লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftপিতৃত্ব (জুন ২০১৮)

দূরদেশী বাবা
পিতৃত্ব

সংখ্যা

আসাদুজ্জামান খান

comment ০  favorite ০  import_contacts ২৩০
(১)
স্কুলে ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে। সাজু মানে সাজিদ হাসানের মন একই সাথে খুব ভালো আবার খুব খারাপ। এই প্রথম সে ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে। ক্লাস ওয়ান থেকে টু, আর টু থেকে থ্রীতে ওঠার সময়ে সে রেজাল্টের গুরুত্ব তেমন বুঝত না। ক্লাস ফোরে ওঠার সময়ে তার রোল নাম্বার হয় পাঁচ। কাউকে বুঝতে দেয়নি, কিন্তু সাজুর খুব খারাপ লেগেছিল। সে দেখেছে ক্লাসে ফার্স্ট, সেকেন্ড বা থার্ড হলে স্যাররা খুব আদর করেন, মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনরা খুব খুশি হন। বাবার কথা মনে পড়তেই সাজুর মন খারাপ হওয়া শুরু করল। কতদিন বাবাকে দেখেনা!

বাবা অনেক দূরে কাজ করেন। জাহাজে করে সাগরে, সমুদ্রে, বন্দরে ঘোরেন। কখনো একবছর কখনো দু বছর পরপর আসেন। এবারে এক বছরের বেশি হয়ে গেলো! জ্ঞান হবার পরে সাজু এইই দেখে আসছে। তবে বাবা চিঠি লিখেন। যখনই কোন বন্দরে তার জাহাজ নোঙ্গর করে, সেখান থেকে বাবা চিঠি পাঠান। মা’র নামে, দাদা-দাদীর নামে আর তার নামে। সেই সাথে থাকে অনেক রকমের উপহার সবার জন্য। আর থাকে ছবি। কি সুন্দর সেইসব ছবি! জাহাজের ছবি, সমুদ্রের ছবি, বিভিন্ন দেশের বন্দরের ছবি, শহরের ছবি, প্রকৃতির ছবি। সাজুর অবশ্য সবচেয়ে ভালো লাগে বাবার ছবি। জাহাজের রেলিংএ ভর দিয়ে, কিংবা কোন এক সমুদ্র সৈকতের বালুচরে বাবার ছবিগুলো দেখে সাজু আনমনা হয়ে যায়। তার বাবা, তার নায়ক। অনেক দিন পরপর যখন বাবা বাড়ি আসেন, সেই সময়গুলো হয় সাজুর সুন্দরতম সময়। বাবা তাকে অনেক গল্প বলেন, তার সাথে খেলেন, ঘুরতে নিয়ে যান।

সাজু আগে মা’কে প্রশ্ন করত “মা, বাবা দূরে থাকে কেন? আমাদের সাথে থাকেনা কেন?
মা বোঝাতেন “তোমার বাবা আমাদের সবার ভালোর জন্য দূরে গিয়ে কাজ করেন। টাকা উপার্জন করেন”।
“টাকা দিয়ে কি হয় মা?”
“টাকা দিয়ে আমরা কাপড়-চোপড় কিনি, ভালো ভালো খাবার কিনি, তোমার খেলনা কিনি। তোমার বাবা কাজ না করলে টাকা না পাঠালে এইসব কেনা যেতোনা।”
“আমার নতুন কাপড় লাগবেনা, খেলনা লাগবেনা, খাবারও লাগবেনা। বাবাকে আসতে বলো”।
সাজুর মনে পড়ে সে যখন এরকম বলত মায়ের চোখ দিয়ে পানি পড়ত। তবে সাজু এখন আর এরকম প্রশ্ন করেনা। সে বড় হচ্ছে। বুঝতে শিখেছে, বেঁচে থাকার জন্য টাকার দরকার। তবুও মাঝে মাঝে মন খারাপ করে। নিজের জন্য, বাবার জন্য। বাবাও তাকে কত ভালোবাসে! তাকে ছাড়া বাবারও নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হয়। নিজের মন খারাপ অবশ্য সে বুঝতে দেয়না কাউকে। একা একা কাঁদে।

রেজাল্ট কার্ড হাতে দিয়ে হেডমাস্টার স্যার সাজুকে আদর করে দিয়েছিলেন। অন্য স্যার ম্যাডামরাও তার প্রশংসা করছিলেন। সাজুর চাচা তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। সাজুর খুব লজ্জা লাগলেও সে গর্ব বোধ করছিল। মা খুশিতে কপালে চুমু দিলেন। দাদা-দাদী আশীর্বাদ করলেন। চাচা বাজার থেকে মিষ্টি আনলেন। সাজুর খুব ভালো লাগল। কিন্তু একা হতেই আবার মন খারাপ লাগল। সে বাবাকে চিঠি লিখতে বসল।
“বাবা,
তুমি কেমন আছো? আমি ভালো আছি। জানো বাবা, আমি না এবার পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছি। সবাই খুব খুশি, আমিও খুশি। কিন্তু তুমি যদি থাকতে কি ভালোই না হত! তুমি কবে আসবে বাবা?
ইতি-
সাজু”

চিঠি ভাজ করে সে মায়ের হাতে দেয়। মা প্রতি সপ্তাহে বাবাকে চিঠি লিখেন। একসাথে পাঠিয়ে দেবেন। সাজুর মনে হয় তার যেমন হল, বাবারও তাই হবে। চিঠি পেয়ে তার খুব ভালো লাগবে, আবার মন খারাপও হবে।

(২)
দিনের শেষে কাজ থেকে ফিরে খুব একা লাগে সাজুর। এমন না যে সে একা থাকে। দাম্মাম শহরের এই ছোট বাসায় আরো দুই বাংলাদেশী থাকে। তবে দিনশেষের ক্লান্তি আর রান্নাবান্নায় ওরা ব্যাস্ত। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব কম হয়। সাজু একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। সে এখানে একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানীতে কাজ করে। সাজু তার ল্যাপটপ খুলে বসে। কিছু অফিসিয়াল কাজ সেরে বাংলাদেশে কল দেয়। স্কাইপে। মা’র সাথে কিছুক্ষন কথা বলে তারপর তার স্ত্রীর সাথে আর মেয়ে শানুর সাথে। দিনের শেষে এই তার আনন্দের খোড়াক। স্ত্রী-কন্যাকে এখানে আনা খুব সহজ নয়। তাছাড়া বাড়িতে মা আছেন বৃদ্ধাবস্থায়। তার কাছেও কারো থাকা প্রয়োজন। সাজুর বউ নিতু তা স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিয়েছে। সাজু অবশ্য বছরে দুইমাসের ছুটি পায়। সে সময়টা সে দেশেই কাটায়। গত তিন বছর ধরে এইই নিয়ম।


শানু এইবার ছয়ে পড়ল। আজই তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে। স্কাইপে কল দেয়ার সাথে সাথে সে ব্যাস্ত হয়ে উঠল বাবাকে তার নতুন স্কুলের অভিজ্ঞতা বলার জন্য। অবশ্য বাবা তার জন্য যতটা না ‘জ্যান্ত মানুষ’ তার চেয়েও বেশি মোবাইল ফোনের স্ক্রীনে ভেসে ওঠা এক মুখ! সে কলকল করে কথা বলে। যদিও প্রতিদিনই কথা হয়, তবুও কত কথা তার জমে থাকে! সারাদিনের খুটিনাটি তার বাবাকে বলা চাই। নতুন স্কুলে তার স্যার ম্যাডামরা কেমন, তার কতগুলো বান্ধবী হয়েছে, স্কুলের মাঠে যে বিড়ালটা দৌড়াদৌড়ি করছিল সেটা কি রঙের, ইত্যাদি কোন কিছুই বাদ পড়েনা। হঠাত সে বলে বসে “বাবা তুমি কেন বিদেশে থাকো? আমার বান্ধবী মুমু’র বাবা আর মা ওকে নিয়ে এসেছে ভর্তি করাতে। আমার সাথে শুধু মা গেল। ওর বাবা এখানেই চাকরী করে। তোমার কেন বিদেশে চাকরী করতে হয় বাবা?”

সাজুর মনে পড়ে দুই যুগ আগের দিনগুলোতে তার বাবা যখন জাহাজের চাকরী নিয়ে দেশ বিদেশে ঘুরতেন সেও এরকম প্রশ্ন করত তার মাকে “বাবা কেন দূরে থাকে!” হায়রে জীবন! শৈশবের অভিজ্ঞতায় সাজু পন করেছিল, সে কখনই পরিবার ছেড়ে দূরদেশে যাবেনা। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় এক। ইন্টারমিডিয়েটে পড়া অবস্থায় একদিন বাবা বাড়ি এলেন। চিরতরে। আর কোনদিন সমুদ্রে ফিরে যাবেন না। জাহাজে চড়ে বন্দরে বন্দরে ঘুরবেন না। সাজুর খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু সেই দিনটা সাজুদের খুশি হওয়ার দিন ছিলনা। তার বাবার জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়েছিল। অনেক কষ্টে উদ্ধার পেলেও তার বাবা সহ আরো অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কলোম্বো বন্দরের এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবার আত্মা ফিরে গেল আল্লাহপাকের কাছে। বাড়িতে এল বরফে মোড়ানো তার শরীর। তার নায়ক, তার বাবা তাদের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে গিয়ে নিজের জীবন সমুদ্রে রেখে ফিরে এলেন।

এই অবস্থায় সাজুর ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট তত ভালো হলনা। ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সে চান্স পায়নি। আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব আর স্যারদের পরামর্শে সে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয়েছিল। এখানে অবশ্য সে খুব ভালো করেছিল। তবে পাশ করার পরে দু’বছরেও তার কোন ভালো কর্ম-সংস্থান হয়নি। তার জাহাজি বাবার এক দীক্ষা ছিল তার জন্য “জীবনেও কোন অন্যায় পথ, অসৎ পথে যাবেনা”। সাজু যায়ওনি। ঘুষ না দিতে চাওয়ায় তার কোথাও চাকুরী হয়নি। অবশেষে আল্লাহ তার ব্যাবস্থা অন্যভাবে করে দিয়েছিলেন। সৌদি আরবের এক কন্সট্রাকশন কোম্পানির চাকরি পেয়ে যায় সে। মা প্রথমে আসতে দিতে চায়নি বিদেশে। সাজু বুঝিয়েছিল “তকদীর কে খন্ডানো যায়না মা”।

গত আট বছরে সে তিনটা কোম্পানিতে চাকরি করেছে। আসার পরের বছর দেশে গিয়ে বিয়ে করেছে। স্ত্রীকে এখানে আনা সম্ভব হয়নি। তবে মন্দের ভালো এই যে, সে বছরান্তে ছুটি পায়। দু বছর পরে মেয়ে এল সংসারে। কি ফুটফুটে! ধীরেধীরে সে বড় হচ্ছে। কিন্তু সে আর মেয়েকে কাছে পেলো কোথায়! কতদিন পরপর দেখা হয়! ইন্টারনেটে দেখা আর বাস্তবের সান্নিধ্যের অনেক ফারাক। সাজুর মনটা হুহু করে উঠল। তার শৈশবে সে যেমন বাবাকে ‘মিস’ করত, তার শানুও তাকে সেইভাবে ‘মিস’ করে। “বাবা তুমি কেন বিদেশে থাকো? এর উত্তরে কি বলবে সাজু! হায়রে জীবন! কতভাবেই না পরীক্ষা নেয়!

(৩)
সাজুর বাসার অনতিদূরেই পার্সিয়ান গালফ বা উপসাগর। রাতে ঘুম না আসলে মাঝে মাঝেই সাগরের তীরে এসে সে দাঁড়ায়। দূরের ‘কিং আব্দুল আজিজ সমুদ্র বন্দরে’র আলোর ঝলকানি দেখা যায়। এখানে আসার অনেক বছর আগেই এই বন্দরকে সে চেনে। তার বাবার পাঠানো ছবি থেকে। এই পার্সিয়ান গালফ, তারপর আরব সাগর পেরিয়ে ভারত মহাসাগরের আরেক অংশের বঙ্গোপসাগরব্যাপী বিস্তীর্ন এই সমুদ্রপথের বাতাসে ভেসে বেড়ানো তার বাবার শরীরের গন্ধ নেয়ার চেষ্টা করে সে। ঘামে ভেজা শরীর থেকে শার্ট খুলে নেয় সাজু। যদি বাবার গায়ের কিছু সুবাস তার গায়ে এসে লাগে, কিংবা তার নিজের গায়ের কিছু গন্ধ যদি সমুদ্রে ভেসে বেড়ানো বাতাসের মাধ্যমে সুদূর বাংলাদেশের কোন এক পল্লীগ্রামে তার কন্যাকে পাঠানো যায়!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement