রিখটার স্কেল সেভেন

ভূমিকম্প (জানুয়ারী ২০২৬)

Jamal Uddin Ahmed
  • 0
  • ৩৪
‘এমন ঝাকান দিছে ভাইজান, আমি তো অটো’র নিচে পইড়া যাইবার লইছিলাম। আবুল চাচায় ওয়ালের চিপায় পেচ্ছাব করতে বইছিল, লুঙ্গি-টুঙ্গি নষ্ট কইরা ফালাইছে।’ টোকাই ডাবলু একথা বলে ময়লা দাঁত বের করে হাসতে থাকে।

আমাদের মহল্লার টোকাই ডাবলুই শুধু না, উপরতলা, নীচতলা এমন কি নেই-তলার আবালবৃদ্ধবনিতা পড়িমরি করে রাস্তায় নেমে এসে – মা গো – কী হুলস্থূলই না বাঁধিয়ে দিয়েছে! এখন যারা গায়ে গা লাগিয়ে কথার খই ফোটচ্ছে তারা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। মৃত্যুভয় তাদের সবাইকে এনে এক সমতলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি মাত্র ঝাঁকুনিতে ইষ্টনাম জপতে জপতে সবাই যেন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে।

রূপমহল অ্যাপার্টমেন্টের অশতিপর বৃদ্ধ আকমল আঙ্কেল, যাকে পাঁজাকোলা করে সপ্তম তলা থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে তিনি চৌপায়া লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন আর কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর বলতে চেষ্টা করছেন, ‘এটা তো তেমন বড় আর্থকুয়েক নয়, নাইন্টিন ফোরটি … … খুকখুক।’ কিন্তু কাশির বেগ বেড়ে যাওয়ায় তিনি আর বাক্যটি পূর্ণ করতে পারছেন না।

ভূমিকম্পের সময় আমাদের বাসার খণ্ডকালীন গৃহকর্মী আকলিমা পাশের কোনো এক বাসায় কাজ করছিল। সে হঠাৎ ভিড়ের মাঝখান থেকে হনহন করে ছুটে আসে, ‘বাইজান, আফনারা সব ঠিক আছুইন নি?’

আমি বলি, ‘আমরা ঠিক আছি; শুধু আম্মার পায়ে ব্যথা – তাছাড়া এমনিতেও তিনি নামতে চান নাই।’

‘আমি না বাসন ধুইতেছিলাম; আমার হাত থন পইড়া কাপটা ভাইঙ্গা গেছে।’ আকলিমার মুখে উত্তেজনা চকমক করছে। চোখ দুটি টেবিল টেনিসের বলের মতো গোল হয়ে রয়েছে।

আমি অভিভাবকের মতো তাকে উপদেশ দিই, ‘ভয় পাবে না। আল্লাহ সবাইরে বাঁচায়ে দিছেন। আর একটা কথা খেয়াল রাখবে, কোনো দুর্ঘটনার সময় হুড়াহুড়ি করবে না; সিঁড়ি দিয়ে সাবধানে নামবে। নইলে আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটায়ে ফেলবে।’

আকলিমাকে উপদেশ দেওয়ার সময় দেখি, একটু দূরে, দক্ষিণের বিদ্যুৎস্তম্ভের পাশে মিরানা আন্টি দুহাত ছুঁড়ে ছুঁড়ে আরও কয়েকজন মহিলার সাথে কথা বলছেন। কী আর বলবেন? ভূকম্পের সময় তিনি কী করছিলেন – ঘুমাচ্ছিলেন কিংবা চা বানাচ্ছিলেন, নয়তো টয়লেটে ছিলেন – এসব আরকি। তাঁর ঠিক পেছনেই দাঁড়ানো টুম্পা – মিরানা আন্টির সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট মেয়ে। দেখি, টুম্পা আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি শানিত কি না বুঝতে পারছি না। আর শানিত হবেই বা কেন? আমি তো এমন কোনো দৃষ্টিকটু কাজ করিনি; শুধু আকলিমার সাথে দু’চারটা কথা বলেছি। তারপরও আমার ভেতরে সন্দেহের পোকা কটকট করতে থাকে।

আরও কিছু সময় আমি টুম্পার প্রতিক্রিয়া নিরীক্ষণ করে পা টিপে টিপে বিদ্যুৎস্তম্ভের দিকে এগোবো, এমনটিই ভাবছিলাম। পা টিপে কেন এগোবো তা বলাই বাহুল্য – মিরানা আন্টি। মাইরি! বাজখাঁই গলার কী ভয়ঙ্কর মহিলা! আমার সাথে যে কথা বলেন না, এমন নয়। তবে সোজা-সরল তাকিয়ে নয়; কৌণিক দৃষ্টিতে। আর তখন যদি টুম্পা পাশে থাকে, তাহলে তো হয়েছে। আমার সাথে কথা বলতে বলতে তাকে বজ্রহুঙ্কারে একটা অহেতুক ধমক লাগাবেন, ‘কলাগাছের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন; কোনো কাজ নেই ঘরে?’

ভাবনায় ছেদ ঘটালেন পাশের এক ভদ্রলোক। ফোন কানে নিয়ে তিনি এত জোরে চিৎকার করে কথা বলছেন যে প্রায় গোটা জটলা তাঁকে কপাল কুঁচকানো দৃষ্টি উপহার দিতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি বলছেন, ‘…আরে না রে ব্যাটা, তোর বাপের জনমে এমন ভুঁইচাল দেহস নাই। তুই টের পাইবি ক্যামনে? তুই তো বইয়া রইছস টেকনাফে। ক্ষয়ক্ষতি? ক্ষয়ক্ষতি তো অইবো। পুরান ঢাকা আস্ত আছে কি না কেঠা জানে। না, অহনও কুনো নিউজ পাই নাইক্যা।…কী কইলি? জোরে ক’…।’

ইনকাম ট্যাক্স অ্যাডভাইজর সুলেমান কাকা বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলেন, ‘বাদ দেন তো। লাইন কেটে গেছে, আর জোরে কওয়া-কওয়ির দরকার নেই।’ সুলেমান কাকার হস্তক্ষেপে লোকটা একটু নিরাশই হলো, তবে কিছু বললো না।

পরে আমি মনোযোগ দিয়ে চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখি, শুধু ওই ভদ্রলোকই নয়, আরও ডজনখানেক লোক – কেউ ফোনের অডিওতে, কেউ ভিডিওতে ভূমিকম্পের বিলম্বিত ধারাবিবরণী দিয়ে চলেছে। আমার মনে টুম্পা জাগরূক রয়েছে বলে ওদিকে তাকিয়ে দেখি সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। মিরানা আন্টিও ধ্রুপদী নৃত্যের মুদ্রায় হস্ত সঞ্চালন করে ভূমিকম্পের নাড়িনক্ষত্র বিশ্লেষণ করছেন। তাঁর এই ভঙ্গি দেখে আমার কিঞ্চিত হাসি পায়। তখন আমার পেছন দিকে শুরু হয়েছে আরেক কেত্তন। আমাদের পাড়ার অবসরপ্রাপ্ত কলেজ-শিক্ষক রহমান স্যার তাঁর সমবয়সীদের মধ্যমণি হয়ে জ্ঞানচর্চা করছেন। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক না হলেও অধিকাংশের মতো আমিও তাঁকে স্যার সম্বোধন করি।

রহমান স্যারের ওজনদার বক্তৃতা হজম করার মতো রুচি অনেকেরই নেই। কিন্তু তারপরও আগ্রহী ও উৎসাহী একদল শ্রোতা তাঁকে ঘিরে ধরে রেখেছে। স্যার তাঁর ক্লাসরুমের বক্তৃতার স্টাইলে কথা বলে যাচ্ছেন, ‘বুঝলেন, সমস্যাটা হলো টেকটোনিক প্লেটে। একটা প্লেট যখন আরেকটার সাথে গুঁতোগুঁতি করে কিংবা পিছলে যায়; অথবা, ভূগর্ভস্থ শিলা ভেঙে গিয়ে ফল্ট লাইনের দিকে দৌড় দেয় তখনই ভূত্বক কেঁপে ওঠে। অবশ্য অন্যান্য কারণেও ভূমিকম্প হয়, যেমন, অগ্নিগিরি, খনিতে বিস্ফোরণ, আণবিক বোমার পরীক্ষা, ভূমিধ্বস, ইত্যাদি। তবে আমাদের দেশে এসবের বালাই নেই।’

আমাদের পাড়ার কলেজ-পড়ুয়া স্মার্ট ছেলে সুমন খুব মনোযোগ দিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনছিল। সে অনুনয় করলো, ‘আমাদের রিস্ক ফ্যাক্টর সম্বন্ধে কিছু বলেন না, স্যার।’

রহমান স্যার দৃশ্যত উজ্জীবিত হয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশ পলল বদ্বীপ হওয়াতে রিস্ক বেশি। ছোট ধরণের আর্থকুয়েক হলেও কম্পন বেশি হবে; দালান কোটা ধ্বসেও পড়তে পারে। দেখো না, আমাদের কাছের ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেটে ক্রমাগত ঘষাঘষি হচ্ছে আর এতে ভূগর্ভে অনেক শক্তি জমা হচ্ছে। যদি সে শক্তি একবার এক্সপ্লোড করে, তবে রক্ষা নেই। তাছাড়া ওই যে আমাদের ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, চিটাগাং-ত্রিপুরা বেল্ট, এগুলোও রিস্ক ফ্যাক্টর। যদি কখনও রিখটার স্কেলে সাত-আট মাত্রা ওঠে তবে তো বুঝতে পারছো!’

রহমান স্যারের বক্তৃতার অভিনিবেশ হয়তো আরও গভীর হতো, কিন্তু অনতিদূরে আরেক মজমা বসে যাওয়ায় অনেকের দৃষ্টি ওদিকে নিবদ্ধ হয়েছে। বিকাশ-নগদের এজেন্ট খলিফা তার হাতের টাচ্‌ফোন উঁচিয়ে ধরে চেঁচাচ্ছে, ‘ইন্নালিল্লাহ ইন্নালিল্লাহ, দেখেন দেখেন, বালা করি চাই দেখেন, ওই বাম পাশের বিল্ডিংটা ঝুরঝুর করি পড়ি গেল – আরে, সামনের দুইডার মাথা কেমনে ঠুকাঠুকি কইত্তে আছে – এই দুইডাও খাড়াই থাইকতে পাইত্তো ন। আল্লারে, লাখে লাখে মানুষ শহীদ অই গেল গই…।’

খলিফার বিলাপ শুনে উৎসুক নারীপুরুষ হুড়মুড় করে তার ফোনের ভিডিও দেখতে এগিয়ে যায়। এদের কয়েকজন ছবির স্থান-কাল-পাত্রের ধার না ধেরেই খলিফার সুরে সুর মিলিয়ে আহাজারি আরম্ভ করে দেয়, ‘…আহারে, কার মা’র বুক খালি অইলো রে! …আরও কত বিল্ডিং গুড়া হইছে আল্লাই জানে। …এই কপাল-পোড়া দেশের কী অইবো রে…।’

এই হইহল্লার মধ্যে হঠাৎ করে উদয় হন মিলি আপা। প্রচণ্ড সাহসী ও মেজাজি মিলি আপা আমাদের থানার প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক দলের নেত্রী। তিনি এসে হুঙ্কার দেন, ‘অ্যাই মিয়া আপনি কোন সিনেমার শো করতাছেন?’

মিলি আপার আবির্ভাবে উপস্থিত দর্শকরা ভড়কে যায়। খলিফা আমতা আমতা করে বলে, ‘চাই দেখেন আফা, ভূঁইচালে সবকিছু কেমন লণ্ডভণ্ড করি দিছে।’

মিলি আপা রেগে গিয়ে বলেন, ‘এইটা কোন চ্যানেলের খবর, কোন দেশের ছবি?’ তার কথা শুনে সবাই একে অপরের দিকে মুখ হা করে তাকায়। মিলি আপা গলার স্বর আরও উঁচু করে জিজ্ঞেস করেন, ‘এই ছবি আপনি পাইছেন কই?’

খলিফার উত্তরের অপেক্ষা না করে সুমন এসে একটা ঝাড়ি দেয়, ‘অ্যাই খলিফা ভাই, আপনি কী আরম্ভ করছেন? কোথাকার কোন ছবি কোন বেক্কল রীলে ছেড়ে দিছে, আর অমনি আপনি আসর জমাইয়া বসছেন। আপনি এডিটিং বোঝেন? এ.আই. বোঝেন?’

মিলি আপা আর কাউকে না ধমকিয়ে সবাইকে উপদেশ দিতে আরম্ভ করেন, ‘আপনারা কেউ ভয় পাবেন না, তবে সাবধান থাকবেন, সাবধানের মার নেই। আমরা শীঘ্রই একটা ড্রিল করবো, ভূমিকম্পে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করবেন, কীভাবে নিরাপদ থাকবেন, সব শিখাবো। আর শোনেন, দুর্ঘটনার সময় লিফট ব্যবহার করবেন না, সিঁড়ি দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে নেমে এসে খোলা মাঠে গিয়ে জড়ো হবেন।’

স্কাইশুট অ্যাপার্টমেন্টের সিকিউরিটি গার্ড মোহাব্বাত বলে, ‘খোলা মাঠ কই পামু, আপা?’

মিলি আপা মোহাব্বাতকে ধমক দেন, ‘চুপ করো! খোলা মাঠ কি তোমার জন্য তুইলা নিয়া আসবো। নিজে খুঁইজা বাইর করবা। মাঠ না পাও খোলামেলা জাগায় গিয়া দাঁড়াইবা।’

মিলি আপা আরও কী কী বলছিলেন, কিন্তু শ্রোতাদের মনোযোগ চলে যায় অন্যদিকে। একটা রিক্সায় চড়ে হ্যাণ্ডমাইকে কীসব বলতে বলতে কে একজন দক্ষিণ দিক থেকে আসছে। আমিও সবার মতো সেদিকে আকৃষ্ট হই। তবে একই সাথে আমার চোখজোড়া অন্য কাউকে খুঁজতে থাকে। না, তাকে তো বিদ্যুৎস্তম্ভের নিচে দেখা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে ঘোষক রিক্সা আমার সামনে চলে এলে দেখি – ও মা – এ যে বাবু! আমার বন্ধু। হারবাল ওষুধ বিক্রেতার মতো গলায় তরঙ্গ-বৈচিত্র্য খেলিয়ে সে সাবধান-বাণী উচ্চারণ করে চলেছে, ‘প্রিয় এলাকাবাসী, হুঁশিয়ার, সাবধান! আপনারা কেউ এক্ষুণি ঘরে ফিরে যাবেন না। ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন। এত বড় একটা ভূমিকম্প থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন। কিন্তু এর পরপর আরও কয়েকবার ভূমিকম্প হবার আশঙ্কা আছে। এটাকে আফটারশক বলে। আপনারা আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তারপর ঘরে ফিরুন।’

বাবুকে আমি থামিয়ে বলি, ‘অ্যাই বেটা, মানুষ এমনিতেই ভয়ে কাঁপতেছে। তোরে পণ্ডিতি করতে কে বলছে?’

‘হ্যাঁ, তাই তো। এসব কথা বলার দরকার কী?’ একথা শোনার পর আমি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, সুলেমান কাকা। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি বন্ধ করেন তো; আর প্যানিক ছড়াবেন না।’

আমাদের দুজনের যুগপৎ আপত্তিতে বাবু একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তারপরও আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য নিচুকণ্ঠে বলে, ‘না, লোকজনকে একটু সচেতন করতেছি; বলা তো যায় না।’

আমি বলি, ‘ঠিক আছে; অনেক হয়েছে। এবার রেহাই দে।’

বাবু আমার ন্যাংটাকালের বন্ধু। একসাথে স্কুল-কলেজ পেরিয়েছি। ও-ও বেকার, আমিও বেকার। তবে একটু তফাৎ আছে। ও বড়লোক বাবা-মার সন্তান। বাবা সরকারি চাকরি করেছেন। ঢাকায় দুটি বহুতল ভবন আছে। ভাড়ার টাকায় দিব্যি চলে যায়। তাই চাকরির পেছনে সে যত না ছোটে তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

বাবু ঘোষণা থামিয়ে দিলে কী হবে, দেখি, যারা ইতোমধ্যে ঘরে চলে গিয়েছিল, ওরা আবার পিঁপড়ার মতো চতুর্দিক থেকে ফিরে এসে পূর্বস্থানে একত্রিত হচ্ছে। তখন সুলেমান কাকাকে বলতে শুনি, ‘যা ভেবেছিলাম তাই হলো।’

আমি উত্তর প্রান্তের মোড়ে তাকিয়ে দেখি বরিশাইল্লা হেকমত চাচা তার মোবাইল চা-পানের দোকানে চুটিয়ে বেচাবিক্রি করছে। যারা সাধারণত চা খায় না, তারাও কেউ কেউ চিনি ছাড়া লিকার চা খাচ্ছে। মুরব্বিরা আছে বলে চ্যাংড়ারা কেউ বড় বেশি সিগ্রেট কিনছে না। আর কিনলেও একটু দূরে সরে যাচ্ছে। বাবু হ্যাণ্ডমাইকের সুইচ আগেই অফ করেছিল। সে চা-ওয়ালার দিকে ইশারা করে বলে, ‘চল।’

আমি বলি, ‘না।’ আমার এখন চা কিংবা সিগ্রেট খাওয়ার ইচ্ছা নেই। তাছাড়া এটা উপযুক্ত সময়ও না। সবচেয়ে বড় কথা, এমন একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখনও আমি টুম্পার ভাল-মন্দ’র খোঁজ নিতে পারলাম না।

হঠাৎ দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে দেখি, আমার মা। মিরানা আন্টির সাথে সমান তালে হাত নেড়ে কথা বলছেন। আমার রক্ষণশীল মা লোকসমাগমে যেতে পছন্দ করেন না। বাবুর মাইকিং শুনেই হয়তো অনিচ্ছায় নেমে এসেছেন। মিরানা আন্টিও হয়তো আফটারশকের ভয়ে আবার ফিরে এসেছেন। সাথে টুম্পাও। আমার হৃৎপিণ্ডের ভাল্বে টিক্‌ টিক্‌ আওয়াজ শুনতে পাই। মাথায়ও একটা বুদ্ধি খেলে যায়। মা’কে টোপ বানিয়ে আমি টুম্পাদের সামনে যেতে মনস্থ করি।

আমি পাকা অভিনেতার মতো মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, ‘মা! তুমি কখন এলে? তুমি না নামতে চাইলে না।’

আমি আসলে মায়ের জবাবের অপেক্ষা করছি না; আমি আড়চোখে টুম্পার দিকে তাকাচ্ছি। মিরানা আন্টি ইতোমধ্যে একবার ঠোঁট উল্টিয়ে ফেলেছেন। আমি কালক্ষেপণ না করে সালাম ঠুকে বলি, ‘আন্টি, আপনি ভাল আছেন তো? কোনো অসুবিধা হয়নি তো? কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার! রিখটার স্কেল পাঁচ দশমিক আট।’

মিরানা আন্টি কলের পুতুলের মতো একবার মাথা ঘুরালেন, কিন্তু কোনো জবাব দিলেন না। তবে আমার মা মৃদু ভর্ৎসনা করে বললেন, ‘তুই এতক্ষণ ধরে রাস্তায় কী করছিস? যা, বাসায় যা।’

এমন একটা টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কোত্থেকে হেকমত চাচা তার ফ্লাস্ক-বালতি-প্যাটরা নিয়ে এসে যমদূতের মতো আমার পাশে দাঁড়ায়। আমি তার দিকে তাকাতেই সে বেনসনের প্যাকেট হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘মামা, দিমু নাকি একখান?’

আমি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে দাঁত কিড়মিড় করতেই সে সংযত হয়ে পিছুটান দেয়।

মুহূর্তের এই অস্বস্তিকর আবহ থেকে মুক্ত হবার জন্যই আমি সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে টুম্পাকে প্রশ্ন করি, ‘টুম্পা, তুমি কি ভয় পেয়েছিলে?’

টুম্পা কপট ভাব নিয়ে বলে, ‘ভূমিকম্প কি খুব আনন্দের বিষয়? ভয় তো সবাই পেয়েছে।’

আমি কথা লম্বা করার চেষ্টা করি, ‘তুমি ঠিক বলেছ। এটা আনন্দের বিষয় নয়। তবে অনেকে প্যানিক্‌ড হয়ে যায়। জানোই তো, অনেকদিন ধরে আমরা মারাত্মক ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছি। রিখটার স্কেল ছয় পেরিয়ে গেলে দেশের অবস্থা যে কী হবে!’

টুম্পাও বিজ্ঞের মতো বলে, ‘পুরো দেশের একই রকম অবস্থা হবে না; ক্ষয়ক্ষতি উৎপত্তিস্থলকেন্দ্রিক হবে।’

মিরানা আন্টি বিলক্ষণ বিরক্ত হচ্ছেন। তাঁর চেহারা কয়েক দফা মোচড় দিয়েছে। তিনি আর নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে টুম্পার দিকে ঘুরে বাজখাঁই গলায় বলে ওঠেন, ‘তুই কি ভূবিজ্ঞানী? তোর এত পণ্ডিতির দরকার কী? যা, বাসায় যা!’

টুম্পা আর দাঁড়িয়ে থাকতে সাহস পায় না। আমিও বুকের ভেতর রিখটার স্কেল সেভেনের কম্পন অনুভব করি এবং ভগ্নচিত্ত নিয়ে পেছন ফিরে বাবুকে খোঁজার ভান করি।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
ফয়জুল মহী খুব সুন্দর লিখেছেন। বেশ ভালো লাগলো।
মাহাবুব হাসান গল্পের হিউমারটাকে খুব উপভোগ করলাম। আপনার গল্পে দৃশ্যকল্প খুব ভালো ফোটে। সহজ সরল ভংগীতে গল্প এগোয়। ফলে সহজেই কানেক্টেড হওয়া যায়। এই গল্পটাও তাই। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আমি একটা শহরতলীর মধ্যে দাঁড়িয়ে গল্পের কুশীলবদের দেখছি!
আপনার সুন্দর মন্তব্য উৎসাহ উদ্দীপক। অনেক ধন্যবাদ।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

এমন ঝাকান দিছে ভাইজান, আমি তো অটো’র নিচে পইড়া যাইবার লইছিলাম।

১৯ নভেম্বর - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ১৮৩ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "মাতৃভাষা”
কবিতার বিষয় "মাতৃভাষা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ জানুয়ারী,২০২৬