পিতৃত্ব কে নানা ভাবে উপস্থাপন করা যায়। এক পিতার ত্যাগ, ধৈর্য ,ভালবাসা ,সন্তানকে বড় করার যুদ্ধ শুধু পিতাই করতে পারেন।আমার গল্পের নায়ক অনিমেষ বিখ্যাত লেখক হবার বাসনায় সারা জীবন নানা বাস্তব গল্প রচনা করে লেখায় জীবন্ত করে তুলেছে।বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নারীর সাথে প্রেমের ছলনা করে নতুন জীবন্ত গল্প তৈরি করেছে। দীর্ঘ পথ চলায় সে পায় খ্যাতি যশ প্রতিপত্তি ।কিন্তু ব্যক্তি জীবনে সংসারে এক নারীর ভালবাসায় থিতু হয় নাই।সে এত টাই খ্যাতি লাভে অন্ধ হয়ে পড়ে যে বিয়ে সংসার সন্তান নিয়ে ভাবেনাই। কিন্তু ভালবাসার খেলা খেলতে গিয়ে এক ভালবাসার বীজ বুনে যায় নিজের অগোচরে। তার সেই মহীয়সী প্রেমিকার বদৌলতে পাওয়া সন্তান আজ তার মাঝে পিতৃত্ব জেগে তুলেছে। সে বুঝতে পারে পিতা হতে পারা কতটা সুখের ভালবাসার পূর্ণতার বিষয়। তাই সকল যশ খ্যাতি প্রতিপত্তির বিনিময়ে শুধু পিতা হতে চায়। তাই আমি মনে করি পিতৃত্ব শব্দটির সাথে আমার লেখা টি সামঞ্জস্য পূর্ণ
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ মে ১৯৭৬
গল্প/কবিতা: ৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপিতৃত্ব (জুন ২০১৮)

অবরুদ্ধ পিতৃসত্ত্বা
পিতৃত্ব

সংখ্যা

Shamima Sultana

comment ০  favorite ০  import_contacts ৬৩
জীবনেরঊষালগ্নে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের পর এত গুলো বছর কেটে গেল বুঝতেই পারে নাই শ্রীলেখা। তার যৌবনের বাতায়নে এক অধরা সুখ পাখি কেবলই ডেকে ডেকে ব্যর্থ নীড়ে ফিরেছে।অশুভ বাজ পাখি ভেবে দূর দূর করে তাড়াতে তাড়াতে পচিশ টা বসন্ত পেরিয়েছে। প্রথম যৌবনের সামান্য ভুলের ছোঁয়ায় নাবালিকার ক্লান্তিকাল আজ।
কতটা ভালবেসেছিল অনিমেষকে। যার তপ্ত কথাও শীতল স্পর্শ পেত। একটু চাহনিকে সীমাহীন প্রান্ত ভাবত। এক ফোঁটা জল কে ভাবত সাগর নদী জলাশয়।
তাই প্রথম কলি দুমড়ে মুচড়ে দেবে ভাবে নাই।তার সাথে লং ড্রাইভের নেশায় সারা রাত ঘুমাতে পারে নাই। মাকে বলেছিল বান্ধবীর জন্ম দিন,সারাদিন হৈ চৈ আড্ডা চলবে ।ভেবনা, আসব বিকেল বেলা।

অনিমেষ বলেছিল শ্রী চলনা দূরে কোথাও ঘুরে আসি। লিখতে পারছি না বেশ কিছুদিন হয়। একটু হাওয়া বদল সাথে তোমার সান্নিধ্য আমার লেখার খোরাক যোগাবে।

আহা!অনিমেষের এই অল্প কথার অভিব্যক্তি শ্রীলেখার ব্যাকুল মন আকুলভাবে ধরা দেয়।তার মন বলে অনিমেষ যেন তাকে ছাড়া অচল পৃথিবীতে।ভালবাসা আবেগ অনুভূতি একীভূত ভাবে উদ্দীপ্ত করে তাকে। শ্রী তুমিই পার অনি কে লেখক বানাতে। তোমার অনির নাম দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়বে কোন এক শুভ উম্মেসে।তাতে তোমার নাম হবে জ্বলজ্বলে। আর অনি সে তো শ্রীর জন্ম জন্মান্তরের বিধির বিধান।

শ্রীর সামনে এইচ এস সি পরীক্ষা। সব তুচ্ছ জ্ঞানে ছুটল অনির হাত ধরে লং ড্রাইভে। অনিমেষ শ্রী কি অপূর্ব জুটি। সুপুরুষ অনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ি ছাড়ি করছে। এস এস সি পরীক্ষার আগে অঙ্কের সমস্যার সমাধান পেতে অনিমেষকে শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিল। এটা তার শখের কাজ।প্রয়োজন মেটানো নয়। বাবার বিশাল বিজনেস। টাকার অপ্রতুল আসা যাওয়া। প্রত্যকের আলাদা দামী গাড়ি। কালো গ্লাসে ঢাকা তেমন এক গাড়িতে ড্রাইভিং সিটে অনি পাশে শ্রী। তারা আজ স্বপ্ন ডিঙায় ছুটে চলছে। অনি গাড়ির স্টিয়ারিঙে হাত শ্রী এলিয়ে দিয়েছে শরীর অনিমেষের অঙ্গে। শহরের ব্যস্ততা ছাড়িয়ে গাড়ি চলছে এগিয়ে সামনে। প্রায় একটানা তিন ঘণ্টা চলছে বিরাম হীন।

কত কথাই চলছে দুই জনের। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ।শ্রী বলে এত পরিকল্পনা করোনা। স্বপ্ন দেখতে বড় ভয়। কেবল ছাত্রী। পড়াশোনা শেষ হবে তার পর ভাবব।

আহা তাই বলে স্বপ্নরা বুঝি বসে থাকবে?তোমাকে যদি না বলি বলব কাকে?

হুম স্বপ্ন নিয়ে বসে থাক। আমার কত পড়া বাকি।আমার ইচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব ভাল সিজিপি নিয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেব।

ও তুমি পারবে আমি জানি।

যদি পাশে থাক তুমি।

আমি তো আছিই পাশে, এই যে হাত বাড়ালেই ছুঁতে পাও।

আজ শ্রীর কি যেন কি হল। চারপাশ বাধাহীন। কালো গ্লাসে ঢাকা গাড়ি। বাইরের দৃষ্টির অগোচরে। অনি গাড়ি থামায় পাশের নিরিবিলি পার্কে। গাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে শ্রীর দিকে অপলক চেয়ে থাকে। দুজনের অনাহুত দৃষ্টি। দৃষ্টির সীমানায় পার্থিব চাওয়া পাওয়া ডাকতে থাকে।
অনি শ্রীর ঠোঁটে আসতে করে নিজের ঠোঁট রাখে। দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শ্রী অনিকে। একটুও ছাড়তে ইচ্ছে করে না। দেহের প্রতিটা লোমকূপ অনির স্পর্শ পেতে চায়।

অনেকক্ষণ পর তাদের যেন হুঁশ ফেরে। লজ্জিত শ্রী।কামনায় তৃষ্ণায় পাগল অনি।

আচ্ছা বাসা থেকে কি বলে এসেছ শ্রী।

বলেছি সুচন্দার জন্ম দিন। বিকাল হবে আসতে।

তবে তো আরও অনেক সময়।

শ্রী একটা কথা রাখবে?

তোমার সকল কথা আজ রাখব ভেবেই বেড়িয়েছি।

চল না পাশেই একটা রেস্ট হাউজ আছে ওখানে থাকি কিছুক্ষণ ,রেস্ট নেই।

শ্রী বাঁধা দিতে পারে না।

ভালবাসায় সাড়া দিতেই যেন আজ বের হওয়া।

জীবনের প্রথম এমন সাড়া দিচ্ছে মন।তাকে কোন ভাবেই অস্বীকার করতে পারে না শ্রী। আজ যে তার মাথায় পাপ ভর করেছে।

অনি অত্যান্ত নিপুণ স্পর্শে শ্রী কে ছুঁয়ে দিতে থাকে। সুনিপুণ বস্ত্র হরণ চলে। কি পৈশাশিক আনন্দে জ্ঞান হারাবার মত মনে হয়। অনির লোমশ শরীরের স্পর্শে ভরসা পায় শ্রী। পুলকিত শিহরিত দুই নওজোয়ান ক্লান্ত জড়াজড়ি।

এবার যেন হুঁশ ফেরে শ্রীর।

একি করলে অনি কি সর্বনাশ।

অনিমেষ শ্রী কে আশ্বস্ত করে। প্লিজ এর জন্য কি শুধুই আমি দায়ী? তাছাড়া এভাবে ভাবছ কেন? তুমি আমি দুজনার।না হয় একটু আগেই কাছে এলে। প্লিজ ভেব না। তাছাড়া কেউ তো জানবে না।



এই একবারের ভুল একবারের আনন্দ শ্রীর জীবন তছনছ করে দেয়।

সেইদিন বাসায় ফিরতে ফিরতে অনি শ্রী কে বলে সে সিঙ্গাপুর যাবে। এক মাস পর। এর মধ্যেই তার বাকী পরীক্ষা শেষ হবে। সেখানে গিয়ে নতুন লেখাটা শেষ করব। সাথে বাবার বিজনেসের দেখাশোনা।

কই আগে বল নি তো?


বলব বলেই তো আজ লং ড্রাইভে এলাম।

কত দিন তোমাকে দেখতে পারব না?

তা তো বলতে পারছি না।
ভাবছ কেন? এই প্রযুক্তির যুগে দূরে থাকা মানে হারিয়ে যাওয়া না। তবে লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকব। তোমাকে আমিই ফোন দেব। তোমাকে ছাড়া কি আমি বাঁচব?

অনিমেষের প্রতিটি কথা বিশ্বাস করে শ্রী। সে যে তাকে ছাড়া কখনও বাঁচবে না। এই তার বিশ্বাস।

এরপর দিন গড়াতে থাকে। শ্রীর পরীক্ষা চলছে সাথে চলছে শারীরিক অসুস্থতা। ভয় পায় আবার মনকে আশ্বাস দেয় একবারের কোন ভুল এত টা অনাহুত জীবন ডাকবে সে মানতে পারে না। আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। অনিকে বলতে পারলে ভাল হত। অনি তো সিঙ্গাপুর। সে বলেছে পরীক্ষার মাঝে তোমাকে বিরক্ত করব না। ভাল থেকো । পরীক্ষার ঠিক পরদিন ভি ডি ও কল করব। সারা রাত কথা হবে। সেই অপেক্ষায় শ্রীলেখা বসে থাকে।

অতপর সেই কাঙ্ক্ষিত রাত। শ্রীলেখা এপাশওপাশ করে কখন আসবে অনির ফোন।
ফোন আর আসে না। রাত শেষ হয় চাতকের চেতনায়।সকালে তন্দ্রার মত চোখ লেগে যায়। সে এক উঁচু পাহাড়ের শীর্ষে দাঁড়ান। পিছন থেকে অনি জড়িয়ে ভালবাসার তপ্ত স্পর্শে। শ্রী আজ বিরক্ত, অনি তুমি আমাকে ছেড়ে দাঁড়াও। এই আবেগ এই মাখামাখি চাইনা। তুমি আমার অন্তর ছুঁয়ে আছ আপাতত সেখানেই থাক। জীবনকে এভাবে লাগাম হীন যদি চালানো যেত তবে সূর্য টা প্রতিদিন একই দিকে ডুবত না একই দিকে উঠত না। পৃথিবী নিয়মহীন চলত।তুমি সত্য আমি সত্য আর সত্য আমাদের প্রেম ভালবাসা। সময় গড়িয়ে শুভ দিন আসবেই। সেদিন তোমার বুকে মাথা রেখে অনন্ত কাল কাটবে প্লিজ ছেড়ে দাও। জোরাজোরি করতেই সে যেন ছিটকে গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের চূড়া থেকে।

ধড়ফড় করে জেগে ওঠে শ্রী। সে তো বেঁচে আছে । এতক্ষণ তবে কি স্বপ্ন দেখেছে?

শ্রীলেখা ধীরে ধীরে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। খেতে পারে না দাঁড়াতে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে। মা বাবা খুব চিন্তিত। কি হল তাদের মেয়ের। মেয়ের আপত্তি উপেক্ষা করে একদিন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়।ডাক্তার কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। শ্রী কে চেম্বারে একা কিছু প্রশ্ন করে। দুই দিন পর রিপোর্ট আনতে যায় শ্রী। অনেক মানা সত্বেও বাবা সাথে যায়। সেই সাথে আছেন মা। শ্রীলেখা বিষণ্ণ মনে বসে থাকে ঝিমানো দৃষ্টি। কি হতে পারে পরবর্তী পরিস্থিতি। ভাবনা বিহ্বল উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মা ভয় পেয়ে যায়। তার মেধাবী মেয়েটার হঠাৎ করে কি এমন হল?


কিছুক্ষণ পর বাবা রিপোর্ট নিয়ে আসে একসাথে চেম্বারে ঢোকে তারা। ডাক্তার যা বললেন তার জন্য কোন অভিভাবক প্রস্তত থাকে না।হার্টের রোগী ইসলাম সাহেব ঢলে পড়ে চেয়ার থেকে। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে কলঙ্কিত মুখ লুকায় । বাবা মারা গেল একমাত্র মেয়ের কলঙ্ক সইতে না পেরে। শ্রীলেখার একমাত্র ভাই তখন মাত্র মাস্টার্স শেষ করে চাকরী খুঁজছে। অসহায় মা নানা দিক দিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। একদিকে একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী বিয়োগ অন্য দিকে মেয়ের এমন কলঙ্ক।


কি করবে সে । দিশেহারা হয়ে পথ খোঁজে।দিনের পর মাস চলে যায় অনি আর ফোন করে না।শ্রী কিভাবে এই সমুদ্র পারি দিবে?কুমারী নারী গর্ভবতী এটা সহজ কথা না।কোন সত্য চাপা থাকবে না। সেই ভয়ে মা শ্রী কে গর্ভপাতের জন্য চাপ দেয়। চুপি চুপি গর্ভপাত করে এই কলঙ্ক দূর করতে চায়। যে জায়গায় গেলে কেউ জানবে না এমন একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে যোগাযোগ করে।

অন্য দিকে অনি সম্পর্কে শ্রী খোঁজ খবর নিতে থাকে। সে তার সম্পর্কে যে টুকু জানতে পারে তা হল বিত্তশালী বাবার শখের লেখক অনি। লেখার উপকরণ খুঁজতে সে হন্যে থাকে। প্রাণবন্ত লেখা দেবার জন্য সব সময় জীবন্ত ঘটনা খোঁজে। এই ঘটনা তৈরি করতে মাঝে মাঝে নতুন নতুন প্রেমিক তৈরি করে। তারপর সেই জীবন্ত প্রেমঘটনা সত্য প্রকাশ করে লেখার মাধ্যমে। গত বছর সে একটা উপন্যাসের জন্য তরুণ মেধাবী লেখকের সম্মাননা পেয়েছে।

এত কিছু জানার পর স্বাভাবিক থাকার কথা না । কিন্তু শ্রী কি এক দৈবিক কারনে সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেয়। মাকে সাফ জানিয়ে দেয় গর্ভপাত সে করবে না।যত ঝড় যত অসম্মান আসুক মাথা পেতে নেব। আমি কুলাঙ্গার আমি কলঙ্কিনী আমি অসতী যে যাই বলুক মানব না।

সে একা একা ভাবে যে প্রথম ভালবাসার প্রকাশ এই গর্ভ আমি তাকে ধারণ করব। ভালবাসার যে তৃপ্তি সুখ আমি প্রথম পেয়েছি যার কাছে তার দিয়ে যাওয়া বীজ আমি বহন করব। যার জন্য আমার আঠার বছরের ধারণ করা কুমারীত্ব বর্জন করেছি তার ফসল আমার মাঝে বেড়ে উঠছে আমি তাকে ধারণ করে সম্মানিত করব।


মেয়ের এই অনড় সিদ্ধান্তে মা আরও ভেঙ্গে পড়ে।রাজধানী শহরে বাস করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। অতপর অন্য এক মফস্বল শহরে আশ্রয় নেয় তারা। যেখানে কেউ তাদের চেনে না। তাছাড়া রাজধানী শহরে বাস করার মত আর্থিক অবস্থাও তার নেই। স্বামীর পেনশনের কিছু টাকা তা খুবই অপ্রতুল। তাই ছেলেকে কোন এক মেসে রেখে দূর মফস্বলে এক রুম ভাড়া করে থাকে মা মেয়ে।



শ্রীর আর সে বছর ভর্তি কোচিং করা হল না । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আশা ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসেই পড়ে। এক সময় তার কোল জুড়ে জন্ম নেয় অর্ক ঠিক যেন অনির অনুরূপ মূর্তি।

মফস্বলের এক কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ভর্তি হয় রসায়নেঅনার্স।পাশাপাশি টিউশানি করে। মায়ের হাতে কিছু দেবার চেষ্টা করে।ভাইটা একটা ফার্মে চাকরি হয় । কেউ জানে না শ্রী অবিবাহিত। সবাই জানে স্বামী বাইরে থাকে। অর্ক জানে তার বাবা দূর বিদেশে থাকে। সে যখন অনেক বড় হবে তখন সে আসবে অনেক অনেক লজেন্স খেলনা নিয়ে। সেই অপেক্ষায় সে তাড়াতাড়ি বড় হবার চেষ্টা করতে থাকে। মা যেভাবে বলে সেভাবেই।

শ্রী সে এক দীপ্ত প্রতিবাদি মনে মনে প্রতিজ্ঞ।কঠিন আত্ন বিশ্বাসে এগিয়ে চলে। প্রতিটা পরীক্ষায় প্রথম হয়ে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে। বি সি এস করে। অতপর ঢাকায় ফেরে সরকারি বদরুন্নেসা কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসাবে।

যে নারী তার ভালবাসা হারিয়েছে এক মিথ্যে প্রতারক প্রেমিকের কাছে। অর্ক যে অপেক্ষায় আছে দূর প্রবাসী বাবার জন্য। যাকে যোগ্য করে তুলছে পিতৃত্ব আদায় করার জন্য। শক্ত বুনিয়াদ গড়ে তুলছে মনে দেহে শিক্ষায় চিন্তায় স্বপ্নে ।বাস্তবে রুপ দেবার দৃঢ় বাসনায়।

পচিশ টা বছর দীর্ঘ পচিশ টা বছর শুধু সংখ্যায়। শ্রীর কাছে এ শুধু দিনক্ষণ হিসাব নয়। তার একটা একটা মুহূর্ত একটা একটা প্রহর থামিয়ে রাখা লুকানো অশ্রু বিন্দুতে ভরা।অনির প্রতি তার নিষ্কলুষ ভালবাসা এভাবে কলঙ্ক যুক্ত হবে ভাবে নাই।

কত প্রেমিক ভালবাসায় হাত বাড়িয়েছে কত যুবক লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকেছে কত সত্যিকারের প্রেমিক পুরুষ পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে সবাইকে দূর দূর করে তাড়িয়েছে। ভালবাসা নামক শব্দটি তার কাছে মৃত। তার যৌবন আর কখনও কারো স্পর্শ চায় নাই।আর কারো প্রেমের আহ্বানে শরীরে পুলক জাগে নাই। আর কারো জন্যে প্রতিটা লোম কূপ জেগে ওঠে নাই। তার অঙ্গ জুড়ে আগুনের বসবাস। সেই আগুনে সমস্ত ভালবাসা পুড়ে খাক হয়েছে। যে ছুঁতে এসেছে সে জ্বলে পুড়ে শেষ হয়েছে। তাকে আর জ্বালানোর কারো সাধ্যি নাই।

অনিমেষ চক্রবর্তী সাহিত্য জগতের এক অনন্য নাম।তার যশ খ্যাতি প্রতিপত্তির তুলনা ভার। যে লেখা শেষ করতে সে সিঙ্গাপুরে বাস করেছে দীর্ঘ দেড় বছর এক টানা। অতপর যে উপন্যাস সে লিখে শেষ করে তা এক সময় সারা বাংলাদেশে আলোড়ন ফেলে দেয়। লেখার বিষয় ভালবাসার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তরুণ সমাজে সে এক আলোড়ন তোলা লেখক। মূর্তিমান প্রেমের ছবি খুঁজে পায় যুব সমাজ। অর্ক চক্রবর্তী সেও ভক্ত অনুরক্ত অনিমেষের ।গুরুর পায়ে দক্ষিণা দিতে প্রায়ই যাতায়াত চলে।এ কাজে মাও তাকে উৎসাহিত করে। অর্কও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে নাম করে ফেলেছে লেখক হিসাবে।

অনেক ভক্তের ভিড়ে অর্ক কে আলাদা করে দেখে অনি। মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গ অনির সাথে রাত্রি যাপন করে। সারা জীবন প্রেমের খেলা খেলতে খেলতে লেখার উপকরণ তৈরি করতে করতে আজ সে ক্লান্ত। এখন লেখা তৈরির উপকরণ তৈরি করতে হয় না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা কষ্ট হাহাকার লেখার উপকরণ। অনেক ভালবাসার মাঝে কি এক শূন্যতা জীবনের সকল পাওয়া কে মিথ্যা করে দেয়।এত ভক্তের মাঝে অর্কের প্রতি এক অজানা টান অনুভব করে। অপ্রকাশিত পিতার ভালবাসা দিতে ইচ্ছে করে।

অর্ক কে দেখলেই নিজের শরীরের এক অংশ মনে হয়। অবিচ্ছেদ্য এক সূচনা ভাবতে ইচ্ছে করে। ওকে খুব আদর করতে ইচ্ছে করে।অর্কের চেহারায় নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায়। ওকে আয়নায় মাঝে মাঝে পাশে দাঁড়াতে বলে। দেখতে চায় কতটা মিল। সে যেন পচিশ বছরের পূর্বের অনি। সেই নাক চোখ ভ্রু যুগল।শুধু ঠোঁট দুটো অন্য কারো বড় চেনা তবু যেন মনে করতে পারেনা। কপালের দুই পাশে একটু এগিয়ে চুল। এত সেই শ্রীলেখার কপালের মত।এতদিন পর মনে পড়ে গেল। কত প্রেমিক কত নিশি যামিনী তার হাহুতে ছিল কত অপরূপাকে সে কপালে ভালবাসার চুম্মন দিয়েছে কয়টাকে সে মনে রাখে। কত রকম গল্প তৈরি করেছে এ জীবনে। কত গল্প আশ্রয় নিয়েছে স্মৃতিতে কেউ কেউ তলিয়ে গেছে মহাকালের গর্ভে। কিন্তু আজ যে অর্ক কে সে দেখছে সে যে মহা কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে তুলে এনেছে তার সামনে।

এখনও যতদূর মনে পড়ে কি নিস্পাপ সেই মেয়ে। যার বাহু ডোরে সে একদিনের যে সুখ পেয়েছিল তেমন টি আর পায় নাই। যত দিনে তার এই উপলব্ধি হয়েছে তাকে খুঁজে আর পায় নাই। হাজার ললনায় হাজার বাহু ডোরে ভুলে থেকেছে।

আজ খুব মনে পড়ছে। পঞ্চাশ উর্ধ এক বিখ্যাত লেখক ।যার ভালবাসা এক অর্কের মাঝে খুঁজে পাচ্ছে। অনি হাজার প্রশ্ন করে অর্ক সম্পর্কে মা বাবা সবার সম্পর্কে। শ্রী তার বাবার নাম কিন্তু অনিমেষ বলেই জানিয়েছে। শুধু জানায় নাই এই অনিমেষ চক্রবর্তী বিখ্যাত লেখক। সে জানিয়ে তার বাবা দূর বিদেশ থাকে। ছোট বেলা ছেলে ভুলানো কথা বলেছে। বড় হলে বুঝিয়েছে অনেক দিন হয় তার সংবাদ পাচ্ছি না। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে। অনিমেষের কাছে এসে অর্কও যেন হারানো বাবার স্বাদ পেত। ভালবাসা নিংড়ে নিতে চাইত।

আজ অনিমেষ অর্ক কে খুব করে ধরেছে তাদের বাসায় যাবে। অর্ক মায়ের অনুমতির জন্য সময় নেয়।

মা আমি যে লেখকের সাথে দেখা করি উনি আমাদের বাড়ি আসতে চায়।
শ্রী মনে মনে বলে আমি এই দিনের অপেক্ষায় আছি।
কই কিছু বলছ না যে।
কি বলব , এত বড় লোক আমাদের কুঁড়ে ঘরে আসবে? আমি কি তার উপযুক্ত আপ্যায়ন করতে পারব?

না মা, লোকটা খুব সহজ সরল সাদা মনের।
শ্রী মনে মনে হাসে।
কত যে সহজ সরল তার চেয়ে ভাল আর কে তাকে চেনে। আবার ভাবে হয়ত বয়সের সাথে সাথে সরলতা বেড়েছে হায়িয়েছে জটিল কুটিল চিন্তা চেতনা।

ঠিক আছে আগামী শুক্র বার নিয়ে এস।

আগামী শুক্র বার কে কেন্দ্র করে শ্রী তার সারা জীবনের পরিকল্পনা সাজায়।
অনির প্রিয় অনেক খাবার সাজায়।অনির সামনে স্বাভাবিক ভাবেই যায়। কথা বলে। দুই জনেই তাদের চেনে। অনি অবাক তাকিয়ে থাকে কিন্তু অর্কের সামনে চুপ থাকে না চেনার ভান করে।

খাওয়া শেষ করে ।শ্রী সারা জীবন ধরে যে বাসনা লুকিয়ে রেখেছে তা আর করতে পারে না। অপমান অপদস্ত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।এক সময় অনি অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করে তার স্বামী সম্পর্কে। নির্দিধায় বলে দেয় তার অতিত বর্তমান । অর্ক তার আর অনির সন্তান।পিতা হীন সন্তানকে জারজ সন্তান আখ্যা দেয় সমাজ।এই অপমানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তাকে কি কি করতে হয়েছে কত কিছুই হারাতে হয়েছে সব বলে।

অর্ক নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারে না। যাকে এত উচ্চ আসনে বসিয়ে ছিল যাকে ফেরেসতা ভাবত সে কিনা তার মায়ের জীবন ধ্বংস করেছে। তার এত নাম ডাক সব মিছে মনে হয়। তার মনে হয় এর চেয়ে গরীব অশিক্ষিত কেউ বাবা হলে খুশি হত। ঘৃণায় মুখে থুথু দলা পাকিয়ে ওঠে। কিন্তু ছুঁড়তে পারে না।

কেন পারছে না। আবেগে দুই চোখ ভিজে যাচ্ছে। ইচ্ছে করছে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে ।ইচ্ছে করছে সকল প্রশ্নের জবাব নিতে। ইচ্ছে করছে বলতে বাবা কত দিন অপেক্ষায় ছিলাম লজেন্স খেলনার জন্য। কত দিন অপেক্ষায় ছিলাম তোমার হাত শক্ত করে ধরে বড় রাস্তা পার হয়ে স্কুলে যেতে। কত দিন ইচ্ছে করত সামনের মাঠে তোমার সাথে ফুটবল খেলতে। বাবা শুনবে? কয় টা শুনবে বাবা ?


অনিমেষ বাক রুদ্ধ। তাদের সাথে যে অন্যায় সে করেছে তার কোন জবাব তার জানা নেই।কিন্তু অনিমেষ খুব অবাক হয় কিভাবে অর্ক কে দেখে বুকে মোচড় দিত। আদর করতে ইচ্ছে করত। বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করত। একেই কি বলে পিতৃত্ব। পিতার জীন যার মাঝে প্রবাহিত, পিতার শুক্র থেকে যার পয়দা পিতার এক বিন্ধু রক্ত যার সঞ্চালন এই এত টুকু। আর পচিশ বছর পর তাকেই খুঁজে বের করল। সে জানে পিতা হবার যোগ্যতা তার নেই। কিন্তু তার ভিতরে যে পিতা বাস করে সে টা অস্বীকার করতে পারে না।

সম্মান পাঠকের ভালবাসা খ্যাতি যশ পুরষ্কার সব কিছুর পিছনে ছুটতে গিয়ে সে যে অমানুষ হয়ে পড়েছিল। তার মাঝেও ভাল মানুষ পিতৃত্ব জেগে ওঠে। তার সকল ধন সম্পদ খ্যাতি অর্কের পায়ে দিতে চায় বিনিময়ে শুধু বাবা হতে চায়। বাকী দিন গুলো তাদের নিয়ে কাটাতে চায়।

শ্রী ক্ষমা করবে কিনা জানি না । তবে অর্ক তার অস্বীকার করার কিছু নেই যে সে তার বাবা নয়।
পিতার প্রতি ঘৃণার চেয়ে ভালবাসাই জাগে বেশি।
অনিমেষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পিতা কোনভাবেই অর্ক কে ছেড়ে যেতে দেয় না। এ এক কঠিন বন্ধন। যাদের সেতু বন্ধন করে দিয়েছে সারা জীবন বঞ্চিত শ্রী।তার ত্যাগের ফসল আজ অনির সন্তান। পিতা পরিচয় দিতে পেরে ধন্য।প্রতিটি মানুষের মাঝেই থাকে এক স্নেহার্দ পিতা। সন্তানের জন্যে যে সমস্ত ত্যাগ করতে পারে। শুধু সন্তানকে কাছে পাওয়ার হৃদয়ের আকুলতা।

অনিমেষের মাঝের পিতৃত্ব আজ জেগে উঠেছে অর্ক নামক সন্তানের ভালবাসায়। এখন তার জীবনে অর্কের চেয়ে মুল্যবান আর কিছু নেই । হোক সে খ্যাতি প্রতিপত্তি সব তুচ্ছ করতে পারে অর্কের জন্য।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement