পিতৃত্ব বিষয়টা আমাদের সমাজে খুবই স্পর্শকাতর।এমন পরিস্থিতিও হয় যখন পিতৃ পরিচয়ই হয়ে ওঠে সব পরিচয়ের মূল।সে পিতা যেমনই হোক।পিতৃপরিচয়ের অভাবে কত জীবন হয়ে যায় দূর্বিষহ।কিন্তু কোন মানুষ কি নিজে তার জন্মের জন্য দায়ী হতে পারে?মানুষ ছাড়া প্রকৃতির কোথাও কি এই পরিচয় মুখ্য?পিতৃত্ব বিষয়টা আমাদের এই একবিংশ শতাব্দীতে বড় ভাববার বিষয় হয়ে উঠেছে।গল্পের রাজা নামক শিশুটির মানসিক কষ্ট গল্পের বিষয়ের সামঞ্জস্যতা প্রমাণ করে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ ডিসেম্বর ১৯৬২
গল্প/কবিতা: ৫টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপিতৃত্ব (জুন ২০১৮)

বৃক্ষতনয়
পিতৃত্ব

সংখ্যা

ARJUN SARMA

comment ০  favorite ০  import_contacts ১০৩
বড় রাস্তাটা এখানে বাঁক নিয়েছে।বাঁকের ভিতরের দিকে রাজাদের বসতি।সবাই বলে‘বস্তি’।গঞ্জের কাছাকাছি এই বস্তিতে সবই ঝুপড়ি।উপরে পলিথিনের ছাউনি,সরষের তেলের পুরোনো টিনের ঢাকনা আর খড়ের বা ছনের বেড়া ইত্যাদি দিয়ে যে যেভাবে পারে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে।বর্ষা ছাড়া তেমন অসুবিধা নেই।ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলেই শুধু একটু কষ্ট।ভিজে,কাঁপে,জ্বরজারি হয়,ওষুধ খায়,সেরেও যায়।এসব কেউ গা করে না।হাতচাপা একটা কল আছে।দক্ষিণ দিকে লুঙ্গার মাথায় একটা ডোবা আছে।তাই খাবার আর স্নানের জলের চিন্তা নেই।প্রাতঃকৃত্যাদি যে যার মতো করে ঝোপের আড়ালেই সেরে নেয়।কেউ কাউকে দেখে না।মহিলাদের মধ্যে অনেকে গঞ্জে গিয়ে বাবুদের বাড়িতে কাজ করে।কেউ পুরুষদের সঙ্গে রাজমিস্ত্রী,ফেরিওলা বা মাটিকাটার কাজ বা অন্য কিছু করে।কোন বাঁধাধরা কাজ নেই।সকালে খাবারের পুঁটুলি নিয়ে বেরিয়ে যায়,কাজ খোঁজে।পেলে করে,না পেলে বস্তিতে ফিরে আসে।এসব ছাড়া একটা স্পেশাল কাজ প্রায় সব ঘরেই আছে।চোলাই মদের ঠেক।বড় রাস্তা দিয়ে যেসব গাড়ি, বিশেষ করে লরি যায় তার ড্রাইভার ও সহযোগীরা এই বস্তিতে এসে গলা ভিজিয়ে যায়,জিরিয়ে নেয়।এসবের কোন দিনরাত নেই।ছোট থেকে বড় যে যখন ঘরে থাকে চোলাই সাপ্লাই করে।এ থেকেও কিছু আয় হয় বস্তিবাসীদের।গাড়িওয়ালার কারণে এবং নিজেদের মধ্যে হরঘড়ি খিস্তি খেউড়ের কারণে বস্তি দিনরাত মুখরিত থাকে।
রাজার কাছে জায়গাটা এমনিতে ভালই লাগে।শুধু মা যখন তিরিক্ষি মেজাজে থাকে তখন তার খুব ইচ্ছে করে এ জায়গা ছেড়ে যে দিকে চোখ যায় চলে যেতে।একা যেতে ভয় যে করে না তা নয়।তবে সপ্তপর্ণীর কাছে গেলে ভয়টা চলে যায়।সপ্তপর্ণীর যখন ফুল ফোটে তখন বস্তির চোলাইয়ের গন্ধ ছাপিয়ে যায় সেই সুগন্ধে।মা আর দিদা ছাড়া তো তার আর কাছের কেউ নেই।সপ্তপর্ণীই তার বন্ধু।বস্তির লোকেরা তো তাকে দুচ্ছার করে হরদম।গালমন্দ করে,খারাপ খারাপ কথা বলে।আর যে বিশেষ কথাটা সকলে রাজাকে বলে সেটা সে তার ছোট্ট মন দিয়েও খুব বুঝতে পারে আর কাঁদে।তখন একমাত্র সপ্তপর্ণীই তাকে সান্ত্বনা দেয়,আদর করে,চোখের জল মুছিয়ে দেয়।তার মনের কথা বুঝে নিয়ে তাকে কত কত সুন্দর সুন্দর কথা বলে।
আর একটা কারণেও তার যেদিকে খুশী চলে যেতে ইচ্ছে করে।তা হল কোন কোন রাতে ট্রাক থামিয়ে ঐ লোকগুলো যখন মাকে খারাপ খারাপ কথা বলে তখন।মা’র জন্যও তার কোথাও যাওয়া হয় না।মা বড় দুঃখী তার।সে তাড়াতাড়ি বড় হতে পারলে মাকে নিয়ে এই জায়গাটা ছেড়ে চলে যাবে।কিন্তু সে তো বড় হচ্ছে না।এখনো এই দশ বছর বয়সেও মা যখন তাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমোয় তখন সে সারা দুনিয়ার রাজা হয়ে যায়।দিদা বলেছে দুনিয়া নাকি অনেক বড়।এইরকম কোটি বস্তির সমান।‘কোটি’ শব্দটা সে শুনেছিল তারক মাস্টারের ইস্কুলে।তারক মাস্টার বলেছিল কোটির চেয়ে বড় আর কিছু হয় না।তাই দুনিয়াটা কত বিশাল সে কল্পনা করে থই পায় না।দিদা বলেছে দুনিয়াতে কী সব আজব আজব জিনিস আছে।দিদাও দেখে নি,শুনেছে।লোহার চাকার রেলগাড়ি আছে,আকাশে উড়ার উড়োজাহাজ আছে।তারক মাস্টারও এসব বলেছিল।এখন তো সে আর তারক মাস্টারের ইস্কুলে যায় না।আর কোনদিন যাবেও না।সপ্তপর্ণীই বলে দিয়েছে আর যেতে হবে না।
দিদা তাকে কত ভয় দেখিয়েছে,শেষ শরতে যখন ফুল ফোটে সপ্তপর্ণীর ফুলের গন্ধে সাপেরা নাকি গাছের কাছে চলে আসে।গাছে পেঁচিয়েও থাকে।তাছাড়া এই গাছে অনেক ভুতের বাস।কিন্তু রাজাকে নিরস্ত করতে পারে নি।সে রোজ সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে হেলান দিয়ে বসে।তখনই সপ্তপর্ণী তার সাথে কথা বলে।লুঙ্গাটার শেষ প্রান্তে ঝোপের ভিতর সপ্তপর্ণী দাঁড়িয়ে।কেউ সেদিকে যায় না পারতপক্ষে।দিদাই তাকে সপ্তপর্ণী চিনিয়েছিল।এই এলাকায় এত বড় গাছ আর নেই।মা কাজে চলে গেলেই সে চলে আসে সপ্তপর্ণীর কাছে।কত কথা যে বলে সপ্তপর্ণীর সাথে তার ঠিক নেই।দুপুর রোদে সে ঘুমিয়েও পড়ে সপ্তপর্ণীর তলায়।তখন সপ্তপর্ণী তার গায়ে হাওয়া করে,ছায়ার আড়াল দেয়।একদিন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল সেখানে।সপ্তপর্ণী বলল,আমাকে জড়িয়ে ধর।সেও ধরল।সপ্তপর্ণীর গা চোঁয়ানো জলে তার খোলা বুক ভিজে গেল।সপ্তপর্ণী বলল,আমিও তোর মতো,আমারও জামা নেই।তার মন ভাল হয়ে গেল।
সপ্তপর্ণীর তলায় বসে সে অনেক কিছু করে।ঝোপ থেকে বন কূল পেড়ে এনে খায়,গাছে গাছে থোকা থোকা আমলকি ধরে আছে,সেগুলো এনে খায়।বুনো জাম,টেকরই,কাউ,লাল গোটা,আরো কত কী!তেষ্টা পেলে জল-গাছে’র আগা চিবোয়।সপ্তপর্ণী খিল খিল করে হাসে।বলে,খা খা,তোর জন্যই তো গাছে গাছে ফল ধরে আছে।তুই খেলে গাছেরা কত খুশী হয় দেখেছিস।এখানেই তার বেশীরভাগ দুপুর কাটে।কালুর দাদুর উপর খুব রাগ হয় রাজার।সপ্তপর্ণীর ফুল ফুটলেই বুড়োটা খেপে যায়।বুড়োটা বলে ‘ছাইত্যান’গাছ।একবার একটি পাতা তারক মাস্টারকে সে দেখিয়েছিল।তিনি বলেছেন এর নাম ‘সপ্তপর্ণী’,দেখেছিস কেমন সাতটি পাতা সুন্দর করে সাজানো।আর গাছের ডালগুলো কেমন ছাতার মতো চারিদিকে ছড়িয়ে আছে।তাই একে ‘ছাতিম’ গাছও বলে।দেখেছিস বনের মাঝে কেমন সব গাছ ছাপিয়ে রাজার মতো দাঁড়িয়ে থাকে?শুনে রাজার খুব ভাল লেগেছিল।তারক মাস্টার আরো বলেছিল,এই গাছের ছাল,মূল,পাতা থেকে নাকি অনেক ওষুধ বানানো হয়।রাজার কাছে ‘সপ্তপর্ণী’ নামটা বেশ লাগে।দক্ষিণী হাওয়ায় যখন ফুলের গন্ধ বস্তিতে আসে তখন বুড়োটা নাক ধরে বলে,কী বাজে গন্ধ।এত দুরেও থাকা যায় না।গাছটাকে একদিন কেটেই দেব।অথচ গাছের থোকায় থোকায় যখন হাজার হাজার ফুল ফোটে তখন রাজার কাছে মনে হয় পুরো এলাকাটা যেন আলোকিত হয়ে যায়।আবার লতার মতো ফলগুলো যখন ঝালরের মত সারা গাছে ঝুলে থাকে তখন গাছটাকে মেলার ফেরিওয়ালার হাতের লাঠির মতো মনে হয়।রাজার খুব ভয় করে।বুড়োটা বস্তিতে সবাইকে শাসন করে,সবাই ভয় পায়।চোলাই খেয়ে যখন খুব খারাপ কথা বলে তখন সবাই চুপ হয়ে যায়।বুড়োর মুখটা খুব,খুব খারাপ।
রাজা বুড়োকে এড়িয়ে চলতে চায়।তাকে দেখলেই বুড়ো একটা না একটা কাজ করাবেই।একদিন সে সবেমাত্র সপ্তপর্ণীর দিকে হাঁটা দিয়েছিল।পড়ে গেল বুড়োর সামনে।বুড়ো বলল,কী হে রাজা বাহাদুর,কোথায় চললেন?আমার সঙ্গে আসুন তো।রাজার রাগ হল।বুড়ো তাকে দিয়ে খাটিয়ে নেবে,আর খারাপ কথা বলবে।সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই বূড়োর খিস্তি,এই নবাবের বাচ্চা,গায়ে যে দেখছি বাতাস লেগেছে।কী হল?রাজা থামে না।বুড়ো চেঁচাচ্ছে,হবেই তো যার বাপের ঠিক নেই তার তো দেমাক হবেই।কথাটা কানে যেতেই রাজা ছুট লাগায়।এক দৌড়ে সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে হু হু করে কাঁদতে থাকে।তখনই সপ্তপর্ণীর গলা শোনে,আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখ।সেও তাই করে।একটা বাতাস এসে গায়ে লাগে।সে শীতল হয়।কান্না থেমে যায়।চোখের জল মুছে যায়।

এই কারনেই তো সে তারক মাস্টারের ইস্কুলও ছেড়ে দিয়েছে।দুই ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছিল।বহু অপমান সে সহ্য করেছে।অপমান বলতে সে বুঝে সেই বিষয়টা যা তার মনের একটা খুব ভিতরের জায়গায় খুব কষ্ট দেয়।কালু,দুলু,রকেট,দেবা-সবাই তাকে কষ্ট দিতো ইস্কুলের দিনগুলোতে।যখনই ঝগড়া হতো তখনই ঐ কথাটাই বলে দিত ওরা।সেই কথাটা শুনলে তার ছোট্ট মাথাটার ভিতরে আগুন জ্বলে উঠতো।তখন মনের সেই গহীন কোণে কী যে কষ্ট হয় তা সপ্তপর্ণী ছাড়া আর কেউ বুঝে না।সেই কষ্টটা বাঘকাঁটার খোঁচার থেকেও কোটি কোটি গুণ বেশী।রাজার সঙ্গে কেউ কুস্তিতে পারে না,বল লাথি দিয়ে এত দূ্রে নিতে পারে না,ডাংগুলি খেলতে পারে না,এত সুন্দর ধনুক বানাতে পারে না,লাটিম ঘোরাতে পারে না,পাতার বাঁশী বানাতে পারে না,ডোবার জলের এপার ওপার করতে পারে না।সবাই তাকে হিংসা করতে আর খারাপ কথা বলতে পারে।যখন তাকে কিছুতেই হারাতে পারে না তখনই ঐ খারাপ কথাটা বলে দেয়।রকেট আর দেবাটাই বেশী বেশী করে।মুখ ভেংচিয়ে বলে,এই বেজম্মা,আমাদের সঙ্গে তোর কিসের মিল?আমাদের বাপ আছে,আর তোর বাপ?হে হে করে দাঁত বের করে তাকে কষ্ট দেয়।এটাকে সে বুঝে খুব, খুব অপমান।
মাকেই একদিন রাগ করে বলে দিল,মা আমি কী বেজম্মা?বেজম্মা মানে কী?বেশ,মা’র মুখটা মুহূর্তেই মেঘের মতো ঘন কালো হয়ে গেল।কালুর দাদুটার মুখেই প্রথম সে ঐ শব্দটা শুনেছিল।মানে না বুঝলেও কথাটা যে খুব খারাপ সেটা সে বুঝতে পেরেছিল।মা সেদিন কাজে যায় নি,রান্না করে নি।দিদা তাই মাকে আরো খারাপ খারাপ কথা বলল।ভয়ে সে মার কাছে ঘেঁষে নি।দুপুর রোদে সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে কেঁদেছে।কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।স্বপ্ন দেখেছে।সপ্তপর্ণী তার শিয়রে বসে মাথাটা কোলে নিয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়েছে,ঠিক মা’র মতো।হাওয়া করেছে।সেদিন রাতে ঘুমুতে গিয়েও মা’র থেকে দূরে শুয়েছিল।ঘুম আসছিল না।হঠাৎ মা তাকে বুকে টেনে নিয়ে সপ্তপর্ণীর মতো আদর করে দিল।চুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বিলি কেটে দিল।সে মা’র বুকে মুখ গুঁজে টের পেল মা’র বুকে খুব কান্না জমেছে,তার যেমন জমে খারাপ কথাটা শুনলে।সে বুঝে তারক মাস্টারের কাছে শোনা সাগরের মতো ঢেউ উঠছে মা’র বুকে।কিন্তু ঢেউগুলি থমকে আছে।মাকে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে,যেমনটা সপ্তপর্ণীকে ধরে।তার কষ্ট কমে যায়।কিন্তু বুঝতে পারে মা’র বুকে একটা বড় পাথর জমে আছে।
আরো ছোটবেলায় যখনই মাকে বাবার কথা জিজ্ঞেস করতো,মা তখন দূরের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়ে বলতো,ওই দিকে চলে গেছে।আসবে একদিন।ইস্কুলের খাতায় লিখে দিয়েছিল আর তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল বাবার নাম রবি দাস বলতে।সেই রবি নামের লোকটাকে দেখতে তার খুব ইচ্ছে করে।বাবা ডাকতে ভারী ইচ্ছে করে দুলু,রকেটদের মতো।তখনই মনের সেই জায়গাটায় টনটন করে ওঠে।মনে হয় সেখানে রক্ত ঝরছে।লোকটা একবার এলেই তার কষ্টটা চলে যেত,রক্তও আর ঝরতো না।দুলু,রকেট আর ঐ দুষ্টু বুড়োটাও খুব জব্দ হয়ে যেত।বস্তির সকলের থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে যেত।সেও আবার তারক মাস্টারের ইস্কুলে যেত।লোকটা কি সেকথা বুঝে না?তারক মাস্টার দুনিয়ার কত কিছু জানে।তারক মাস্টারের সামনেই জোরে জোরে বলতো,আমি রবি দাসের ছেলে।আমার বাবা রবি দাস।আমি রাজা দাস।কতবার যে ‘বাবা’শব্দটা উচ্চারণ করত ঠিক নেই।কোটিবারই করত।এইসব ভেবে তার চোখে জল এসে যায়।কেউ তো এসব বুঝে না।শুধু সপ্তপর্ণীই বুঝে।
দিদাটা কেমন যেন বদলে গেল।তাকে আরো ছোটবেলায় কত কত রাজপুত্তুরের গল্প শোনাতো।অথচ এখন সে দিদাকে সহ্যই করতে পারে না।দিদার কাছে শোনা ডাইনী বুড়ির মতোই লাগে দিদাকে।মাকে প্রতিদিন খারাপ কথা বলে।সন্ধ্যের পর মা তাকে নিয়ে ঘুমুতে গেলেই বুড়ির চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়।বলে,এই নবাবের ঝি,মদের গেলাসগুলো রেডি করে রাখ।ড্রাইভাররা এলে আমি একা পারি?
কাল রাতেও এই নিয়ে তুমুল ঝগড়া করল বুড়ি।মাকে যা খুশী বলে গালাগাল করল।মাও শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে বলল,আমি এখন উঠতে পারব না,রাজাকে ঘুম পাড়াবো।বুড়ি এবার রাক্ষুসীটার মতো রেগে গেল।বলল,সোহাগ দেখে বাঁচি না।কত দেখলাম!যার জন্মের ঠিক নেই তার জন্য এত?আমি বুড়ো বয়সে এসব পারি?তখন কতবার বলেছি,এসব আপদ খালাস কর।শুনলে আমার কথা?এখন? এখন ঐ কাঁটা’ই বয়ে যা সারা জীবণ।আরো খারাপ কথা বলছিল।রাজা দেখল মা চুপ মেরে গেছে।আর তার দুই কানে দুই আঙ্গুল ঢুকিয়ে চেপে ধরেছে।সেও বেশ জোরে সপ্তপর্ণীর মতো মাকে জড়িয়ে ধরেছে।কিন্তু টের পেল মাথার রক্তটা গরম হয়ে যাচ্ছে।মনের সেই গোপন জায়গাটায় টনটন করে উঠছিল।পরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মনে নেই।সকালে ঘুম থেকে উঠতেই বুড়ির গালাগাল মনে এল আর মাথার রক্তটা আবার গরম হয়ে গেল।মাথাটা দুই হাতে চেপে ধরল।কাজ হল না।চোখ বুজেও দেখল দুলু,রকেট,দেবরা হাসছে হি হি করে,বুড়োটা হাসছে খ্যাক খ্যাক করে,বাবুদের বাড়ির লোকেরা কেমন করে তার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে,ইস্কুলে সবাই আঙ্গুল তুলে বলছে –এই বেজম্মা,তোর বাপ কে রে?সব এক সাথে মাথার ভিতর কিলবিল করে উঠল।রাজা দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ছুট দিল।এক দৌড়ে সপ্তপর্ণীর তলায় গিয়ে হেলান দিয়ে বসল আর শব্দ করে কাঁদতে থাকল।কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।রাতের অসম্পূর্ণ ঘুম তাকে চেপে ধরল।
সপ্তপর্ণী তাকে হাওয়া করল,চুলে হাত বুলিয়ে দিল।শেষে বলল,তুই তো রাজা।রাজাদের কোন দুঃখ থাকতে নেই।রাজা বলল,আমার তো আর কোন দুঃখ নেই।দুনিয়াতে আমার বাবা নেই-এটাই কষ্ট।সবাই যে আমাকে ঐ খারাপ কথাটা বলে তাতেই তো দুঃখ।সপ্তপর্ণী বলে,দূর বোকা,কে বলেছে তোর বাবা নেই?আমিই তোর বাবা।আমার তো কত সন্তান আমি নিজেই জানি না।আর একজন বাড়ল।তবে তোর মতো বোকা সত্যিই নেই।আরে আমার বাবা কে আমিই তো জানি না।এই যে তোর চারপাশে শত শত গাছ,এদের বাবা কে?এই যে পাখি,ফুল এদের বাবা কে বল?এত বড়ো যে আকাশ,তার বাবা কে?আমাদের কারো কোন দুঃখ তো নেই।তাহলে তোর কেন থাকবে?কতগুলো বোকার কথা শুনে তুই শুধু শুধ কষ্ট পাবি কেন?
সপ্তপর্ণী তার চোখের জল মুছে দিয়েছে।তার চুলে বিলি কেটে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।সে আরো জোরে সপ্তপর্ণীকে জড়িয়ে ধরেছে।বুকের কষ্টটা কমে গেছে।মনের সেই জায়গাটার টনটন করাটাও কমে গেছে।মাথার রক্তের টগবগ কমে গেছে।সে আবার তারক মাস্টারের ইস্কুলে যাবে।দুনিয়ার গল্প শুনবে।পাশ ফিরতেই অবাক হল।মা সপ্তপর্ণীর গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে আর তার মাথাটা মা’র কোলে।মা’র হাতের আঙ্গুল তার চুলে ঘুরছে।সে নিঃশব্দে মাকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরল।গনগনে রোদ উঠে গেলেও সপ্তপর্ণীর ছায়ায় রাজার গায়ে রোদের আঁচ লাগছে না।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement