তাল গাছ কে এখানে তুলনা করেছি উঁচু স্তরের কিছু মানুষের সাথে। যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায় অন্ধ থাকে সব সময় । কখনও কখনও সময়ের পরিক্রমায় সেই উঁচু স্থানিয়দের অহমিকা চূর্ণ হয়। কিন্তু নতুন কোন দাম্ভিক আবার তার স্থান দখল করে। এভাবেই বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ হয়ে উঠেছে গল্পের বিষয় । আমি তাই মনে করছি
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ মে ১৯৭৬
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬২

বিচারক স্কোরঃ ২.৯২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৭ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - দাম্ভিক (জুলাই ২০১৮)

বুড়ো তাল গাছ
দাম্ভিক

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬২

Shamima Sultana

comment ১১  favorite ০  import_contacts ২৬২
বুড়ো তালগাছটা আজও একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে যুগের সাক্ষী হয়ে। কত মানুষের হৃদয় ভাঙ্গার আর্তি নিয়ে। ভালবাসার মানুষগুলো এই পথ দিয়ে চলে যাওয়া দেখতে দেখতে সে বৃদ্ধ হল। তার কোটরে পোকারা বাসা বেঁধেছে সেই অনেক বছর আগে। যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়বে তার উঁচু মাথা। যে উচ্চতার দম্ভে একসময় অন্ধ ছিল। ধরাকে সরা জ্ঞান করত। তার ছায়ায় শত শত বাবুই পাখি বাস করত শিল্পীর ছোঁয়ায় গড়ে তুলত বাসভবনে। হাজারও পাখির আশ্রয় দাতা হয়ে অহমিকায় অন্ধ ছিল সে। কিচির মিচির গান কলকাকুলিতে মুখর হত চারপাশ আর এই অনিন্দ্য আনন্দে ভেসে যেত সুখের পানসিতে।পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নব যৌবনা জলাভুমিটা এখন মরা খাল।তারও যৌবন জোয়ার ভাটার দিকে।

সেই বৃদ্ধ তালগাছ আজ আমাকে করুণ সুরে ডাকছিল। তার কণ্ঠে করুণ আর্তি শুনে আমি অবাক! এটা কি হতে পারে?দাম্ভিক তাল গাছের মলিন কণ্ঠ আমাকেও কিছু আহত করে।
সে ডেকে ডেকে বলছিল-
হে পথিক, তোমাকে বড্ড চেনা চেনা লাগে।
আমি খুব কষ্ট পেলাম। বললাম আমি এই গাঁয়ের মেয়ে গো। আমাকে ভুলে গেলে? ঐ যে দূরে নদী দেখছ ঠিক নদীর মাঝখানেতে আমার পাড়া ছিল।আজ গ্রামের সেই পাড়া নেই মানুষ নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেথায় সেথায় বাস করে।তাই বুঝি আমাকে ভুলে গেলে?তোমার পাশ দিয়ে হেঁটে কত দিন স্কুল বাড়ি আসা যাওয়া ছিল। কখনও তোমার বাবুই পাখির বাসার দিকে অবাক তাকিয়ে থাকতাম আর তোমাকে ধন্য ভাবতাম।যার ডাল পালায় নান্দনিক সব পাখির বাসা কি অপরূপ!কতদিন ইচ্ছে হত তোমার মাথা স্পর্শ করি। কিন্তু এত উঁচু কি করে সম্ভব বল।
আমি তো একদিন তোময় বলছিলাম ওগো তাল গাছ-তোমার মাথা টা একটু নিচু করবে? আমি তোমার মাথায় বসে এই দূর দিগন্ত দেখতে চাই। ভুলে গেলে সেই কথা। সেই দিন তুমি খুব রাগ দেখিয়েছিলে আমার এখনও মনে আছে।
বলেছিলে পুঁচকে মেয়ে সাহস কত আমার মাথায় বসতে চায়। জান আমি কে? আমি রাজা , গাছের রাজা। দেখ চেয়ে যত দূর চোখ যায় আমার চেয়ে বড় কেউ আছে?রাজার মাথায় বসবে, কি দুঃসাহস?

আমি খুব কেঁদেছিলাম। কি বোকা আমি দেখ। নীল দিগন্ত ছুঁতে চেয়েছিলাম তোমার মাথায় চেপে। আজ মনে হলে হাসি পায়। তোমার মাথায় চড়েই যদি দিগন্ত ছোঁয়া যেত তবে বিমান আকাশে উড়ত না।পাখিরা সুদূর ঘুরে বেড়াত না।ছোট বেলার ভাবনা গুলো কি অদ্ভুত সরল সুখের।অথচ দিনকে দিন তা বদলে যায়। স্বার্থ বাড়ে বয়সের সাথে সাথে। হানাহানি হিংসার বহুরূপ।

আমি তো ভুলি নাই বাছা। বয়স হয়েছে চোখে ছানি পড়া, আগের মত চোখে দেখি না।তাই তো বুঝতে পারি নাই। কষ্ট পেলে?

আমি তো খুব অহংকারী ছিলাম। নিজেকে মহারাজ ভেবে কত অন্যায় আচরণ করেছি। তাইত কোন গাছ আমাকে পছন্দ করে না। যখন যৌবন ছিল উদ্যম ছিল মাথা সর্বোচ্চ ছিল নিজেকে মহাবীর মহা পালোয়ান ভাবতাম।আজ সবাই আমাকে পর করে দিয়েছে। জীবনের ভাটি বেলায় সব মনে পড়ে যায়। অনুশোচনা হ্য়।কিন্তু দুঃখ বলার লোক নাই বাছা। আমার বয়সি সবাই চলে গেছে পরপারে।

আচ্ছা তোমার কি মনে পড়ে তোমাদের পাড়ার ঐ শেখের ব্যাটাকে। যার দাপটে এই তল্লাটের কেউ তার সামনে যাবার সাহস করত না। সবাই ভয়ে জবুথবু হয়ে থাকত। তার শেষ জীবন কত না কষ্টে গেল।আমারই মত দম্ভ অহংকারে অন্ধ ছিল।দুই জনের জীবনে কত মিল ছিল।


আমি এসেছি তোমাদের কাছে শহরের নির্মম নিষ্ঠুর কাজ কর্ম দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে। ভাবলাম একটু গ্রামের সুবাতাস গায়ে মেখে আসি।প্রিয় জনদের আদর নিয়ে আসি।এখানে এসে দেখি নতুন আরেক শহর।ভালবাসাহীন মায়ামমতাহীন কদর্য রাজনীতি মাদক লালসা হিংসা বিবেকবর্জিত কাজ কর্মে ছেয়ে গেছে আমার গ্রামের মানুষ গুলোর অন্তর বাহির।শহরে তবু অচেনা মানুষের দ্বারা হতে দেখি কদর্য কর্ম।বুক ফেটে যায় আমারই চেনা জানা লোকজনগুলো যখন অনাচারে লিপ্ত।শহরের মন্দ হাওয়া এত দ্রুত গ্রামে ছড়ে পড়বে ভাবিনি।আগের সেই গুরুজনেরা বেঁচে নেই।শিক্ষিত ভাইয়েরা চলে গেছে শহরে জীবিকার খোঁজে।যারা আছে এখনও গ্রামে গুটিকয়েক ভাল মানুষ এই সব অল্প শিক্ষিত অল্প জ্ঞানী ভয়ংকারিদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে।কি পৈশাশিক নৃত্য এদের। কোন কোন রাজা মহারাজার উস্কানি আশ্রয় প্রশ্রয়ে তারা আজ বিভোর। সমাজ কে ধ্বংস করার লালসায় লিপ্ত।

বাছা কি হয়েছে তোমার? কেমন কষ্টের যন্ত্রণার আভাস পাচ্ছি।তুমি কি খুব কষ্টে আছ? আমার চেয়েও কষ্ট? এই যে আমাকে দেখ আমার চারপাশ তাকিয়ে দেখ। যে ভুমিতে সোনার ফসল ফলত আমার চারপাশের ফসলি জমিতে সেই খানে এলোমেলো লোকালয় ছেয়ে গেছে।যে কৃষককে দেখেছি পাশের জমিতে সোনার ফসল ফলাত আজ সেই জমিতে নিজের আশ্রয় খুঁজছে। বসত বাটি ঐ নদীতে ভেসে গেল একটা টিনের চালাও ধরে রাখতে পারে নাই।যে সব লোকের গোলা ভরা ধান পুকুর ভরা মাছ গোয়াল ভরা গরু ছিল আজ তাদের নিরন্ন মুখ কেমন করে সয়ে আছি চেয়ে চেয়ে দেখছি।তাদের ঘরের সন্তান গুলো জীবিকার খোঁজে শহরে পড়ে আছে।আমার মত সম বয়সী যারা ছিল কেউ আর বেঁচে নেই।তারা সুখে আছে বেহেস্তে। আর আমি এক শূন্যতায় ডুবে আছি।


ঐ যে বললে তোমার পাড়াটা যেখানে ছিল নদীর সেই জলাটুকু নিয়ে কত কোন্দল মারামারি রাজনীতি পুলিশ কেস চলল তুমি কি তা জান?

নাত, কবে কি হল!

