চল ভিজি।
পাগল তুই? পড়াতে যাবি কি ভিজা গায়? ঠাণ্ডা লাগবে।
আরে ধুস আমি ম্যানেজ করে নেব।
তারচেয়ে চল ছাতা মাথায় দিয়েই হাঁটি। পাড়ার লোকজনও তাহলে খেয়াল করবে না। এই ভর সন্ধ্যায় আমি আর তুই বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে হাঁটলে আগামীকাল দেখবি সবকটা পত্রিকার শিরোনাম হয়ে গিয়েছে।
তুই বড় ভয় পাস, গাধা। আয় ছাতার নিচে আয়।
তারপর আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। আমি আর তন্দ্রা।
সারাদিন একটানা বৃষ্টি পড়েছে। রাস্তায় একটাও মানুষও নেই। মাঝখানে কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিল। এর মধ্যেই তন্দ্রা বের হয়েছে পড়াতে যাবে বলে। ঠিক আমাদের পাশের বাসায়ই পড়ায় ও। বাসার গেটের সামনে এসে এসএমএস দিল বের হ। আমরা সারাদিন এসএমএস এর মধ্যেই থাকি। মাঝে মাঝে তো আমার মনে হয় আমাদের মোবাইল দুটোর মুখ থাকলে বলতো ভাইজান আপামনি এইবার মাফ দ্যান। যা হোক তন্দ্রা ডাকলে আমি বের হব না, এই ক্ষমতা আমার নেই। বের হতেই তার পাগলামি শুরু হয়ে গেল। অগত্যা কি করার হাঁটছি। সশব্দে বাজ পড়লো পাশেই কোথাও। তন্দ্রা আমার বাহু জড়িয়ে ধরল।
আস্তে চাপ দে, নখ কাটতে পারিস না? আমি মৃদুস্বরে ধমক দিয়ে উঠলাম।
এমন করিস ক্যান, ভয় পেয়েছি চোখে দেখিস না তুই? একটা মেয়ে হাত ধরলে ছেলেদের হার্ট-বিট বেড়ে যায়, ব্যাকগ্রাউন্ডে ভায়োলিন বাজে, তুই এমন খাটাশ কেন?
ওসব নাটক। আরেহ! ছাগলের মত ছাতা বন্ধ করলি কেন?
শশসসসস। কথা বলিস না হাঁট।
কেউ দেখে যদি?
কেউ আছে নাকি যে দেখবে? গাধা একটা!হাঁট।
আসলেই আশেপাশে কেউ ছিল না। লোডশেডিং এর জন্য রাস্তায় কোনও বাতিও নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাথায় উপর টিপ টিপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে। বৃষ্টির এখন তেমন তেজ নেই। সন্ধ্যা মিলেয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। হাঁটতে হাঁটতে অনেকখানি সামনে এসে পড়েছি। একটা কুকুরও নেই রাস্তায়। মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নয় মধ্যরাত। সবাই বৃষ্টির সন্ধ্যাটা মুড়িমাখা আর গরম চায়ের সাথে উপভোগ করছে বোধহয়। মনে হচ্ছে আমরা পৃথিবীর শেষ দুজন মানুষ। আর সবাই কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। শুধু তারা যে ছিল এখানে সেখানে তার চিহ্ন পড়ে রয়েছে।
কি ভাবছিস?
ভাবছি হলিউডের সিনেমার মত মনে হচ্ছে না?
হ্যাঁ, কেমন লাগছে বল?
অসাধারণ।
এই জন্যেই বলি তুই আমার কথায় উঠবস করবি। যা বলব তাই শুনবি। নিজের বুদ্ধিতে যেটাই করিস সেটাতেই তো ঝামেলা পাকাস।
হ্যাঁ তোমার বুদ্ধি কত ভাল কালকে বুঝা যাবে যখন বাসায় ধরে ক্যাঁচা দিবে।
আবার! মাথায় আর কোনও চিন্তা আসে না তোর?
তুই আমাকে কতটুকু ভালবাসিস?
ধর কোনদিন আমার আর তোর বিচ্ছেদ হয়ে গেল। আমার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে গেল। একসময় আমি তাকে উজাড় করে ভালবাসবো। আমি কাউকে ঠকাতে পারি না। সে আমার সবটুকু পাবে। শুধু আমার বৃষ্টির ভাগ আর কেউ কোনদিন পাবে না। যখন তুই থাকবি না, তখন থেকে আমার বৃষ্টি প্রেম সমাপ্ত। দ্যা এন্ড।
আমার সাথে বৃষ্টি প্রীতির কি সম্পর্ক?
তুই আমার সবচেয়ে পছন্দের আবার বৃষ্টিও আমার সবচেয়ে পছন্দের। কিন্তু তুই যদি না থাকিস, বৃষ্টি আমার কাছে অর্থহীন। তাই তুই নেই, বৃষ্টিও নেই। মুখ কাল করে ফেললি কেন? আমি কি সত্যি চলে যাচ্ছি নাকি, গাধা?
কিন্তু তুই আসলেই একসময় আমাকে ছেড়ে চলে যাবি তন্দ্রা, আমার কেন যেন মনে হয়।
আমারও মনে হয় এই গল্পটা অসমাপ্ত থেকে যাবে। আচ্ছা আবিদ, আমি চলে গেল থাকবি কিভাবে?
জানি না। এটা ভেবে বের করার সামর্থ্য আমার নেই। আচ্ছা তন্দ্রা, তুই আমাকে কতটুকু ভালবাসিস?
পাঁচ ফিট এক ইঞ্চি!
মানে?
আমার সমান!
আকাশের মন খারাপ। হৃদয়ের গভীর বেদনাকে মুছে ফেলতে একনাগাড়ে কেঁদে যাচ্ছে সে। কখনো গভীর আর্তনাদ, কখনো ক্লান্তি স্তব্ধ হাহাকার। আকাশের কিসের এত কষ্ট? কি এমন গভীর বেদনা যাকে মুছে দিতে তাকে এভাবে কাঁদতে হয়? নাকি এ আনন্দের অশ্রুজল? নাহ আনন্দের অশ্রু এরকম হয় না। এটা কষ্টেরই। অথচ কি অদ্ভুত। তার বেদনার জলেই আমরা গড়ে তুলেছি অপার্থিব স্বচ্ছ ভালবাসা যার পবিত্র সুখে একটা জাতি নিঃশেষ হয়ে গেলেও বোধহয় আমাদের গায়ে লাগবে না। আমাদের ভালবাসার জন্যই আজ রাতে রূপকথা সৃষ্টি করেছেন বোধহয় ঈশ্বর নিজ হাতে। পাড়ার জনশূন্য গলিপথ, টিপটিপ বৃষ্টির ফোটা, একটু পরে পরে ঝলসে উঠছে বিজলি তার আলোয় একটা মুখ দেখতে পাচ্ছি। একটা উচ্ছল মুখ, একটা নিষ্পাপ মুখ। যার চোখে আনন্দের আভা, ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি। যার নরম হাত নির্ভরতায় আঁকড়ে ধরে আছে আরেকটা শক্ত বাহু। যার পা ছন্দে ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে অন্য কোনও ভুবনে যেখানে একবিন্দু অবিশ্বাস নেই, হাহাকার নেই, বেদনা নেই। ঠিক এভাবেই যদি যুগযুগ ধরে হেঁটে যাওয়া যেত? এই এক চিলতে হাসির জন্য যদি মরে যাওয়া যেত? আচ্ছা তাহলে মরে গিয়ে কি কোনও আফসোস থাকতো? আমার তো মনে হয় না।
আবিদ একটা কবিতা আবৃতি কর তো।
আমার রাজকন্যার ঠোঁটে হাসি, চোখ ভর্তি আলো
এই অবিরাম জল ধারায় তাকে লাগছে ভাল!
খিলখিল করে হেসে তন্দ্রা বলল এর চেয়ে জঘন্য কবিতা আমি আর কখনো শুনি নি। আমি ওর হাসির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই হাসির জন্য এমন হাজার খানেক জঘন্য কবিতা লিখে ফেলাও অপরাধ হবে না।
মাথায় থাপ্পড় দিয়ে পিছন থেকে একটা কণ্ঠ বলে উঠলো কিরে ছাগল খাম্বার মত দাঁড়িয়ে ভিজছিস কেন? ছাতা জিনিসটাকে কি এখনো অহেতুক আবিষ্কার মনে হয়?
আমি পাশ ফিরে তাকিয়ে ধাক্কার মত খেলাম। কল্পনা এত শক্তিশালী যে এখন ভ্রম হচ্ছে? তন্দ্রাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি! আমি পারিও! অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলাম বাস স্টপে এসে দাঁড়ানো মাত্র শুরু হল ঝুম বৃষ্টি। আর প্রতিবারের মত এবারও আমার মনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করল সতের বছরের পুরনো বৃষ্টিমাখা এক সন্ধ্যা। কল্পনার জোর আজ বোধহয় বেশী হয়ে গিয়েছিল!
কিরে এমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছিস কেন? চিনতে পারছিস না? এত খারাপ হয়ে গিয়েছি?
আমি আরও বেশী হতবাক হয়ে গেলাম। সত্যি তন্দ্রা? অসম্ভব, সে তো বিদেশে।
না মানে ইয়ে।
তোলাচ্ছিস ক্যান? তোর সমস্যা কি? ভাবছিলি কি? মাথা পুরোই হালুয়া?
এত বছর বাদে তোমার প্রথম প্রেম হুট করে সামনে এসে পড়লে এমন হওয়াটা কি অস্বাভাবিক?
ভাবছিলি কি?
ভাবছিলাম এরকম এক সন্ধ্যায় একজন বলেছিল আমার বৃষ্টির ভাগ তুই ছাড়া আর কেউ পাবে না। তখনই তুই ডাক দিলি! আমি ভেবেছি হ্যালুসিনেশান হচ্ছে। যাই হোক কেমন আছিস? দেশে কবে আসলি?
হাহাহা! এখনো তোর মাথা থেকে ওসব যায়নি? এসেছি সপ্তাহ খানেক আর আছি বেশ ভালই। ছাগল ভিজছিস কেন? ছাতার নীচে আয়।
এসে লাভ কি? একটু পর তুই তো ছাতা বন্ধ করে দিবি!
নাহ। আমি আর ভিজি না। বৃষ্টি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে বহু আগে কিংবা বলা যায় আমি বৃষ্টিকে ছেড়ে দিয়েছি। বৃষ্টি প্রীতি বহু আগেই হারিয়ে গিয়েছে।
হুম! তা কোথায় যাচ্ছিলি?
তোর সাথে দেখা করতে।
জানলি কি করে?
এই শহরে তোর খবর বের করা কি আমার জন্য খুব কঠিন? তোর বিয়েটা নাকি টেকে নি, কি হয়েছিল?
তিনমাসের মধ্যে বুঝে ফেলেছিল আমার ভালবাসার ক্ষমতা নেই। এরপর কিছুদিন সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। যখন দেখল ক্ষমতা আর ফিরে আসবে না তখন ছেড়ে চলে গিয়েছে। ভেবেছিলাম বিয়ে করলে ভালবাসার ক্ষমতাটা ফিরে আসবে। কিন্তু ভুল হয়ে গিয়েছে। শুধু শুধুই আরেকজনের জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে দিলাম। ক্ষমা চেয়েছি যদিও আর আমরা এখনো ভাল বন্ধুও। কিন্তু কাজটা ঠিক করিনি। যাই হোক, তোর খবর বল। সংসার কেমন চলছে? দেশে এসেছিস কত দিনের জন্য?
দেশে একেবারের জন্য চলে এসেছি। এবার চলে গেলে একেবারে ওপারে। আর সংসার ভালই চলছে আমার আর তুলিকার। আমার মেয়ে। এই দ্যাখ ছবি।
বাহ, বেশ দেখতে তো একেবারে তোর মত। কিন্তু ওর বাবা?
সে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে বিয়ের তিনবছর পর। তারপর থেকে আমি আর আমার মেয়ে।
সেকি! কেমন করে?
রোড অ্যাকসিডেন্ট। অফিস করে বাসায় ফিরছিল নিজে ড্রাইভ করে। একটা ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চাপা দিয়ে দিয়েছে। মানুষটার সুন্দর চেহারাটা আর দেখার মত ছিল না।
কাঁদছিস?
ওকে আমি খুব ভালবাসি রে, খুব।
আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কথাটা কি সত্যি শুনলাম? মনে হচ্ছে কেউ একজন ধারাল ছুরি দিয়ে আমার বুক চিরে হৃদপিণ্ডটা বের করে এনে দু হাত দিয়ে মুচড়ে দিলো। চোখে অন্ধকার দেখছি। এতটা বছর নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে এসেছি এই ভেবে যে পরিবার আর সমাজের চাপে আমার রাজকন্যাকে চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু সে আমাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসে। তাহলে এতকাল মিথ্যের সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে তীরের কাছে এসে দাঁড়ালাম কেবল একটা নির্মম সত্য জানতে? আমার এত রাতের বুকফাটা আর্তনাদ, হাহাকার, নির্ঘুম বেদনাগুলো কেবল একটা মিথ্যের জন্য? নাকি বলব নিষ্ঠুর সত্যের জন্য? যার থেকে আমি পালিয়ে বেড়িয়েছি এতদিন। মিথ্যে মায়ায় নিজেকে এবং অন্য একজনকে এলোমেলো করে দিলাম! এ আমি কোন মরীচিকার জন্য বসে ছিলাম? তার কষ্টের কথায় সমবেদনা জানাবো নাকি নিজের চোখকে সামলাবো সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। এখানে আর বেশি সময় থাকা যাবে না। তাহলে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়ে যাবে। আমাকে চলে যেতে হবে।
আবিদ!
হুম।
কিছু বলছিস না যে? মন খারাপ করলি?
হ্যাঁ তোর কষ্টের কথা শুনে খারাপ লাগলো।
নাহ, আমার কষ্টের চেয়ে বেশী আমার সত্যিটা তোকে আঘাত করেছে তাই না?
আমি বাসায় যাব। তুই কি আর কিছু বলবি?
একটু বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা হচ্ছে। আমার সাথে কিছুক্ষণ হাঁটবি?
নাহ। আমি যাচ্ছি। ভাল থাকিস।
আবিদ একটু দাঁড়া। তোকে কিছু কথা বলা দরকার। আরও বহুদিন আগেই বলা দরকার ছিল। কেন যে বললাম না! আমি বুঝতে পারি নি তুই এভাবে কাটিয়ে দিবি।
বল।
তন্দ্রা হাতের ছাতাটা বন্ধ করে দিল। আকাশ থমথমে। সন্ধ্যা নামতে এখনো কিছুটা সময় বাকি কিন্তু চারপাশে অন্ধকার নেমে গিয়েছে। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তাটা একেবারে ফাঁকা। সাই সাই করে কয়েকটা গাড়ি চলে গেল। আমরা ফুটপাত ধরে হাঁটছি। বহু বছর আগে এমন এক সন্ধ্যায় এক কিশোরী আরেক কিশোরের হাত শক্ত করে ধরে বলেছিল আমার বৃষ্টির ভাগ কাউকে দেব না। আজ একজন মহিলা পাশে হাঁটছে, পার্থক্য কেবল তার মনে এখন আর বজ্রপাতের ভয় নেই। তার চোখে মুখে সেই স্পষ্ট আনন্দের আভা নেই। বরং কেমন যেন কাঠিন্য। ভয় লাগে। মনে হয় এই মুখ দিয়ে এরপর যা বের হবে তা আমার টুকরো টুকরো পৃথিবীকে আরও বেশী টুকরো করে দেবে।
আবিদ, জীবনটা নাটক সিনেমার মত হলে ভাল হত না রে?
কেন?
এই যে তোর নায়িকার বাবা জোর করে তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে তুই বেকার ছিলি বলে। বেকারকে কন্যার বাবারা হজম করতে পারে না। নায়িকার প্রেমিকাও সমাজ মেনে নেয় না। তাই তোর নায়িকা তোকে ভালবাসলেও ছেড়ে চলে গিয়েছে। আজো তোকেই ভালবাসে কিন্তু বুকে পাথর রেখে অন্যের সংসার করছে। আর তুই তার বিরহে কিংবা বলা যায় সেই ভালবাসার বিরহে একাই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছিস। ভাবছিস নাহ, অন্তত সে আমাকে ভালবাসে, এই অনেক একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য। সিনেমা হলে এমন চমৎকার কাহিনী হতো। বাস্তবতা এমন নয়।
কেমন?
শুনলে তোর দুনিয়ে দুইখন্ড হয়ে যাবে। সবকিছু অনর্থক হয়ে যাবে। তবু শুনবি?
হ্যাঁ!
বাবা আমাকে কখনোই জোর করতেন না, সেদিনও করেন নি । তিনি শুধু বলেছিলেন দেখ এরকম একটা ভাল ছেলে আছে, বাহিরে থাকে তোমার জীবনটা সুন্দর হবে। আমি তোমাকে জোর করবো না কিন্তু তুমি সিদ্ধান্ত নাও সারা জীবন অর্থকষ্ট নিয়ে একটা কঠিন জীবন কাটাবে নাকি সচ্ছল সুন্দর জীবন বেছে নেবে। আর ভালবাসা? সে থাকতে থাকতে হয়ে যায়। সিদ্ধান্তটা আমার ছিল। আমি অর্থ কষ্টহীন সহজটাকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। সেজন্য একবিন্দুও আফসোস নেই। তুলির বাবা আমাকে প্রচণ্ড ভালবাসত। আমিও ওকে খুব ভালবাসতাম। সুখেই ছিলাম।
মিথ্যা কথা! আমার জীবনের একটা গতি হোক সেজন্য তুই এসব বানিয়ে বলছিস!
তাই? তাহলে আমি তোকে এখন বিয়ে করতে চাইছি না কেন? আমি তোকে ভালবাসলে এখন তোকে নিয়ে জীবন সাজাতে আমার আসলে কোনও বাঁধা নেই! বরং আমার মেয়ে একজন অসাধারণ বাবা পাবে। কেন করছি না? আমি তুলির বাবাকে প্রচণ্ড ভালবাসি। আর কাউকে সে জায়গা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়!
তাহলে সেই বৃষ্টির সন্ধ্যার সবকিছু মিথ্যে?
হ্যাঁ। আমার ধারনা সেটা ছিল এক কিশোরীর প্রথম পুরুষ সঙ্গ লাভের আবেগ আর কৌতূহল। ভালবাসা নয়। ভালবাসা হলে আমি এত সহজে চলে যেতে পারতাম না। ভালবাসা থাকলে তুলির বাবা চলে যাওয়ার পর তোর কাছে ফিরে আসতাম। বাঁধা ছিল না। আসতে একটুও ইচ্ছে হয় নি। সত্যি হচ্ছে তোর জায়গায় অন্যকে আমি সহজে বসিয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু তার জায়গায় আজ তোকেও বসাতে পারছি না। আমি তোকে ভালবাসি না। নির্মম কিন্তু নির্ভেজাল সত্য। কথাটা আরও আগে বলতাম তোকে। যখন জানলাম তুই বিয়ে করেছিস, ভেবেছি আর বলার দরকার হবে না, তুই গুছিয়ে নিয়েছিস। এখন দেশে এসে যখন সত্যিটা জানলাম, আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমি মহাপাপ করেছি এতগুলো বছর! ভয়ানক মহাপাপা। আর বোধহয় তার শাস্তিই আমি পাচ্ছি বিয়ের তিনবছর পর। এই দুনিয়ার আদালতকে ফাঁকি দেওয়া যায় কিন্তু উনার আদালতে পাপের মুক্তি নেই।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে দেখতে দেখতে। অস্পষ্ট আলো আঁধারের খেলা শেষ। বৃষ্টি পড়ছে অবিরাম ধারায়, থেকে থেকে বিজলি চমকে উঠছে আর সেই সাথে বহুদূর থেকে ভেসে আসছে গভীর বজ্রপাতের শব্দ। দাঁড়িয়ে আছি বাসস্টপেজে। অফিস ফেরত মানুষজন ইতিমধ্যে যার যার বাড়ির পথে চলে গিয়েছে। তাদের বাড়িতে যাওয়ার তাড়া আছে। তাদের জন্য কেউ একজন পরম মমতায় অপেক্ষা করছে। আমার কয়েকটা বাস মিস করলেও অসুবিধে কিছু নেই, আমার জন্য কেউ অপেক্ষায় নেই। তন্দ্রা একটু আগেই তার গাড়িতে করে চলে গিয়েছে। আমাকে নামিয়ে দিয়ে যেতে চেয়েছিল, একা থাকার কথা বলে আমি আর যাই নি। এই জনশূন্য স্টপেজে দাঁড়িয়ে আমি ভিতরের ঝড় সামলানোর চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে অনেকখানি ভিজে গিয়েছি। বহু বছর পরে এভাবে ভিজলাম। বৃষ্টি আমার কাছে রোমান্টিক কিছু মনে হয় না। বরাবরই বিরক্তির উদ্রেক করে। বৃষ্টি কিছুটা ভালবাসতাম শুধুমাত্র তন্দ্রার জন্য। আচ্ছা আর কি কি জিনিস আমি নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিয়েছি কেবলমাত্র তন্দ্রাকে ভালবাসতাম বলে? আমি কি আদৌ আমি? আমার নিজের স্বত্বা? জীবন থেকে তন্দ্রাকে মুছে দিলে, আমি বলতে আমার আর কি থাকে? শূন্যতা! এতগুলো বছর ধরে তন্দ্রাকে ধারণ করেছি ভিতরে পুষে রেখেছি। সতের বছর। কি অবলিলায় বলে দেওয়া যায় দুটি শব্দ। অথচ সতের বছর মানে পুরোপুরি সতের বছর সময়! একবার শুধু যদি চোখটা খুলে তাকাতাম! হয়তো জীবনটা অন্যরকম হতো। তাই বলে এতটা অর্থহীন হয়ে পড়বে? কাকে দোষ দেবো? তন্দ্রাকে? সে তার জন্য যা সঠিক সেটা বেছে নিয়েছে। অল্প বয়সের আবেগকে পাত্তা দেয় নি। এতে দোষের কি আছে? সবাই তার জীবনের দিক নির্বাচন করার অধিকার রাখে। কিন্তু সত্যটা আজ কেন? কেন সতের বছর আগে আমার মুখের উপর বলে দিয়ে গেল না? এই অপরাধের শাস্তি দেওয়ার মত আইনের কোনও ধারা নেই। পৃথিবীর কোনও আদালত একে অপরাধ বলবে না! অথচ খুনের অপরাধও কি এর কাছে শিশু তুল্য নয়? খুন করে খুনি হয়, ফাঁসি হয়, তাকে অপরাধী বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়! আর এখানে? আমাকে সতের বছর ধরে প্রতি রাতে একবার খুন হতে হল, এর বিচারে করার আদালত কোথায়? কেউ কি অপরাধী বলে গণ্য হবে? মন তো ভেঙে দিয়েছে বহু আগেই, তাকে প্রতি রাতে একবার করে জোড়া লাগিয়ে আবার ভেঙে দেওয়ার জন্য শাস্তি কি পাওয়া উচিত নয়? আর কোন শাস্তিটাইবা সতের বছর ধরে প্রতি রাতে মেরে ফেলার জন্য উপযুক্ত হবে?
আচ্ছা ওকে কি ঘৃণা করা যায়?
নাহ, তাতে মনের এক কোনে তার জন্য জায়গা রাখতে হবে। সে ইচ্ছা আর হচ্ছে না। তন্দ্রা, যে অপরাধ তুই করেছিস তার শাস্তি যেন তোকে পেতে না হয়। এর ভার সামলানোর মত শক্তি তোর কখনই ছিল না। আমি তোকে ক্ষমা করলাম। উড়িয়ে দিলাম। যেটা বহু বছর আগে করা দরকার ছিল সেটা করতে এতদিন লাগিয়ে দিলাম বলে নিজের উপর খুব ঘেন্না হচ্ছে।
আমি কাঁদছি। টপটপ করে চোখ বেঁয়ে পানি পরছে। কিন্তু বৃষ্টির জলের জন্য চোখের জলকে আলাদা করা যাচ্ছে না। ভাবছি নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছি বহু আগেই, সঙ্গে কি চমৎকার একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিলাম, শুধুমাত্র এক টুকরো মিথ্যের জন্য।আমার বৃষ্টির ভাগ আমি কাউকে দেব না। অথচ সেই বৃষ্টির ভাগটাও সে আমার জন্য জমা রাখে নি! কত রাত আমি হাউমাউ করে কেঁদেছি একটা মিথ্যার জন্য, কত সকাল আমি অহেতুক কল্পনায় রঙ মাখিয়েছি একটা মিথ্যার জন্য, কত সম্পর্ককে আমি পায়ে ঠেলে দিয়েছি এই একটা মিথ্যের জন্য! এসব কার কাছে ফেরত চাইবো? যে মেয়েটা আমাকে বলেছিল চেষ্টা করে দেখ চাইলেই আমাকেও ভালবাসতে পারবে আমি তোমাকে সময় দিতে রাজি আছি তার সত্যি মমতাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছি! আমার শাস্তিও কি কম হওয়া উচিত? আমার অপরাধটাও কি কম?
হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বেখেয়ালে এখানে এসে পড়েছি খেয়াল করি নি। এইটুক বৃষ্টিতেই শহরটা একেবারে তলিয়ে গিয়েছে। হাঁটু পানির মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি নিকুঞ্জ-২ এর স্বপ্ন কুটিরের সামনে। তিনতলার জানালার পর্দা দিয়ে আলো আসছে। এখানেই সবকিছু থেকে দূরে এসে নিজের একার জগত গড়ে নিয়েছে নিশাত। ওর সাথে বড্ড অপরাধ করেছি। সেদিন ওকে আমি বলেছিলাম তুমি আমাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাও। নিজের মত করে গুছিয়ে নাও আবার শুরু কর। তুমি খুবই চমৎকার মেয়ে।
সে বলেছিল তুমি যখন আবার বিয়ে করেতে চাইবে, আমাকে বলবে আমি ডিভোর্স দিয়ে দেব। আর যতদিন বিয়ে না করছ এভাবেই থাক। ক্ষতি কিছুই তো হচ্ছে না। আর আমার যদি বিয়ে করার ইচ্ছে হয় আমি ডিভোর্স চেয়ে নেব কিংবা দিয়ে দেব। অসুবিধা নেই। তুমি আর যাই হোক আমার খুব ভাল বন্ধু, অফিসিয়ালি স্বামী হিসেবে থাকতে অসুবিধা কি? আমার আসলে বিয়ে করার একেবারে ইচ্ছেও ছিল না। বাবার ইচ্ছেই বিয়েটা করেছি। আবার নতুন করে এই ঝামেলার মধ্যে যাওয়ার ইচ্ছেও নেই। তাই এভাবেই থাক। আমরা বন্ধু আছি থাকি।
তারপর থেকে আজ অব্ধি নিশাত আর বিয়ে করেনি। জিজ্ঞেস করলে হাসতে হাসতে বলে আমার জামাই আছি, বিয়ে করবো কোন আক্কেলে? বহুবার ওকে বুঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অনড়। তার বিয়ে লাগবে না। একটা মেয়েকে টিকে থাকতে বিয়ে করতেই হবে এই স্টেরিওটাইপের সাথে সে মোটেও একমত না।
সুলতান মিয়া কেমন আছো?
স্যার ভাল আছি, উপ্রে যাইবেন?
না, আপাকে বল আমি এসেছি এখুনি যেন একটু নিচে আসে। বলবে আমি উপরে যাবো সে যেন এখুনি নিচে আসে আমার খুব দরকার।
জী স্যার বলতাছি।
স্যার আসতাছে আপায়, আপনারে বলছে ভিতরে আইসা খাড়াইতে, বৃষ্টিতে না ভিজতে।
সুলতান মিয়া, সৃষ্টিকর্তা আশীর্বাদ করেছেন, এই আশীর্বাদ পায়ে ঠেলে দেওয়ার অর্থ হয় না, কি বল?
জে স্যার!
কি ব্যাপার তোমার আক্কেল জ্ঞান কি হারিয়ে গিয়েছে? এই হাঁটু পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছ কি মনে করে? নিশাত কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলল।
একটু বাহিরে আসতে পারবে? আমার তোমার সাথে একটু হাঁটা দরকার। খুব জরুরী।
পাগল হয়েছ? জানো না আমি বৃষ্টি সহ্য করতে পারি না? আর এই ময়লা পানির মধ্যে হাঁটতে বের হবো? তুমি উপরে চলো এরপর যা কথা আছে সব শুনছি।
না নিশাত প্লিজ, একবার আমার জন্য এসো। ছাতাটা সুলতান মিয়ার হাতে দিয়ে এসো। সামনে আর পানি নেই। আমার জন্য, একবার প্লিজ!
আমরা নিকুঞ্জের জনশূন্য রাস্তায় হাঁটছি। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। লোডশেডিং এর জন্য কোথাও আলো নেই। রাস্তায় একজন মানুষও নেই। মনে হচ্ছে আমরা পৃথিবীর শেষ দুজন নারী ও পুরুষ।
নিশাত, তন্দ্রার সাথে দেখা হয়েছিল।
চমকে তাকাল আমার দিকে, কি বলছ! কোথায় কিভাবে? কি বলল?
বলল বৃষ্টির ভাগটা সে আর কাউকে দেয় নি ঠিক কিন্তু তার কাছে বৃষ্টির ভাগ দেওয়া না দেওয়া গুরুত্বহীন। মনটা সে অন্যের কাছে বন্ধক দিয়ে দিয়েছে, তাতে আমার জায়গা ছিল না কখনোই। যা ছিল তা অল্প বয়েসের আবেগ। সে আমাকে ভালবাসে না কখনো বাসেও নি! সবটাই এক টুকরো মোহ ছিল
আই এম সরি আবিদ। জানিনা কি বলবো!
নিশাত জানি এই কথাটা বিশাল অপরাধ হয়ে যাবে অনেক বেশী স্বার্থপরতা হয়ে যাবে। কিন্তু আমি বড্ড অসহায়বোধ করছি। মনে হচ্ছে আমার সবকিছুই অর্থহীন মিথ্যা। তুমি আমাকে একবার সময় দিতে চেয়েছিলে, আমাকে কি আর একবার সুযোগ দেওয়া সম্ভব? আমি মন থেকে সমস্ত স্বত্বা দিয়ে চেষ্টা করতে চাই শুধুমাত্র তোমার জন্য।
খুব স্পষ্ট শান্ত গলায় নিশাত বলল না। তুমি আমার জন্য এখানে আসো নি আবিদ। যদি আসতে এই মুহুর্তে তোমার সাথে চলে যেতাম। তন্দ্রার সাথে দেখা হওয়ার আগে একবার যদি এসে আমাকে বলতে আবার চেষ্টা করতে চাই, আমি তোমার সমস্ত বেদনার ভার একা নিয়ে নিতাম। আমাকে তুমি শেষ অপশন হিসাবে নির্বাচন করেছ? আমি কি এতটাই অযোগ্য? নিজেকে এতখানি বিক্রি করে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি চেয়েছিলাম, সত্যি চেয়েছিলাম এর থেকে তোমাকে মুক্তি দিতে। তুমি আমাকে সুযোগটা দিতেই চাও নি। অভিযোগ নেই। কিন্তু যদি আজ আসতে শুধু আমাকে তোমার বৃষ্টির অংশ করতে, একবার, মাত্র একবার! আমি জনম জনম তোমার জন্য বৃষ্টিতে পুড়তাম।
চলি!
বৃষ্টি পড়ছে, সতের বছরের পুরনো বৃষ্টি। এক নারী মৃদু পায় সীমানার বাহিরে চলে যাচ্ছে। তাকে এখন ঝাপসা মনে হচ্ছে, এক পুরুষ অপলক তাকিয়ে আছে তার চলে যাওয়ার দিকে। ভাবছে যদি শুধু একবার ফিরে আসতো। শুধু একবার!