উল্লেখিত বিষয়ের সাথে ভাবগত সামঞ্জস্যপূর্ণ মিল রয়েছে। যা গল্পকে ছাপিয়ে যাবে। এবং পাঠক হৃদয় কাঁদাবে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ এপ্রিল ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ১২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - উষ্ণতা (জানুয়ারী ২০১৯)

পরাজিত মুক্তিযোদ্ধা
উষ্ণতা

সংখ্যা

মোঃ মাসুদ রানা

comment ৪  favorite ০  import_contacts ৬৯
বছর তিন চারেক হলো শহর ও গ্রামে বেশ ভালোই শীতের আমেজ পাওয়া যায়। শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক আগেই শীতের পরতে থাকে। শহরে বড় বড় দালানকোঠা আর শিল্প কারখানার কারণে বুঝা যায় না শীতের আগমন। তাছাড়া বহুরকমের গাড়ি, বাস ইত্যাদির কারনেও শীতের আমেজটা তেমন লক্ষ করা যায় না। কিন্তু গ্রামে বেশ ভালোই শীতের শীতল হাওয়া গায়ে লাগে। যখন শীতের আগমন হয় তখন শীত উপভোগ করা যায়। তবে গত বছর এই শীতের ঘটনা এখনও আমাকে নাড়িয়ে যায়। মনে পরলেই শরীর শিউরে ওঠে।

বেশ কয়েক বছর লেখালেখির সাথে যুক্ত। কখনো কবিতা, কখনো ছড়া, আবার কখনো ছোট গল্প কিংবা চিঠি অথবা সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতে বসি হরহামেশাই। কোন কিছু না লিখলে এখন আর ভালোই লাগে না। তাছাড়া বেশ কয়েকটি কবিতা, ছড়া বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশ পাওয়ায় লেখালেখির ইচ্ছাটা আরও প্রবল রূপে বেড়ে গেছে। জানিনা এতে ক্ষতি আছে কিনা। তবে মনে হয় বেশ লাভও আছে।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির হাত ধরার পরে অনেক গুলো সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি। মানুষের সেবা করতে বেশ ভালোই লাগে। আমার একটু কষ্টে যদি অন্য কেউ সুখের জোয়ারে ভাসে তাহলে ক্ষতি কি। আমিও খুবই উপভোগ করি সকলের সাথে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যেতে।

লেখালেখি আর ভিন্নধর্মী সংস্থার সাথে যুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই অনেক নতুন বন্ধুর খোঁজ পেয়েছি। যারা সর্বদাই মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকে। ডাক দিলেই যাদের পাওয়া। এই সব বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে গত বছর নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলাম।

গতবছর এই শীতের দিনে আমরা কিছু কলেজের বন্ধুবান্ধব মিলে ঠিক করেছিলাম অসহায়, হতদরিদ্র, খেটেখাওয়া মানুষের, এমনকি কিছু ছিন্নমূল মানুষদের শীত বস্ত্র উপহার দেব। আমরা সবাই যে যার সাধ্যমতো পুরানো কাপড়চোপড় কিংবা টাকা পয়সা জোগাড় করে ফেলি। কিন্তু মনে হলো এগুলো একেবারেই সামান্য হয়ে গেছে। চেষ্টা করলে আরও বেশি করা সম্ভব। ঠিক তখনই শ্যামলের ফোন কল পেলাম।
শ্যামলঃ কিরে কি খবর, কি করিস?
বললাম নারে কিছু করিনা ; রুমে বসে আছি ; পড়তেও ভাল লাগছে না।
শ্যামলঃ কেন? শরীর খারাপ নাকি।
আরে না; এমনিতেই ;ভাবছি।
শ্যামলঃ কি এতো ভাবছিস?
ভাবছি কিভাবে আমাদের উদ্যোগটা বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু কিছুতেই মাথা কাজ করছে না।
শ্যামলঃ আমার মাথায় একটি আইডিয়া এসেছে তুই চাইলে বলতে পারি।
হুমম, বল।
শ্যামলঃ তোর তো অনেক সংগঠনের সাথে পরিচয় আছে ; আবার আমাদের অনেক মানুষের সাথে ফেসবুকে বন্ধুত্ব রয়েছে ; যারা প্রতিনিয়ত এসব করে; তুই চাইলে আমরা সবাই একসাথে ফেসবুকে এসব প্রচার করতে পারি; মনে হয় অনেকেই এগিয়ে আসবে; আর আমাদের কাজটাও সহজ হয়ে যাবে।
ঠিক বলেছিস; কাল কলেজে আয়; সকলের সাথে আলোচনা করবো।

পরের দিন সবাই একসাথে বসে আলোচনা করার পর এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হলো; আমরা সবাই একে অপরের আইডি থেকে পোষ্ট করতে থাকলাম; দুই একদিনের মধ্যেই আমরা আশানুরুপ ফল পেতে লাগলাম ; পরিচিত অনেকেই তাদের সাধ্যমতো জামাকাপড় ও টাকা পাঠাতে শুরু করলো; আমরাও সবসময় আপডেট দিতে থাকলাম ; কে, কোথায় থেকে কি জিনিস পাঠিয়েছে, কতো টাকা দিয়েছে ; কিছুদিন পর আমরা একটি নির্দিষ্ট দিন ঠিক করলাম। শীতার্ত মানুষদের কাছে পৌঁছে দেব শীতের বস্ত্র।

আমরা আবারও বৈঠকে বসলাম। কোন গ্রাম বা কোন বাজার এবং কোন ষ্টেশন থেকে শুরু করা যায়। তবে ভিন্ন ভিন্ন মতামত আসলে আমরা সবাই এটাকে লিপিবদ্ধ করে রাখলাম। এবং সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা আগে ষ্টেশন থেকে শুরু করবো। কেননা স্টেশনে যারা দিনযাপন করে তাদের কোন ঘরবাড়ি ভিটেমাটি নেই। তাদের অনেকেরই দুবেলা খাবার জোটে না।

পর্যায়ে ক্রমে আমরা শীতবস্ত্র উপহার দিতে শুরু করলাম। স্টেশন, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি যায়গায় দেওয়ার পরও আমাদের আমাদের কাছে কিছু শীতবস্ত্র ও টাকা রয়ে গেল। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কিছু শীতবস্ত্র গ্রামে উপহার দেব।

কথামতো সেদিন রবিবার সকাল ১০ টার দিকে আমরা যথাস্থানে পৌঁছে গেলাম। এবং শীতবস্ত্র উপহার দিতে শুরু করলাম। কয়েকজনকে কয়েকটি দেওয়ার পর একজন বয়স্ক মানুষ মাথা নিচু করে একটি কম্বল চাইলো। আমি কিছু জিঙ্গেস না করেই যখন কম্বলটি তার হাতে দেব ঠিক তখনই তিনি আমার দিকে ফিরে চাইলো। ওনাকে দেখে আমার বুকের ভেতরটাও লাফিয়ে উঠলো। আমিও কিছু বললাম না। কিন্তু আমি ওনাকে চিনে ফেলেছি। উনি আমাকে চেনেন না। চেনারও কথা না।

বছর খানেক আগে আমি আমার আব্বুর সাথে আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আত্মীয়ের বাড়ি থেকে আসার পথেই ওনার সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল। আব্বু ওনাকে দেখেই সালাম দিয়েছিল। আমিও দিয়েছিলাম। একটু দূরে আসার পর আব্বু আমাকে বলতে আরম্ভ করলো, ওনাকে তুমি চিনবে না। আমি চিনি। ওনি হলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে সাহসের সাথে যুদ্ধ করছেন। যুদ্ধে মা বাবা, ভাইবোন হারানো সত্বেও তিনি পিছপা হননি। এগিয়ে গিয়েছে পাকিস্তানের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে। ঝাপিয়ে পড়েছে পাকিস্তানি সৈন্যদের উপর।

শীতবস্ত্র দেওয়ার পর আমি আমার সহপাঠীদের বললাম তোরা একটু হাঁট।আমি আসছি। কিন্তু জোসনা বললো, কেন রে তুই কোথায় যাবি?
কোথাও না; আমি আসছি ;তোরা একটু হাঁটা দে।

জোসনা বললো, ঠিক আছে ; তুই তাহলে একটু তারাতারি আয়।
আচ্ছা ঠিক আছে ; আসবো।
আমি দ্রুত ওনার বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বাড়ির কাছে গিয়ে একটি ঝগড়ার আওয়াজ কানে আসলো। আমি কোনকিছু না ভেবেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পরলাম। আমাকে দেখে বয়স্ক মানুষটি চিনতে পারলো। আমার কাছে এগিয়ে এসে বললো, কিছু চাও নাতি। আমি বললাম না দাদু আমি কিছু চাই না। শুধু আপনার সাথে কথা বলতে চাই। দাদু কোন সংকোচ বোধ না করেই আমার হাত ধরে বাড়ির বাইরে গাছতলায় নিয়ে আসলো। দাদু বলতে থাকলো - এরকম প্রায় দিনেই বাড়িতে ঝগড়া হয়। আমার ছেলের বউ আর আমার ছেলে। কারণ জানতে চাইলে, কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললো আমিই নাকি ওদের কাছে বোঝা হয়ে গেছি। আমি নাকি বেশি খাই খাই করি। এতো কষ্ট করে ছেলেকে মানুষ করেছি আর ছেলের বউ........।কথা বলতে বলতেই দাদু কেঁদে ফেললো। দাদুর জমিজমা বলতে শুধু ওই বাড়ি টুকুই। তাও ছেলের নামে লিখে দিয়েছে। খুবই কষ্ট হচ্ছিল দাদুর কাহিনী শুনে। দাদুকে জিঙ্গেস করলাম, দাদু আপনিতো মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সবাই আপনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই চেনে। দাদু খুবই আফসোস করে বললো আর মুক্তিযুদ্ধা! মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কি পেলাম? কিছুই পায়নি! যারা রাজাকার হিসেবে কাজ করেছে তাদের নামেই সরকার ভাতা দেয়। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা তারাই বঞ্চিত। আমাকে দেখ, মুক্তিযুদ্ধে মা বাবা, ভাইবোন হারিয়ে, নিজের জীবনের মায়া না করে দেশ স্বাধীন করেছি। বিনিময়ে কি পেলাম? কিছুই পায়নি। অবহেলা, দুঃখ ছাড়া আর কিছুই পায়নি। যদি পেতাম তাহলে শেষ জীবনে ছেলে আর ছেলের বউয়ের দিকে এমনকি শীতবস্ত্রও আনতে যেতাম। লজ্জা করে আর কি করবো? রাতে খুবই শীত পরে। একটা কাঁথায় শীত যায়না। এজন্য..........! আমি আর কিছু বলিনি। শুধু বললাম চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছিলেন? গিয়েছিলাম কিন্তু কোন কাজ হয়নি।

সেদিন ওখান থেকে ফিরে আসার পর মনটা কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। কোন কিছুতেই মন বসাতে পারছিলাম না। বারবার শুধু মনে হচ্ছিল একজন ব্যক্তি দেশকে স্বাধীন করার জন্য সব কিছু হারালো। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর সে কিছুই পেলেন না। এ কথাগুলোই বারবার মনে জমাট বেধেছিল। সহজেই বুকের ভেতর থেকে নামতে চায় ছিলোনা। যেন আঠার মত লেগেছিল। আমিও হতভাগ্য যে ওনার পাশে দাড়াতে পারলাম না। তারপর কিছুদিন পর আমার পরীক্ষা আরম্ভ হয়ে গেল।

তারপর আর দাদুর কোন খোঁজ খবর নিতে পারি নি। মানুষ মনে হয় এ রকমই। কাউকে মনে রাখে না। যার যার নিজের কাজে সবাই ব্যস্ত।

এবার ; ২০১৭ সালে। আবারও গতবারের মতো আমরা উদ্যোগ নিলাম শীতবস্ত্র উপহার দেব।তবে এবার মন থেকে ইচ্ছা ছিল দাদুকে একটু বেশি করে উপহার দেব।এজন্য আগে থেকেই দাদুর জন্য সবকিছু আলাদা করে রেখেছি। একজোড়া জুতা, সাদা পান্জাবী, একটি গেঞ্জি ও পরনের লুঙ্গি। তাছাড়া শীতবস্ত্র তো আছেই।

আমরা যথাসময়ে আবার আমাদের কার্যক্রম শুরু করার আগেই আমি জোছনা ও অন্যান্যদেরকে বললাম, তোরা কাজ চালিয়ে যা। আমি আসতেছি। ওরা বললো, যেখানেই যাস খুব তারাতারি ফিরে আসিস।
বললাম, হুমম ;আসবো।

আজ খুবই ভাল লাগছিল। নিজেকে আজ অনেক বেশি খুশি মনে হচ্ছিল। মনের ভিতর সুখের ছোঁয়া নাচানাচি করছিল। যাক আজ দাদু অনেক খুশি হবে। এতো উপহার দেখে নিশ্চয়ই দাদু অবাক হয়ে যাবে। নিজের মধ্যেও কেমন যেন অন্য রকম একটা অনুভূতি কাজ করছিল। বারবার মনে হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্ম নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধার জন্য এই সামান্য কিছু করতে পারছি এটাই অনেক।

বাড়ির উঠানে গিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ডাকতে শুরু করলাম কেউ কি আছেন? কয়েকবার ডাকার পর একটি বউ বাইরে চলে এলো। মনে হলো এই মনে হয় সেই বউ। আমি কিছু বলার আগেই তিনি জিঙ্গেস করলো, কার কাছে এসেছেন?
আমি বললাম, একজন বয়স্ক দাদু ছিলো...।
কথা শেষ না করতেই তিনি বলে উঠলো, ও ওই বুড়োর কথা বলছেন।
কথা শুনে মনে হলো তিনি কতোটা বিরক্ত দাদুর ওপর।
আমি বললাম, জি ওনাকেই খুঁজছিলাম।
তিনি বললো, তাকে খুঁজে আর কি হবে?
কেন? দাদু কি নেই?
তিনি বললো, না নেই। তিন মাস হলো তিনি বিদায় নিয়েছেন।
মানে। বুঝলাম না।
তিনি একটু রাগ করে বলে উঠল, সে মরে গিয়েছে।
শুনেই বুকের ভেতরটা নড়ে উঠলো। সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে গেল চারপাশের। অজানা এক দমকা হাওয়া মাথার উপর দিয়ে বয়ে গেল। আমি আর কিছুই বললাম না। মাথা নিচু করে চলে আসলাম। তখন ওই মহিলাটি ভির ভির করে কি যেন বলতে লাগলো। আমি না শোনার ভান করে চলে আসলাম।

সেদিন রাতে আর খাওয়া হলো না। খেতে আর ইচ্ছে হলো না। কোনকিছুই আর ভাল লাগছিলো না। রাতে যখন ঘুমাতে যাবো ঠিক তখন মনে হলো ভালোই হয়েছে। পৃথিবীতে থেকে কষ্ট, যন্ত্রণা সহ্য করার চেয়ে মরে গেছে এটাই অনেক ভাল হয়েছে। তাকে নিয়ে আর কারো ঝগড়া করতে হবে না। কারো বোঝা হয়েও বসবাস করতে হবে না। শুধু একটি কথা বারবার আমাকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে যে, যাঁরা দেশের জন্য এতোকিছু করলো বিনিময়ে তারা শুধু দুঃখ দুর্দশা, কষ্ট, যন্ত্রণা ভোগ করে গেল। দেশের জন্য যাঁরা এতো ত্যাগ তিতিক্ষা করলো দেশ তাঁদের কি দিল? তাঁরা কি পরাজিত মুক্তিযোদ্ধা? না না তাঁরাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। যাঁরা শুধু দেশকে দিয়ে গেছে বিনিময়ে কিছুই আবদার করেনি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement