গল্পটি মূলত একটি শার্টের আত্মকাহিনী। যা শুধু অলীক বা অবাস্তব, কল্পনাতেই সম্ভব তা। হ্যাঁঁ, এটা কাল্পনিক। যদিও কাল্পনিক, তবুও এটা যেন আমাদের আশেপাশেরই গল্প।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৮টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - অলিক (অক্টোবর ২০১৮)

আমারো সুখ দু:খ আছে!
অলিক

সংখ্যা

ফারহানা সিকদার (বহ্নি শিখা)

comment ৪  favorite ১  import_contacts ১৫২
অমন করে ট্যারা চোখে আমাকে দেখোনা। এখন আমার গায়ে পুকুরের কাদা মাটি আর গোবর মিশিয়ে, তাদের এক রুমের ছোট্ট মাটির ঘর লেপন করছে।
তাই তো তুমি আমার সুন্দর শরীর টাহর করতে পারছোনা!
অথচ এই আমাকে দেখে কত যুবকের যে মাথা আউলা হয়েছে, তা কি তোমরা জানো? জানোনা!
কিভাবে জানবে , আমাকে তো আজকাল আমার রূপে দেখাই যায়না।
বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি দোকানে, আমার গায়ে যখন তিন হাজার ছয় শত টাকার ট্যাগ লাগিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলো, কত তরুন যে অসহায় চোখে তাদের অসামর্থ্য হাত দিয়ে আমাকে ছুঁয়ে দেখেছে হিসাব নেই।
আমি তাদের বুকের ধুকধুকানি শুনতে পেতাম, তারা মুখের ভেতর অস্ফুট আফসোসও করতো যেন।
আমার কখনো খুব গর্ব হতো, কখনো খুব কষ্ট লাগতো। সবচেয়ে বেশী কষ্ট লেগেছে শোভা নামের মেয়েটির জন্য।
আমার যদি পা থাকতো বা নড়ার সামর্থ্য তবে সেদিন আমি তার ব্যাগে চুপটি করে ঢুকে যেতাম। শোভা'র মুখটা আমি কোনোদিন ভুলবনা।
শোভা তার বান্ধবীকে নিয়ে এসেছিলো, প্রিয় বন্ধু'র জন্মদিনে গিফট দেবার জন্য কিছু উপহার কিনতে। সাথে এনেছে দু'হাজার একশত টাকা। মনে হয় এক'শ টাকাটা গাড়ি ভাড়ার জন্য।
হয়তো ওটা বন্ধু নয়, প্রেমিক ছিলো তার । প্রথম দেখাতেই, আমাকে ভালো লেগে যায় মেয়েটির। তারপর আমার কাঁধে'র জায়গাটা চেক করে মুখ কালো করে ফেলে। ফিসফিসিয়ে বান্ধবীকে কিছু বলে।
বান্ধবী তার ব্যাগ খুলে টাকা গুনে দেখে বলে, "সাত'শ সত্তর আছে আমার।"
ওরা হিসেব করে দোকানদার চাচা'র কাছে কত অনুনয় যে করে আটাশ'শ টাকা দিয়ে শার্টটা দেবার জন্য। কিন্তু পাষান্ড মালিক কিছুতেই রাজি হন না।
বলেন কি, "কেনা দামও আসেনা।"
অথচ এটা ডাহা মিথ্যে কথা। আমাকে কিনেছে আঠারো'শতে!
বেটা, তুই এক হাজার লাভ কর, এতো লোভ কেনো তোর?
কি হতো কোনো এক ভালোবাসার ছোঁয়ায় আমাকে আলোকিত করলে। হয়তো আমি এখনো তার বন্ধু'র যতনে থাকতাম!
সে হয়তো গভীর রাতে বান্ধবী'র কথা ভেবে বালিশের নীচ থেকে আমাকে বের করে নাকে নিয়ে শুঁকে দেখতো। হয়তো গায়ে দিয়েই শুয়ে পড়তো, বান্ধবী'র ছোঁয়া আছে ভেবে।
ভোরে মা ডাকতে এসে অবাক হয়ে বলতেন,
"শার্ট পরে কেউ ঘুমায়! তাও নতুন শার্ট! আমি বাপু আয়রন করে দিতে পারবোনা, তুমি নিজে করো।"
সে লজ্জিত মুখে মুচকি হাসতো। এই শার্টের প্রতিটি কোণায় যে একজনের স্পর্শ লেগে আছে, তা মাকে কিভাবে বুঝাতো!
হয়তোবা, মেয়েটি বন্ধু'র জন্মদিন আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাকে বারবার ব্যাগ থেকে বের করে দেখতো । আর তার সুন্দর হাত দুটো দিয়ে সুন্দর করে গভীর মমতায় গিফট প্যাকে মুড়িয়ে নিতো। দেবার আগে বন্ধুটিকে ভেবে প্যাকেটের উপর চুমুও খেয়ে থাকবে।
আহা, কত ভালো লাগছিল এমন ভাবতে!
বেটা খবিস দোকানদার!
আরেকদিন দোকানে এসেছিলো এক মধ্যবিত্ত বাপ পুত্র। পুত্র আট বা এমনই বয়সের বালক হবে ।
পুত্র বলে, "আব্বু কি সুন্দর জামা ! আমি কিন্তু নিব।"
"বাবা সোনা, এটা যে বড়দের জামা।" বাপ বলেন।
"আব্বু ..
তাহলে তুমি কিনে ফেলো।"
"দাঁড়াও দেখি।" বলে তিনি দাম দেখে চুপসে গেলেন। "চলো সায়ান, আমরা অন্য দোকানে যাই।" মন খারাপ গলায় তিনি পুত্রকে ডাকেন।
"কেনো আব্বু? কিনবেনা?"
"নারে, আমার সাইজের নেই , এটা খুব টাইট হবে।"
"তাহলে আমি একটু বড় হলে আমাকে কিনে দিও এটা।"
"আচ্ছা তোমাকে কিনে দেব।" বাবা সান্ত্বনার সুরে বলেন ।
ওরা চলে যায়। ঐ বাপের জন্যও আমার কষ্ট হয়েছিলো খুব।
তারপর দোকানে আমার শেষ মুহূর্ত টা আসে। এক যুবক তাড়াহুড়ো করে দু'একটা শার্ট নেয়, আমাকে সহ।
ভালোভাবে না দেখেই নিয়ে নিলো মনে হয়। অভিমান হয় আমার একটু। আমি কি এতই ফেলনা!
অহংকারী স্বরে বললো, "প্যাক করো, কত হলো?"
কি একটা কার্ড একটা মেশিনে ঢুকিয়ে , প্যাকেটে করে আমাদের কার এর ভেতর তার পাশের সিটে বসিয়ে বাসায় নিয়ে আসে।
সারা দিন রাত অভারড্রয়ারের উপর অমনই পরে থাকি।
পরদিন সকালে আমাকে পছন্দ হয় বোধহয়, গায়ে দিয়ে কি একটা স্প্রে লাগালো, পড়ে দেখলাম পয়জন!

অমা, বিষ নাতো!
না, বিষ না, খুবই মিষ্টি সুগন্ধ । পারফিউম এটা। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল বলি, "আরও একটু লাগাওনা।"
যুবকের সাথে সারাদিন আমি দামী কার করে ঘুরে বেড়ালাম, আবারো শীতাতপ একটা ঘরে থাকলাম অনেকক্ষণ।
তারপর হোটেলে গেলাম, ওখানে আমার সমমানের আরো শার্টকে গর্ব ভরে চলতে দেখলাম অন্য বড়লোকদের শরীরে করে।
আহা কত সুখ আমাদের!
বাসায় এসে সে আমাকে এক পাশে ছুঁড়ে মারে অযত্নে, খুব গায়ে লেগেছিলো ব্যাপারটা আমার। অনেকক্ষণ মন খারাপ ছিলো। তারপর দেখি এক পুঁচকে কিশোরী মেয়ে এসে আমাকে আরো অনেক কাপড়ের সাথে মেশিনে ঢুকিয়ে দেয়।
মেশিন ঘুরতে থাকে, সাথে আমিও।
আমার মাথা থাকলে ঘুরতে ঘুরতে বমি এসে যেতো নিশ্চয়, আর নাড়িভুড়ি বের হয়ে যেত। সে পরদিন যখন আমাকে সাহেবের রুমে রাখতে যায়, ঐ বেটা তো আমাকে দেখেই এক চিল্লান দেয়,
"কি করছিস এটা!"
"কি ভাইজান?" ভয়ার্ত কিশোরীর জবাব ছিলো।
"এটা ড্রাই ওয়াসের.. তুই ওয়াসিং মেশিনে কেনো দিলি? যা আমার সামনে থেকে নিয়ে যা এখুনি।"
আমার জায়গা হলো পুরনো কাপড়ের ভিড়ে।
একদিন বাড়ীর কর্তী অনেক কাপড় সহ আমাকে তাদের ড্রাইভারকে দিয়ে দেন।
সে সুবাদে আমি আবার কার আর ড্রাইভারের ঘরের বাসিন্দা হই।
আমার আগের সৌন্দর্য্য একটু কমছে বুঝতে পারি। তাইতো দু'একদিনের ব্যবধানে সাহেব থেকে ড্রাইভারের গায়ে। সেও অবশ্য সস্তা ধরণের একটা পারফিউম ইউস করে, নামের কাগজটা ছিঁড়ে গেছে, তাই পড়তে পারিনি! একদিন ড্রাইভার পত্নী আমাকে শুকাতে গিয়ে পেরেকের সাথে লাগিয়ে অনেকখানি
ছিঁড়ে ফেলে,ল। খুব লেগেছিলো আমার! মনে হয়েছিলো, কলজে ধরে কেউ টান দিয়েছে।
পরে অবশ্য সে সুন্দর করে সেলাই করেও দেয়। তবুও বেটা আর আমাকে পছন্দ করেনা।
তার বড় ভার বেড়েছে! তার যে সাহেবের মায়ের দেয়া অনেক জামা আছে এখন, একটা গেলে আরেকটা আছে । তাই আমার জায়গা আবার পুরনো কাপড়ের সাথে।
একদিন ড্রাইভার পত্নী এক ফেরিওয়ালেকে আমি সহ, এক গাট্টি পুরনো কাপড় দিয়ে পঁচিশ টাকার মতো প্লাস্টিকের জিনিস কিনে।
আমি ফেরিওয়ালার ফেরির জিনিসের ভেতর করে হেলতে দুলতে ওর বাড়ী যাই। মন্দ লাগেনি এই দোল খাওয়া। আবার যুক্ত হই নতুন আরেক পরিবারের সুখ দু:খের সাথে।
ফেরিওয়ালার বয়স কম ,ঊনিশ কুড়ি হবে হয়তো। মাও জোয়ান মহিলা, শক্ত সামর্থ্য। বাপ নেই বোধহয়, দেখিনি কোথাও ।
আর কেউ তো নেই ঘরে! পরদিন সেই ছেলে আর সবার মতো আমাকেই পছন্দ করে পরে নেয় গায়ে। ফুরফুরে মেজাজে শিস দিতে দিতে ফেরি করে প্ল্যাস্টিক সামগ্রী।
প্ল্যাস্টিকের ব্যাংক, ঝুড়ি, মগ, বাচ্চাদের ব্যাট বল সব আছে তার কাছে।
আচ্ছা, আমার পাশ ঘেঁষেই তো শোভা গেলো মনে হয়!
অবাক দৃষ্টিতে কি সে আমাকেই দেখছিলো না?
সাথে কি ঐ ছেলেটা?
বাহ, সুন্দর তো! খুউব মানাবে দু'জনকে। শোভা'র চোখের ঐ বিষ্ময়কে তো আমি চিনি। যে শার্ট ও কিনতে পারেনি, তা এই গরীব ফেরিওয়ালার গায়ে কেনো? তাকে শোনাবার জন্যই যে আজ আমার এই গল্প বলা।
শোভা, "তুমি কি আমার কাহিনী পড়ছো?"

আমরা একটা ঘরে গেলাম , গৃহকর্তা অনেক জিনিস কিনেন। কিন্তু টাকা দেবার সময় দরাদরি শুরু করে দেয়। শেষে আমার নতুন মালিকের গায়ে চড় থাপ্পড়, লাথি দিয়েই ক্ষান্ত হয়না, আমাকেও ছিঁড়ে ত্যানা ত্যানা করে ফেলে! এতো রাগ বেটার...
ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে আমাকে গা থেকে খুলে আরেকটা পুরনো জামা গায়ে দেয়। তবুও আমাকে ফেলে দেয়না।
তার দু:খে আমারও কান্না আসে। বুকে খুব কষ্ট হতে থাকলো। কিছু কষ্ট দলা গলার নিচ থেকে বুক পর্যন্ত আটকে আছে। চোখ থাকলে পানি গড়িয়ে পড়তোই।
কি দোষ ছিলো ওর?
বেচারা গরীব কে ঠকিয়ে তুই কি বড়লোক হবি?
শরীর আর শরীরে বল দুটোই যদি থাকতো, দিতাম বেটা'র পাঁচায় খসে দু'টা।
তারপর আর কি ....
আমার জায়গা হয় মাটির কাদা আর গোবরের মিশ্রণে।
কোথায় তিন হাজার ছয়'শ টাকার মানুষের স্বপ্ন আমি , আর কোথায় এই আমি!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement