়ে গেছে ডেমো রুম থেকে। আমিও ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে বের হচ্ছি, স্পষ্ট শুনলাম কেউ একজন আবারো আমাকে 'রিমঝিম' বলে ডাকল। পেছন ফিরে তাকাতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল, যেন পশ্চিম কোণায় রাখা ক্যাডাভারটা আমার দিকেই তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়তে পড়তে চোখ প্রায় বন্ধ করেই বের হয়ে আসলাম ডেমো রুম থেকে।
সেই রাতে আমি ভয়ানক এক স্বপ্ন দেখলাম। আমি ডেমো রুমে দাঁড়িয়ে আছি, চারপাশে তিনটে ক্যাডাভার হাত ধরে আমাকে ঘিরে রেথে নাচানাচি করছে। আমি কিছুতেই বের হতে পারছিনা। হঠাৎ আরেকটা ক্যাডাভার একটু দূরে দাঁড়িযে শক্ত গলায় বলল, 'আমার রিমঝিমকে ছেড়ে দাও'। সাথে সাথে তিনজন নিজ নিজ টেবিলে গিয়ে শুয়ে পড়ল। নতুন আসা ক্যাডভারটার দিকে তাকাতেই আমি সকালে দেখা পশ্চিম কোণার ক্যাডাভারের চোখ দুটো দেখতে পেলাম স্পষ্ট। রাত সাড়ে তিনটায় সারা গা ঘামে ভিজিয়ে বিকট এক চিৎকার দিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম আমি। রুমমেটরা তো বটেই, পাশের রুমের আপুরাও দৌড়ে এলো। আমি ওদের একজনকে ধরে থরথর করে কাঁপতে লাগলাম।
পরদিন ডেমো স্যারকে অসুস্থতার বাহানা দিয়ে সপ্তাহখানেক ছুটি নিয়ে বাসায় চলে আসলাম। আম্মু ভয় পাবে ভেবে কিছুই বললাম না। বেচারার অনেক দিনের শখ, আমাকে মেডিকেলে পড়ানোর। এইসব বললে উনি। টেনশনেই মরে যাবেন যে, কবে না আমি মেডিকেলের পাঠ চুকিয়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ী চলে আসি। আম্মু জুয়েলকে অনেক বলে কয়ে রাজী করালাম আমাকে পেন্ডিং আইটেম গুলো বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। পেন্ডিং পড়া দুটো আইটেমের মধ্যে প্রথম দিন ক্লাশ শেষে লিভার পড়তে পড়তে বেলা গড়িয়ে গেল। ক্লাশ শেষ, ছাত্র-ছাত্রীরা এদিকটায় কেউ নেই, চারিদিক শুনশান। আমি এনাটমি বইয়ের ছবির সাথে ভিসেরা মিলিয়ে লিভারের। ফুটোফাটা মুখস্থ করতে ব্যস্ত। আচমকা কেউ আমাকে স্পষ্ট ডাকল, রিমঝিম। আমি চমকে তাকিয়ে দেখি জুয়েল নেই পাশে। বিশালাকার রুমের মাঝে আমি ছাড়া আরও তিনটা মানবদেহ আছে, শুধু পার্থক্য এই যে, আমি ছাড়া বাকীদের দেহে প্রাণ নেই। আমি কোনরকমে বই আর ব্যাগটা হাতে নিয়ে দৌড় দিতেই মনে হল কেউ আমার ওড়না টেনে ধরেছে। পেছনে ফিরে তাকানোর সাহস হল না। জোরে একটা চিৎকার দিয়ে ওড়না ফেলেই এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দূরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল জুযেল। আমি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ছুটতে লাগলাম। জুয়েল দৌড়ে এসে আমাকে ধরতেই আমার চোখের সামনে নানা রঙের বাতি জ্বলতে জ্বলতে দপ করে নিভে অন্ধকার হয়ে গেল চারিদিক । এরপর আর কিছু মনে নাই। হঠাৎ চোখ খুলে দেখি আমার মুখের উপরে স্যার-ম্যাডামসহ আমার কয়েকজন ক্লাশমেট ঝুঁকে আছে। আমাকে চোখ খুলতে দেথেই ওরা হাসাহাসি শুরু করে দিল। ভয় ভাঙানোর জন্য আমাকে টানতে টানতে ডেমো রুমের সামনে নিয়ে গেল। আমি দেখলাম, পশ্চিম কোণার ক্যাডাভারের বুড়ো আঙ্গুলের সাথে আমার নীল ওড়নাটা ঝুলে আছে। একজন সেটা নিয়ে এসে আমার হাতে দিল। ওটা ধরতে এক ধরনের শিরশিরে অনুভূতি হলেও সবার সামনে লজ্জায় পড়ে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম দ্রুত।
হোস্টেলে ফিরে আমি তাড়াতাড়ি কাপড় পালটে শুয়ে পড়লাম। রাতে হাড় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো। স্বরের ঘোরে আমি স্পষ্ট দেখলাম, পশ্চিম কোণার সেই ক্যাডাভার নীল ওড়নাটা লুঙ্গির মতো কোমরে পেঁচিয়ে আমার মাথার কাছে বসে আছে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলছে, 'রিমঝিম, তোর কষ্ট হচ্ছে মা? ভয় পাসনে, আমি তো আছি।'
আবার আগের মত চিৎকার করে আমি বিছানায় উঠে বসলাম। ঘাম দিয়ে আমার জ্বর ছুটলেও ঘোরের মধ্যে কি সব আবোলতাবোল বকে বাকী রাত পার করলাম। সকালে আমার রুমমেটরা সে নিয়ে অনেক হাসাহাসি করলেও ভয়টা আমার ভেতরে গেঁথে গেল। ভয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হল, সকালে উঠে আমার সেই নীল ওড়নাটা আর কোথাও খুঁজে পেলাম না। আশ্চর্যজনকভাবে সেটা গায়েব হয়ে গেল।
কি সব আবোলতাবোল বকে বাকী রাত পার করলাম। সকালে আমার রুমমেটরা মে নিয়ে অনেক হামাহাসি
এরপর প্রায় রোজ রাতেই সেই ক্যাডাভারটা আমার স্বপ্নে আসতে লাগলো। প্রতি মধ্যরাতের পরে সে আসে, কিছুক্ষণ আমার পাশে বসে কথা বলে, তারপর চলে যায়। তার পরনে থাকে আমার হারিয়ে যাওয়া নীল ওড়না। প্রথম দিকে চিৎকার করে ঘুম ভাঙলেও ধীরে ধীরে আমার সাহস কিছুটা বাড়ল। কিংবা বলা চলে, রুমমেটদের বিরক্তি এড়াতেই নিজেকে কিছুটা সামলে নিলাম। স্বপ্ন শেষে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসলেও গলা দিয়ে স্বর বের করতাম না। রোজই ঘামে আমার বিছানা ভিজে যেত। নিস্তব্ধ অন্ধকারে আমি যেন আশেপাশেই তার অস্তিত্ব টের পেয়ে আবারো চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়তাম, কাঁপা কাঁপা গলায় ফিসফিস করে

দোয়া ইউনুস পড়লেও বুকে ফুঁ দেয়ার সাহসটাও হতো না। হাত-পা, শরীর কোনকিছু না নড়িয়ে চুপচাপ মরার মত পড়ে থাকতাম বিছানায়।
সব জেনে সুযেল আমাকে জোর করে মেডিসিনের স্যারের কাছে নিয়ে গেল। তিনি আমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দিলেন। স্বপ্নে ক্যাডাভার আসা বন্ধ না হলেও লাভের লাভ যেটা হল, আমার ভয় কমে গেল। স্বপ্নে আমি উনার সাথে গল্প করতে শুরু করলাম। আমার নানান জেরার বিপরীতে তার কাছে যতোটুকু জানলাম, তার সারমর্ম হল, আমি তার অতি আপনজন কেউ। কিন্তু কে? সে প্রশ্নের উত্তর উনি বারবার এড়িয়ে যেতে লাগলেন। একদিন সাহস করে জানতে চাইলাম, ।
-আপনি আমার কাছে কি চান? -প্রতিশোধ। -কিসের প্রতিশোধ? -তোমাকে আমার কাছে থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার প্রতিশোধ। -আমাকে পরিষ্কার করে বলেন। আমি তো বুঝতে পারছিনা। -বুঝবে কিভাবে? তোমাকে তো অন্ধকারেই রাখা হয়েছে চিরকাল।

অনেকদিন পর সেদিন আবার নিজের ঘুম ভাঙার চিৎকারে পুরো ব্লকের ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম। আমাকে আবারো শুইয়ে দিয়ে পাশের রুমের এক আপু আমার বুকে নানান দোয়া-দরুদ পড়ে ফু দিতে লাগলেন। কিন্তু সে রাতে আমার আর ঘুম এলো না। বারবার আমার নানুর শেষ কথাটা কানে বাজতে লাগল, তিনিও কোন একটা অন্ধকারের কথা বলেছিলেন। কার কাছে আমি পাব সেই অন্ধকারের গল্প, এই চিন্তাই মাথার ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগল। একটা নিউরণ আরেকটা নিউরণকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করতে থাকল, কি সেই অন্ধকার?কে দেবে সেই অন্ধকারের সন্ধান?
ভোরের দিকে তল্লামতো আসতেই আমার নিউরনগুলোই আমাকে জাগিয়ে তুলে চুপিচুপি বলল, তোমার নানুর কাছেই যাও। আমি সকালের বাসেই নানুবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নানুর বন্ধ ঘরের প্রতিটি জিনিস খুঁজে কেবল একটি দরকারী কাগজই উদ্ধার করতে পারলাম, সে আমার মায়ের বিয়ের কাবিননামা। কাগজটা। আম্মুর কাছে না থেকে নানুর কাছে কেন, এই প্রশ্ন মাথায় আসতে না আসতেই উত্তর পেয়ে গেলাম, কণের নামের জায়গায় আম্মুর নাম থাকলেও, বরের নামের জায়গায় আমার আব্ব রফিকুল ইসলামের জায়গায় আবু জাফর লিখা। এক প্রশ্নের উত্তর জানতে এসে আরও এত প্রশ্ন সামনে আসবে ভাবিনি।।
আম্মুর মুখোমুখি হলাম। উত্তর দেয়ার বদলে আম্মু আমাকে আরো দশটা প্রশ্ন করলেন। মনে মনে ততোক্ষণে পণ করেছি, আমার উত্তর না পেলে আমি কারো প্রশ্নের উত্তর দিব না। অনেক জেরার পর আম্মু আমার সামনে খুললেন তার জীবনের এক কপাটবদ্ধ অধ্যায়।

নিতান্ত গরীব ঘরের মেধাবী ছেলে জাফর এলাকার ধনবান ব্যক্তি সোলায়মান তালুকদারের বাড়িতে জায়গির থেকে পড়াশোনা করতো। বিনিময়ে তালুকদার সাহেবের একমাত্র স্কুল পড়ুয়া মেয়ে রেখার গৃহশিক্ষকতা করা ছিল তার দায়িত্ব। পরিণতি অনিশ্চিত জেনেও সবার অলক্ষ্যে কিশোর বয়সী মিষ্টি প্রেম গড়ে উঠে জাফর আর রেখার মাঝে। তালুকদারের অসম্ভব সুন্দরী মেয়ের সাথে অসম সামাজিক সম্পর্কের স্বপ্ন যখন জাফরের কাছে অলীক প্রায়, তখনই ভাগ্য তার স্বপ্নের দুয়ার খুলে দেয়। ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়ে এলাকায় তাক । লাগানোর পর সাহস করে বিয়ের প্রস্তাবটা দিয়েই ফেলে গরীব কামারের ছেলে জাফর। ওদের গোপন প্রেমের কথা জেনে প্রথমটায় রাগে ফেটে পড়লেও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শে পড়াশোনার খরচ চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাফরের দুঃসাহসিক প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান সোলায়মান তালুকদার। বিয়ের পর থেকেই দুই পরিবারের সামাজিক অবস্থানের সুবিশাল ফারাকের মাঝে ব্যালেন্স করে চলতে রীতিমত হিমশিম খায় রেখা। এই সুযোগে রেখার বাবার গোপন আক্রোশ ফুলেফেঁপে উঠলেও জাফর-রেখার ভালোবাসায় এর প্রভাব পড়ে সামান্যই। পঞ্চম বর্ষে পড়ার সময় রেখার গর্ভে আসে জাফরের প্রেমের নিদর্শন রিমঝিম। হ্যাঁ, এই নামটাই ঠিক করে রেখেছিল জাফর। রিমঝিম যখন তিন মাসের গর্ভে তথনই হঠাৎ একদিন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো জাফরের মৃত্যুসংবাদ আসে রেখার কাছে। সুস্থ মানুষ রাতে ঘুমিয়ে সকালে উঠেনি আর। জাফরের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে লাশ নিতে ছুটে গিয়ে রেখাসহ অন্যান্য আত্মীয়রা জানতে পারে, মরণোত্তর দেহ দান করে গেছে জাফর। সেই আবু জাফর আর কেউ নন, সে আমার বাবা।
-তাহলে আমার বাবার নামে তার নাম দেয়া হল না কেন?
-তোর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই রফিক আমাকে বিয়ে করে তিনমাসের মধ্যেই। রফিক ছিল জাফরের মেডিকেলের রুমমেট। এক বছরের সিনিয়র হলেও সে ছিল জাফরের বন্ধুর মতো। ছুটিতে প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতো সে জাফরের সাথে। সেই সূত্র ধরেই অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে রফিকের সাথে আমাদের পরিবারের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। সদ্য বিধবা গর্ভবতী মেয়ের জন্য বড়লোক বাবার একমাত্র ডাক্তার ছেলের দেয়া বিয়ের প্রস্তাব একরকম লুফে নেয় তোর নানা-নানু। আমি তখন শারিরীক আর মানসিকভাবে অনেকটাই ভারসাম্যহীন। যদিও আমার মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তোর জন্মের পর পরই তোর নানু তোকে নিজের কাছে নিয়ে চলে যান। কিন্তু রফিকের অনুরোধে তার নামেই তুই বড় হয়ে উঠিস।
আমি আরও অনেক প্রশ্ন বুকে নিয়ে ফিরে আসলাম ক্যাম্পাসে। নথি ঘেঁটে আবু জাফরের দেহ দানের ডকুমেন্ট বের করলাম। আশ্চর্যজনকভাবে এটাও জানতে পারলাম যে,ওনার মৃত্যুর মাসখানেক আগে একই দিনে একই সাথে মরনোত্তর দেহ দানের অঙ্গীকার করেছেন আমার বর্তমাম বাবা রফিকুল ইসলাম। ওই সময়ের সূত্র ধরে আবু জাফরের ছবি আর ডেথ সার্টিফিকেটও বের করলাম। কিন্তু কোনভাবেই অস্বাভাবিকভাবে ঘটা তার স্বাভাবিক মৃত্যুর রহস্য উৎঘাটন করতে পারলাম না। সবচেয়ে অবাক হলাম, তার মৃত্যুতে একটা সাধারণ ফাইলও হয়নি যা সাধারণত অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর হয়ে থাকে। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে স্বপ্নে আসা নীল ওড়না পেঁচানো ক্যাডাভারের অপেক্ষা করতে লাগলাম। মাস পার হয়ে গেল, সে এলো না। অনেক সাহস নিয়ে একা একদিন ডেমো রুমের পশ্চিমদিকের ক্যাডাভারটার সামনে দাঁড়ালাম। ভয়ে ভয়ে তার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললাম, আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন অন্ধকারের সন্ধান পেতে? আমার বাবা আবু । জাফরের সাথে তার চেহারার মিল খোঁজার চেষ্টা করেও কোনভাবেই মেলাতে পারলাম না। ফিরে এসে সব ভুলে পড়াশুনায় মন দিলাম।
ট্রাষ্ণের পুরনো তালা একটু টানাটানি করতেই খুলে গেল। পুরনো স্যাঁতসেঁতে কিছু বই ছাড়া ব্যবহার্য পুরনো আরো কয়েকটা জিনিসের ভেতরে একটা চিঠি পেলাম। চিঠির লেখাগুলো অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে। চিঠিটা আমার নানা সোলায়মান তালুকদার লিখেছেন আমার নামধারী বাবা রফিকুল ইসলামকে।। 'তুমি ওই ফকিরটাকে এত নিঃশব্দে সরাতে পারবে আশা করি নাই। ওটাকে এখানে পাঠানোর পথ রুদ্ধ করে আরো ভাল করেছো। এই গ্রামে ওর চিহ্ন থাকলে রেখাকে কোনদিনও আমি সেই দুঃস্মৃতি থেকে ফেরাতে পারতাম না। তোমার শর্ত মোতাবেক ফকিরের বাচ্চাটাকে পেট থেকে সরানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছি কিন্তু রেখার জিদের কারণে পারছিনা। তুমি কি একবার এখানে আসবে?
ট্রাঙ্কে পাওয়া পুরনো বোতলটার গায়ে লেখা ইঞ্জেকশনের নামটা এখনও স্পষ্টই আছে। ওষুধের দোকানে গিয়ে খোঁজ করতেই পেয়ে গেলাম সহজেই। সিরিঞ্জে ওষুধটা তুলে নিতে অপেক্ষা করলাম আরো দুইদিন। এনেস্থেসিয়ার কি একটা কনফারেন্সে আব্দু দেশের বাইরে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসে সেই যে রাতে ঘুমালেন,সেই ঘুম আর ভাঙলো না তার। সকালে তার ঠান্ডা লাশের পাশে তার শ্বশুরের লেখা পুরনো ঝাপসা চিঠি আর বহু বছর আগে ব্যবহৃত ওষুধের ভায়াল ছাড়া একটা খালি সিরিঞ্জ পাওয়া গেল। হাজার চেষ্টা করেও গোয়েন্দারা সেখানে কোন আঙ্গুলের ছাপ উদ্ধার করতে পারল না। সিরিঞ্জের ওষুধ আর বাইরের আলামত দেথে ডা. রফিকুল ইসলামের মৃত্যুকে তীব্র আত্মদহনে ঘটানো একটি আত্মহনন বলে চিহ্নিত করল পুলিশ।
ক্যাম্পাসে ফিরেই আমি সেই ক্যাডাভারের খোঁজে ডিসেকশন রুমে গেলাম। আশ্চর্য পশ্চিম কোণার টেবিলটা ফাঁকা। আমি ডোমকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, 'উহা কে জানি চুরি করিয়া লিয়ে গেছে মামা। ছুটি শেষে দুয়ার খুলে দেখি, ওই বোডিটা নাই,গায়েব হইয়ে গেছে।'
পশ্চিমের টেবিলটার কাছে গিয়ে ক্যাভাভারের শুণ্য জায়গাটায় আমি হাত বুলালাম কয়েকবার। আদরের হাত, সন্তানের হাত, এক অসহায় বাবার স্নেহের কন্যা রিমঝিমের হাত। যে হাত দিয়ে সোলায়মান তালুকদারের লেখা চিঠি আর পুরনো ওষুধের ভায়ালটা রফিকুল ইসলামের সামনে মেলে ধরেছিলাম, সেই হাত। ইঞ্জেকশন ভরা সিরিঞ্জটা তাক করতেই সদ্য ধরা পড়ে যাওয়া আমার বাবার হননকারী পেছনে মুড়িয়ে শক্ত করে ধরে ফেলেছিল যে হাত, সেই হাত। নীল ওড়না পেঁচানো মচকে যাওয়া সেই হাতটা দিয়ে আমার হারিয়ে যাওয়া বাবার স্মৃতিজড়িত টেবিলটাতে হাত বুলাতে বুলাতে মনে মনে বললাম, 'থ্যাংকস বাবা, সেদিন তুমি সময়মতো না আসলে আমার হাত থেকে পড়ে যাওয়া ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জটা দিযে সে তোমার রিমঝিমকেও ঠিক তোমার মতই নিঃশব্দে মেরে ফেলতো। অনেক দেরীতে হলেও আমি তোমার অন্ধকারের সন্ধান পেয়েছি বাবা। অন্ধকার পৃথিবীতে ভাল থেকো তুমি।' ট্রলির ঘড়ঘড় শব্দে সম্বিৎ ফিরে পেতেই ডেমো রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দুই ডোম সাদা চাদরে ঢাকা একটা ডেডবডি নিয়ে এসে ডেমো রুমের লাগোয়া রুমে ঢুকল। এই রুমের অর্ধেকটা জুড়েই রয়েছে বিশালাকৃতির ফরমালিনের চৌবাচ্চা,যেখানে একটার উপর আরেকটা লাশ এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্তু মামা দাঁত কেলিয়ে হেসে কথা বলতে বলতে ট্রলি থেকে নতুন ডেডবডিটা তুলে ঝপ করে ফেলে দিল লাশের চৌবাচ্চায়। 'দেকিলেন মামা, এক বোডি হারালো তো ভোগোবানের ইচ্ছায় আরেক বোড়ি এসে গেলো। আপনার এলাকারই এক ডাক্তারবাবুর লাশ গো মামা এটা। নাম বললে চিনবেন হোয়তো বাবুকে। এ মেডিকলেরই ছাত্তর ছিল বাবু। দু'বন্ধু মিলে একি দিনে দেহ দান করিছিল। একঝনা মরিছে উনিশ বোছোর আগে, তার লাশ আর দেশটা লাশের সাতে হারিয়ে গেছে কোথা! এটাও আর কো'দিন পর চেনা যাবেনা আলাদা কোরে। এই চৌবাচ্চায় ডুবার পর সোবাই একই চেহারার হয়ে যায় গো মামা।'
ঘাড়ের কাছে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে তাকালাম,কেউ নেই। নতুন ডেডবডি চৌবাচ্চায় ঝপাৎ করে পড়ার সাথে ছলকে ওঠা ফরমালিনের গন্ধের সাথে হালকা মিষ্টি একটা আতরের সুবাস পেলাম নাকে, যা ফরমালিনের ঝাঁঝালো গন্ধকেও ম্লান করে দিল। আমি চারপাশে এলোপাথাড়িভাবে খুঁজতে লাগলাম তাঁকে। পেলাম না,শুধু অনেক দূর থেকে খুব অস্পষ্টভাবে 'রিমঝিম' ডাকটা কানে ভেসে এলো।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • ফাহমিদা   বারী
    ফাহমিদা বারী গল্পকবিতা ডট কমে আপনাকে স্বাগতম আপা। আপনার গল্পটি পড়লাম। সত্যি কথা বলতে কী, আপনার লেখনী ঠিক খুঁজে পাইনি। গল্পে ভাষাগত ও শব্দগত বেশ ভুল পেয়েছি। সেটা মূদ্রণজনিত কী না ঠিক বলতে পারছি না। একটু চেক করে নেওয়ার অনুরোধ থাকবে। গল্পের ভীতির জায়গাটা ভালোভাবে জমে ওঠা...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ১ ডিসেম্বর

advertisement