ঐ টুকু জলায় তোমাদের জমিই তো বেশির ভাগ। তোমার বাবাকে দেখতাম আমারই পাশ দিয়ে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরত স্কুল থেকে। তারপর আবার মাঠে আসত কামলাদের নিয়ে ঐ জমিতে। তাদের দেখিয়ে দিত কাজ কর্ম। সেখানে যে আবাদ হত তা দিয়েই তো তোমাদের সারা বছর চলে যেত।বাকী গুলো না হয় পড়ে থাক। অথচ ক্ষমতার দাপটে সেই সব জলা ভুমি অন্যদের দখলে। তোমার পাড়ার লোক সেখানে কিছুই করতে পারে না। তাদের পূর্ব পুরুষের সাত জন্মের জমি জমা নদীর গর্ভে তবু অন্য লোকের দখলে।

তাকিয়ে দেখ কত সুন্দর গৃহ শয্যা তাদের। অথচ যারা ছিল ধনী ব্যক্তি তাদের বাড়ি ঘরের কি দশা।এসব দেখতে ভাল লাগে বল?
থাক তুমি এত কষ্ট পেও না। আমি তোমার একটু সেবা যত্ন করি। ডাক্তার ডেকে তোমার শরীরে বসা পোকা মাকড় তাড়িয়ে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেই। তুমি আবার সুস্থ হয়ে উঠবে।

না থাক, এ জীবন আর ভাল লাগে না। এই ঘুণে ধরা সমাজ সংসার আর দেখতে চাই না। এভাবেই ধুকে ধুকে মরতে দাও। আমার বুকের আর্তনাদ আর বাড়াতে চাই না। তোমার এই দরদমাখা ভালবাসা নিয়ে বেঁচে থাকি যে কয়টা দিন আছি।
কিন্তু আমি তোমার জন্য কিছু করতে না পারলে নিজে খুব কষ্ট পাব যে।

আচ্ছা, যদি কিছু করতে চাও তবে তোমরা যারা শহরে বাস কর এখনও গ্রাম টাকে ভালবাস সবাই মিলে এই গ্রামের সহজ সরল যে কয়জন মানুষ আছে তাদের রক্ষা কর।তাহলেই আমি খুশী হব সুখে মরতে পারব।

চেষ্টা করব। গ্রামের অনেক ছেলে আছে যারা শহরে বাস করেও এখনও গ্রামের ভাল কাজ করতে চায় কিন্তু দুর্বিত্তের ভয়ে বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারে না। তা ছাড়া দূরে থেকে শহরের সংসার দায় সেরে তাদের সাথে পেড়ে ওঠা কঠিন কাজ।বন্ধু তাল গাছ তুমি বেঁচে থেকো আরও হাজার বছর এই গাঁয়ের মানুষ গুলোর জন্য। আমি আবার এসে যেন তোমাকে দেখতে পাই। কথা দাও।

কি যে বল মরণের উপর কি কারো হাত আছে?
তুমি যদি মারা যাও কত গুলো বাবুই আবাস শূন্য হবে ভেবে দেখেছ?
যেভাবে তোমার গ্রামের মানুষ বাসস্থানহীন হয়ে নতুন বসত গড়েছে এরাও তাই করবে। কারো জীবন কারো জন্যে থেমে থাকে না বাছা। হয়ত সাময়িক অসুবিধা হয়। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।যেদিন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে অন্যায়ের মাত্রা বাড়তে বাড়তে এতটুকু চলার পথ থাকবে না সেই দিন প্রতিবাদের জোয়ার নামবে। রাস্তায় ঢল নামবে সাধারণ জনগণের।

তাই ভেব না বাছা। সাময়িক কষ্ট হচ্ছে এই যা। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখ কিভাবে দিন বদলিয়েছে?
সেই ভাবেই দিন বদলের জোয়ার আসবে।


শহর থেকে গ্রাম
রাজপথ থেকে মেঠো পথ
উঠবে জেগে ভুক্তভোগী সাধারণ।
কৃষক শ্রমিক মুটে মজুর জনগণ
কিংবা অফিস ফেরত কেরানি থেকে বড় বস
যে যেখানে কষ্ট পাচ্ছে সেইসব।
একসাথে প্রাণে পড়বে বাঁধন
এগিয়ে আসবে মানবে না কোন শাসন
ক্রসফায়ার গুমের ভয়
হবে দূর মন থেকে সবার।
অন্যায়ের প্রতিবাদে সবাইকে জাগতে হয়
ঘুম ভেঙ্গে যাবে একসাথে সবার
রুখবে তখন কে?
এত গুলো সর্ব সাধারণ?


ভাল থেকো আবার বেড়াতে এস । যদি আমি নাও থাকি তবুও এস । নতুন কোন তাল গাছ লাগিয়ে দিও। নতুন কোন কালের সাক্ষী হতে একটা তাল গাছ সব সময় দরকার।বিদায় বন্ধু।

বিদায়। আমি ছল ছল নয়নে তার দাঁড়িয়ে থাকা দেখি আরও কিছুক্ষণ। কত স্মৃতি কত হারানোর ব্যথা এক জনমে থাকে।কত দম্ভ চূর্ণ বিচূর্ণ হয় সময়ের সাথে সাথে। নতুন দাম্ভিক তৈরি হয়।পূর্বের কারো জীবন থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্ব মজবুত থাকে অহংকারে অন্ধ থাকে। হয়ত এভাবেই চলে জীবন সময়ের কাঁটা ধরে। কত চেনা মুখ কত ভালবাসা হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। পড়ে থাকে শুধু স্মৃতি হৃদয়ের মাঝে। শুধুই শূন্য বুকে আজও পথ চেয়ে নতুন কোন উজ্জীবনের।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement