লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ আগস্ট ১৯৯৯
গল্প/কবিতা: ১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশহীদ দিবস (মার্চ ২০১৮)

আমি তোমায় ভালবাসি
শহীদ দিবস

সংখ্যা

বিক্রম আদিত্য

comment ০  favorite ১  import_contacts ১৮১
১৯৫১ সাল জানুয়ারী মাস কামাল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর বাংলা বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ।গ্রামের সাদা সিধে যুবক ,সুউচ্চ কাধ ,মুখ ভরা দাড়ি যদিও সে সেইভ করে থাকে ।সব মিলিয়ে দারুন উজ্জল এক পৌরষদীপ্ত চেহারা তার ।বাঙালীর অধিকার আদায় ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র আন্দোলনের সাথেও সে জড়িত ছিল, তার দীর্ঘদেহ সবার আগে চোখে পড়ত আর বলিষ্ঠ কন্ঠের আওয়াজ যেন কম্পিত হত চারদিক। যে ভাগ্যবতী মেয়েটি এই সুপুরুষ এর হৃদয় অর্জন করে নিয়েছিল তার নাম তৃষ্ণা ।সেও বাংলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর বাংলা বিভাগের ছাত্রী তবে এবার সে ১ম বর্ষে ।তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় এ এসেই ।কামাল ও তৃষ্ণা দুজনেই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িত ছিল ,এক সাংস্কৃতিক সন্ধ্যাতেই তাদের পরিচয় ।তৃষ্ণা খুব ভাল রবীন্দ্রসংগীত গাইত ,আর সেটাই কামাল কে মুগ্ধ করেছিল ।সেই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় মিলি গেয়েছিল
"কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া
তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া।
চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি
গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি।"
এই গানটিই যেন কত আপন কামালের কাছে ।আর কামাল সেদিন সেই অনুষ্ঠান এর সঞ্চালক ছিলন ।সেখান থেকেই পরিচয় এর সূত্রপাত ।এর মাঝে ঘটেছে অনেক ঘটনা আর কেটে গেল একটা বছর ।কেউ কাউকে বলতে পারেনি যে তারা একজন আরেকজন কে ভালবাসে ।কামাল এর হৃদয়ে যে অনুভব তৃষ্ণাকে নিয়ে আর তৃষ্ণাও রাতে বুকে বাকিশ চেপে চুপি চুপি কামালের পৌরষে পুড়ে মরছে এ কথা কেউ ই কাউকে বলতে পারেনি এই এক বছরেও।
১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রি খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহ্'র কথারই পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু ।রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত তাঁর ভাষণে তিনি আরো উল্লেখ করেন যে কোনো জাতি দু'টি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি ।নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে।প্রতিবাদী সভায় কামাল যেতে পারেনি তবে ৩০ তারিখের ধর্মঘটে কামাল তার বন্ধুদের সাথে রাজপথে ছিল সক্রিয় ।
এসবের মধ্যেই ১৫ ফেব্রুয়ারী "বসন্ত বরণ" উৎসব এ তারা আবার মিলিত হলো ।তৃষ্ণা রবীন্দ্রসংগীত এর ক্ষয়েরী ডায়েরীটা নিয়ে এসেছে ।পাকিস্তানে যা চলছে তাতে রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলগীতি গাইতেও যেন বড় সড় কলিজা লাগে ।তবে তৃষ্ণা বেশ সাহসী আর তার মত অনেক সাহসী গায়ক ও গায়িকারা পাকিস্তান এর বাংলা বিরোধী ফতোয়া পরোয়া না করেই নিজের সাংস্কৃতি চর্চা করে চলেছে ।যা হোক সকালে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানটা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত ।সেদিন সন্ধ্যায় কামাল তৃষ্ণাকে ডেকে মঞ্চের পেছনে নিয়ে যেয়ে বলে ,"আমি কি বলব জানি না ,গত এক বছরে অনেক চেস্টা করেছি পারি নাই ।আমায় ক্ষমা করে দিও যদি গ্রহন করতে না পারো ।আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি" ।তৃষ্ণা সেদিন কিছু না বলেই দৌড়ে পালিয়ে গেল ।

সেদিন রাতে তৃষ্ণা বিছানায় শুয়ে শুধু সেই মুহূর্তের কথাই ভাবছিল আর শিহরিত হচ্ছিল ,সে যে কামালকে ভালবাসে সে তো কামাল কে বলা হল না ।এভাবে সে রাত কেটে গেল কেটেগেল আরো ৫-৬ দিন ।এসব ভাবনায় তৃষ্ণা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি, যদি কামাল এর সামনে পড়ে তখন সে কি বলবে?
এসব এর মধ্যে ২১ তারিখে পূর্বপাকিস্তানে প্রাদেশিক হরতাল এর ডাক দেওয়া হয় ।দাবি একটাই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং মাতৃভাষা বাংলা চাই।কামাল এর সাথে তৃষ্ণার আর দেখা হয়নি ১৫ তারিখের পর ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছাত্র জনতা এক হয়ে গেছে ২১ তারিখ সকালে তারা মিলিত হবে তারা কোনো আইন মানবে না ,১৪৪ ধারা তার মানবে না ।কামাল সেই ছাত্রদের একজন যারা ২১ তারিখ বিশ্ববিদ্যালয় এর আমতলায় মিলিত হয়েছিল।বেলা দুইটাই যে মিছিল বের হয়েছিল তাতে কামালও যোগ দিয়েছিল ।হঠাত পুলিশের ফায়ার ,এতে নিহত হয় অনেকে যাদের মধ্যে রফিক শফিক সালাম আছে আর গ্রেফতার হয়েছিল অসংখ্য ছাত্র ।কিন্তু কামাল কি নিহত হয়েছিল নাকি গ্রেফতার ?২১ তারিখের পর তাকে আর কেউ দেখে নি ।তৃষ্ণা শুধু এতটুকু জেনেছিল কামাল ২১ তারিখের মিছিলে গিয়েছিল ,এটা জেনেছি কামাল এর বন্ধু রশিদ এর কাছে থেকে ।রশিদ ও যেতে চেয়েছিল কামাল এর সাথে সেদিন এর মিছিলে কিন্তু শেষে ভীত হয়ে সে আর যায়নি মিছিলে ।এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্লাস বন্ধ ,কামাল এর কোনো খোজ না পেয়ে তৃষ্ণা যেন উন্মাদ ।সে বার বার ভাবছে আবার কামাল এর সাথে দেখা হলে সব মনের কথা তাকে বলবে ।কিন্তু কামাল কোথায় তা কেউ জানে না ,তবে এতটুকু বলা যায় কামাল আর ফিরে আসবে না এসব চিন্তা বার বার তৃষ্ণার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে ।
১৯৫৩ সাল ২১ ফেব্রুয়ারী তৃষ্ণার হাতে ফুল সেও আজ নগ্ন পায়ে শহীদ মিনার এর পথে প্রভাত ফেরির সাথে ।সে এত দিনে বুঝে গেছে ইতিহাস ,কামাল আর ফিরবে না ।আর বলবে না আমি তোমায় ভালবাসি ।মাতৃভাষায় বলা এই কথাটিই সবচেয়ে মধুর "আমি তোমায় ভালবাসি" ।শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে তৃষ্ণা বলল "আমি সত্যি তোমায় অনেক ভালবাসি"।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement